কোথায় যে পাস এইসব ফালতু কথাবার্তা, চিৎকার করে ওঠে শান্ত।
একই অপরাধে শান্তর ছোট বোনও ধমক খেয়েছে বেশ কিছুদিন আগে।
শেষবার এই ধরনের ঘটনা ঘটালেন শান্তর মামা। বড় মামা। তিনি তার বন্ধুর মেয়ের বিয়ে প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এই কথাটা-ই টেনে আনলেন।
শুনে শান্ত একরকম শান্ত হয়েই বসে রইলো। কেমন যেন হয়ে গেল। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এখানে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর সাহস বা পরিস্থিতি কোনোটাই অবশ্য নেই তার। একরকম অসহায় সে। সে তো তার অপছন্দের একটা কথা বলার জন্য মামার উপরে রাগ দেখাতে পারেনা। তাই কিছুক্ষণ বসে থেকে মিনমিন করে কি যেন বলল। তারপর ওঠে চলে গেলো।
সেখানে বসে থাকা মামা, মামি, মামাতে ভাই বোন, শান্তর মা সবাই হা করে তাকিয়ে রইলো। কিছু বুঝলো না। একমাত্র শান্তর ছোট বোন কিছু একটা ধারণা করে নিল। চটজলদি কি এক কথা বলে সবার মনোযোগ আড্ডায় ফিরিয়ে নিল সে।
২.
এইচএসসি পাশ করা প্রেম এখন আর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা না। উল্লেখযোগ্য ঘটনা না সেই সময়ের আগে শান্তর এই প্রেমে পড়াও। কম বয়সী প্রেমে ফিলিংসের মাত্রা এতো প্রবল থাকে যে সেখানে হৃদয় নামের বস্তুটা একটা দ্রুতগতির গাড়ীতে রূপ নেয়। এমনও বলা যায়, এ গাড়ীকে থামাবার জন্য সেখানে উপযুক্ত ব্রেক চেপে ধরার ব্যবস্থাও থাকেনা। শান্তর অবস্থা হয়েছে তেমন-ই। এসএসসি পরীক্ষার সময় আরেক স্কুল থেকে যে মেয়েটি তার পাশে বসেছিল পরীক্ষা দিতে, সে মেয়েটিকে তার ভীষণ ভালো লেগে যায়। কম বয়সে ভালোলাগাটা দীর্ঘক্ষণ ভালোলাগায় থাকেনা। যত দ্রুত সম্ভব রুপান্তরিত হয় ভালোবাসায়। ব্যতিক্রম হয়নি শান্তর ক্ষেত্রেও। সে ভালোবাসায় আটকে যায় এবং ভয়ংকরভাবে যেটা তার পরীক্ষার হল থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।
শান্ত পরীক্ষার হলেই বেশ কিছু আত্মঘাতি কাজ করেছিল। কোনো কারন ছাড়াই কিছুক্ষণ পরপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতো। সবগুলো পরীাতে শান্ত যতবার নিলা নামের মেয়েটার দিকে তাকিয়েছে, ততবার হয়তো তার খাতার দিকেও তাকায়নি। তবে ভাগ্য ভালো এতো কিছুর পরও শান্ত কোনোভাবে বেঁচে গেছে। যদিও একে বেঁচে যাওয়া বলে না। কারণ, শান্তর মতো ছাত্রদের জন্য এটাকে একরকম পঙ্গুত্ব বরণ বলা যায়। এমন একটা গ্রেড নিয়ে সে পাশ করেছে, যা শান্তর নিজেরই এবং তার মা বাবার কারোরই প্রত্যাশিত ছিল না।
যে রেজাল্ট নিয়ে প্রচুর কথাও শুনতে হয়েছে শান্তকে।
৩.
একটা সময় রেজাল্টের কারনে মা বাবার কথা অসহ্য লাগতো শান্তর। বিরক্তি ধরে যেত সবার উপরে। আজ মাস ছয়েক পর নিজের রেজাল্টের কারনে নিজের উপরই প্রচণ্ড বিরক্ত শান্ত। এই রেজাল্টই এখন তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানের একটা কলেজে ভর্তি হতে হলো শান্তকে। যে মেয়েটার জন্য এতো কিছু সে মেয়েটার কাছে পৌঁছাতে পারলেও সব দিক দিয়ে শান্তিতে নেই শান্ত। মেয়েটা এখন কাছের হয়েও অনেক দূরের। মেয়েটার সাথে একটা ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে শান্তর। কিন্তু ভালো ষ্টুডেন্ট হলে যে সমস্যা হয়, মেয়েটা বন্ধুত্ব পর্যন্ত দাঁড়াতে রাজী। এর বেশি যেতে চায় না এখন। মেয়েটার মুখে সারাক্ষণই তার মা বাবা আর ক্যারিয়ারের কথা। শান্ত যতবার-ই এসব নিয়ে কথা বলতে গেছে ততবার-ই নিলার একই কথা, এখনই এসব সম্পর্কে আমি যেতে চাইনা শান্ত। তুমি তো জানো, মেডিক্যালের পড়াশুনা কত টাফ?
