বিন্নি পল্লীঃ
কথায় আছে বারো মাসে তেরো পার্বণ। আমাদের লোকজ সংস্কৃতি খুবই সমৃদ্ধ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও কৃত্রিমতায় অনেককিছুই হারিয়ে গেলেও দেশের কোনো কোনো জনপদে অতীতের সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতি এখনও বেশ দাপটের সঙ্গে টিকে আছে। এমনই একটি লোকজ খাবার বিন্নি ধানের খই।
খুবই সৌখিন খই বিন্নি। দেখতে যেমন ধবধবে সাদা, খেতেও পারেন দাঁত নেই এমন বুড়ো দাদা। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি, লোকসঙ্গীতে, পালাগানে, বিচ্ছেদ গানে বিন্নি খইয়ের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে ছড়া সাহিত্যের বিন্নি বিষয়ক ছড়াটি বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী হয়ে আছে:
আমার বাড়ি যাইও বন্ধু, বসতে দেবো পিঁড়ে
জলপান যে করতে দেবো শালি ধানের চিড়ে
শালি ধানের চিড়ে দেবো বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের সবরী কলা গামছা বাঁধা দই।
বিরহী বধূয়া প্রবাসী স্বামীকে উদ্দেশ করে লোক সুরে বলেছে।।
বিন্নি ধানের খই রাইখাছি
রাইখাছি দুধের সর,
সোহাগ কইরা মুখে দেবো
আইলে আমার ঘর।
পালাগানেও বিন্নি খইয়ের কথা উল্লেখ আছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ গীতিকার নায়িকারা চন্দ্রাবতী, মহুয়া, মলুয়া, কংকা লীলা, মদীনা এদের মুখে বিন্নি খইয়ের কথা উচ্চারিত হয়েছে।
বিন্নি খই বাংলাদেশের অন্য কোনো জেলায় তৈরি হয় কিনা জানা নেই। তবে এক সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রতি ঘরে ঘরেই বিন্নি খই ভাজা হতো।
দিনকাল পাল্টেছে। আধুনিকতার দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী বিন্নি খই। ঐতিহ্যবাহী বিন্নি খই বিলুপ্তির পথে সত্য। এরপরও আনন্দের সংবাদ যে, কিশোরগঞ্জ জেলার একটি গ্রামে মহা ধুমধামের সঙ্গে প্রতিবছর বিন্নি খই ভাজা হয়। বিক্রি হয় দেশে-বিদেশে।
একটি গ্রামের নাম দাসেরগাঁও। জানা যায়, সুদূর অতীতে এ গ্রামে হিন্দু সমাজের দাস সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। সে কারণে গ্রামের নাম দাসেরগাঁও। কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী থানার বনগ্রাম ইউনিয়নের গ্রাম দাসেরগাঁও। দু'টি কারণে গ্রামটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় পরিচিত ও বিখ্যাত। প্রথমত, এ গ্রামে রয়েছে জারীগানের দল। মরহুম ছালাম বয়াতির নাম অনেকেই জানেন। বর্তমানে আশু বয়াতি জারীগান করে একাধিকবার জেলা ছাড়াও বাইরের জেলাতেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, বিন্নি খইয়ের জন্য গ্রামটি সারাদেশে পরিচিত। ঢাকা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে দাসেরগাঁও থেকে বিন্নি খই রফতানি করা হয়ে থাকে। শীতের শুরু থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত বিন্নি খই ভাজা হয়। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারগণ এসে এখান থেকে বিন্নি ধানের খই নিয়ে যান। এক সময়ের হতদরিদ্র বিন্নি পল্লীতে এসেছে সচ্ছলতা। শুধু বিন্নি খই বিক্রি করে অনেকেই রাতারাতি ঝলমলে টিনের ঘরের বাসিন্দা হয়েছে। বিন্নি পল্লীতে ফিরে এসেছে স্বাচ্ছন্দ্য। বিন্নি খইয়ের ধবধবে সাদার মতোই হাসি ঝিলিক দিচ্ছে বিন্নি পল্লীর বধূদের মুখে। টেলিভিশন চ্যানেল বিন্নি পল্লী নিয়ে প্রতিবেদন করলে দেশের মানুষ জানতে পারতো আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের সৌখিন অধ্যায়।
কিশোরগঞ্জ জনপদে বিন্নি খই খাওয়ার পদ্ধতি বেশ মজাদার। গরম দুধ, খেলনা কদমা (বড় বাতাসা) আর বিন্নি খই একসঙ্গে মিলিয়ে খেতে বেশ মজা।
আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের ঐতিহ্যবাহী বিন্নি খই সবার কাছে পরিচিত করে তুলি। পুনরুজ্জীবিত করি হাজার বছরের ঐতিহ্য লালিত লোকজ সংস্কৃতিকে।
(লেখায় ব্যাবহৃত দুইটি ছড়া ডঃ আশরাফ সিদ্দিকীর " বাংলার প্রাচীণ লোক সাহিত্য" বই থেকে নেয়া)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ১১:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



