লালকুঠিঃ
সপ্তদশ শতকের প্রথমদিকে ঢাকা থেকে বাংলার রাজধানী পরিবর্তন করে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যাওয়ার পর থেকে ঢাকার ক্ষয় শুরু হয়। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে ঢাকা পরিণত হয় মোগল স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষে। ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঊনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ঢাকায় গড়ে উঠতে থাকে নতুন নতুন ইমারত। এসব ইমারত যেমন ব্যক্তিগত অর্থানুকূল্যে গড়ে উঠেছিল তেমনি জনগণ এবং প্রশাসনের যৌথ অর্থ সাহায্যেও গড়ে উঠেছিল। ঢাকার কালেক্টর ওয়াল্টার ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার উন্নয়নের জন্য "কমিটি অব ইমপ্রুভমেন্ট" নামে একটি সভা করেন। প্রথমদিকে সেটির প্রধান কাজ ছিল রাস্তার দেখ ভাল করা। পরবর্তীতে এটিই রূপ নেয় পৌরসভার।
সেই যাই হোক আসল কথা হচ্ছে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ঢাকা আধুনিক শহরের রূপ ধারণ করতে শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় পুরনো ঢাকার ফরাশগঞ্জ এলাকায় গড়ে উঠেছিল নর্থ ব্রুক হল। একে মূলত ঢাকাবাসীদের জন্য নগর মিলনায়তন হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। লাল রংয়ের হওয়ার জন্য এটিকে লালকুঠি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তৎকালীন ভারতবর্ষের গভর্ণর জেনারেল এবং ভাইসরয় লর্ড নর্থ ব্রুকের নামানুসারে এই মিলনায়তনটির নামকরণ করা হয়েছিল। লর্ড নর্থ ব্রুকের পুরো নাম ছিল টমাস জর্জ ব্যারিং নর্থ ব্রুক। তাঁর দাদা ব্যারিং নর্থ ব্রুক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রভাবশালী পরিচালক ছিলেন। পারিবারিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকার দরুন সহজেই তিনি ভারতবর্ষের প্রশাসনে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৮৭২ সালের মে থেকে ১৮৭৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ভারতের গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় ছিলেন। তিনি গভর্নর জেনারেল থাকাকালীন সময়েই সম্ভবত এই মিলনায়তনটি নির্মাণ করা হয়। মোগল স্থাপত্য রীতির সাথে ইউরোপীয় রেনেসার সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয় এই ভবনটির স্থাপত্যে। এর উত্তরে রয়েছে চারটি অষ্টভুজ মিনার যা কিনা সাদা রং করা। "নর্থ ব্রুক হল"টির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি বেশ জাঁকজমকভাবে পালিত হয়। পরবর্তীতে এর সাথে জনসন হল নামে একটি ক্লাব ঘর সংযুক্ত করা হয়। সেখানে
প্রথম দিকে এই হলে স্থানীয়দের কোন প্রবেশাধিকার ছিল না। ইংরেজরা সাধারণত এখানে বিলিয়ার্ড খেলে তাদের অবসর সময় কাটাতেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে এ মিলনায়তনটি সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেয়া হয়। এখানে বিভিন্ন সভার সাথে চলতো নাট্যচর্চা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র অভ্যুদয়ের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই মিলনায়তনটি ছিল ঢাকার নাট্যচর্চার অন্যম কেন্দ্রস্থল। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর ঢাকায় নতুন রাজস্ব ও ডাক অফিস খোলার জন্য ঐদিনই ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা মোহাম্মদ ইউসুফের উদ্যোগে নর্থ ব্রুক হলে একটি বড় সভা করা হয়। শহরের গণ্যমান্য মুসলমান ও ইউরোপীয়দের এতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সভায় বৃটিশ সরকারকে নতুন প্রদেশ গঠন ও ঢাকায় তার রাজধানী করার জন্য ধন্যবাদ ও সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এ ধরনের নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে এই নর্থ ব্রুক হল।
অবসর সময়ে আমরা আমাদের এই ঐতিয্যবাহি নর্থ ব্রুক হল দেখে আসতে পারি।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ২:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