শান্ত চুপ থাকে। কথা বলতে পারেনা। এর বেশি কি-ই-বা বলার আছে তার?
শান্তর ভেতর জ্বলে পুড়ে যায়। তবে এ দহন আরো তীব্র হয় যেদিন নিলা হোষ্টেলে সিট পেয়ে ঢাকায় চলে যায়।
তারপর থেকে বদলে যেতে থাকে শান্তর গল্প।
শান্ত যতই প্রেমের ব্যাপারে সিরিয়াস কথা আশা করে, নিলা ততই সিরিয়াসলি তার লেখাপড়া মা বাবা আর ক্যারিয়ারের কথা বোঝাতে চায়।
এর মধ্যে অবশ্য একটা আলো জ্বালিয়ে রাখে নিলা, শোন শান্ত তোমার আমার এই সম্পর্ক যে কোনোদিন অন্যকিছুতে টার্ন করবেনা তা কিন্তু না। তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমি কিন্তু তোমাকে যথেষ্ট পছন্দ করি। তবে আমার সে পছন্দ আপাতত আমার মা বাবা অথবা আমার পড়াশুনার চেয়ে বেশি না। কিন্তু এই পছন্দ যে একদিন সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাবে না সেটাও আমি বলছি না।
শান্ত শুধু কথা শুনে যায়। কিছু বলতে পারে না। বলার কিছু নেইও তার। শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
৪.
এভাবে সম্পর্কের বয়স বাড়তে থাকে। বয়স বাড়তে থাকে শান্তর। বয়স বাড়তে থাকে নিলারও। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দুটি বিপরীত ঘটনা ঘটতে থাকে। একদিকে শান্তর ভালোবাসা ব্যাপকতর হতে থাকে, অন্যদিকে ক্রমশই জীবনকে বুঝতে শেখা নিলার ভালোলাগা ম্লাণ হতে থাকে। সে বুঝতে পারে ডাক্তারী জীবন খুব কঠিন। ডাক্তারী জীবনের সাথে অন্য পেশার মানুষের সমন্বয় করে চলা বেশ কঠিন হবে।
তাই তাদের ভালোবাসার রেললাইন আর সমান্তুরাল চলে না। বেঁকে যেতে শুরু করে। যেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা শান্ত।
৫.
নীলা এবার সেকেন্ড ইয়ারে। প্রচুর চাপ পড়াশুনায়। প্রতিদিন বেশ কয়েকটা ক্লাস, প্র্যাকটিক্যাল আর রুমে এসে পড়াশুনায় খুবই ব্যাস্ত থাকে সে। ফোনের পর ফোন দিয়ে যায় শান্ত। ধরতে পারেনা নিলা। ধরলেও দুয়েক মিনিটের মধ্যেই রেখে দিতে হয়। তার নিজের তো বটে-ই, তার রুমমেটের সমস্যা হয়। এতে করে তাদের সম্পর্কের গ্রাফ স্কেচ ক্রমশ নিম্মমুখি হতে শুরু করে। তবে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে শান্ত। একসময় এসে সেটা হয়তো সম্ভব হবে না অনুমান করে একদিন কিছু কঠিন কথা বলে ফেলে, আমার সাথে তুমি যা করছো তা কি ঠিক হচ্ছে?
নিলা জবাব দেয় না।
শান্ত বলে, এ আচরনের জন্য তুমি কি দুঃখিত না?
নিলা চুপ করে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলে, শান্ত আমি ভুল করি কম। যে কারনে কখনো কাউকে সরিও বলি না।
শান্তর রাগটা আরো বেড়ে যায়। সে এবার আরেকটু কঠিন হয়ে বলে ফেলে, কিন্তু তুমি আমার সাথে ভুল করছো। খুব-ই ভুল। আমাকে কষ্ট দিচ্ছ।
নিলা চুপ। নিরুত্তর।
ঠিক আছে দাও। তবে বলে রাখি এমন দিন হয়তো আসবে, তুমি অনুতপ্ত হবে। আমার সামনে দাঁড়িয়েই তোমাকে হয়তো সরি বলতে হবে।
৬.
