বিশ্বাসী ধর্ষিত হয় ব্যবসায়ীর হাতে প্রতিনিয়ত
১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:১৯
বিশ্বাস প্রতারিত হওয়ার রাস্তা খোলা রাখে, অন্তত বিশ্বাসী বিশ্বাসের কারণে সামান্য নাজুক অবস্থানেই থাকে সব সময়। সেটা যেকোনো ধরণের বিশ্বাসই হতে পারে, বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারিত করা সহজ, ঠিক এ কারণেই বাংলাদেশে পানিতে ফুঁ দিয়ে আর কাগজে দোয়া লিখে মানুষ বড় বড় বাসা করে ফেলছে।
রংপুর তারাগঞ্জে এক সাধক ফকিরের দেখা পাওয়া গেলো, তারাগঞ্জের বাবা, তিনি হাদিয়া নেন না, নজরানা নেন না, তবে মোমবাতি নেন, তিনি সকল রোগের চিকিৎসা করেন, সে বাবদে কিছু অনুদান গ্রহন করে ভক্তদের কাছে। সেটা টাকার অঙ্কে সামান্য- ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নিতেন তিনি।
দরিদ্রের ভেতরে আরও দরিদ্র উত্তর বঙ্গের মানুষের হাসপাতালে আর প্রাইভেট ক্লিনিকে পয়সা খরচ করে চিকিৎসা চালানোর সঙ্গতি নেই। তারা কবিরাজ, হেকিম, ইউনানী এবং এইসব ব্যর্থ হলে এলোপ্যাথিতে না গিয়ে হেমিওপ্যাথি, এবং এইসব পন্থা ব্যর্থ হলে অবশেষে ইশ্বরঅভিমুখী হয়ে যায়। এবং এই ইশ্বর অভিমুখীতা কখনও কখনও অভাবের ফসল, কখনও কখনও বিশ্বাসের ফসল।
ভুল চিকিৎসায় কষ্ট পাওয়া কোনো কোনো মানুষ যেকোনো কারণেই হোক হাসপাতাল ভয় করে, এমন অনেক মানুষই নিশ্চিত ভাবে জানে তাদের শাররীক অসুস্থতা সম্পূর্ণ নির্মূলের জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তারাগঞ্জের পীর বাবা তাদের এই অস্ত্রোপচার করে দিতো। প্রক্রিয়াটা অদ্ভুত, বাবা একটা কাগজে লিখে কাঁচি দিয়ে কেটে দিতেন, এরপর বলতেন বাবা তোমার সমস্যা মিটে গেছে, তুমি সুস্থ।
মানুষের বিশ্বাসের অদ্ভুত জোর, মানুষ সত্যি সত্যি কিছুটা সময়ের জন্য প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠতো। তবে কখনই এটা ঘটতো না যে কাগজে লিখে অস্ত্রোপচারের পরে রোগী সুস্থ হয়েছে।
আমার এক পরিচিত পীর মামা আছে, গদিনশীন পীর তবে তেমন জাঁদরেল হয়ে উঠতে পারে নি এখনও, বিস্তর সম্মান পায়, হাদিয়াও পায়, তবে নগদ অর্থে না বরং এই ঘরের চালকুমড়াটা, এই লাউটা, এই মাছটা, এই গাছের প্রথম ফলটা। এইসব নানাবিধ জিনিষ বিশ্বাসী মানুষ পীর বাবার কাছে সমর্পন করে মানসিক শান্তি পায়।
পীর মামার ছোটো মেয়ে সামান্য শাররীক সমস্যা আছে তার। শরীরের পেশী ছোটো বেলা থেকেই দুর্বল, নড়তে পারে না, ঠিকমতো বসতে পারে না, বয়েস ৩ বছর, শরীর চমৎকার একটা যন্ত্র এবং এর প্রতিটা অংশই প্রতিটা অংশের সাথে সংযুক্ত, একটাতে সামান্য সমস্যা হলে অন্যগুলোতেও এর প্রভাব পড়ে, তাই উঠে বসতে না পারার সমস্যার সাথে সংযুক্ত হয়েছে তার মানসিক দুর্বলতা, তার মানসিক গড়নও বাড়ছে না, কথা বলতে শিখছে না, প্রতিক্রিয়া দেখাতে শিখছে না, নানাবিধ শাররীক এবং মানসিক সমস্যার ভেতরেও পীর মামা কোনো নাস্তিক্যবাদী চিকিৎসা করতে নারাজ, তিনি দুই বেলা দোয়া পড়ে ফুঁ দিচ্ছেন, পানি পড়া খাওয়াচ্ছেন, তবে লাভের লাভ কিছু হচ্ছে না।
আমাদের পরিবার থেকে তাকে অনুরোধ করা হলো, ভাই আপনি গিয়ে এলোপ্যাথি ডাক্তার দেখান, বাচ্চাটা কষ্ট পাচ্ছে-
তার নিরেট জবাব, আমার পয়সা নেই, আমার বাচ্চা আমার সংগতি অনুযায়ী চিকিৎসা পাবে।
আমরা বাচ্চার বাবার সাথে কঠোর কোনো কথা বলতেও পারি না, শেষ পর্যন্ত তিনিই বাচ্চার বাবা, মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী হলে সেটা বাংলাদেশের সমাজে একটু খারাপ চোখেই দেখবার নিয়ম।
