রূপকথার গল্প শুনতে অন্তুর খুব ভালো লাগে। এজন্যে মামাকেও ওর খুব পছন্দ। আগে মা অনেক ভালো ছিল, প্রতি রাতে ওকে জোলার গল্প, হাঁড়ির ভূতের গল্প শোনাত। এখন মা সারারাত জেগে থাকে বারান্দার ইজিচেয়ারটায়, কি যেন ভাবে। কিছু বলতে গেলে চুপ হয়ে থাকে, কোনো কথা বলে না। মাঝে মাঝে এখন মাকে খুব ভয় লাগে। রাতে ভূতের স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলেও কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। ও এখন সবচাইতে ভয় পায় ঘুমন্ত রাজকন্যাটার ড্রাগনটাকে। ওইদিন মামা ঘুমন্ত রাজকন্যার গল্প বলেছিল। কিন্তু মামাটা খুব ফাঁকিবাজ, গল্প বলতেই চায় না, শুরু করতে না করতেই পালিয়ে যেতে চায়। ক্লাস আছে না কি আছে বলে ড্রাগনের মুখে রাজপুত্রকে রেখে চলে গেলে। ওদিকে রাজকন্যা তো ঘুমের জগতে। মামার গল্পের ড্রাগনটা এতো ভয়ংকর যে প্রতি রাতে এখন ড্রাগনটাকে স্বপ্নে দেখে ঘুম ভাংছে আর কম্বলের নিচে কাঁপাকাঁপি করতে হচ্ছে।
ইচ্ছে করলেই কিন্তু মামা গল্পটা শেষ করে দিয়ে যেতে পারতো। তাহলে ওর-ও জানা থাকতো ড্রাগন কিভাবে মারতে হয়, রাতে ড্রাগন মেরে রাজকন্যাকে উদ্ধার করে নিত। এখন প্রতি রাতে ও নতুন নতুন আইডিয়া ট্রাই করছে, কিভাবে ড্রাগন মারা যায়। হ্যারি পটারের জাদুর কাঠিটা আজকে রাতে ব্যবহার করবে কিনা ভাবছে। ঠিক এরকম সময় বেল বেজে উঠলো। খুশিতে অন্তু লাফিয়ে উঠে দৌড়ালো দরজার দিকে, নিশ্চয়ই মামা এসেছে। দরজা খুলতেই অয়ন ঘরে ঢুকলো। অন্তু এক ঝাপে মামার কোলে উঠে পড়ল। অয়ন জিজ্ঞেস করলো হাসতে হাসতে,"কিরে বেটা, কেমন আছিস?" অন্তু কপট রাগ দেখিয়ে বললো,"তুমি তো ওইদিন কার না কার ফোন পেয়ে চলে গেলে, আমি এখন ড্রাগনের ভয়ে ঘুমাতে পারছি না।" "বলিস কি? "অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল অয়ন, হাসতে হাসতেই বলতে লাগলো,"আচ্ছা যা, আজ রাতে ড্রাগন মেরে রাজকন্যাকে ঘুম থেকে তুলে তোর কোলে তুলে দিব, পারবি তো কোলে নিতে?" অন্তু লজ্জা পেয়ে গেল, মামাটা যে কিসব বলে না!!
ভাত খেতে খেতে অয়ন জিজ্ঞেস করলো,"আপা কোথায়? বারান্দায়?" অন্তু চুপচাপ মাথা নাড়লো। অয়ন আর ওকে ঘাঁটালো না। উঠে গিয়ে বারান্দায় গেলো। মলিন মুখে আপা আধাশোয়া হয়ে আছে। "আপা, খাবি না?"পাশের মোড়ায় বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো অয়ন। অর্পা জবাব দিল,"তুই খা, খেতে ইচ্ছে করছে না।" তারপর দীর্ঘক্ষণের নীরবতা, দুইজনেই চুপচাপ বসে রইলো। "দুলাভাই আসেনি এখনো?"নীরবতা অয়নই ভাংলো। অর্পা কিছুই বললো না, অয়ন ধীর পায়ে হেটে বারান্দা থেকে বেরিয়ে আসলো। অর্পার চোখের কোল বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো...ভেবেই পেল না ও, এতো অশ্রু কোথায় জমা ছিল?
"মামা, এবার গল্প শুরু কর", অন্তুর আবদার শুরু হলো। অয়নের মন এমনেই খারাপ লাগছে, অনেক কষ্টে ঝাড়ি দেয়া থামালো। বললো,"আজ না রে, ঘুমা। কালকে বলবো।"কাঁদোকাঁদো মুখ করে অন্তু বললো, "বলো না মামা, নাহলে যে আমি ড্রাগনটার ভয়ে ঘুমাতেই পারছি না।" অয়ন এতো দুঃখেও হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারলো না কি আর করা, আবার গল্প শুরু করলো...
