আমার প্রিয় পোস্ট

একটি অপ্রকাশিত লেখা: হাসি

০২ রা নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:৪৮

শেয়ার করুন:                   Facebook

২ জানুয়ারি ২০০৭

আমার হাসি আর কাশির কোন লাগাম নেই, কখন যে ফস করে বেরিয়ে পড়ে! এই যেমন একটা লোককে সকালে ফাঁসি দেয়া হলো, বিকেলে তার প্রতিবাদে মিছিল, সেখানেও কিনা আমার হতচ্ছাড়া হাসি। দু’হাতে মুখ চেপে ধরি, মনে মনে বলি, থাম বাবা থাম; কিন্তু ‘হাসি’ ব্যাটা বড়োই নচ্ছাড়। থামে না, হেঁচকি দিয়ে দিয়ে ওঠে। মানুষের জীবন-মরণ নিয়ে কথা, এখানে কি হাসি মানায়? অনেক বলে-কয়ে যেই হাসিটাকে কন্ট্রোলে আনলাম, ওমনি আবার শ্লোগান, ... এক সাদ্দামের রক্ত থেকে লক্ষ সাদ্দাম জন্ম নেবে ... আমরা সবাই সাদ্দাম হবো, সাদ্দাম হত্যার বদলা নেবো ...। এবার হাসিটা যেন কাপ্তাই লেকের বাঁধ ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে। আমি নিরূপায়। পাশেই ছিলো প্রদীপ ঘোষ। সে চোখ মটকে তাকায়। হাসিতে ভাইরাস থাকে। মটকানো চোখে তাই সে-ও হেসে ওঠে।
শ্লোগানদাতাকে আমি চিনি। ভালো করেই চিনি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাম রাজনীতি করে। সে কী বুঝে সাদ্দামের ‘উত্তরসূরী উৎপাদন প্রকল্প’ শুরু করল, মাবুদ জানে। এটা কি তার মার্ক্সিজমের থিউরিতে পড়ে, না সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধে! নাকি, বলা দরকার তাই বলছে মিছিমিছি। শেষের টা যদি হয়, তাহলে আমার হাসিটা নিশ্চয়ই অবান্তর নয়।
প্রদীপ কাঁধ ঝাঁকিয়ে ওঠে: দেখো, কমিউনিস্টরা কত সরল, এই সাদ্দাম ক্ষমতায় থাকতে পাইকারি দরে কমিউনিস্টদের মেরেছে, আজ তার ফাঁসির পর সেই কমিউনিস্টরাই তার নামে শ্লোগান দিচ্ছে। কই, আমাদের কাটমোল্লা ভাইরা কই? ইরাক আক্রমণের সময় প্রতি জুম্মা বার কত বড়ো বড়ো মিছিল বেরুত, সাদ্দামকে নিয়ে কত স্তুতিবাক্য, তারা কই?
পাশে কে একজন ছিলো, ফোঁড়ন কেটে ওঠে: সামনে ভাই নির্বাচন, কে আমেরিকারে খ্যাপায়? প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে মিছিলটা পাক খায়। মিছিলের পুরোভাগে ধরা ব্যানারটা আমার চোখে পড়ে।
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বীর সৈনিক/সাদ্দাম হোসেন যুগ যুগ জিও।
এবার বোধহয় হেসেই মারা যাবো। ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বীর সৈনিক!’ তাহলে সাম্রাজ্যবাদের সৈনিকটা কে শুনি? বীর সৈনিকের তকমা দেয়ার আগে আসুন একটু জেনে নেই এই সাদ্দাম হোসেন কোত্থেকে এলেন? তার গোড়ায় কে জল দিলো? কার পাওয়ারে সে গোঁফে তা দিয়ে দু’যুগ দেশ চালাল? এসব জানার আগে তার উত্থানপর্বে পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটু জেনে নেয়া জরুরি।
সত্তর ও মুক্তির দশক:
নকশালিস্টরা একটা শ্লোগান দিতেন: সত্তরের দশক হউক মুক্তির দশক। আসলেই, সত্তরের দশকে এসে পৃথিবী সেদিকেই এগুচ্ছিল। ষাটের শুরু থেকে সত্তরের শেষ পর্যন্ত অফ্রিকা, এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় সোয়া শ’ রাষ্ট্র উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদের জিঞ্জির ভেঙে মুক্ত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে বাংলাদেশ, ভিয়েৎনাম, ইরান, মিশর, কিউবা, নিকারাগুয়ে, চিলি, সিরিয়া, পর্তুগালে পুঁজিবাদবিরোধী সরকার ক্ষমতায় আসে। সে সময়টা ছিল পুঁজিবাদীদের জন্য বড়ো খারাপ সময়। দিকে-দিকে সমাজতন্ত্র ও কল্যাণমুখী অর্থনীতির জয়ধ্বনি ওঠে। তারা রাজনৈতিকভাবে সমাজতন্ত্রের উত্থানকে প্রতিহত করতে পারছিল না। অনেক ছল-চাতুরী আর শক্তি প্রয়োগ করেও এদের উত্থান প্রতিহত