আমি অফিসে ঢুকে যাদের দেখতে চাই না, তাদের মধ্যে ফিরোজ একজন। কিন্তু সমস্যা, যেদিক দিয়েই ঢুকি সেদিকেই আবির্ভূত হয় ফিরোজ। দাঁত কেলিয়ে হেসে ওঠে, ইস্টিক ভাইয়া!
আমি মহাবিরক্ত নিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে যাই। ব্যাটা, কম বয়সের প্রবীণ। তার ওপর নামটাও উচ্চারণ করতে পারে না। মেজাজ ভেতরে ভেতরে গরম হলেও মুখ সামান্য প্রসারিত করে হাসি। ফিরোজ দেখে আরও উৎসাহিত হয়। আবারও ময়না পাখির মতো ডেকে উঠে, ইস্টিক ভাইয়া। ইস্টিক ভাইয়া।
আমি মনে মনে বলি, চোপ।
উপরে হাসি দেই।
ফিরোজের নানা ধরনের বিরক্তে অফিসে থাকা কঠিন। আমি যে পিসিতে বসি। ফিরোজ বসে তার পাশেই। বসেই তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে নানা বিষয়ে উত্ত্যক্ত করে। বিষয়টা 'কলিগ টিজিং' টাইপ। দেশে কলিগ টিজিংয়ের কোন শাস্তি নেই বলে ফিরোজ দিব্যি মাথা উঁচু করে এ সমাজে বাস করে যাচ্ছে।
সবাই এক পিসিতে কাজ করলেও ফিরোজ বহুগামী। তার একাধিক পিসিতে কাজ করতে হয়। নানান পিসিতে কাজ করার সময় তাকে হাতেনাতে ধরা যায়। এদিক থেকেও তার বিরক্ত সহনীয় পর্যায়ে নেই।
ফিরোজের অনেক কিছুকে মানুষ পছন্দ করে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ফিরোজ রাজনীতি সম্পর্কে অনেক বেশি ধারণা রাখে। অফিসে যখনই রাজনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় তখনই সে প্রতিপরে ওপর হামলে পড়ার মতো আলোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে ফিরোজ যখনই রাজনৈতিক জ্ঞান জাহির শুরু করে তখন আমি প্রায়ই অবাক হই সে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে রাজনৈতিক সংকট সম্ভাবনা তুলে ধরতে পারে।
আমি তার ওপর কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলেও এদিকটায় খুশি হই। না ব্যাটা জানে।
কিন্তু একদিন আমি নিজ থেকে দেশের পরিস্থিতি আলোচনা করতে গিয়ে বোকা হলাম। ভেবেছিলাম তার কাছ থেকে কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে অন্য আলোচনায় চালিয়ে দেব।
কিন্তু প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে সেদিন লক্ষ্য করলাম, ফিরোজ সেদিন কিছুই বলতে পারল না।
আমি বুঝতে পারলাম না ঘটনা। তার সেকশনে আলোচনায় সে যতটা অ্যাকটিভ আমার সঙ্গে তার সিকিভাগও কিছু বলতে পারল না। পরে আমি তক্কে তক্কে থাকলাম এ পার্থক্যের ঘটনা অনুসন্ধানে।
ভেবেছিলাম আমি গোপনে হিডেন ক্যামেরা ফিট করে দেব।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হিডেন ক্যামেরার আলোচনা দেখে সেদিকে গেলাম না। দেখা যাবে আবার কী হতে কী বেরিয়ে আসে।
তবে একদিন আমার চোখেই ধরা পড়ে গেল ফিরোজ।
বুঝতে পারলাম, তার জ্ঞানের গোপন রহস্য। সে আলোচনার সময় তার সামনে নানাভাবে পত্রিকা ভাঁজ করে রেখে দেয় এবং সেখান থেকে দেখে দেখে আলোচনা করে।
যার কারণে আশপাশের সবাইকে চুপ মেরে যেতে হয়। আমি ফিরোজের নকল প্রবণতা দেখে অবাক হই। ভাবি সেই কিশোর সময়ে সে নকলের রাজাই না ছিল!
একদিন আমি তার আলোচনার সময় এসে তার পাশ থেকে পত্রিকা সরিয়ে ফেলে তাকে স্মরণকালের সবচেয়ে বিপদে ফেলে দিয়েছিলাম।
এ লেখা যখন লেখা হচ্ছিল ফিরোজ তখন লাঞ্চে।
প্রতিদিন ফিরোজ এ কাজটা করে ব্যাপক আনন্দ নিয়ে। খাবারের আগে ৫ মিনিট এবং পরে ৫ মিনিট খাবার নিয়ে আলোচনা করে সময় কাটায়। সবচেয়ে মজার বিষয় খাবার খাওয়ার পুরোটা সময় তার সামনে দিয়ে যে যায় তাকেই ফিরোজ ডাকে। খাবার যখন আর এক মুঠ আছে তখনও সে ডাকে। এ জন্যও আমি তাকে ভালো ভাবতাম প্রথম দিকে। কিন্তু শংকায়ও থাকতাম, ফিরোজ তো এত ভালো না।
নিজের খাবার-দাবার রেখে মানুষকে ডাকে কেন সে?
এ ব্যাপারে তদন্ত করতে গিয়ে যা পেলাম তা আরও ভয়াবহ।
সে আগেই তরকারি শ্রেষ্ঠাংশ খেয়ে ফেলে। যার কারণে যে-ই খেতে আগ্রহী হয়, সে আর পা বাড়ায় না। সরি হাত বাড়ায় না।
গতকালও একজনকে দেখলাম, তার ডাকের প্রতারণার শিকার হয়ে তরকারিতে মাছ না পেয়ে বিরস মুখে শুধু ঝোল দিয়ে খেয়ে উঠল।
ফিরোজ সব মিলিয়ে খারাপ হলেও আমি তাকে ভালোই বলি। সে সময় তাকে আমি নানান ধরনের ভালো কথা বলি। তাকে বলি তুমি কিন্তু আসলে সেলিব্রেটি এটা বোঝ?
ফিরোজ বিষয়টা ঠাওর করতে না পেরে, কোন দিকেই মাথা নাড়ে না। আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি বলি, শোন ভাই আমি ফান করছি না। সিরিয়াসলি। তুমি হচ্ছ দেশে শিমুল, নোবেল, ইন্ডিয়াতে মিলিন্দ সোমান, জন অ্যাব্রাহামদের মতো। তারাও বিজ্ঞাপন নিয়ে কাজ করেন। তুমিও কর।
উল্লেখ্য, ফিরোজ আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ডিজাইনের কাজ করে।
শিমুল, নোবেল, মিলিন্দ সোমান, জন অ্যাব্রাহাম এবং আমাদের ফিরোজের গল্প
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিএনপির আবালীপনা।


চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।