'সূর্য উৎসব'-এর কথা শুনে আসছি অনেক দিন ধরে। ৮-১০ বছর তো হবেই। ব্যাটে-বলে হচ্ছিল না বলে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আর এবার যখন বল ব্যাটে লেগেই গেল, তখন 'সূর্য উৎসব' তার এক যুগ পার করতে যাচ্ছে। 'সূর্য উৎসবের' আয়োজক বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবারের উৎসবটা করছে 'চর কুকরি-মুকরি'তে। সেটা আবার পড়েছে একেবারে 'বে অব বেঙ্গল' মানে বঙ্গোপসাগরের মুখে। আর একটু পরিষ্কারভাবে বললে ভোলা জেলার চরফ্যাশনের একটা দ্বীপ বা চর হচ্ছে 'চর কুকরি-মুকরি'।
যাত্রা শুরুর দিন ৩০ ডিসেম্বর, ২০১১। আমাদের প্রধান বাহন মানে লঞ্চটি অপেক্ষা করবে ঢাকার সদরঘাটে। ছাড়বে সকাল ৮টায়। বাঙালির সময় জ্ঞানের দুর্নাম ঘুচিয়ে একেবারে যথাসময়ে হাজির হলাম। কিন্তু হায়! অন্যরা যে বাঙালির পুরনো ঐতিহ্যটি ধরে রাখতে সচেষ্ট। তাদের সবাই একত্রিত হতে হতে ঘড়ির কাঁটা পেঁৗছে গেছে ৯টার ঘরে। আমাদের 'মাদারশিপ' (মানে কল্পবিজ্ঞানের ভাষায় বললাম আর কী) তিনতলা বিশিষ্ট এক লঞ্চ। দ্বিতীয় তলার মেঝে চাটাই বিছিয়ে যে যাঁর পছন্দমতো জায়গা বেছে নিলেন। রকি, আফসার, শাওন ভাই আর আমি মিলে একটা জায়গা ঠিক করে মালপত্র রাখলাম।
ভেঁপু বাজল
একসময় ভেঁপুতে আওয়াজ তুলে ছেড়ে দিল লঞ্চ। বুড়িগঙ্গা ধরে চলল। অল্প কিছুক্ষণ পর শুরু হলো শোরগোল। আরে কী হলো, কী হলো? কাকে যেন আমরা সেই সদরঘাটে রেখে এসেছি। কী আর করা! লঞ্চ ঘুরিয়ে আবার সেই নাদান ব্যক্তিকে তোলা হলো। এখানেই ঝামেলার শেষ নয়। জানা গেল রান্নার জন্য যেখানে তিন হাঁড়ি আসার কথা, এসেছে মাত্র একখান! তবে রাঁধুনী সাহেব প্রথম দিন বাদে সে অভাব আর বুঝতে দেননি। খানিকটা ধীরস্থির হওয়ার পর শুরু হলো আনুষ্ঠানিক পরিচয় পর্ব। পুরো অনুষ্ঠানটি হাস্যরসের মধ্য দিয়ে পরিচালনা করলেন উৎসবের প্রধান সমন্বয়ক মেসবাহ য়াযাদ। একে একে সবাই মাইক্রোফোনে এসে নিজেদের নামধাম, পেশা আর উৎসবে আসার অনুভূতি জানালেন।
পরিচয় পর্ব শুরু হওয়ার আগে মেসবাহ ভাই বলেছিলেন তাঁর গলার অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়। চাইলেই বেশি কথা বলতে পারবেন না। তবে পরে সেটা তিনি ভুল প্রমাণ করেছেন। পরিচয়-পর্ব শেষ হওয়ার পর জানালেন পুরো উৎসবের প্ল্যান-প্রোগ্রাম। প্রথম দিনই থাকবে কুইজ আর ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা।
রান্না হতে যেহেতু এখনো অনেক বাকি, তাই এ ফাঁকে হয়ে যাবে সেই কুইজ প্রতিযোগিতা। সবার ভ্রু কোঁচকানো দেখে মনে হলো, কোথায় ঘুরতে এসেছি, তা না এখন পরীক্ষা দিতে হবে! ঘোষণা করা হলো, প্রথম দুটি প্রশ্ন বাদে সব প্রশ্ন সোজা। আর তাই যিনি আগে উত্তর জমা দিতে পারবেন তিনিই (যদি তাঁর সব উত্তর সঠিক হয়) হবেন বিজয়ী। আর প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয়র জন্য থাকবে চমৎকার সব উপহার। এটা শোনার পর যাঁদের দ্বিধা ছিল_'পরীক্ষা দেব নাকি দেব না', তাঁদেরও ছুটতে দেখা গেল। প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দেখা গেল, আসলেই প্রথম দুটো প্রশ্ন বেজায় কঠিন। খাতা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে 'আমার দেশ' পত্রিকার রকি হলেন প্রথম। আর ওই পর্যন্ত। পরে তাঁর নাম আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কুইজ প্রতিযোগিতা শেষ হতে না হতেই জানা গেল দুপুরের খাবার রেডি। তবে সেটাকে 'বিকেলের খাবার' বললেও ভুল হতো না। কেননা ঘড়িতে তখন ৪টা। নদীতে ভাসতে ভাসতে মাছ, সবজি, ডাল দিয়ে ধোঁয়া ওঠা ভাত খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বললাম, 'তোফা তোফা!'