তবে অনেক দিন পরে তিনি বাচ্চাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, চিকিৎসক পেশীগত সমস্যার কথা বলে বলেছেন ফিজিওথেরাপি দিতে। নিয়মিত ফিজিওথেরাপী দেওয়া ব্যয়বহুল, তার সঙ্গতি না থাকলেও যেটুকু না শিখলেই নয় সেইটুকু শিখে নিয়ে আমরাও বাচ্চাটাকে চলৎক্ষম বানাতে আগ্রহী ছিলাম, তিনি সেটা করেন নি, ৬ মাস হয়ে গেলো ডাক্তারের সাথে দেখা করবার কথা, তিনি দেখা করছেন না।
অবশ্য তিনি এই ডিসেম্বরে মক্কা যাবেন, রসুলের রওজায় গিয়ে চোখের পানি ফেলবেন, আশা ছিলো যাবো সোনার মদিনা- তার অর্থের অভাব, তিনি বাচ্চার চিকিৎসার সঙ্গতি রাখেন না, তবে তিনি যেহেতু প্রতিটা সঙ্গতিসম্পন্ন সমর্থ মানুষের হজ্জে যাওয়া ফরজ তাই তিনি হজ্জে যাবেন। এই ইতরামি দেখে গালিও দিতে পারি না মন খুলে, তাকে অনুরোধ করলেও ফায়দা হবে না, তিনি হজের টাকা মেয়ের চিকিৎসা খাতে ব্যয় করবেন না।
বিশ্বাসীর বিশ্বাসের গলদ সব সময় তাকেই শুধু আক্রান্ত করে না , মাঝে মাঝে তার পরিচিত মানুষেরাও ভীষণভাবে আক্রান্ত হয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, তবে বিশ্বাসীর প্রতারিত হওয়ার ঘটনা সব পরিবেশে, সব সমাজেই ঘটে।
অস্ট্রেলিয়ায় গত ২ সপ্তাহে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, সবটাই বিশ্বাসী মানুষদের নিয়ে, প্রথমত এক চার্চের কর্ণধারের ছেলে হঠাৎ ঘোষণা দিলো, সে দুই দিনের মেহমান, তার ক্যান্সার হয়েছে। তবে সে ক্যান্সার রোগীদের জন্য কিছু করতে চায়, এইসব গালগল্পের ভেতরে তার একটা গানের সিডি বের হয়, সেটা অল্প সময়েই টপ চার্টে উঠে যায়, বিশাল বিক্রীত এই গানের সিডির পরে অনেকটা সময় গিয়েছে, অবশেষে সে ঘোষণা দিয়েছে আদতে তার ক্যান্সার ছিলো না, কখনই ছিলো না, সে এই কাজটা করেছে তার অতিরিক্ত পর্ণোপ্রীতিকে আড়াল করবার জন্য। প্রোটেস্ট্যান্ট কিংবা এই ঘারানার মানুষেরা এমন করতেই পারে,
পরের ঘটনা দুইটা ক্যাথলিক চার্চের, এবং ঘটনার সংঘটনের স্থান নিউ সাউথ ওয়েলস, প্রথমত ২জন পাদ্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আটক করা হয়েছে, তারা ৩০ বছর ধরে এই নীপিড়ন চালিয়ে এসেছেন দুইটি ক্যাথলিক চার্চ পরিচালিত স্কুলের হোস্টেলে।
তবে এটাতে বিশ্বাসীদের আক্রান্ত হওয়ার কিছু নেই, বরং বিশ্বাসীদের শিশ্নে আক্রান্ত হয়েছে কোমল শিশুদের পশ্চাৎদেশ।
বিশ্বাসী উজবুক হলো গ্রীক ক্যাথলিক চার্চের কতিপয় মহিলা, যারা অপদেবতার অপদৃষ্টি, যাদু টোনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পয়সা দিয়ে ধর্ষিত হয়েছেন।
এবারও ঘটনার নায়ক কিংবা ভিলেন ২ পুরুষ, যারা কিছু মহিলাকে বলতো তোমাদের পরিবারের উপরে শনির নজর পড়েছে, এই অপদৃষ্টি, যাদুটোনা থেকে নিজেদের পরিবার পরিচিত জনদের রক্ষা করতে হলে নির্দিষ্ট হোটেলে ৫০০০ ডলার দিয়ে বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করতে হবে।
সেখানে মেয়েরা যেতো, তাদের চোখ মুখ ঢেকে তাদের ধর্ষণ করে দুজন ফিস নিয়ে চলে আসতো। এমন ঘটনা ঘটছে গত ৫ বছর ধরেই।
একজন গত ২ বছরে অন্তত ৭০ হাজার ডলার খরচ করেছেন নিজের পরিচিত জনদের অপদৃষ্টি আর যাদুটোনা থেকে রক্ষা করবার জন্য। কখনও কখনও মাসে ২টা সেশন, কখনও মাসে ৪ টা সেশন কাটিয়েছেন তারা হোটেলের কক্ষে।
বিশ্বাসী যদি বিশ্বাস করে পৃথিবীতে যাদুটোনা সম্ভব, বাণ মারা সম্ভব, তবে তারা এই বাণ থেকে নিজেদের রক্ষা করবার জন্য কতটা নির্যাতন সহ্য করতে পারে, এই ঘটনা এবং এমন অনেক ঘটনা দেখে এটা উপলব্ধি করা যায়।
বিশ্বাস এবং বিশ্বাসী মানুষ কোনো অর্থে খারাপ নন, হয়তো কিছুটা নির্বোধ, এবং নির্বুদ্ধিতার পরিমাণ এমনই যে তারা পয়সা দিয়ে ধর্ষিত হন, কখনও মানসিক ভাবে কখনও শাররীক ভাবে, তবে মোদ্দা কথা আদতে তারা শাররীক ভাবে ধর্ষিত হলেও মূলত বিশ্বাস নিজেই ধর্ষিত হতে থাকে, অনবরত, নির্বোধ বিশ্বাসী এবং চতুর ব্যবসায়ীদের হাতে।
মদন বলেছেন:
ভাল বলেছেন...
