ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ২০, ২১ ও ২২ আগস্টের ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশব্যাপী সহিংস ঘটনা সৃষ্টির নেপথ্যে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যুগপৎভাবে ছাত্রদের উস্কে দিয়ে জনগণ ও সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করানোর প্রয়াস চালিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার নীলনকশার অংশ হিসেবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল ঘটনার সময় খালেদা জিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ছাত্র আন্দোলনকে দীর্ঘায়িত করার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিয়েছিলেন। বেগম জিয়ার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী হেলাল সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে আন্দোলনের কৌশল সম্পর্কে অবহিত করতেন। একইভাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে কয়েকজন আইনজীবী উদ্ভ‚ত আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে অধ্যাপক আনোয়ারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে আটকের পর ব্যাপক পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানা যায়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পুরো ঘটনার সঙ্গে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশক’জন শিক্ষক, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা, দুটি টিভি চ্যানেলের মালিক, একজন ব্যাংকার ও একজন শিল্পপতি জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ, সাবেক ভিসি অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী, অধ্যাপক মিজানুর রহমান, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, অধ্যাপক হোসেন মনসুর, অধ্যাপক নূরুর রহমান খান, ড. জিনাত হুদা, ড. তাজমেরী, অধ্যাপক ফখরুল আলম, অধ্যাপক আবদুস সামাদ, অধ্যাপক জিএম চৌধুরী, অধ্যাপক সদরুল আমিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইদুর রহমান, অধ্যাপক আবদুস সোবহান, অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সিএসবির কর্ণধার ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে ফজলুল কাদের চৌধুরী, একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম, র্যাংগস গ্র“পের কর্ণধার আবদুর রউফ চৌধুরী, ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভীন হক সিকদার, মোকাদ্দেম হোসেন, ড. সাইফুল ইসলাম, ড. সদরুল, ড. হোসেন মাসুদ, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম, ছাত্রলীগ নেতা আশফাকুর রহমান, ঢাবি ছাত্রদল সভাপতি হাসান মামুন, ঢাবি ছাত্র মেহেদী ও শ্রাবণ জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে।
সূত্র মতে, ২০ আগস্ট পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ঢাবি ছাত্র মেহেদী ও শ্রাবণকে সেনাসদস্যদের সঙ্গে গোলযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে খেলার মাঠে পাঠান। পরে মেহেদী এবং শ্রাবণের মাধ্যমে এক সেনাসদস্যের সঙ্গে ঘটনার সূত্রপাত ঘটানো হয়। এর রেশ ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর চালানো হয়। অধ্যাপক আনোয়ার, অধ্যাপক হারুন ও অধ্যাপক সদরুল ছাত্রদের আন্দোলনের দিকে ধাবিত করতে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। তারা জরুরি অবস্থা তুলে নেয়াসহ বর্তমান সরকারের পতনের আন্দোলন শুরুর জন্য সাধারণ ছাত্রদের ইন্ধন যোগান।
সূত্র আরও জানায়, ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে হকার, রিকশাচালক ও স্বল্প আয়ের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে বিএনপির সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি হাজী সেলিমের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের যোগান দেয়া হয়। অধ্যাপক আনোয়ার, হারুন ও সদরুল বিভিন্ন সংগঠনের ছাত্র নেতাদের মাধ্যমে এই অর্থ দিয়ে ছাত্রদের আন্দোলনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। ২১ আগষ্ট ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় অধ্যাপক আনোয়ার ও হারুনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক, অধ্যাপক আজাদ প্রমুখ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক সদরুল আমিনের নেতৃত্বে বেশকিছু উস্কানিমূলক প্র¯-াব গ্রহণ করান। সরকার ২২ আগস্ট দুপুর ১২টার আগেই ক্যাম্পাস থেকে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার ও ঘটনা তদšে- বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠনের ঘোষণা