মার্চ থেকে জুলাই ২০০৭। পাঁচ মাস নবযুগ বের হলো, জেলায় জেলায় বাড়ছে পাঠক, আগ্রহী হচ্ছে বিক্রেতারা, অর্ডার আসছে আরও বেশী করে দেওয়ার জন্য। আমরাও উৎসাহিত।
এমনই এক সময়ে বজ্রপাত। চকবাজার থেকে নোটিশ এলো। লাল কালিতে লেখা চিঠি। লেখক লিখেছেন, তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে নবযুগ নামে নতুন পত্রিকা বের করার চেষ্টা করছেন, কয়েক বছরে দু তিনটি সংখ্যাও বের করেছেন, বর্তমানে তিনি বাংলাবাজার দৈনিকে সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত, কাজেই তার হাত বেশ বড়, সুতরাং এ নামে পত্রিকা বন্ধ না করলে তিনি আইনী মামলা করে দিবেন আমাদের নামে। প্রমাণ হিসেবে তিনি বেশ কিছু কভার পাঠালেন, সাক্ষাত চেয়ে তারিখ চেয়েছেন।
আমি আমার সহকর্মীদের নিয়ে বসলাম। কী করা যায়, পরামর্শ করলাম। কেউ বলল, আমাদের পত্রিকার বয়স পাঁচমাস, কতো জেলায় জেলায় আমরা পৌঁছে গেলাম, তিনিও পেয়ে গেলেন, অথচ তার নবযুগ কয়েক বছরেও তো চকবাজার থেকে বেরহয়ে লালবাগ পর্যন্ত আসতে পারে নি। কোন কথা নেই, আমরা চালিয়ে যাব, দেখি সে কী করে? নতুন পত্রিকা, নতুন পাঠক, নতুন ব্যস্ততা, এর মধ্যে এমন উটকো ঝামেলা, সবাই যখন এমন উত্তেজিত, আমি ভাবলাম, এভাবে না গিয়ে আপোষ করে ফেলাই ভালো। নাম নয়, কাজ আমাদের মুখ্য। তাছাড়া তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এ নামে অন্য কোন পত্রিকা আছে কিনা, খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সবার মতের বিপক্ষে গিয়ে আমি ঐ সম্পাদককে আমন্ত্রণ জানালাম, বললাম, শিগগিরই নতুন নামে আমরা পত্রিকা করব, তবে এ ঘোষণাটুকু সবাইকে জানাতে আরও একটি সংখ্যা ছাপতে হবে নবযুগ নামে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার সম্মতি চাই।
তিনি রাজী হলেন, ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, যদিও তার পত্রিকার হদিস নেই, কিন্তু আমাদের তোয়াজ ও সম্মানে তিনি ভেতরে ভেতরে নিজেকে বেশ বড় সম্পাদক ক্ষমতাধর ভেবে পুলকিত। আমরা নবযুগ নামে সর্বশেষ সংখ্যা সীমিত ভাবে প্রকাশ করলাম এবং নতুন নাম আহবান করলাম।
আবার নতুন নাম, নতুন সাজ সজ্জা, নতুন উদ্যোমে আমরা ব্যস্ত হলাম। পাঠক ও শুভাকাঙ্খীরা অনেক নাম পাঠালো, অবশেষে কিছূ নাম নিয়ে আমরা গেলাম ডিএফপিতে। নবধ্বনি নামটি নির্বাচিত হল এবং এ নামেই আগস্ট থেকে পত্রিকা বের হলো। নবধ্বনির প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন স্বপ্নকুটির আবাসিক হাউজিংয়ের চেয়ারম্যান জনাব সোলায়মান। আমাদের জন্য তার মায়া ও স্নেহ দেখে আমরা অবাক হতাম। বেশ বড় অঙ্কের বিনিময়ে একাধারে অনেক মাস তিনি আমাদের চতুর্থ কভারে রঙীন বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাদের আর্থিক মেরুদন্ড সোজা রেখেছিলেন। অশেষ কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা তার জন্য।
আমাদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পক্ষ ছিলনা, ছিলনা কোন উপদেষ্টা কিংবা বড় ভাই, এমন কেউও ছিলনা যার কোন রশি ধরে আমরা উপকৃত হতে পারি, মাত্র পাঁচ টাকায় বত্রিশ পৃষ্ঠার এই মাসিক ম্যাগাজিনটিকে তবুও কিছু মানুষ ভালোবাসতো কেবল বিষয় বৈচিত্র্রের কারণে। আমরা কোনদিন এর নামে চাঁদা চাইনি কারো কাছে, নেইনি কোনো অনুদান। প্রতি সংখ্যার আয় দিয়ে পরের সংখ্যা ছাপতাম। কারো কোনো বেতন ছিলনা।
