ধর্মের বিরুদ্ধে কিংবা প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের লড়াইয়ের মাত্রাগত তারতম্যতার কারণে লড়াইটা অনেক সময় খোদ বিজ্ঞানের বিরুদ্ধেই হয়ে যায়। বিজ্ঞানমনস্কতার দাবী করে বিজ্ঞানকে ধর্মের খোলস পড়িয়ে দেওয়া ছদ্মবৈজ্ঞানিক মানসিকতাও নিন্দনীয়। মূলত প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত উপলব্ধির জগতেই চলে আসে।
ধর্মে গোঁজামিল থাকলেও এর মানবহিতৈষ্যি ভুমিকাও ধর্মবাদীদের আচরণ এবং কুসংস্কারগ্রস্থতার কারণে সমালোচিত হয়, এবং সময়বিশেষে ধিকৃত হয়, এমন ভাবেই বিজ্ঞানবাদীতা এবং এর চর্চাকারী মানুষের কারণে বিজ্ঞানের কল্পিত ধর্মময়তার প্রকাশ চলছে ।
বিজ্ঞজনের উক্তি ইনভার্টেড কমার ভেতরে রেখে কোনো বক্তব্য প্রতিষ্ঠা বক্তব্যের বৈজ্ঞানিকতা প্রমাণ করে না। ধর্মের বৈজ্ঞানিকতা দাবি করা ধর্মবাদী এবং বিজ্ঞানকে ধর্ম করে তোলা বিজ্ঞানবাদী উভয়ের জন্যই এ কথা সমান ভাবে প্রযোজ্য।
ভাববাদী মানসিকতা নিয়ে বিজ্ঞানকে উপলব্ধি করতে চাওয়া, পপুলার কালচার এবং পপুলার সায়েন্সের নিবন্ধ খুঁজে বিজ্ঞানকে উপলব্ধি করতে চাওয়া সময়ে সময়ে বৈজ্ঞানিক বিভ্রান্তি তৈরি করে। তবে সাধারণ পত্র-পত্রিকা এবং ফোরামে বিজ্ঞানের চর্চা হয় কম, বরং বিজ্ঞান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পঠিত ধারণার চর্চা হয় বেশী। বিজ্ঞানপুঁথি পড়ে একেকজন ছদ্মবিজ্ঞানবাদী নাঙ্গা তরবারী উঁচিয়ে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
ফাঁপা বিজ্ঞানসম্পর্কিত ধারণা যখন উন্মোচিত হয় তখন বিজ্ঞান উপহাস করে এইসব বিজ্ঞানবাদীদের, পরিহাসের বিষয় অনেক জ্ঞানী জনের উক্তি সম্বলিত এইসব বিজ্ঞানময় প্রবন্ধ বিষয়ে কিছু বললে বিজ্ঞানবাদী এবং ধর্মবাদী উভয়ের জন্যই স্পর্শ্বকাতর হয়ে উঠতে পারে।
প্রথম আলোর বিজ্ঞানপ্রজন্মে এবং প্রায় মুক্তমনা হতে চাওয়া সচলায়তনেও লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার নিয়ে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের গবেষণা এবং বিজ্ঞানের মূল সূত্র জানবার প্রক্রিয়ায় এত বড় একটা আয়োজন আগে কখনই ঘটে নি।
লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন প্রোটন প্রোটন সংঘর্ষ এবং আরও বড় পরিসরে সীসা- সীসা পরমাণুর ভেতরে সংঘর্ষের মাধ্যমে মূলত তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার এখন পর্যন্ত করা অনুমাণের যথার্থতা যাচাই করা হবে।
পপুলার সায়েন্স পত্রিকা পড়া মানুষেরা অনেকটা ধর্মের মতোই প্রশ্ননিরপেক্ষ মনে করতে পারে এই অনুমাণকে। তবে শেষ পর্যন্ত এটা একটা মডেল, যে মডেল এখন পর্যন্ত সীমিত পর্যায়ে ভবিষ্যত বানী করতে পারে, আমাদের পরীক্ষণের ফলাফলগুলোকে ব্যখ্যা করতে পারে একটা পর্যায় পর্যন্ত।
কিন্তু গাণিতিক হয়ে উঠা পদার্থবিজ্ঞান এবং সৃষ্টিতত্ত্ববিজ্ঞানে এমন একটা তত্ত্বের ভেতরে পরিবর্তনযোগ্য প্যারামিটার শতাধিক, এগুলোর যেকোনোটাই পরীক্ষণের ফলাফল বদলে দিতে পারে।
তাই এত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা। তরল হিলিয়াম দিয়ে একটা ভুগর্ভস্ত চেম্বার করে ১.৩ কেলভিন তাপমাত্রায় রাখা বিশাল বড় মাপের একটা কাজ। যদিও এই চেম্বার থেকে হিলিয়াম হারিয়ে যাওয়ায় পরীক্ষণ কিছু দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে বর্তমানে তবে যদি মহাবিশ্বকে বিবেচনা করতে হয় তবে এটাই মহাবিশ্বের শীতলতম স্থান।
