আমারও আগে থেকেই প্ল্যান চললেও অফিসের ছুটিটাই মোটামুটি বড় বিষয় ছিল। ছুটি পাওয়া মানেই বর্ডারের ওপাশে এক পা চলে যাওয়া।
তাই যখন ছুটি মঞ্জুর হলো তখন মূলত আমি অফিস থেকে বাইরে পা বাড়াইনি আমার পা তখন বেনাপোল পেরিয়ে পেট্রাপোলে।
তখনই বাসের টিকিট কনফার্ম করে নিলাম।
যে টিকিট নিয়ে পরদিন গভীর রাতে গিয়ে হাজির হলাম বাস কাউন্টারে। গন্তব্য কলকাতা। টিকিট কাউন্টার চিরকালই আমার কাছে প্রিয়। মানুষের বৈচিত্র্য এখানে খুব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। ভালো লাগে। বিচিত্র মানুষ সব। কাউন্টারে তাদের কত কাজ। কত ভাব। এমন অনেক কাজ করা একজন আমাদের সঙ্গে কলকাতা যাবার গাড়িতে উঠে এসে পান্থপথের মোড়ে জানতে পারলেন তার চট্টগ্রাম যাবার গাড়ি এটা না।
২.
আমার ভোর চিরকালই অন্য শহরের গল্প বলে। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। এমনি এক ভোরে আমি যশোরে। যশোরের বেনাপোলে। একটু পরই আমাকে নো-ম্যান্সল্যান্ড পার হয়ে চলে যেতে হবে কলকাতা। তার আগে খাওয়া দাওয়ার একটা বিরতি। সেখানে পরিচয় হলো বরিশালের আঞ্চলিক টোনে কথা বলা এক যুবকের সঙ্গে। নাম, রিগ্যান। সাদাসিদে এই যুবকের ভেতর যে কত রঙ তা টের পেয়েছি কলকাতার বাকি দিনগুলোতে।
সীমান্তের যাবতীয় বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আমি উঠে বসলাম কলকাতা যাওয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে। একটা সময় পৌঁছলাম ঐতিহ্যের শহর কলকাতায়। কলকাতাতে এটা আমার দ্বিতীয়বার আসা। যে কারণে পুরাতন প্রিয়মুখ অনেকদিন পর দেখার ফিলিংস পেলাম। মনে ভেসে এলো, অনেক পাল্টে গেছো- টাইপ নাটকের ডায়ালগ।
৩.
বিকেলের দিকে বেরোলাম। আমার বন্ধু নিখোঁজ। সে ব্যবসা ছাড়া যে কোন কিছুই কম বোঝে। তার দিন কাটে মালামাল সংগ্রহে। আমার দিকে তাকিয়েও সে তার জায়গাতেই থাকে। আনমনে বলে ফেলে ৩৫টা।
আমি আঁতকে উঠি। কাহিনী কি? ৩৫টা কী? আমার চোখ নাক আবার বেড়ে গেল নাকি!
পরে অবশ্য বুঝতে পারি, হোটেলের রুমে বসেও তার ব্যবসায়ী আত্মা ঘোরাফেরা করছিল কলকাতার বিভিন্ন মার্কেটে। সেখানকার জামা কাপড়ের প্যাকেটের হিসাবই করছিল সে মনে মনে। তাই বের হয়েই ফোন দিই রিগ্যান নামের সেই যুবককে। শুরু হয় আমাদের কলকাতা অভিযান।
কলকাতা এসে বাঙালিদের মূলত আবাসস্থল হয় নিউ মার্কেটের আশপাশের গলিতে। সবাই যে দিক দিয়েই তার হোটেলে ঢুকুক, নিউ মার্কেট দিয়ে বেরোনোর কাজটা সারে। আমরাও ব্যতিক্রম হলাম না। যখন যেখানে যাওয়ার জন্য বেরোই সামনে এসে দাঁড়ায় নিউমার্কেট। নিউ মার্কেটটির আরেকটা কারণ হল খুব সুন্দর আর অন্যরকম জায়াগাটা। বসার ব্যবস্থা এবং গোছানো সব কিছুই নিউমার্কেটের মূল সৌন্দর্য। সামনে দোকান। নিচে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক মার্কেট আসলেই ভাবায়। কত এগিয়ে যাচ্ছে তারা। তাদের এগিয়ে যাওয়ার খবর প্রতিটি জায়গাতেই। চার বছর আগে যখন এসেছিলাম, তখন বিদ্যুৎ সমস্যা ছিল। এখন তাদের বিদ্যুৎ এক মিনিটের জন্যও যায় না। বেসরকারি খাতে চলে গেছে।
