somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

২০১০: বিজ্ঞানের বছর

২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ দুপুর ১:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডিসক্লেইমার: ইহা একটি বিজ্ঞান বিষয়ক পোস্ট। অতত্রব পাঠকগণ নিজ দায়িত্বে প্রবেশ করবেন। কারো ধর্মানুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হলে লেখক দায়ী নন।

২০১০। এ বছরটিকে অনায়াসে বিজ্ঞানের অগ্রগতির বছর বলা যেতে পারে। কারন ২০১০ এর পুরো বছরটাই ছিলো বিজ্ঞানের জগতে ঘটনাবহুল। এ বছর ইতিহাসে স্থান করে নেওয়ার মত বেশ কিছু আবিষ্কার যেমন হয়েছে তেমনি নতুন নতুন প্রশ্ন ও চ্যালেন্জের মুখোমুখিও দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাদেরকে। আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরাও এ বছর প্রচুর অবদান রেখেছেন। বিগত বছরের এমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও তাক লাগানো আবিষ্কার ও ঘটনা নিয়ে আজকের আয়োজন।

১. কৃত্রিম প্রাণ আবিষ্কার: কৃত্রিম প্রাণ আবিষ্কারের ঘটনাটি একাই হুলস্থূল ফেলে দেবার জন্য যথেষ্ট। মে মাসে বিজ্ঞানী ক্রেইগ ভেন্টর ও তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মত নিজে নিজে বংশবৃদ্ধির করতে পারে এমন ক্ষমতা সম্পন্ন কোষ তৈরি করে সাড়া ফেলে দেন। তাঁরা ল্যাবরেটরীতে কৃত্রিমভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যক্টেরিয়া ডি.এন.এ তৈরি করে সেটি অন্য একটি ব্যক্টেরিয়ার কোষ দেহে প্রবেশ করিয়ে দেন এবং লক্ষ্য করেন ব্যক্টেরিয়াটি সংখ্যায় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাঁদের উদ্ভাবিত ডি.এন.এ টি এক প্রজন্ম থেকে বংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে অন্য প্রজন্মে গমন করছে।


চিত্র: কৃত্রিম ডি.এন.এ. নির্মিত ব্যক্টেরিয়ার বংশ বৃদ্ধি

২. লেড আয়ন সংঘর্ষ: সার্নের বিজ্ঞানীরা নভেম্বর মাসে প্রথমবারের মত দুটি লেড বা সীসার আয়নের ঝাঁকের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটাতে সক্ষম হন। এই সংঘর্ষের ফলে বিগ ব্যাং এর পরবর্তী অতি ক্ষুদ্র সময়ের (এক সেকেন্ডের বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ) মধ্যে মহাবিশ্বের অবস্থা কেমন ছিল সেই সম্বন্ধে ধারনা লাভ করেন। যদিও এই পরীক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো সংঘর্ষের মাধ্যমে পরমানুর মূল কণিকা হিগস বোসন উদ্ভাবন। হিগস না পাওয়া গেলেও এ পরীক্ষা থেকে প্রাপ্তিও কম নয়। তাছাড়া এই পরীক্ষারই ধারাবাহিকতায় এ বছর আরো কিছু পরীক্ষা চালানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।


ALICE: লেড আয়ন সংঘর্ষে ব্যবহৃত ডিটেক্টর

৩. এন্টি-ম্যাটার তৈরি: এ বছরই প্রথমবারের মত এন্টি ম্যাটার বা প্রতি পদার্থ তৈরি ও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এন্টি-ম্যাটার হলো স্বাভাবিক পদার্থের বিপরীত বস্তু, যা সমপরিমান স্বাভাবিক পদার্থের সংস্পর্শে এলে উভয়েই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং বিপুল পরিমান শক্তি উৎপন্ন হয়। ধারনা করা হয় মহবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম দিকে পদার্থ ও প্রতি-পদার্থ তৈরি হয়েছিলো। এর মধ্যে প্রতি-পদার্থ, পদার্থের সংস্পর্শে এসে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্হ হয়ে যায়, কিন্তু স্বাভাবিক বা দৃশ্যমান পদার্থ কিছুটা বেশী তৈরি হওয়ায় সেই অতিরিক্ত পদার্থ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং সমগ্র মহাবিশ্ব তৈরি করে।

৪. প্রাণের উদ্ভবকালীন পরিবেশ: বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন প্রাণের উদ্ভব ঘটেছিলো বিষাক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতিতে। শুধু তাই নয় প্রথম দিকে জীবের বংশবৃদ্ধিও হয়েছিলো আর্সেনিকের সহায়তায়। জীবের শক্তি উৎপাদনে ফরফরাস একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। বর্তমানে সকল জীবদেহে শক্তি উৎপাদনে ফসফরাস অপরিহার্য। আর্সেনিক, ফসফরাসেরই সমগোত্রীয় একটি পদার্থ যা সৃষ্টির শুরুতে ফসফরাসের বিকল্পরূপে জীবদেহে আবির্ভূত হয়।