এ বছরই কিছু কাকাতালিয় ঘটনা ঘটে যায়।
পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা প্রতিবছর অনেক পূর্ণবয়স্ক মানুষের পাশাপাশি কিছু কম বয়সী মানুষের জীবনও প্রত্যাহার করে নেন। এ বছর সে তালিকায় শান্তর নামও হয়তো ঢুকে গিয়েছিল। যে কারনে চলে যেতে হয়েছে শান্তকেও।
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতবাক। হতবাক শান্তর মা। বাবা। বোন। হতবাক আত্মীয়স্বজণও। আর অসম্ভব হতবাক নিলা নামের মেয়েটা। অনেকদিন শান্তর ফোন না পেয়ে নিজেই ফোন করে শান্তর বোনের কাছ থেকে খবরটা পায়। সে হতবাক হয় শান্তর বোন তাকে যখন জিজ্ঞাসা করে, আপু কি মেডিক্যাল ষ্টুডেন্ট?
কেন?
প্রশ্ন করে অবশ্য কোনো জবাব পায়নি নিলা। শান্তর বোন বলেনি।
অবশ্য বলতেও চায়নি। সে এমন একটা কিছু ধারণা করেছিল সবসময়। বলেনি এই ভেবে, এতে মেয়েটার দুঃখ আরো বাড়বে। কারণ, মৃত্যুর কিছুদিন আগে শান্ত তার মা বাবাকে একটা বিষয়ে রাজী করিয়েছিল। যে যদি কখনো মারা যায় তবে তার দেহ যেন কোনো মেডিক্যালে দান করে দেয়।
সে সেদিন মজা করে শান্তকে বলেছিল, ভাইয়া এটা আম্মু আব্বুকে না বলে তোমার নাতি নাতনিদের বলে যেও।
কিন্তু ওই ঘটনা যে এতো তাড়াতাড়ি ঘটে যাবে কে জানতো?
৭.
সময় অনেক চলে গেছে।
নিলা এবার ফোর্থ ইয়ারে। অনেকটা ভুলেই গেছে শান্তকে। তবে মাঝে মাঝে তার কথা মনে হলেই ভেতরটা কেমন যে হু হু করে ওঠে। প্রচন্ড খারাপ হয়ে যায় মন। মেডিক্যাল জীবনে লেখাপড়া, প্র্যাকটিক্যাল, ওয়ার্ড করে করে অনেক মৃত্যু দেখেছে। মৃত্যুর মানবিক বিষয়টা অনেকটা ম্লাণ ছিল তার কাছে। এটা তাদের শিক্ষার অংশ। কিন্তু শান্তর মৃত্যুর কথা ভেবে সে ভীষণ মানবিক হয়ে যায়। চোখে পানি চলে আসে।
মৃতদেহ নিয়ে তাদের যে প্র্যাকটিক্যাল হয় সেখানে গেলেই নিলা খুব বিমর্ষ থাকে। যেমন বিমর্ষ আজও। আজও তাদের প্র্যাকটিক্যাল হচ্ছে। একটি কম বয়সী ছেলের দেহ নিয়ে প্র্যাকটিক্যাল।
কাসে ছেলেটার মৃতদেহ দেখেই কেমন যেন হয়ে যায় নিলা। তার মনটা খারাপ হয়। সবাই এক এক করে মৃতদেহটার কাছে যাচ্ছে। এটা সেটা পরীক্ষা করে দেখছে। সে ধারাবাকিতায় নিলাকেও আসতে হলো মৃতদেহের সামনে। নিলা এসেই মৃতদেহের বুকটাতে হাত রাখলো। মুহুর্তেই কেঁপে ওঠল। ঘটনা কি? হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া প্রবাহ চলছে মনে হলো। বুক কেঁপে ওঠল নিলার। সে বুঝতে পারছেনা কি হচ্ছে? তার হাত পা কাঁপছে। চিৎকার করে বিষয়টা জানাতে ইচ্ছে করছে। তবে চিৎকার দিতে গিয়েও স্বর নিচু করে ফেলল। তার মনে পড়ল মৃতঘোষিত কোনো প্রাণে জীবনীশক্তি পাওয়া যাওয়ার কোনো প্রমাণ মেডিক্যাল সায়েন্সে নেই। কিন্তু ততণে ক্লাসের স্যারসহ সবাই হা করে আছে নিলার দিকে। নিলা লজ্জায় তাদের দিকে তাকাতে পারছে না। মাথা নিচু করে মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পার হয়ে যাবার পর নিলা কিছুটা স্বাভাবিক হলো। কিন্তু মাথা তুলল না। সে মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল, সরি।
(গল্পটির অর্ধেক উৎসর্গ করা হলো আগামী দিনের ডাক্তার এবং তুখোড় ব্লগার আলীম আল রাজীকে। বাকী অর্ধেক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজির এক ফেসবুক ফ্রেন্ডকে। রাজী পৌছিয়ে দিয়েন)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুন, ২০১১ রাত ১২:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