ত্রিভুজ বলেছেন:
হুমমম... আইন করে এসব ভন্ডামী বন্ধ করা উচিত! আমি একবার এক বন্ধুর অনুরোধে এরকম একজনের দরবারে গিয়েছিলাম... অসাবধানতা বশত ওখানেই বলে ফেলেছিলাম "মানুষ কতরকম ভন্ডামী করতে পারে..."... সব লোকজন দেখলাম তেড়ে আসছে... সেযাত্রা কোনরকম বেঁচে ফিরেছি... তখন মনে হলো এরা আসলে অনেক শক্তিশালী... এদেরকে খুব শক্তিশালী কোন আইন দিয়েও প্রতিহত করা যাবে কিনা আমার সন্দেহ আছে!
সৌম্য বলেছেন:
আমারো মনে হয় আইন করে বিশ্বাসকে দূর করা যাবে না। লাগবে সমাজের বেশিরভাগ মানুষের সচেতনতা আর শুদ্ধ শিক্ষা। লিখাটা ভালো হয়েছে।
কাঙাল মামা বলেছেন:
বিশ্বাস এবং বিশ্বাসী মানুষ কোনো অর্থে খারাপ নন, হয়তো কিছুটা নির্বোধ,
দুরের পাখি বলেছেন:
বিশ্বাস চতুর ব্যবসায়ীদের হাতে ধর্ষিত হয় না, বরং উৎপাদিত হয়, অসীম পরিমাণে, বিনা পুঁজিতে, কিন্চিৎ মানসিক শ্রমে। ব্যবসায়ীদের লাভও তাই অসীম । বিশ্বাসীরা বিশ্বাস কিনে, কেউ সম্ভ্রমের দামে, কেউ সম্মানের দামে, কেউ বৈষয়িক দামে ।
বিশ্বাসী শুরু থেকেই নির্বোধ থাকে না, তাকে চটুল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বোকা বানিয়ে পেছন থেকে ঢুকিয়ে দেয়া হয় । ঠিক যেমন করে পেপসির বিজ্ঞাপনে রানীর দুধ দেখিয়ে, দেখায় মগ্ন ভোক্তার নিজ পাছা দিয়ে দামের বোতলটা ঢুকিয়ে দেয়া হয়।
আব্রাহাম, যীশু মোহাম্মদদের কারখানা এখন জাকির নায়েকরা চালায় । বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাও অনেক সোফিসটিকেটেড । শুধু সুন্দর কবিতায় এখন আর হয় না ।
লেখাজোকা শামীম বলেছেন:
এসব বিশ্বাসকে পুঁজি করে এখনও মুশকিলে আসান মিলে বলে লাখ লাখ হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। আর কিছু মানুষ আছে তাদের জীবনের সব সমস্যায় কোন অলৌকিক সমাধান চায়। তারাই বিশ্বাস নিয়ে ভীড় জমায় এসব প্রতারকদের আস্তানায়। কেউ হারায় সম্ভ্রম, কেউ হারায় সম্পদ।
বিডি আইডল বলেছেন:
সারাবিশ্বেই আছে এ জিনিষ...কানাডে অন্যতম ধনীদের একজন হলো এক হীলার, হাত দিয়ে ধরে সে মানুষের রোগ ভালো করে দেয়, তার উপার্জন হলো ট্যাক্স ফ্রি (এখানে প্রায় ৩০% ট্রাক্স দিতে হয়)...এ থেকে মানুষের বাচোয়া নেই
স্টিংরে বলেছেন:
আপনি নাকি ব্যান খাইছেন? তা রোজার আগে না পরে?


