উৎসবের মুকুট হচ্ছে
সময় যায় আর ধীরে ধীরে নদীর দুই পাশের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। আড়ত, ডকইয়ার্ড, কারখানা, জেটি পার হয়ে লঞ্চ এসে পড়ে মাঝ নদীতে। সেখানে যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। নগর সভ্যতাকে পেছনে ফেলে আমরা প্রাকৃতিক হয়ে উঠি। এরপর পড়ন্ত বিকেলে ব্যস্ত হয়ে পড়ি ফটোসেশনে। ধীরে ধীরে নিভে আসে দিনের আলো। আমরা ক্ষ্যান্ত দিই ছবি তোলায়। লঞ্চের ছাদ থেকে নিচে নেমে দেখি, সূর্য উৎসবের মুকুট বানানো শুরু হয়ে গেছে। শিল্পীদের করা নকশায় হলুদ, নীল, লাল রঙের কাগজের মুকুট বানাতে বসে গেলেন অতিউৎসাহীরা। পাশাপাশি চলছিল বড় পর্দায় আগের সব সূর্য উৎসবের আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এরপর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। বিজয়ের মাস বলেই কি না প্রথম দিন দেখানো হলো নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু পরিচালিত 'গেরিলা'। রাতের খাবার শেষ হতে হতে লঞ্চ এসে ভিড়ল পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধুলিয়া ঘাটে। রাত যেন কটা? মনে হয় ১০টা হবে। জানা গেল, এখানেই রাতের মতো লঞ্চ নোঙর ফেলবে। ক্লান্তিতে চোখে ঘুম চলে আসে। লঞ্চের বিশৃঙ্খল অবস্থায় কি ঘুমানো যায়? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়ি 'ঘুম-বস্তা'য়। একসময় তলিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে। এক ঘুমেই রাত কাবার। ঘুম থেকে উঠেই ক্যামেরা বের করলাম। বছরের শেষ সূর্যোদয়টাকে যদি বন্দি করা যায়!