করা যাচ্ছিল না। তখন যুক্তরাষ্ট্র সোজা রাস্তা ছেড়ে কাদায় নেমে আসে। দেশে দেশে সামরিক বাহিনীকে উসকে দিয়ে ক্ষমতা দখল করায়। বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী আর উগ্রধর্মীয় গোষ্টীগুলোকে লেলিয়ে দেয় সমাজতান্ত্রিক বা সমভাবাপন্ন সরকারগুলোর বিরুদ্ধে। যেহেতু কমিউনিজম ধর্মের ব্যাপারে উদাসীন, তাই অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষরা এদের দলে ভিড়তে লাগল বানের ঢলের মতো। এদেশে জিয়া-এরশাদের উত্থান সেই পরিকল্পনার আলোকেই।
পুরো পৃথিবীর পালাবদলের ফিরস্তি এখানে দেয়া সম্ভব নয়। তাহলে এটা আর্টিকল না হয়ে থিসিস হয়ে যাবে। আসুন, আপাতত দৃষ্টি কেবল মধ্যপ্রাচ্যে নিবদ্ধ রাখি। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে এসে ব্রিটেন বুঝতে পারল, আগামী পৃথিবীতে কয়লার স্থান দখল করবে পেট্রোলিয়াম অর্থাৎ তেল। দাহ্যমতা ও সাশ্রয়ী মূল্য- সবমিলে তেলের বরকতই বেশি। কিন্তু ততদিনে অটোমন সাম্রাজ্যের সঙ্গে হাত করে জার্মানি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দখল নিয়েছে। জার্মানরা পরিকল্পনা করছে বার্লিন থেকে বাগদাদ পর্যন্ত রেললাইন পাতার। এ রেললাইন হয়ে গেলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জার্মানির মুষ্ঠিতে। জার্মানির জয়যাত্রা ঠেকাতে তাই মরিয়া হয়ে ওঠে ব্রিটেন। অষ্ট্রিয়ার যুবরাজ খুনের জন্য ১ম বিশ্বযুদ্ধ বাধে বলা হলেও, আড়ালে কিন্তু ব্রিটেন-জার্মানির তেল-সাম্রাজ্যের কাড়াকাড়ি। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১ম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি হেরে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো ফ্রান্স, ইটালি, রাশিয়া, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র ভাগজোক করে নেয়। অবশ্য, শেষমেশ পুরো অঞ্চলের আধিপত্য চলে আসে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
মোটামুটি নিষ্কন্টকই ছিলো ইঙ্গ-মার্কিনিদের এই বিশাল তেল-সাম্রাজ্য। তেল ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটা বড়ো সম্পদ হলো সুয়েজ খাল। প্রথম বিরোধটা বাঁধে এ খাল নিয়ে। ’৫৪-তে জামাল আব্দুল নাসের মিশরের রাষ্ট্রমতায় আসেন। দু’বছরের মাথায় ব্রিটিশদেরকে সুয়েজ খাল থেকে উৎখাত করে খালটিকে জাতীয়করণ করে নেন। এ সুয়েজখাল দিয়ে ব্রিটেন পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে নৌ-বাণিজ্য করে। লেজে-পা-পড়া সাপের মতো ক্ষেপে ওঠে ব্রিটেন। যুদ্ধবিগ্রহ সবই হলো, কিন্তু আব্দুল নাসেরকে টলানো গেলো না। নাসের রাতারাতি আরব-জাহানের হিরো বনে যান। তার সাহস আর দূরদর্শিতা ইঙ্গ-মার্কিনদের শিরোপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। সিরিয়া মিশরের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠন করে। ইরাকের বাথ পার্টির পেছনেও ছিলো মিশর-সিরিয়ার অকুণ্ঠ সমর্থন। ১৯৫৯-এ সাদ্দাম জেনারেল কাশেমকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টার পর সিরিয়া হয়ে মিশরে পালিয়ে যান। বুঝতেই পারছেন, আরবের তরুণ বিদ্রোহীদের কেমন আলোড়িত করেছিলেন নাসের।