" তারপর হলো কি, ড্রাগনটাকে মেরে রাজপুত্রকে রাজকন্যা উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু রাজপুত্র ভেবে দেখলো, এই ড্রাগনটা তো ভীষণ ভয়ংকর, কিভাবে মারবে? শিকল দিয়ে বাঁধা ছিল ড্রাগনটা, শিকলের সীমানার মধ্যেই প্রাসাদে ঢোকার একমাত্র পথ। কিছুতেই যে ড্রাগনটা পথ পেরোতে দিবে না। বসে বসে ভাবতে লাগলো রাজপুত্র, কি করা যায়। একসময় অপেক্ষা করতে করতে পাহাড়ের উপরেই রাজপুত্র ঘুমিয়ে পড়ল। ড্রাগনটা সারারাত গর্জন করতে লাগলো, ঘুমের মধ্যেই যেন রাজপুত্র সে গর্জন শুনতে পেলো। সকাল হতেই রাজপুত্র তলোয়ার নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ঢুকতে গিয়ে দেখে ড্রাগন তখনও ফোঁসফোঁস করছে। রাজপুত্র ড্রাগনকে জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে এখানে কে বেঁধে রেখেছে?ড্রাগন গর্জন করতে করতে বললো, আমার মালকিন আমাকে এখানে রাজকন্যাকে পাহারা দিতে বেঢে রেখেছে, তুই কে রে? এখানে কি চাস? রাজপুত্র বললো,আমি তোমাকে তোমার শিকল বন্দী দশা থেকে মুক্ত করতে এসেছি। ড্রাগন কিছুটা অবাক হলো, ভাবতে লাগলো এতো এতো বছরে এতো এতো বীর রাজপুত্র রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে এসে মরেছে, এরা কেউই তো তাকে উদ্ধার এর কথা ভাবে নি! ড্রাগন দুঃখে কাঁদতে লাগলো। রাজপুত্র তার তলোয়ার দিয়ে আঘাত করতে করতে শিকল ছিড়ে ফেললো। বললো, হে ড্রাগন, তুমি এখন মুক্ত। ড্রাগন বললো, হুজুর আমি আপনাকেই আমার মনিব মানলাম। আপনি আজ্ঞা করুন। রাজপুত্র তখন প্রাসাদের চূড়ার চিলেকোঠায় উঠলো আর রাজকন্যাকে ঘুম ভেঙ্গে উঠালো। তারপর তারা ড্রাগনের পিঠে চড়ে দেশে ফিরে চললো। গল্প শেষ, এখন ঘুমা।"
অন্তু তখন চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলো,"তারপর কি হলো?" অয়ন তো অবাক,"তারপর মানে? তারপর আবার কি হবে?" অন্তু বললো,"দেশে ফেরার পর কি হলো?" অয়ন মনে করার চেষ্টা করছে রূপকথার বইয়ের এন্ডিংটা কেমন হয়? তারপর বললো,"দেশে ফেরার পর আর কি হবে? অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।"
অন্তুর জবাবটা পছন্দ হলো না, আবার জিজ্ঞেস করলো,"আচ্ছা মামা, অতঃপরের পর কি সারা জীবন সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো?" অয়ন মাথা নাড়লো,বললো, "হুমম।" "তাহলে অতঃপরের আগে কি হলো?"-অন্তুর এই প্রশ্নে অয়ন প্যাঁচে পড়ে গেলো। অতঃপরের আগে কি হওয়া উচিত? জবাব দিল,"আগে আর কি হবে, দেশে ফেরার পর ওরা বিয়ে করলো, রাজপুত্র রাজা হলো, রাজকন্যা রানী হলো, ওদের একটা ফুটফুটে রাজপুত্র হলো, ঠিক তোর মতো। তাকে নিয়ে রাজা আর রানী সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।" অন্তু আর মনে হয় কৌতুহলী হয়ে উঠলো,"রাজপুত্রটা কি আমার মতো?"অয়ন বললো,"হ্যাঁ, ঠিক তোর মতো। সেও তোর মত রূপকথা র গল্প শুনতে চাইতো তার মামার কাছে।" অন্তু একটু মন খারাপ করে বললো,"মামা, তুমি মিথ্যে গল্প বলেছ, আমার মিথ্যে গল্প ভালো লাগে না।" অয়ন বুঝ দেবার চেষ্টা করলো,"কোনটা মিথ্যে বললাম? জানিস না, বিজ্ঞানীরা এখন ড্রাগন এর ধংসাবশেষ খুজে পাচ্ছে? ড্রাগন সেই যুগে থাকতেই পারে...তাহলে মিথ্যেটা কি বললাম?" অন্তু ঠান্ডা গলায় জবাব দিলাম,"আমি যদি রাজপুত্রের মতো হতাম, তাহলে মা-বাবা একসাথে থাকতো, অনেক সুখে থাকতাম আমরা। আমি ওই রাজপুত্রের মতো না। আমাকে মিথ্যে গল্প বলো না। " চোখ বুজে শুয়ে পড়লো অন্তু।
জানালা দিয়ে অর্পা কে দেখা যাচ্ছে ইজিচেয়ারে কেমন মরার মতো শুয়ে আছে। অন্তু ঘুমের মধ্যেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আধো আধো আলো হতে থাকা ভোরে অয়ন শুধু ভাবছে, রূপকথার শেষগুলো এতো এতো সুখের হয়...অতঃপরের আগে কি এমন হয়?
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


