কয়েকবছর আগের ঘটনা।মুম্বাইয়ের এক ফ্লাটে থাকতেন এক বৃদ্বা।তার ছেলেমেয়েরা সবাই উচ্চশিক্ষিত।এবং আমেরিকা প্রবাসী।তার পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা হঠাৎ একদিন খেয়াল করে যে বৃদ্বার ফ্লাট কয়েকদিন যাবত ভেতর থেকে বন্ধ।তার সন্দেহ হওয়ায় সে পুলিশে খবর দেয়।পুলিশ এসে দরজা ভেংগে ভিতর থেকে বৃদ্বার লাশ উদ্বার করে।প্রায় চার-পাচদিন আগে সে মারা গিয়েছিল।
এই ঘটনা আমার মনে দারুনভাবে রেখাপাত করেছিল।একজন বৃদ্ব মানুষ।একা একটা ফ্লাটে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।শিয়রে কেউ নেই।সারাজীবন সে কতমানুষের সাথে ছিল,কত হাসি-কান্নায় তার জীবন অতিবাহিত হয়েছে,এক নির্জন ফ্লাটে সেই সব্ কাহিনীর সমাপ্তি ঘটছে।তার তখন কেমন লাগছিল বুঝতে চেষ্টা করেছি অনেক দিন।তখন নিশ্চয়ই তার সেই ছোট্ট খোকাটার কথা মনে পড়েছে যাকে জন্ম দিতে গিয়ে সে নিদারুন কষ্ট ভোগ করেছে।যার আধো আধো বোলের কথা শুনে সে আনন্দে অধীর হয়েছে।যার বিপদের ভয়ে সর্বদা তার প্রান কেদেছে,আজ তার বিপদে সে কোথায়?রাতের পর রাত জেগে থেকেছে অসুস্থ মেয়ের শিয়রে বসে।আজ সে অসুস্থ,তারও তো সেবা পাবার অধিকার আছে,আজ কোথায় তার আদরের দুলালী?তার কি একটুও অভিমানও হয়নি?নাকি খোকাখুকুর অমংগলের ভয়ে সে অভিমানও করেনি?
হায়রে পৃথিবী!তোমার একপ্রান্তে গর্ভধারিনী মা ধুকে ধুকে মরছে আরেক প্রান্তে তার সন্তানেরা আরাম আয়েশে দিন কাটাচ্ছে।মায়ের কথা ভেবে আনন্দ মাটি করার মত বোকা তারা হয়নি।চিয়ার্স ম্যান চিয়ার্স।আনন্দ কর,আরো কর।তবে ভুলে যেওনা তোমরাও একদিন বৃদ্ব হবে।
যাই হোক অনেকদিন হয়ে যাবার কারনে ঘটনাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।ঐদিন একটা লেখায় দেখলাম একজন বৃদ্বাশ্রমের ঠিকানা জানতে চাচ্ছে।তার পরিচিত এক বিধবা।একমাত্র ছেলে আমেরিকায় থাকে,উচ্চশিক্ষিত।সে মায়ের খোজ নেয়না।বছরে এক দুবার ফোন করেই তার দায়িত্ব শেষ।এদিকে বৃদ্বার পক্ষে একা একা থাকা সম্ভব হচ্ছেনা।তাই সে এখন একটা বৃদ্বাশ্রমে থাকতে চাচ্ছে।
লেখাটা পড়ার পরে আবার সেই মুম্বাইয়ের ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল।
স্যারের একটা গল্প মনে পড়ছে।এক লোকের ছেলে ভাল ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে।সে তার সহকর্মীর কাছে ছেলের প্রসংশা করছিলেন।তখন ঐ সহকর্মী বলল ভাই আপনার ছেলে মেধাবী হয়েছে কিন্তু সে কি মানুষ হয়েছে?লোকটি মনে মনে ক্ষুন্ন হল।হবারই কথা।সে এইটাকে ব্যক্তিগত ঈর্ষা হিসেবে ধরে নিল।
এরপরে কোন কারনে অনেক দিন তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।অনেক বছর পরে তাদের আবার দেখা হল।অনেক কথার পরে সহকর্মী জিজ্ঞেস করল ভাই আপনার ছেলের কি খবর।তখন লোকটি বলল ভাই আপনি ঠিকই বলেছিলেন আমার ছেলে শিক্ষিত হয়েছি কিন্তু মানুষ হয়নি।সে এখন অনেক বড় চাকরি করে।অনেক ব্যস্ত।তাই মা-বাবার খোজ নেয়ার মত সময় তার হয়না।
আসলেই আমরা শিক্ষিত হয়ে উঠছি।কিন্তু মানুষ হচ্ছি কি?
একজন শিক্ষিত লোক কিভাবে তার বাবা-মাকে বৃদ্বকালে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখে?সেকি জানেনা যে বৃদ্বকালে একজন মানুষ শিশুর মত হয়ে যায়?তখন তার একা থাকা কষ্টকর?তার শেষসময় গুলোতে সে তার প্রিয়জনদের পাশে থাকতে চায়?তার নানা রোগে শোকে ভোগার আশংকা বেড়ে যায়?তার সেবা-যত্নের দরকার হয়?এসব নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?পাশের ফ্লাটের মানুষের?
রাষ্ট্রের?অনেকে বলবেন রাষ্ট্রের।কিন্তু রাষ্ট্র শুধু তার শারিরিক চাহিদা হয়তো পুরন করতে পারবে কিন্তু তার মনে শান্তি কি দিতে পারবে?
তাই আমি ধিক্কার জানাই এমন শিক্ষাকে যে শিক্ষা আমাদের শুধু ইনডিভিজুয়ালিজম আর মেটারিয়ালিষ্টিক শিক্ষা দেয়,আমাদের শুধু ভোগে উদ্বুদ্ব করে ত্যাগ করতে শিখায় না,দায়িত্ব পালনে শিখায় না।ধিক এইসব শিক্ষিত মানুষদের কে।তোমাদের চেয়ে গ্রামের একজন কৃষক অনেক ভাল।তার বাবা-মাকে অন্তত বৃদ্বাশ্রমে মরতে হয়না।
ছোটবেলায় আমার অনেক গুলি গল্পের বই ছিল।তার ভিতরে একটা গল্প মনে আছে।এক লোক তার বাবাকে দূরে ফেলে দিয়ে আসার জন্যে একটা ডুলি কিনে আনল।তারপরে বাবাকে ডুলিতে ভরে যখন সে তাকে ফেলে দিয়ে আসার জন্য রওয়ানা দিয়েছে,তখন তা ছেলে তাকে চিৎকার করে বলল বাবা ডুলিটা কিন্ত ফেলে এসোনা।লোকটি জিজ্ঞেস করল কেন?ছেলেটি উত্তর দিল একদিন তুমিও তো বৃদ্ব হবে।তখন আমারো নিশ্চয়ই এই ডুলিটা দরকার হবে।
আমার মনে হয় আমাদের পাঠ্যপুস্তকে এই গল্প সংকলনের সময় চলে এসেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মার্চ, ২০১১ দুপুর ১:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