১৯৬৭-তে ইসরাইলের সঙ্গে ছ’দিনের যুদ্ধে পুরো আরব-জাহানের নেতৃত্ব দেয় মিশর। হুট করে কাউকে না বলে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি করে যুদ্ধ থেকে সরে আসে মিশর। ফলে নাসের ‘বেঈমান’ হিসেবে পরিচিত পান মধ্যপ্রাচ্যে। তারপরও কিন্তু তার প্রভাবে কমেনি। তার প্রভাবে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো ইঙ্গ-মার্কিন কোম্পানিগুলোর ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে আসে। এটাই একসময় কাল হয়ে দাঁড়ায় ইরানের। ইরানের কথায় যাওয়ার আগে মিশরের আলাপটা একটু এগিয়ে নেই। বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রোপাগন্ডা চালিয়ে নাসেরকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ব্যর্থ হয় ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম-১৬। ’৭০-এ তার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন আরেক সহবিপ্লবী আনোয়ার সাদাত। তিনিও নাসেরের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেন।
এদিকে, ইরানের শাহও নাসেরের মতো জাতীয়তাবাদী পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন। ইঙ্গ-মার্কিনিদের এড়িয়ে ইতালীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে উত্তোলন চুক্তি করেন। ১৯৬৩-তে হাতে নেন সামগ্রিক উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা। এতে অল্পদিনের মাথায় সুফল পেতে থাকে ইরানীরা। ১৯৭৩ সালে বিখ্যাত ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা ইরানকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের জাপান’ বলে অভিধা দেয়। ১৯৭৩-৭৫ পর্যন্ত দেশটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিলো ৭ থেকে ৮ শতাংশ। শিল্প-কৃষি সব দিকেই দেশটি এগিয়ে যাচ্ছিল সমানে। শাহ ধর্মীয় রাজনীতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কাটমোল্লাদের ধরে জেলে পুরেন। শাহ’র আধুনিকায়নের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে শিয়া নেতা আয়েতুল্লাহ খোমেনী ১৯৬৪ সালে দেশত্যাগে বাধ্য হন। ইরাকে চলে যান। ১৯৭৮ সালে বাথ পার্টি ক্ষমতায় এসে তাকে ইরাক থেকে বহিষ্কার করে। খোমেনী ফ্রান্সে চলে যান।
একজন সাদ্দামের উত্থান
ফ্রান্সে গিয়ে শাহ’র বিরুদ্ধে উল্টা-পাল্টা কথা বলে অল্পদিনে খোমেনী মিডিয়ার পাদপ্রদীপে চলে আসেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম-১৬ তাকে ট্রামকার্ড হিসেবে বেছে দেয়। খোমেনীর ধর্মীয় সুড়সুড়ি জাগানো ভাষণের লাখ লাখ কপি ক্যাসেট ইরানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গোপনে বিতরণ করা হয়। পশ্চিমী গণমাধ্যমে লাগাতারভাবে শাহ’র বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হয়। খোমেনীর ভাষণ ইরানের তরুণ সমাজের মধ্যে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে। ’৭৯-তে এক ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ’র পতন ঘটে। শাহ সপরিবারে মিশরে নির্বাসিত হোন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে ইঙ্গ-মার্কিন জোট বুঝতে পারল তারা একটা বড়ো ভুল করে ফেলেছে। একটা কাটা তুলতে গিয়ে আরেকটা কাটা ফুটেছে পায়। খোমেনীর সমর্থকরা ৪৪৪ দিন অবরুদ্ধ করে রাখে আমেরিকান দূতাবাসকে। তেল-বাণিজ্যে কোন প্রকারে ছাড় দিতে রাজি নয় তারা।
ইরান নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে লাগে ইঙ্গ-মার্কিনিরা। তখনই তারা হাতের কাছে পেল সাদ্দাম নামের গোঁয়ার আর মাথামোটা এক রাষ্ট্রনায়ককে। ইরাকের সমুদ্রে পৌঁছার একমাত্র জলপথ শাত-ইল-আরবকে নিয়ে আগে থেকেই ইরাক-ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ছিল। ১৯৭৫ সালে এ সমস্যা সমাধানে আলজিরিয়ায় একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সাদ্দাম মতায় এসে চুক্তি বাতিল করে ’৮০-র ২০ সেপ্টেম্বর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দেন। এই যুদ্ধ চলে ১৯৮৮-র ১৬ মার্চ পর্যন্ত। ৮ বছরের যুদ্ধে দু'দেশের ৬ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এতে এক ঢিলে দুটো পাখি মারে মার্কিনিরা। ’৮০-এর দশকে আমেরিকার অস্ত্রবাজার মন্দা যাচ্ছিল। এই যুদ্ধ লাগিয়ে বেশ কাঁচা পয়সা কামিয়ে নেয় তারা। ইরাক থেকে অস্ত্র বিক্রি বাবদ পাওয়া টাকা তারা আবার নিকারাগুয়ার কন্ট্রো বিপ্লবীদের দিতে লাগল সমাজতান্ত্রিক স্যান্দিনিস্টার সরকারকে উৎখাতের জন্য। আরেক লাভ হলো, ইরানের বেয়াড়া মোল্লাদের একটা শায়েস্তা করা গেলো।