৫. কৃত্রিম ফুসফুস ও কিডনী: কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি ও সংযোজন এখনো সায়েন্স ফিকশনের বিষয় হলেও এবছর এ বিষয়ে খুব বড় অগ্রগতি হয়েছে। গবেষকরা ইঁদুরের ফুসফুসের প্রায় ৯৫% কাজ করতে সক্ষম একটি ফুসফুস কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে সক্ষম হন। তাঁরা আশা করছেন খুব শিঘ্রই মানুষের দেহে প্রতিস্থাপনের উপযোগী ফুসফুস তৈরি করতে পারবেন। বিশেষ করে ফুসফুসের ক্যন্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কৃত্রিম ফুসফুস অত্যন্ত সহায়ক হবে।
Click This Link
অপর দিকে কৃত্রিম কিডনী আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী শুভ রায়। তাঁর মতে কৃত্রিম কিডনি আসল অঙ্গের মতোই কাজ করতে সক্ষম৷ অর্থাৎ রক্তের বিষাক্ত পদার্থ ছাঁকা থেকে শুরু করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও ভিটামিন ডি তৈরি, সব কাজই করতে পারবে এই কৃত্রিম কিডনি। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ও তাঁর আরো চল্লিশজন সহকর্মী কৃত্রিম কিডনী তৈরিতে অংশ নেন।


৬. ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক মশা:
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক মশার মধ্যে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছেন। এই মশা ম্যালেরিয়া ছড়ানোতো বন্ধ করবেই, নিজেরা এই জীবানুর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করবে। এ মশা পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হলে তা অন্যান্য রোগ সৃষ্টিকারী মশার চেয়ে বেশী প্রতিরোধক্ষম হবে। ফলে কয়েক বছরের মধ্য এই মশা অন্য মশাগুলোর স্থান দখল করে ফেলবে। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। এ ধরনের মশা ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে গবেষকরা আশা করছেন।

৭. পরিবেশ বান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তি: নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহার উপযোগী করায় ২০১০ সালে বেশ কিছু অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. জামাল উদ্দিন সবচেয়ে বেশী হারে রূপান্তরযোগ্য সৌর কোষ আবিষ্কার করেছেন। তার উদ্ভাবিত কোষ ৪৩.৪% সূর্যালোককে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করতে পারে। এর আগে এই হার ছিলো ৩০% এর কাছাকাছি। এছাড়াও এ বছর শক্তি উৎপাদনে প্রচুর নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এবছরই প্রথম সৌর চালিত উড়োজাহাজ তৈরি হয়েছে যা একটানা ২৭ঘন্টা আকাশে উড়েছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বড় বড় শহর ও স্থাপনায় সৌর, বায়ু, সমুদ্রস্রোত, এবং আবর্জনা ব্যবহার করে নতুন নতুন শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।

এসব ছাড়াও উল্ল্যেখ করার মত আরো অনেক আবিষ্কার ১০১০ সালে হয়েছে। জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে; শনি গ্রহের উপগ্রহ টাইটানে বরফের আগ্নেয়গিরি ও অপর একটি উপগ্রহে তরল পানি আবিষ্কৃত হয়েছে। ছায়াপথের বিশাল অংশ জুড়ে জায়ান্ট বাবল, মহাশুন্যে মহা-আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরন, দ্বি-নাক্ষত্রিক সৌরজগৎ ব্যসস্থার অস্থিতিশীলতা (যে সব সৌরজগত দুটি তারা নিয়ে গঠিত সেসব ব্যবস্থায় গ্রহগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হবে, কিংবা গ্রহগুলোর পরিবেশে এত দ্রূত পরিবর্তন ঘটবে যে সেখানে প্রাণের উদ্ভব হওয়া সম্ভব হবে না) এবং কিছু কিছু নক্ষত্রের ভর পূর্বের চেয়ে আরো যথার্থ ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। পরিবহন ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে প্রচুর আবিষ্কার রয়েছে যার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলো বৈদ্যুতিক গাড়ি, জেটপ্যাক, স্ট্র্যাডেলিং বাস, শিক্ষাদানকারী রোবট, স্মার্টফোন, থ্রিডি টিভি প্রভৃতি। চিকিৎসা ক্ষেত্রে কিছু বড় অগ্রগতির কথা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া হাঁটা-চলায় অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ই-লেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী আব্দুল কাদের পাটের জীনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার করেছেন।

স্থানাভাবে আরো অনেক আবিষ্কারের কথা আলোচনা করা গেলো না। এদের মধ্যে অনেকগুলো হয়তো এ বছর ব্যপক সাড়া তৈরি করবে। আশা করি এ বছর বিজ্ঞান আমাদের আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে আর গত বছরের মত এ বছরও আমাদের দেশের বিজ্ঞানীগণ সারা পৃথিবীজুড়ে আলোচিত হবেন। বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং মানব কল্যানে এর প্রয়োগ কামনা করে আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করছি।

(লেখাটি বিজ্ঞান ত্রৈমাসিক 'খবর-দার' এর জানুয়ারী-মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মার্চ, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:৩০
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×