প্রথম পর্বের লিঙ্ক- Click This Link
কেন এমন হয়!-২
আমি আমার স্ত্রীর কাছে কি বলবো, কি ভাবে কি বলবো ভাবছি! অস্থির ভাবে এটা সেটা করছি। আমার স্ত্রী আমাকে জানতে চাইলেন-"কিছু বলবে"? আমি আমতা আমতা করে বললাম-"না মানে, কিছুনা"!....আমার অস্থিরতা যাচ্ছেনা। যা আমি কোন দিন করিনা তাই করলাম-রান্না ঘরে গিয়ে বাবুর্চীকে জানতে চাইলাম "আজ কি রান্না হবে"? এবার আমার স্ত্রী খবরের কাগজ থেকে মুখ সরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-"তুমি কি তুতনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে"? আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম-"তুমি কি করে জানলে তুতন এসেছে"?
স্ত্রীঃ-"তুতন এসেছে নাকি? আমিতো এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম"।
আমিঃ-"হ্যা, তুতন এসেছে। আমি হোটেলে রেখে এসেছি। কাল চলে যাবে"।
স্ত্রীঃ-"বাসায় নিয়ে এলেই পারতে। হোটেলে রাখা কি ঠিক হলো"?
আমিঃ-"বিশ্বাস কর, তুতন আসবে তা আমি জানতামনা। হঠাত করেই এসেছে। তাছারা আমার সাথে অনেক দিন তুতনের কোন যোগাযোগ ছিলনা"।
স্ত্রীঃ-"আমিতো বলিনি, তুতনের সাথে তোমার যোগাযোগ আছে। আমিতো বলিনি তুতন হঠাত করে আসেনি। এত কইফিয়ত দেবারতো কিছু নেই। তুতন তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, বহু বছরের প্রবাসী। পারিবারিক ভাবে যা আমরা সবাই জানি-এটা নিয়ে তুমি "চোর চোর" ভাব করছো কেনো"? আমি আমতা আমতা করছি-কোন কিছু বলতে পারছিনা.........
স্ত্রীঃ-"যাও, তুতনকে বাসায় নিয়ে এসো। আমি তাঁর জন্য গেস্ট রুম রেডি করে রাখছি"।
আমিঃ-"তুতন হোটেলেই থাকবে"।
স্ত্রীঃ-"তুতন কি আমাদের সাথে লাঞ্চ করবে"?
আমিঃ-"ওর জেট ল্যাগ, ঘুমোচ্ছে। বাসা থেকে লাঞ্চ নিয়ে গেলে খুশী হবে"।
আমার স্ত্রী বাবুর্চীর সাথে পোলাউ, সাদা ভাত, কয়েক প্রকার মাছ, সব্জ্বি, চিকেন, মুগ ডাল চচ্চড়ি, ইলিশ ভাজি সহ অনেক প্রকার খাবার রান্না করে ২ টা picnic basket ভরে নিজেও রেডি হয়ে আমার সাথে দুপুড় দুইটার সময় হোটেলে এলেন। আমি আমার বৌ কে জানতে চাইলাম-এতো খাবার এতো অল্প সময় রেডি করলে কি ভাবে। আমার বৌ কোন জবাব দিলেননা। আমি মুখ ফুটে বললামনা-এই খাবারের মধ্যে অনেগুলো খাবারই তুতনের খুব প্রিয় খাবার। হোটেল রুমের Door knock করে দেখলাম তুতনের কোন সারা নেই। এখনো ঘুমোচ্ছে। আমরা হোটেল লবীতে বসে প্রায় আধাঘন্টা খানেক টিভি দেখছি।
এমন সময় তুতন ফোন দিয়ে জানতে চাইলো-"তুমি কোথায়, আমি লেট করে ফেললাম। তুমি কি লাঞ্চ সেরে নিয়েছো"? আমি বললাম-"আমরা নিচে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা এক্ষুনি তোমার রুমে খাবার নিয়ে আসছি"। আমরা হোটেলের ছয়তলায় লিফটের ডোড় খোলার সাথে সাথেই দেখি-তুতন আমাদের জন্য (আমার বৌ কে নিতে)নিচে আসার জন্য অপেক্ষা করছে। তুতন আর আমার বৌ দুজন বান্ধবী......ক্লাশ ফাইভ থেকে অনার্স পর্যন্ত একসাথে পড়েছে। অনার্সে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হয়ে তুতন স্কলারশীপ নিয়ে চলে যায় আমেরিকাতে হায়ার স্টাডির জন্য। তুতনের সাথে আমার চমতকার একটা সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তুতন আমেরিকা গিয়ে তিনমাসের মাথায় হুট করে বিয়ে করেন অন্য একজনকে। তুতনের মাধ্যমেই আমার পরিচয় হয়েছিল পরবর্তীতে আমার বৌ হয়ে আসা তুতনের বান্ধবীর সাথে। তুতনের বন্ধুকে বিয়ে করেছি বলে, কিম্বা তুতন আমাকে বিয়ে করেনি বলে-ওদের দুজনের সম্পর্কের হেরফের হয়নি-যদিও আমি বিশয়টা নিয়ে সব সময় একটা মনস্তাত্বিক অসস্তিতে ভুগছিলাম। অনেক দিন পর দুজন দুজনকে পেয়ে খুব হৈ-হুল্লোর করল। আমরা তিন জন একসাথে বেশ মজা করে বাসায় তৈরী খাবার খেলাম।
