নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর কিছুটা মন খারাপ, পুরানো বন্ধুদের মনে পড়ে। আমি এম্নিতে কখনোই খুব বন্ধুবৎসল ছিলাম না, কিন্তু তখন মনে হতে লাগলো...যেন কতো মধুরই না দিন ছিল! গোদের উপর যেমন বিষফোড়া হয়, বন্ধুবিরহে আমার হলো চিকেন পক্স। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি গা খুব চুলকাচ্ছে। পিঠে নখ দিতেই কিছু একটা টের পেয়ে মাকে ডাকলাম। মা কিছুক্ষণ অদ্ভূত চোখে দেখলো, তারপর খুব তাড়াতাড়ি বাবার সাথে কি এক গোপন শলাপরামর্শ করলো। আর অনতিবলম্বে আমাকে গৃহবন্দি করে দিল।
একে তো বন্ধুদের কোনো খবর নেই, তার উপর গৃহবন্দি...মন-মেজাজ এতো খারাপ হলো...কি আর করবো!!আমার দুরবস্থায় বাবার বুঝি দয়া হলো। আমার চাওয়ার আগেই কিনে আনলেন সাইকেল, লাল রঙের একটা দারুণ সাইকেল। কিন্তু এইটুকু শুধু বুঝলাম না, আমাদের এই ছোট্ট ঘরে চালাবো কোথায়...গৃহবন্দি অবস্থায় কিনে এনেছেন নিশ্চয়ই রাস্তায় চালাবোর জন্যে নয়! এক মাস কেটে গেলো শুধু বসে বসে সান্তনার সাইকেল এর প্যাডেল ঘুরাতে ঘুরাতে। অনেক নিম পাতার রস আর হাবিজাবি খাওয়ার যন্ত্রণা শেষে যেদিন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলো যে চিকেন পক্স শেষ সেদিন আর তর সইলো না। বিকাল হতেই সাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামলাম। সাথে বাবা। বাবা পিছনে সীট ধরে বললেন-"সামনের দিকে তাকিয়ে চালা, চাকার দিকে তাকাবি না",নিষিদ্ধ কাজটা বেশি করতে মন চায়, তাই মনে হয় এক মাস পিছে পিছে ছুটেও বাবা তার গাধা ছেলেটাকে প্যাডেল ঘুরানো আর বেল দেয়া ছাড়া আর কিছুই শেখাতে পারলো না। চাচাতো ভাই, বাবা, আরো কত কে যে আমার সাইকেলের পিছে ছুটলো, সে আর বলতে!!
আমার সমবয়সী এক মামাতো ভাই, সেও দোয়া করতে লাগলো তার যেন পক্স হয়, তাহলে মামাকে বলে একটা সাইকেল পাবে। মামাও ভবিষ্যত অমঙ্গলের কথা ভেবে আগে-ভাগেই সাইকেল কিনে দিলেন। আমরা দুইজন এম্নিতে খুব ভাল বন্ধু ছিলাম, দুই জন মিলে সাইকেল নিয়ে বের হলাম। আমার দৌড় তখন দেয়াল ধরে সাইকেল চালানোর মত, আর মামাতো ভাই প্রথম ধরায় সাইকেল নিয়ে এক টানে গলির মোড়টা পার করে ওপাড়ের দেয়ালে জমিয়ে রাখা বালির ঢিবিতে আছড়ে পড়লো। আমি অবাক...এক দিনে এতো দূর!! জেদ চেপে গেলো। দিলাম এক টান, কিন্তু ওর মতো আমার কপালটা ভালো না আর কি...উড়ে গিয়ে পড়লাম ইলেকট্রিক পোলে। সেদিনই আমরা দুইজন সাইকেল চালানো শিখলাম।
সেই সাইকেল নিয়ে কতো শত স্মৃতি...দল বেঁধে ঘোরা...ধানমন্ডির নির্জন রাস্তায় সাইকেল রেস... অন্য পাড়ার ক্রিকেট খেলার মাঝে ডিস্টার্ব করা ...দূরের দীঘিটার কাছে যেয়ে ব্যাংলাফের ঢিল ছোঁড়া...নির্জন কিছু আড্ডা...আরো কতো কিছু। সব ছেপে মনে পড়ে শধু সেই যে বাবা পিছন থেকে সীটটা হঠাৎ করে ছেড়ে দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে পড়তো আর আমি টাল-মাটাল হয়ে চালাতাম, পিছু ফিরে বাবাকে খুঁজতাম, খুঁজে পেতাম শুধু প্রিয় সেই ইলেকট্রিক পোল।
(ফেরারী পাখির চলে আমার সাইকেল- হাওয়ার বেগে লেখাটা পড়ে সাইকেল নিয়ে কিছু লেখতে খুব ইচ্ছে হলো!! )
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