তাদের এই আলোর খবরের পাশে নিজের দেশকে রেখে ভাবলে চোখে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই আসে না। তাই সে ভাবনা বাদ দিয়ে বের হয়ে যাই। হাওড়ার দিকে। হাওড়া ব্রিজ আর হাওড়া স্টেশনের স্থান। তার আগে মোড়ের মিষ্টি লাচ্ছি আর মিষ্টি হাসির শেখর ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়টা আনন্দের ছিল। শেখর আহমেদ, বাংলাদেশী অভিনেতা। সেখানেই থাকেন। নিউ মার্কেটে একটি দোকানও আছে তার।
হাওড়া স্টেশনে গিয়ে ব্যাপক ফটোসেশন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে ফেললাম। যা পাই তার সঙ্গেই ছবি তুলি। সে তালিকা থেকে বাদ গেলেননা সদ্য মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া মমতা ব্যানার্জিও। কলকাতা শহরজুড়ে তার বিশাল বিশাল প্রতিকৃতি দিয়ে তৈরি পোস্টার আর ব্যানারের ছড়াছড়ি। সেগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আমরা মমতার বিজয়ের আনন্দে আমরাও শরিক হলাম। তালিকা থেকে বাদ পড়ল না রাস্তায় বসে গল্প করা এক দল ঠেলাগাড়ি চালকও। যারা ব্যাপক ভাব নিয়ে আমাদের ছবিতে পোজ দিয়ে দিলেন। সেখান থেকে আমরা রওয়ানা হলাম সায়েন্স সিটিতে। মোটামুটি আন্দাজে ঢিল ছোড়ার মতো এই ভ্রমণ। ঠিক কোথায় এই সায়েন্স সিটি তা ঠিক করে না জেনেই আমরা একটা বাসে উঠে বসে পড়লাম। শুরু হল এক বিরক্তিকর যাত্রা। রাস্তা শেষ হয় না। রিগ্যান কিছুক্ষণ পরপর মাথা নিচু করে বাসের জানলা দিয়ে দেখে আর বিড়বিড় করে বলে, এখানেই তো মনে হয়। নাকি আরো সামনে। সেই সামনে যে কতদূর সেটা যদি আগে টের পেতাম তাহলে সায়েন্স কে কাজে লাগিয়ে বাস থেকেই হাওয়া হয়ে যেতাম।
কলকাতা থেকে রওয়ানা হয়ে মোটামুটি আমেরিকার কাছে এসে থামল আমাদের বাস। এত দূর! যাই হোক দূরত্বকে ক্ষমা করে ঢুকলাম। নানা বিজ্ঞানের আয়োজন নিয়ে বসে আছে। আমি আর রিগ্যান সব ঘুরে দেখলাম। আমি দেখে দেখে চলে গেলেও রিগ্যান তা করে না। সে সব চালিয়ে দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বিজ্ঞানরে ভাই বিজ্ঞান। দেখছেন কী কাহিনী কইরা রাখছে?
এসব দেখেতে দেখতে অনেক সময় হারিয়ে গেল আমাদের কাছ থেকে। শুধু সময়কে একা বললে ভুল বলা হবে। সময় আর রিগ্যানের একটা ছাতাও হারিয়ে গেছে সেই তোড়ে।
প্রতিদিন আমাদের রুটিন ঠিক হয়েছিল, দিনে যেখানে থাকি, রাতে গন্তব্য হবে সিনেমা হল। হলও তাই। স্বয়ং সালমান খান যখন তার সিনেমা নিয়ে অপেক্ষা করছে তখন কি চলে আসা সম্ভব?
(চলবে)
ছবি : ১. হাওড়া ব্রিজ
২. ঠেলাওয়ালাদের সাথে রিগ্যান
৩. এই ছবিটি প্রমাণ করে, পৃথিবীর কোথাও প্রয়োজন আইন মানেনা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