আমরা বলতে তখন কেবল আমি, ইমরান, উসামা, সালাহউদ্দীন। ইমরান মূলত বিজ্ঞাপন, যোগাযোগসহ ব্যবস্থাপনার বিষয়, উসামা একটু খোঁজখবর আর বড় অঙ্কের এক দুটি বিজ্ঞাপন, সালাহউদ্দীন কলাম লেখা ও কাটাকাটি করা, আর আমি সবাইকে নিয়ে হৈ হুল্লোড় করে মাস শেষে পত্রিকা ছাপানোর কাজে ডুবে যেতাম। পরিসর ও পাঠক সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো ব্যাপক হয়ে যাওয়ায় এবং প্র“ফ দেখার জন্য ধৈর্যশীল লোকের প্রয়োজনে সাথে যোগ দিলেন হোসাইন ভাই।
কারো কোন বেতন নেই, শুরুতেও না, শেষ পর্যন্তও না। যে মূলনীতিগুলোর আলোকে আমি নবধ্বনি সাজাতাম, তার কয়েকটি হচ্ছে, আমরা বেতনভুক্ত কাউকে রাখবো না, বড় কারো লেখা কিংবা কলাম চাইবো না, নিজেদের লেখা মানুষের সামনে তুলে ধরব, গৎবাধা বিভাগের বদলে নতুন নতুন বিষয়ে আমরা লেখা প্রকাশ করব, সম্পাদকীয় এর পরিবর্তে স্বাগত কলাম, সবার নাম প্রথম পৃষ্ঠার বদলে দ্বিতীয় পৃষ্ঠায়, যত বেশী সম্ভব পাঠকদের লেখা গ্রহণ করব, সেরা পাঠক নির্বাচনসহ যত বেশী সম্ভব পাঠকের কাছে পাঠকের কথাই তুলে ধরব বেশী।
আজও মনে পড়ে. কোন কোন অফিসে বিজ্ঞাপনের কাজে যাওয়ার পর কর্তা জিজ্ঞেস করে বসলেন, আপনাদের সম্পাদককে দেখা করতে বলবেন, আর আপনি ঐ পত্রিকায় কী কাজ করেন? সদ্য একুশে পা দেয়া আমাকে দেখে তারা ভাবতেই পারতেন না যে, সম্পাদক পদবীতে এই ছোকরার নাম ছাপা হচ্ছে। আমি বলতাম, জ্বী আচ্ছা, সম্পাদককে বলবো আপনার প্রস্তাব, আর আমি, এইতো বিজ্ঞাপনের বিল নিয়ে এদিক ওদিক যাওয়ার কাজটুকু করি নবধ্বনিতে। একটু ভাব নিয়ে তখন কেউ উপদেশ দিতেন, ভালো, লেগে থাকবেন কাজের সাথে, একদিন আপনিও হয়তো সম্পাদক হবেন কাজ শিখে শিখে। আমিও জ্বী, দুআ করবেন, বলে উঠে আসতাম বিল নিয়ে।
প্রতি বছর বার্ষিক পরীক্ষার সময় দু তিন মাস আমাদের ম্যাগজিন প্রকাশ হতো না। তবু পাঠক এবং বিজ্ঞাপনদাতারা বিরক্ত হতেন না। এই বন্ধ থাকাটাও প্রমাণ করতো যে, আমাদের পড়াশোনায় ছাড় দিতে আমরা রাজী নই। ঈদুল আযহার সময় বিশেষ সংখ্যা বের হতো আমাদের। এই ছোট সাইেজের ছোট ম্যাগাজিন, তবুও ভাবের কমতি থাকতোনা। কয়েকটি রঙীন কভারে আবৃত বর্ধিত কলেবরে প্রকাশিত সংখ্যাটি দেখে সহপাঠীরা টিপ্পনি কাটতো, কি রে, এবার তো তোরা বড়লোক হয়ে গেলি!! আমি মুচকী হেসে হেসে ভাবতাম, বোকার হাড্ডি, আয় দেখি, যোগ দিয়ে দেখ, কত আয় আর কত ব্যয়!!
বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে টাকা ধার নিতাম ছাপার বিল নগদ দিতে হতো বলে, অথচ সারা দেশ থেকে তখনো সব বিক্রির টাকা এসে হাতে জমা হয়নি। করুণা কিংবা মায়া করে টাকা ধার দিতো সিরাজ, আবরার, মুমিনসহ মাঝে মাঝে অন্য কেউ। দেনা পাওনার খাতায় যোগ হওয়া নতুন নতুন নাম আর দীর্ঘ তালিকা কখনো আমাদের দমাতে পারতো না। অসংখ্য পাঠকদের ভালোবাসা আর সচেতন বড়দের পিঠ চাপড়ে সাবাশ বলা আমাদেরকে সাহসী করতো প্রতিনিয়ত।
ব্যস্ততার কারণে একসময় পাঠকদের পাঠানো এত এত চিঠি সবগুলো পড়ে শেষ করা যেত না, সময় হতো না, তাই খাওয়ার সময় বসে বসে হোসাইন ভাইয়ের কাছ থেকে শুনে নিতে হতো পাঠকদের বিশেষ কোনো আবদার, অনুরোধ, অভিযোগ, দাবী ও বিচারের বিষয়গুলো। এভাবে পেট ভরতো, মনও তৃপ্ত হতো পাঠকদের সাড়া দেওয়ার গল্প শুনে।
চলবে.....
আগের পর্ব

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