প্রায় ৫ টা পর্যন্ত আমরা একসাথে কাটালাম। সন্ধায় আমার বৌ'র একটা ক্লাশ থাকায় আমরা একসাথে তিন জন বেড়িয়ে পরি। বৌ'কে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়ে আমি তুতনকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অনেক অনেক বছরের পুরনো স্মৃতিবিজরিত বিভিন্ন যায়গা ঘুরিয়ে দেখাতে থাকি। হাকিম চত্তরে গিয়ে সেই পুরনো ঐতিয্যবাহি ওভাল্টিন মিশ্রিত চা খাই। আমি তুতনকে নিয়ে গাড়িতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্মৃতিময় যায়গাগুলো খুব স্লোলী ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেখাচ্ছিলাম। তুতন আমার হাটুতে হাত রেখে বলে-'you look very smart & nice when you drive'! আমি থ্যাংকস বলেই এক্টুখানি খোঁচা মেরে বললাম-"স্মার্ট/সুন্দর হলেতো আমাকেই বিয়ে করতে। আমাকে অবহেলা করে অন্য একজনকে বিয়ে করতেনা"! তুতন আমার কথা শুনে কি যেনো ভাবলো উদাস হয়ে।
আমি জিজ্ঞেস করি-"কি ভাবছো তুতন"?
তুতনঃ-"তোমাকে বিয়ে করিনি সত্য। কিন্তু তোমাকে এখনো লাভ করি......তোমাকে মিস করি! ...... every moment to show you, my deepest love and respect for you"
আমি প্রসংগ বদলিয়ে বললামঃ-"তুমি আগের চাইতেও বেশী সুন্দর হয়েছো"!
তুতন বলে-"পরের বৌ সব সময়ই সুন্দর মনে হয়। তোমার বৌ আমার থেকে অনেক বেশী সুন্দর"।
আমিঃ-"চাক্ষুস সুন্দর যতটা চোখের তৃপ্তি মেটায়, অতটা অন্তরের নয়"।
তুতনঃ-"হিমেল, সত্যি করে একটা কথার জবাব দেবে? তুমি কি পারিবারিক/বিবাহিত জীবনে সুখী"? এক কথায় জবাব দাও"।
যদিও এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেয়া যায়না-তারপরও বললাম-"হ্যা, সুখী"।
"তুমি"?এক কথায় জবাব দাও"।
তুতনঃ-"না"!
ফুলার রোডে বৃটিশ কাউন্সিলের সামনে গাড়ি দাড় করলাম। আমি ড্রাইভ করতে পারছিনা। আমার কিছুই ভালো লাগছেনা! তুতন তার জীবনে সুখীনা! তাহলে আমি কেনো সুখী হলাম! তুতন এতোটা বছর গোপনে গোপনে মানষিক কস্ট নিয়ে সুখী থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে......! আমার কিছুই ভালো লাগছেনা...... কেউ কোন কথা বলছিনা। গাড়ী থেকে নেমে আমরা বসে আছি বৃটিশ কাউন্সিলের সামনের রাস্তায়-যেখানে আমরা স্টুডেন্ট লাইফের অনেক সুন্দর সময় কাটিয়েছিলাম। এখানেই আমাদের দুজনের দেখা হতো, ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হত। তুতন আমার সাথে দেখা করে চলে যাবার সময় আমি ওর কপালের টিপ খুলে নিতাম। সেই টিপ আমি অনেক যত্ন করে জমাতাম। পরে তুতন নিজেই সব সময় চলে যাবার সময় ওর টিপ খুলে আমাকে দিয়ে যেতো না চাইতেই। আমি ওকে বলেছিলাম-যদি আমাকে ফাঁকি দাও তাহলে তোমার টিপ তোমাকেই ফিরিয়ে দেব......। অনেক যত্নে রাখা সেই টিপগুলো এখনো আমার কাছে আছে......কাল থেকে ভেবেছিলাম-এবার ওর সেই টিপগুলো ওকে ফেরত দেব। কিন্তু তুতনের অসুখী থাকার কথা শুনে মনে মনে আমার সিদ্ধান্ত থেকে আমি সরে এসেছি।
