হেডলাইটের আলোটা বেয়ে কালো পিচ-ঢালা রাস্তাটা যদ্দুর দেখা যায় শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা। আশপাশটা এতোই নীরব যে মাঝেমাঝে মনে হয় যেন প্রাণের ছোঁয়াটুকুও নেই। হুশহাশ করে যখন দুইএকটা শ্যালোযান অথবা বাসকে ওভারটেক করে পার হই তখন মনে হয় , নাহ, এখনো মৃত্যুপুরীতে পৌঁছিনি। খুব ছোটবেলা যখন ঢাকা থেকে বাইরে যেতাম, বিশেষ করে গ্রামে, তখন রাতের ছুটে চলাটা খুব ভালো লাগতো। চারপাশে ঘুটঘুটে আঁধার, নীরব রাস্তায় সাইসাই ছুটে চলছি আমরা। দুপাশের সবকিছু নিজের মতো করে কল্পনা করে নিতাম। ঘুটঘুটে আধাঁরটা হয়তো মাঠ, হয়তো ফসলী ক্ষেত পার হয়ে যাচ্ছি নীরবে...মাঝে মাঝে দু-একটি আলো নেচে নেচে ফিরে, হয়তো দেরি করে ঘরে ফেরা হাটুরে। হঠাৎ হঠাৎ আঁধার ভেদ করে দু-একটি হ্যারিকেনের আলো মনে করিয়ে দেয়, নাম না জানা সেই গ্রামটা এখনো ঘুমিয়ে পড়েনি, হয়তো কৃষকের ছোট্ট মেয়েটা হ্যারিকেনের আলোয় পড়ছে। আমার কল্পনা করতে বড়ো ভালো লাগতো। নিদেনপক্ষে আধাঁরে একঘেয়ে লাগা শুরু হলে দেখা যেত আমি হয়তো জানালার কাচে হেলান দিয়ে অমাবস্যার আকাশে তারা গুনছি। মাইক্রোর পিছনের দিকে আমরা বাচ্চাকাচ্চারা জায়গা পেতাম, গানের কলি, ঝগড়া, মারামারি, তর্কাতর্কি শেষে যখন সবাই আস্তে আস্তে চুপ হয়ে যেতো তখুনি ঠিক এমনি করে গ্রামের রূপ আমার চোখের ধরা দিতো। এখন ঘরে ঘরে বিদ্যুত এসে পড়েছে, একটু পরপর ঝলমলে আলো দেখে গ্রামের ওরা হয়তো উন্নয়নের ছোঁয়া দেখতে পায়, আমার স্বার্থপর চোখ শুধু এই শহুরে গ্রামগুলো ফেলে সেই গ্রাম-গ্রাম ভাবের গ্রামগুলো খুঁজতে থাকে... যে গ্রামগুলোতে আধার রাতে খড় বিছানো পথ বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি মাকে জিজ্ঞেস করতাম, "মা ওরা কি আমাদের জন্যে কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে?" শহরে তখনো শুধু অভিজাতদের ঘরে কার্পেট দেখা যেত। গ্রামে শহুরে মেহমান হিসেবে খাতিরটা মনে হয় সেই ছোট্টবেলা থেকে টের পেতাম। এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি, সেই দিন কি আর আছে!? তবু শেকড়ের টানে মাঝে মাঝে বাড়িতে যাওয়া লাগে, যদিও আমি নিজে কতোটুকু শেকড়ের টান অনুভব করি তা নিয়ে নিজেই দ্বিধান্বিত। মাঝে মাঝে মনে হয় এ ব্যস্ত চঞ্চল ঢাকা শহরেই হয়তো আগাছার মতো নিজেরা শেকড় গেড়ে ফেলেছি। তবু মাঝে মাঝে দম ফেলতে হলেও ঢাকার বাইরে গিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।এতো বড়ো ভূমিকা শুধু এই দম ফেলা নিয়ে...