দুর্ভাগ্যের খলনায়কের হাতে পড়ে...
ইরাক-ইরান যুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল ইরাক। কুর্দি বিদ্রোহ দমনের জন্য এই অস্ত্র দিয়েই ১৯৮৮ সালের মার্চে হারাবজা শহরের ৫ হাজার কুর্দিকে হত্যা করেছিল সাদ্দাম সরকার। এই রাসায়নিক অস্ত্র তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের একটা ভয় ছিল, না জানি ইরাকের হাতে কত রাসায়ানিক অস্ত্র আছে।
৩০ ডিসেম্বর সাদ্দামের ফাঁসি হলো ’৮২-তে দুজাইল সফরকালে তাঁর গাড়িবহরে হামলার অভিযোগে ১৪৮ জন শিয়াকে হত্যার দায়ে। অথচ ইরাক-ইরান যুদ্ধে ৬ লাখ অথবা হারাবজায় ৫ হাজার কুর্দি হত্যার দায়ে তার নামে মামলা হতে পারত। এবং এই মামলাগুলোতে তার ফাঁসি হলে ব্যাপারটা অনেক যৌক্তিক হত। হত্যা কিংবা বিদ্রোহের চেষ্টার কারণে প্রাণদণ্ড দেয়ার নজির তো ভুরি ভুরি। আমাদের জিয়াউর রহমান সাহেবও সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগে কর্নেল তাহেরসহ দেড় হাজার সোলজারকে বিভিন্নভাবে হত্যা করেছিলেন। কই, তার নামে তো মামলা হয়নি। ওই দুই হত্যাকাণ্ডের কারণে সাদ্দামকে অভিযুক্ত করলে, খেলাটা বেশ জমত। আগেই প্রশ্ন আসত, সারা ইরাক চষে বহুজাতিক বাহিনী তো এক ফোঁটা রাসায়নিক অস্ত্র পায় নি, তাহলে সাদ্দাম সরকার কোত্থেক এ অস্ত্র পেলো? কারা দিলো? যে খুন করে সে যেমনি খুনী, যে তাকে খুন করার জন্য অস্ত্রটা দেয়, সে-ও তো খুনী।
মার্কিনিদের এতো প্রিয়ভাজন শাসকটি কীভাবে রাতারাতি বেঁকে গেলেন? সাদ্দাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাসের পর্দাটা টেনে দেয় মূলত ইসরাইল। বরাবরই সাদ্দাম ছিলেন ইসরাইলবিরোধী। ১৯৮১ সালে ইরাকের ওসিরাকের পারমাণবিক চুল্লিতে বোমা মারে ইসরাইল। সাদ্দামের ঘৃণার আগুনে যেন ঘি পড়ে। ইসরাইল ইস্যুতে মার্কিনিদের কাছে সুবিচার না পেয়ে সাদ্দাম একটু একটু করে সরে আসতে থাকেন। ৮০-এর দশকের শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎ তেলের দাম কমে যায়। ইরাকের অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড তেল। সাদ্দাম হোসেন খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তার প্রতিবেশী দেশ কুয়েত থেকে নির্বিচারে মার্কিনিরা তেল উত্তোলন করছে। ফলে বাজারে তেলের সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম পড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ইরাকের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়।
আর ছিলো লোভ। সাড়ে ১৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট একটা দেশ, অথচ তেল রপ্তানিতে পৃথিবীতে এক নম্বর, প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু আয় ১৭ হাজার ডলার! সাদ্দাম কিছু একটা করার জন্য অস্থির হয় উঠলেন। লোকটা গোঁয়ার ও অর্ধশিক্ষিত। তাই যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন বিকল্প তার মাথায় আসেনি। ’৯০-এর ২ রা আগস্ট ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে কুয়েত দখল করেন। কুয়েতকে ইরাকের প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা দেন। তারপর উপসাগরীয় যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবরোধ, জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা, ২০০৩-র মার্চে ইরাক আক্রমণ, একই বছরের ডিসেম্বরে সাদ্দাম হোসেনের গ্রেফতার- সবই তো আপনাদের জানা। এবার বলুন, সাদ্দাম সাহেবকে ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বীর সৈনিক’ বলা কতটা যৌক্তিক।