দিলে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তখন ছাত্রছাত্রীদের উজ্জীবিত করতে অধ্যাপক আনোয়ার ও হারুনের নেতৃত্বে একদল শিক্ষক প্রথমে অপরাজেয় বাংলায় এবং পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সমবেত হন। সেখানে তারা জরুরি অবস্থা তুলে নেয়ার এক দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে নেয়ার জন্য ছাত্রছাত্রীদের আহ্বান জানান। সেদিন পরিকল্পিতভাবে কিছু শিক্ষকের ইন্ধনে ছাত্রদের একটি অংশ সহিংস ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষক নেতৃবৃন্দ সেদিন ঢাকার বাইরেও ছাত্রদের এ আন্দোলনকে উস্কে দেয়ার জন্য টেলিফোনে সমমনা সহকর্মীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে সূত্র জানায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সরকার ২২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খালি করার নির্দেশ দেয়। কিš' অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন তার গাড়িচালকের মাধ্যমে ছাত্রদের হলে অবস্থান করতে মাইকিং করেন। নেপথ্যে থেকে তাকে উৎসাহ ও সহযোগিতা দেন সাবেক ভিসি অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী।
জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা গেছে, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন কয়েক সহযোগীকে নিয়ে সম্প্রতি ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তা শ্রীবা¯-বের সঙ্গে গুলশানের একাধিক স্থানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গোপন বৈঠক ও পরিকল্পনা করেন। অধ্যাপক আনোয়ার বুয়েটের ভিসির সঙ্গে দেখা করে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সহযোগিতা কামনা করেন। সূত্র মতে, এ চক্রটি সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য সিএসবির কর্ণধার ফজলুল কাদের চৌধুরী ও ইটিভি চেয়ারম্যান আবদুস সালামের সহযোগিতা চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি টিভি চ্যানেল সারাদেশে ছাত্র-জনতার মধ্যে উত্তেজনা ছড়াতে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইন্ধনদাতা অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ১৯৭৪-১৯৭৬ সালে ঢাকা শহরের গণবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। ওই সময় শহরে সব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। তিনি আরবান গেরিলা, মাইন হ্যান্ডলিংয়ের ওপর বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। ১৯৭৬ সালে ভারতীয় হাইকমিশনের সমর সেন অপহরণ অপারেশনে অধ্যাপক আনোয়ার ছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী। ওই সূত্র জানিয়েছে, অধ্যাপক আনোয়ার ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশে আগামী ফেব্র“য়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ক্ষেত্র প্র¯'তের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আর তা সফল করা সম্ভব না হলে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দেয়ার পরিকল্পনা করেন। জনগণের আশা-ভরসা ও শেষ অবলম্বন সেনাবাহিনীকে হেয়-বিতর্কিত করে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে তিনি নিজ স্ত্রী আয়েশা আক্তারকে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের (অনার্স-মাস্টার্স) ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেন। অধ্যাপক আনোয়ার প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিভাগের শিক্ষক। কলেজটি তার অনুষদের আওতাভুক্ত হওয়ায় তিনি অবৈধ প্রভাব খাটাতে সমর্থ হন। অথচ উপাধ্যক্ষ হিসেবে অধ্যাপিকা আয়েশা আক্তারের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এরপরও স্বামীর প্রভাবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ পান।
ওই সূত্র জানিয়েছে, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও হারুন-অর-রশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষের জন্য উস্কানি দিলেও এই দুই শিক্ষকের পুত্র-কন্যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। অধ্যাপক আনোয়ারের ছেলে সানজিদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। অধ্যাপক হারুনের ছেলে ইশতিয়াক রশিদ ঢাবিতে পড়লেও মেয়ে ব্র্যাকে পড়ে। অধ্যাপক হারুনের বিরুদ্ধে ভুয়া ছাত্র ভর্তির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে। অর্থের বিনিময়ে তার ফ্যাকাল্টির ৩৬ ছাত্রকে ফার্স্ট ক্লাস পাইয়ে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
।। যুগান্তর : ২৬.০৮.২০০৭ ।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