চৌধুরী নামের মানে কি সেটা জানার ইচ্ছে কখনো সেভাবে হয়নি, আর বিশ্লেষণধর্মী আমি কোনোকালেই ছিলাম না। ধরে নিয়েছিলাম কোনো পদবী হবে, কিংবা জমিদারেরা নামের সাথে লাগিয়ে নেয় একটু ভাব মারতে! স্কুলের বাংলা শিক্ষকের কাছে প্রথম জানতে পারলাম চৌধুরী মানে কি...চারধারের অধিকারী। বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে চারিধারে যতোদূর দেখা যায়, ততোদূর জমির মালিককেই সেই আমলে চৌধুরী বলা হতো। আমার ধারণা ব্রিটিশ আমলের জমিদারদের চৌধুরী, খান সাহেব ইত্যাদি পদবী দিয়ে ব্রিটিশরা খুশি করে রাখতো। সে আমলেই আমার নানার দাদা এই চৌধুরী বংশের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তীতে উত্তরাধিকার নানা পর্যন্ত আসতে আসতে এ জমিদারী ভাগ হয়ে হয়ে আর চৌধুরী নামের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেনি। তবু জমিদারের নাতি পরিচয়টা দেবার জন্যে এখনও সেই উপাধি আমরা ধরে রেখেছি। যেহেতু আমি জমিদারের মেয়ের ঘরের ছেলে, তাই আমি অবশ্য সে নামের অধিকারীও নেই।
জমিদার আমলের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গেলে হয়তো এ লেখা আর শেষ হবে না, তাই জমিদারি শেষ হবার ছোট্ট এক শোনা গল্প দিয়ে শেষ করতে চাই আমার বিশাল প্যাচালিকা। ১৯৫৪ সালে শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এ জমিদারী প্রথার অবসান ঘটান। শোনা যায় , খুব ছোট্টবেলায় শের-এ-বাংলা একবার দেখেন যে খাজনা আদায়ের জন্যে গরীব কৃষকের উপর জমিদারের নায়েব আর পেয়াদারা অত্যাচার করছে। শিশু ফজলুল হকের মনে যে জিনিসটা দাগ কেটে যায় তা হলো কৃষকের ছোট্ট ছেলের ভাতের বাসনটুকুও পেয়াদারা রেহাই দেয়নি, কাঁদতে থাকা শিশুকে দেখে সেই বয়সেই দৃঢ়চেতা শের-এ-বাংলা সিদ্ধান্ত নেন এ প্রথা রহিত করার আর একসময় সফলও হন। তাই হরিপুরে আমার নানাই ছিল বংশপরম্পরায় শেষ জমিদার, যদিও নানারা ভাইয়েরা-ভাইয়েরা সম্পত্তি ভাগ করতে করতে জমিদারি এমনিতেও শেষ হতো বলে আমার বিশ্বাস।
জমিদারি প্রথাতে ভালো লাগার মতো কিছু নেই, সে ইতিহাস শুধু শোষণ আর বঞ্চনার ইতিহাস। তবে জমিদারের আদুরে ছোট মেয়ে হিসাবে আমার মা ছোট্টবেলার যেসব গল্প বলতেন, আমি সেসব মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আট বেহারার পালকি...জলে টলোমলো দীঘিতে মা-মেয়ে মিলে রাতের বেলা ঘুরে ফেরা, জমিদারদের বৈঠকখানা, বিকেলে পুকুর ঘাটে দরবার, জমিদারদের শিকারে বের হওয়া আর এক হাত লম্বা চিংড়ি উপাখ্যান, বিশাল পালকির আড়ালে লুকোচুরি... আরো কতো ইতিহাস! যে আমলে সাধারণ মানুষ ছনের আর মাটির ঘরের বাইরে কল্পনা করতে পারতো না, সে আমলে জমিদারেরা যে দালান বানিয়েছিল সেটা ভেবে এখনো অবাক হতে হয়। আর তাই সে জমিদারবাড়ি যাবার প্ল্যান হতেই একটা অন্যরকম রোমাঞ্চ বোধ করলাম। ঘুরে এলাম আমাদের চৌধুরীবাড়ি...তারই কিছু চিহ্নঃ
স্মৃতিবিজড়িত নানাবাড়ি...ধ্বসে পড়ার অপেক্ষায়
চৌধুরীবাড়ির আরো এক মহল
ধ্বংসস্তূপ
এরকম কয়টা মহল আছে আসলে গণা হয় নাই
পলেস্তারা খসে পড়ছে
মরা নারকেল গাছ, মায়ের হাতে লাগানো
আমার ক্যামেরার প্রথম ট্যুর হওয়াতে আমার পোরতিভাও কিছু দেখাইলাম
আলোর লুকোচুরি
সুপারি বন
সংরক্ষণ করলে হয়তো এরকম হতে পারতো...রূপসা চৌধুরী বাড়ি
রূপসা চৌধুরী বাড়ি, পার্শ্ববর্তী জমিদারের মহল
এখন সেখানে প্রায় ভগ্নদশা, জমিদার আমলের মহলগুলোতে আর কেউ থাকে না, সংরক্ষণেরও বালাই নেই। কালের সাক্ষী হয়ে তাই দাঁড়িয়ে আছে আজও। পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে, কোথাও ইট খুলে এসেছে, এমনি করে হয়তো একদিন পুরো দালানটা ভেঙ্গে পড়বে। রক্তের টানেই হয়তো কিছুটা বিষন্নতা ঘিরে ধরেছে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