আমি খুশী
তার শাসন আমল ছিল ইরাকীদের জীবনে শ্মশানবাসের মতো। মাত্র ২৫ শতাংশ সুন্নী পুরো ইরাকের রাষ্ট্রমতা জুড়ে ছিল। সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে সাদ্দামের পরিবারের লোকজন। কুর্দিদের তিনি কচুকাটা করেছেন। সবখানে বাথ পার্টির খবরদারি। কিন্তু তিনি যদি স্বৈরতন্ত্রের পথে না গিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে দেশ চালাতেন, তাহলে শেষজীবনে এসে তাকে এতোটা নি:সঙ্গ হতে হত না। হুগো শ্যাভেজের মতো ইরাকের জনগণই তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসত। আমেরিকা ইরাক আক্রমণের সময় তার সেনাবাহিনী ইঁদুরের মতো লেজ তুলে পালাত না। বাগদাদ পতনের আগমুহূর্তে বিলিয়ে দেয়া ১০ লাখ একে-৪৭ গর্জে উঠত সারা ইরাকে।
বেচারা সাদ্দামের দশা দেখে আমার দক্ষিণ ভিয়েৎনামের সাবেক শাসক দিয়ামের স্ত্রীর একটা মন্তব্য মনে পড়ে গেলো। তিনি আফসোস করে বলেছিলেন, আমেরিকা যদি কারো বন্ধু হয়, তাহলে তার আর শত্র“র প্রয়োজন হয় না।
মিছিলটি চেরাগীর মোড়ে এলো। শুরু হলো মিটিং। সাদ্দামের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। একটা জোকস মনে পড়ে গেল।
হাসি-খুশী দুই বোন। খুশী বোনের বাসায় থেকে লেখাপড়া করে। হুট করে রাতে কারেন্ট চলে গেলো। অন্ধকারে দুলাভাই বউ ভেবে শ্যালিকাকে আদর করতে লাগলেন। বেচারী শ্যালিকা পড়ল মহাফাঁপড়ে, না পারে দুলাভাইয়ের শক্ত বাঁধন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে, না পারে চিৎকার করতে- পাছে তার বোনটি কী ভেবে বসে!
ও শুধু ফিসফিসিয়ে বলে, দুলাভাই, আমি খুশী।
দুলাভাই নিবৃত্ত হওয়া তো দূরে থাক, উনিও সুর মিলিয়ে বলেন, আমিও খুশী ...
বেচারা সাদ্দাম, না পারল বন্ধন ছিঁড়তে, না পারল চিৎকার করতে, শুধু বেচারী শ্যালিকার মতোই বলে গেলো, আমি খুশী।
আমার আবার হাসি পায়। আজ না হয় এদ্দূর থাক, আরেক দিন এই হাসির কারণটা লেখা যাবে।
উক্তি
আমেরিকার সকল সৈনিকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রইল, তবে বিচারকদের প্রতি নয়।
রিজ সাকেল, জার্মান ন্যাৎসি কমান্ডার
’৪৬-এ যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনার পর।

 

 

  • ২ টি মন্তব্য
  • ৬২ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ২ জনের ভাল লেগেছে, ১ জনের ভাল লাগেনি
১. ০২ রা নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:০৬
comment by: এখনও গল্প লিখি বলেছেন: সাদ্দাম কে কখনোই স্বৈরশাসক ছাড়া আমি কিছু মনে করিনি। তার আরো আগেই ফাসি হওয়া উচিৎ ছিল। তবে আমেরিকা তার বিচার করার কে?

আর আমেরিকার সাইকো সৈনিকদের শ্রদ্ধা করতে পারছি না বলে দুঃখিত
২. ০২ রা নভেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:৫৬
comment by: মাজেদুল ইসলাম বলেছেন: আপনার লেখা ভাল লাগল,তবে সাদ্দাম এর বিচার সাধ্বীন ইরাকে তার নিজ দেশবাসীর হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।তবে আমি আমেরিকার সেনাদের কর্মকান্ডকে ভাল কিছু বলতে পারছি না।

 

 


এখনো স্বপ্ন দেখি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই

সর্বমোট হিট

 ২৩৩৭