সকাল ৯টায় পেঁৗছলাম ঘোষের হাট। সেখানে নামার পর জানতে পারলাম, গতকালের মতো আজও নাকি নাস্তা দেবে না। আতঙ্কিত (!) যাত্রীরা সেখানকার হোটেলেই নাস্তা-পর্ব শেষ করতে চাইলেন। সেটা শেষ করে অতি চালাক চেহারা করে লঞ্চে হাজির হয়ে দেখলেন লোকজন বেশ আয়েশ করে খিচুড়ি খাচ্ছেন। রাগে তাঁরা কার চুল ছিঁড়বেন বুঝতে না পেরে গজ গজ করতে লাগলেন। আর লঞ্চও ভট্ ভট্ করতে করতে রওনা হলো নিজ গন্তব্যে। চলন্ত লঞ্চে পড়ল ঘুড়ি উড়ানোর ধুম। শৈশবের ঘুড়ি উড়ানোর বিদ্যা নিয়ে সবাই ব্যস্ত আকাশ দখলে। এমনকি যিনি জীবনেও ঘুড়ি উড়াননি, তিনিও চেষ্টা করলেন। চলে কাটাকুটির খেলা। ভোঁ-কাট্টা! তবে সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি ধরতে কেউ আগ্রহী হয় না; কেননা সে চেষ্টা করলে যে সোজা জলে নিমজ্জিত হতে হবে।
নাচতে নাচতে কুকরি-মুকরি
সূর্যটা মধ্যগগনে নিজের রাগ ছড়ালে ধীরে ধীরে সবাই নেমে আসে নিচে। এবার শুরু হয় নৃত্য। গানের তালে তালে। নাচতে নাচতেই আমরা পেঁৗছে গেলাম চর কুকরি-মুকরি। মেসবাহ ভাই এসে জানালেন দুপুরের খাবারটা একেবারে খেয়েদেয়ে নামলে চরে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঘুরে বেড়ানো যাবে। সবার মনে ধরল কথাটা। খাওয়া-দাওয়ার পর ছোট এক ট্রলারে করে আমাদের কয়েকবারে নামিয়ে দেওয়া হলো চরের তীরে। দারুণ কাদা। এতটাই পিচ্ছিল যে পায়ের আঙুল দিয়ে টিপে টিপে হাঁটতে হচ্ছিল সবাইকে। চরে উঠে ছুটলাম সাগরতীরে। কয়েকজন নেমে গেল পানিতে। ওরা পানিতে দাপাদাপি করুক। এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি চরটা সম্পর্কে কিছু তথ্য। কুকরি-মুকরিতে শ্বাসমূলীয় বনের পরিমাণ আট হাজার ৫৬৫ হেক্টর। চরের বন্য প্রাণীর মধ্যে আছে হরিণ, বানর, উদবিড়াল, বনবিড়াল, শিয়াল, সাপ, বন মোরগ প্রভৃতি। আর উদ্ভিদের মধ্যে আছে কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, গেওয়া, কাঁকড়া, হেকাল, পশুর প্রভৃতি। আর চরের মানুষের প্রধান পেশা মাছধরা ও কৃষিকাজ। এই চরে নাকি একটা বড় বাজারও আছে। আমাদের দলের ১০ জন বলল, 'চল, তাহলে সেখানে যাওয়া যাক।'
শুরু হলো বনের মধ্য দিয়ে ট্রেকিং। কাটার মতো বের হয়ে থাকা শ্বাসমূলগুলোকে কাটিয়ে কাটিয়ে সামনে এগোতে থাকে আমাদের শহুরে পা। মাঝেমধ্যে আমাদের গতি রোধ করতে হঠাৎ উপস্থিত হয় খাড়ির ওপর ছোট ছোট পুল। বাজারের কাছে আসতেই তীরে এসে তরী ডোবার উপক্রম। সামনে বিশাল এক সাঁকো। সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে সেটাও পার হই। আমাদের বিশ্ব জয়ের আনন্দ দেখে কে! বাজারে যেতেই স্থানীয় লোকজন আমাদের ঘিরে ধরে; যেন এভারেস্ট জয়টা আমরাই করেছিলাম। সে আনন্দ অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কেননা সন্ধ্যা হয়ে আসছে যে, ফিরতে হবে লঞ্চে। শেষমেশ অনেক ঝক্কি-ঝামেলার পর লঞ্চ থেকে একটা ট্রলার এসে আমাদের উদ্ধার করে।
রাত ১২টায় নতুন বছরের প্রথম ক্ষণে 'আমার সোনার বাংলা...' লেখার চারদিকে বেষ্টিত জ্বলন্ত মঙ্গলপ্রদীপ ঘিরে গাওয়া হয় জাতীয় সংগীত। তারপর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় নতুন দিনের প্রত্যাশায়। পরের দিন সকালে নতুন বছরের নতুন সূর্যকে বরণ করে নেওয়ার অনুষ্ঠান হয় চরের সমুদ্রতীরে। স্থানীয় লোকজনও অংশ নেয়। সমবেত সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুরো উৎসবের আয়োজন। উৎসব শেষ হয়ে যায়, কিন্তু উৎসবের আমেজটুকু থেকে যায়। সেটাই রোমন্থন করতে করতে কেটে যাবে একটি বছর। আবার হাজির হব সামনের 'সূর্য উৎসব'-এ, নতুন সূর্যের আবাহনে।
আলোচিত ব্লগ
চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।