আমার স্ত্রী কল করে জানালো তার ক্লাশ শেষ। কলা ভবনের সামনে থেকে তাকে তুলে নিতে হবে। আমরা কলা ভবন থেকে বেড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে গিয়ে বসি। কিছু নাশতা করে আমরা চলে যাই আমার বাসায়। বাসা থেকে ছোট ছেলেকে তুলে নেই। আমরা চলে যাই ক্রিসেন্ট লেক(জিয়া উদ্দ্যান)। ওখানে বসেই আমার বৌ এবং তুতন আমাকে জানায়-তুতন ঢাকা আসার বিশয়টা আগেই আমার বৌ'কে তুতন ইমেইলে জানিয়েছিল এবং ওভার ফোন কনফার্ম করেছিল। অনেক্ষন ওখানে বসে গল্প করে চলে যাই গুলশান শপার্স ওয়ার্ল্ড। তুতনের জন্য কিছু গিফট কেনার জন্য। শপিং শেষে বনানীর সফুরা টাওয়ারের ১৬ তলার হোয়াইট ক্যাসেল রেস্টুরেন্টে ডিনার করে তুতনকে হোটেলে ড্রপ করি রাত সারে এগারোটার সময়। আমার বৌ বললেন-"তুমি কি আরো কিছুক্ষণ তুতনের সাথে সময় কাটাতে চাও-তাহলে তুমি আরো কিছু সময় থাকো-আমরা বাসায় চলে যাচ্ছি"। তুতন বললো-"না, আমার এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি-আমি এখন ঘুমোব। ভোর চার টায় এয়ারপোর্টে আমার রিপোর্টিং"। আমি তুতনকে বললাম-রাত তিনটার সময় আমি তোমাকে নিতে আসবো।
যদিও তুতন বলেছিলো-"অত রাতে কস্ট করে তোমার আসার দরকার নেই, আমি হোটেল ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস নিয়ে নেবো"। আমি ঠিক তিনটার সময় হোটেলে চলে আসি। আমি পৌছে দেখি-তুতন তার ছোট্ট লাগেজ গুছিয়ে রেডী হয়ে বসে আছে। তার চোখ লাল, মুখটা ফোলা ফোলা। আমি জানতে চাইলাম-"রাতে ঘুমাও নি"? কোন উত্তর না দিয়ে আমাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে নিশ্চুপ কিছু সময় গোপন কান্না করলো। আমিও আমার চোখের পানি গোপন করলাম। আমরা কেউ কারো চোখের পানি কাউকে দেখতে দেইনি.........। আমরা বেড়িয়ে পরি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।
নিঝুম রাত। মাঝে মাঝে কিছু পুলিশ আর RAB এর টহল গাড়ি চলছে। কখনোবা আমাদের মত এয়ারপোর্ট যাত্রীদের নিয়ে কিছু যানবাহন। আমরা চলছি এয়ারপোর্টে। আমার গাড়ির চাকা যেনো নড়ছেনা। কেউ কোন কথা বলছিনা। মহাখালী ফ্লাইওভার পার হবার সময় তুতন বললো-"তোমাদের ঢাকার অনেক জৌলুশ বেড়েছে। অনেক বড় বড় বিল্ডিং হয়েছে"। আমি কোন কথার জবাব দিতে পারছিনা। ঠিক চারটায় আমরা এয়ারপোর্ট প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জে পৌঁছি। আমি গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করেছি। কিন্তু কেউ গাড়ি থেকে নামছিনা। আমার হাত স্টীয়ারিং'র উপড়। তুতন আমার হাতে একটা হাত রাখলো অন্য হাত আমার হাটুতে। আমি ওর দিকে তাকাচ্ছিনা, তুতনও আমার দিকে তাকাচ্ছেনা, হাতে হাত রেখে চুপ করে রইল। কেউ কোন কথা বলছিনা। ডিউটি পুলিশ গাড়িটা সরিয়ে রাখার জন্য বললো। তুতন আস্তে করে বললো-"শরিরের যত্ন নিও"।
তুতন গাড়িথেকে নেমে দাড়ালো। আমি তার ছোট্ট লাগেজটা নামিয়ে তার পাশে রেখে বললাম-"তুমি একটু দাড়াও, আমি গাড়িটা সেইভে রেখে আসি"।
তুতন বললো-"তুমি আর এসোনা...... আল্লাহ হাফেজ"- বলেই ভিতরে চলে গেলো।
আমি শুধু বলতে পারলাম-"তুমি ভালোথেকো"।
(শেষ)।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



