somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম পরিষ্কার, ৩০ শতাংশ শিক্ষায়, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যে, ২০ শতাংশ পরিবেশে। বন্যায় ঘর হারানো মানুষ, গ্রামের ভাঙা স্কুল, গরিবের চিকিৎসা, এই টাকার গন্তব্য ছিল এগুলো। আইডিয়াটা ভালোই । কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার চেয়ারে বসলে এই ফান্ডের উদ্দেশ্য এমনভাবে বদলে যায় যে দেখলে অবাক হতে হয়। সরকার বদলায়, মুখ বদলায়, যুক্তি বদলায়, কিন্তু জনগণের এই টাকার ভাগ্য বদলায় না।

আহসান এইচ মনসুর। আইএমএফ বা ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের (International Monetary Fund) সাবেক বড় কর্মকর্তা। যে সংস্থা দুনিয়াজুড়ে গরিব দেশগুলোকে শেখায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনীতি থেকে দূরে রাখো, স্বচ্ছতা রাখো, মৌখিক চাপে কোথাও টাকা খরচ করো না। সেই মানুষটা বাংলাদেশের গভর্নর হয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সব ব্যাংকের এমডিদের ডাকলেন। বললেন গণভোটে "হ্যাঁ" ভোটের পক্ষে প্রচারণায় সিএসআর ফান্ড থেকে এনজিওদের টাকা দাও। লিখিত কোনো প্রজ্ঞাপন নেই, অফিশিয়াল কোনো নির্দেশনা নেই, শুধু মৌখিক চাপ। ব্যাংকাররা ভয় পেলেন। তারা বুঝলেন আজ এই সরকারের কথায় টাকা দিলে কাল নতুন সরকার এসে হিসাব চাইবে, কিন্তু গভর্নরের মুখের কথার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস কার। সেই ভয়টাই আসলে স্বীকারোক্তি যে কাজটা ঠিক হচ্ছে না।

পরে সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে মনসুর সাহেব বললেন এটা নৈতিকভাবে ঠিক ছিল। কারণ কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়া হয়নি, শুধু সংস্কারের পক্ষে জনমত চাওয়া হয়েছে। যুক্তিটা শুনতে ভালো লাগলেও একজন অর্থনীতিবিদ নিশ্চয়ই জানেন গণভোটে "হ্যাঁ" আর "না" দুটোই রাজনৈতিক অবস্থান। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন জনগণের টাকা দিয়ে এক পক্ষের ঢোল পেটায়, অন্য পক্ষ সমান সুযোগ পায় না। আর কাজটা যদি সত্যিই এতটা নৈতিক ছিল, তাহলে লিখিত প্রজ্ঞাপন দেওয়ার সাহস হলো না কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর আর পাওয়া যায়নি। লিখিতে দায় থাকে, মৌখিকে শুধু সুবিধা।

তবে মনসুর সাহেবকে একা দোষ দিয়ে লাভ নেই। চেয়ারে বসার নিয়মটাই এমন হয়ে গেছে। আগের আমলে শেখ হাসিনা এই সিএসআর ফান্ডকে আক্ষরিক অর্থেই নিজেদের পারিবারিক তহবিল বানিয়ে ফেলেছিলেন। অডিট রিপোর্ট বলছে ব্যাংকগুলোর সিএসআর খাত থেকে ১২৪৩ কোটি টাকা গেছে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টে যার চেয়ারপারসন ছিলেন তিনি নিজে, সূচনা ফাউন্ডেশনে যার প্রতিষ্ঠাতা তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, আর প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। তখনো যুক্তি ছিল চমৎকার, দেশের মানুষের উপকার আর দাতব্য কাজ। এখন আদালত সেই ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করছে, দুদক নড়েচড়ে বসছে। কারণ সেই সরকার এখন আর ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতায় থাকলে যা জনকল্যাণ হিসাবে বিবেচিত হয় , ক্ষমতা হারালে সেটাই দুর্নীতি, এই সহজ সত্যটা আমাদের শাসকেরা কখনো মনে রাখেন না।

এবার সমসাময়িক একটি বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার । বিএনপি সরকার তাদের প্রথম বাজেটে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির নামে সিএসআর ফান্ড থেকে ৫০০ কোটি টাকা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফিল্ম, মিউজিক, গেমিং, ডিজিটাল কনটেন্ট। শুনতে বেশ আধুনিক এবং প্রগতিশীল মনে হয় । ২০২৪ সালে সারা বছরে বাংলাদেশের সব ব্যাংক মিলিয়ে সিএসআর খাতে মোট খরচ হয়েছে ৬১৫ থেকে ৬১৬ কোটি টাকা। এটাই ছিল আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর বিএনপি সরকার তাদের প্রথম বাজেটে এই ফান্ড থেকেই এক কামড়ে নিতে চাইছে ৫০০ কোটি টাকা, মানে পুরো বার্ষিক ফান্ডের প্রায় আশি শতাংশ , শুধু ক্রিয়েটিভ ইকোনমির নামে।

যে টাকাটা গত বছর গেছে গরিবের চিকিৎসায়, বন্যার্তের ত্রাণে, সেই একই ফান্ড থেকে এবার যাবে সিনেমায়। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি একটা বাণিজ্যিক শিল্প, দাতব্য খাত নয়। সরকারের নিজের বাজেটে এর জায়গা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা না করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য রাখা টাকায় সিনেমার ফান্ড বানানো হচ্ছে, আর যুক্তি দেওয়া হচ্ছে এতে দেশের সংস্কৃতির উন্নয়ন হবে।

তিনটা সরকার, তিনটা ভিন্ন যুক্তি, একটাই ফলাফল। হাসিনা নিলেন পরিবারের নামে, মনসুর নিলেন সংস্কারের নামে, বিএনপি নিচ্ছে উন্নয়নের নামে। যে টাকাটা যাওয়ার কথা ছিল বন্যার্ত মানুষের কাছে, ভাঙা স্কুলের চালে, গরিবের হাসপাতালে, সেই মানুষগুলোর কথা তিন আমলে তিনজনের কেউ একবারও ভাবেননি। নিয়মের খাতা ব্যাংকের ফাইলেই পড়ে থাকে। লঙ্কায় গেলে রাবণ হতে হয়, এটা বাংলাদেশে এখন আর প্রবাদ নয়, এটা পরম্পরা।

ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশে প্রাথমিক বরাদ্দ ৩০০ কোটি টাকা- এখন টিভি ।

সিএসআর ফান্ড থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা নৈতিকভাবে ঠিক ছিল মনে করি: আহসান এইচ মনসুর- টিবিএস রিপোর্ট

সিএসআর অর্থ বণ্টনে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল ও হাসিনা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গেছে ১২৪৩ কোটি টাকা- citizens' voice


সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫৭
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×