৪.
পরদিন বন্ধুর সঙ্গে কিছুটা সময় ব্যবসায়িক কাজ করে আবার বেরোলাম। গন্তব্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। আমি আগে দেখলেও রিগ্যানের অদেখা। তাই রিগ্যান দেখছিল বিস্ময় ভরা চোখে আর আমি দেখছিলাম আগেরবার যা দেখেছি সব ঠিক আছে নাকি সেই দৃষ্টিতে। তবে আগেরবার ভেতরে ঢুকতে ব্যর্থ হলেও এবার হলাম না। বিদেশীদের এন্ট্রি ফি ৫০০ রুপি শুনে আমরা বাইরেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের স্মৃতি নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। এবার তা করলাম না। এবার আমরা লোকাল ভাব নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। অতি চালাকি হিসেবে রিগ্যান তার টিকিট চেকারদের সামনে নিজেকে ইন্ডিয়ান প্রমাণের জন্য 'নেহি' 'নেহি' করতে করতে ঢুকল। তাই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবার আমাদের কাছে ভিক্টোরের মেমোরি হয়ে রইল।
দুপুরে খাবার এবং বিশ্রামের জন্য আবার হোটেলে আমাদের ফিরে আসা। রাতের গন্তব্য কফি হাউস।
খাওয়া দাওয়া শেষে রিগ্যানের প্রশ্ন কফি হাউস কী? বললাম, এটা কলকাতার একটা বিখ্যাত জায়গা। কফি খাওয়া যায়। যেখানে সব বিখ্যাত লোকেরা কফি খেতে আসেন। রিগ্যান কী বুঝল কে জানে, সে বলল তাহলে তো সুটেড বুটেড হয়ে যেতে হবে। আমি বললাম, তা তো অবশ্যই। না হলে তো আমাদের সম্মান থাকে না। সে প্রকৃত অবস্থায় তা-ই করল।
আমরা অনেক খুঁজে কফি হাউসে গিয়ে বসলাম।
ইহা মান্না দে'র বিখ্যাত কফি হাউস। তবে এটা ক্রয়সূত্রে মান্না দে'র কফি হাউস নয়। গান রচনার সূত্রে। যেখানে চেয়ারের জন্য পাশে দাঁড়িয়ে কলকাতার নানা এলাকার পঞ্চায়েত বা তৃণমূলের আলোচনা থেকে শুরু করে বিদেশী বেনিয়া, সাম্রাজ্যবাদ, আগ্রাসনের আলোচনা হজম করতে হয়। সেটা ঠিক কতক্ষণ চলবে তা কেউ বলতে পারবেনা। একটা সময় চেয়ার পেলে পরিষ্কার টেবিল পেলাম না। চেয়ার ও পরিষ্কার টেবিল পেলে খাবার অর্ডার দেয়ার লোক পেলাম না। লোক পেলেও ডাক শোনাতে পারলাম না। ডাক শুনলেও 'দাদা বছুননা' টাইপ কথা ছাড়া বেশি কথা শুনলামন না। এত কিছুর পর একটা সময় গিয়ে তারা দেবতার মতো মুখ তুলে তাকালো এবং নিয়ে আসসো কাঙ্খিত সেই কফি। অনেকটা বিস্বাদ সেই কফি। আমার ধারণা, মান্না দে কফি হাউস নিয়ে গান রচনার মাধ্যমে কফি হাউসের প্রচারণা চালিয়ে কফির মান খারাপ করে দিয়েছেন। তবে কলকাতাবাসীকে দেখলে মনে হবে এর স্বাদ অমৃত। কারণ তারা এই এক কাপ কফি থেকে শুধু কফির স্বাদ নেয় না, নেয় শিল্পের স্বাদ, সাহিত্যের স্বাদ, চেতনার স্বাদ, বিপ্লবের স্বাদ,
আর আমরা নেই কষ্টের স্বাদ। শালা! এত নামডাক শুনলাম, টাকা খরচ করে আইলাম, দাম দিয়া কফিও কিনলাম, খাইতে স্বাদ হইব না কেন?
আমি আর রিগ্যান তাই বিস্বাদ এক কফি খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে সেখান থেকে বেরোলাম।
রাতে আমাদের গন্তব্য আবার সিনেমা হল। ইচ্ছে না থাকলে ছবি দেখতে যাওয়া আমাদের। ভাবটা এমন, ইন্ডিয়া আসলাম অথচ বলিউড সিনেমার উন্নয়নে কিছু খরচ করে যাব না, তা কী করে হয়!
৫.
পরদিন আমাদের ছিল গন্তব্যহীন ঘোরাঘুরি। কোথায় যাব কোথায় যাব ভাবতে ভাবতে দিন শেষ হয়ে যাওয়া আর কী। রিগ্যানের সঙ্গে ঘোরার মজাই আলাদা। এক বাঁশিওলার কাছ থেকে বাঁশি কেনার কথা বলে যেভাবে বাঁশি বাজালো তা মুগ্ধ হওয়ার মতো। আবার এক কি বোর্ডের দোকানে ঢুকে যেভাবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সুর বাজালো তারও জবাব নেই।
জানতে চাইলাম এগুলো কোথায় শিখেছে?
জবাব না দিয়ে আধ্যাত্মিক ভাষায় বলল, আমারে দেইখা কি বোঝা যায় এই হুদয়ে কত আঠা?
এই ফেভিকলের দেশে আমি তাই নতুন আঠার সন্ধান করলাম না। তবে তার বাঁশি কি বোর্ড দুই বাজছিল কানে।
হঠাৎ সেসবকে ছাপিয়ে কোথা থেকে যেন ঘণ্টা বাজা শুরু হলো। বুঝতে পারছিলাম না ঘটনা কী? এটা কিসের ঘণ্টা এটা?
বুঝতে পারলাম, বিদায়ের ঘণ্টা এটা। বিদায়ের সময় হয়ে গেছে। দেশ ডাকছে। তার চেয়ে বেশি ডাকছে অফিস। কারণ ছুটি শেষ। পরদিন সকালের টিকিট করে রাতে আবার সিনেমা হলের দিকে রওয়ানা দিলাম। কারণ রাত হলেই মনে হয় কোত্থেকে যেন সালমান, শাহরুখ, ক্যাটরিনা, দীপিকারা ডাকে।
চার দিনের ভ্রমণ এবং নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরছি। পেছনে পড়ে রইল নিউমার্কেট, ফায়ার স্টেশনের গলি, মারকুইস স্ট্রিট, বিহারি হোটেল, মিষ্টি লাচ্ছি, শেখর আহমেদ আরও কত কত কিছু! দেশে এসেও কয়েকদিন সে স্মৃতি তাড়া করতো। তাড়া করতো সন্ধ্যের পর হিন্দী সিনেমা দেখার অভ্যাস। তাড়া করতো ক্যাটরিনা, দীপিকাদের ডাকও। যে
ডাক শুনে মন খারাপ হতো। দীর্ঘশ্বাস চলে আসতো। মনে মনে বললাম, একটু ওয়েট করো। আবার আসছি।
ছবি : ১. ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
২. কফি হাউজ
৩. শেখর ভাই
৪.সায়েন্স সিটিতে রিগ্যান

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