পৃথিবীর পরীক্ষাগারে এরও বেশী শীতল অবস্থা তৈরি করা হয়েছে। পরম শূণ্য না হলেও তার কাছাকাছি তাপমাত্রায় পৌঁছানে একটা নিয়মিত বিষয় বড় বড় গবেষণাগারে । ০.১ ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রা তৈরি এখন তেমন আলোচিত ঘটনা নয়। তবে মূলত তাপমাত্রা নয় বরং এখানে বিবেচিত হয় পরমাণুর গতিশক্তি।
কোনো উপায়ে আমরা যদি পরমাণুর গতিশক্তি হ্রাস করতে পারি তবে তার তাপমাত্রা কমে যাবে, শুতরাং বিভিন্ন কারিগরি ব্যবস্থায় আমরা শুধুমাত্র পরমাণুগুলোর গতিশক্তি হ্রাস করি, এভাবেই আমরা কিছু পরমাণু পাই গবেষণাগারে যাদের গতিশক্তি মূলত ০.১ ডিগ্রী কেলভিনে পরমাণুর গতিশক্তির চিত্র যেমন হবে তেমন।
মূলত পপুলার সায়েন্সের নিবন্ধগুলোতে এই কথাই বলা হয়েছে এটা মহাবিশ্বের উষ্ণতম স্থান বিবেচিত হবে। প্রোটন -প্রোটন সংঘর্ষের পরে সেখানের তাপমাত্রা উঠে যাবে সূর্য্যের তাপমাত্রা ১ লক্ষ গুণ বেশি হয়ে যাবে এই অনুমাণ আসলে প্রোটনের গতিশক্তি বিবেচনায়। অর্থ্যাৎ আমাদের সংঘর্ষরত প্রোটনের গতিশক্তিকে আমরা যদি রূপান্তরিত করি তাপ গতিবিদ্যার সূত্রে তবে প্রোটনের ৭ টেরা ইলেকট্রনভোল্ট শক্তি পাওয়ার ঘটনা ঘটবে যদি প্রোটোনের তাপমাত্রা সূর্য্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার লক্ষ গুণ হয়ে যায়। তবে প্রোটনের শক্তিটা কিন্তু তাপমাত্রার কারণে সঞ্চিত হচ্ছে না এখানে।
প্রথম আলোর সাময়িকি পড়ে অনেকক্ষণ হাসলাম, এখানে সংঘর্ষের সময় সূর্য্যের চেয়ে ১০ হাজার গুণ বেশী তাপ উৎপন্ন হবে। বিজ্ঞান বেচে খাওয়া মানুষদের সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ থাকে না, তবে অজ্ঞতা নিয়ে পরিহাস করাও উচিত নয়। সূর্য্যে প্রতি সেকেন্ডে যে পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয় সেটার ১০ হাজার গুণ তাপ উৎপন্ন হওয়ার সম্ভবনাই ভীতিপ্রদ। এ কারণেই সম্ভবত পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরে একজন আতংকিত মানুষ আত্মহত্যা করেছে।
মূলত বস্তু কি কারণে ভর পায় এ নিয়ে একটা অনুমাণ রয়েছে বিজ্ঞান গবেষকদের। তারা একটা প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছেন, যেটা দিয়ে সম্ভবত পদার্থের ভর তৈরি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো কণিকার ভর থাকে না, এটা একটা সাম্যতার শর্ত ভঙ্গের মতো বিষয়। সাম্যতা ভেঙে নতুন প্রতিসাম্যতা তৈরি কিংবা এমন একটা অনুকুল পরিবেশ তৈরি যাতে শুধুমাত্র আমাদের পরিচিত কণিকারাই অবশেষে টিকে থাকতে পারে। এই অনুমাণগুল অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষ এবং এসবের উত্তর জানাও প্রয়োজন।
কোন প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র আমাদের পরিচিত কণিকাগুলোই টিকে থাকলো এটা যাচাই করা যাবে এই পরীক্ষায় এটা একটা বড় বিষয় বৈজ্ঞানিকদের জন্য। হিগস বোসন পাওয়া যাবে কি যাবে না এটা একটা বড় মাপের প্রশ্ন, সেটার প্রাপ্যতা অবশ্যই বিজ্ঞানগবেষকদের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়। কি কি প্রক্রিয়ায় সংঘর্ষে সমান ও বিপরীত ধর্মী কণিকারা একই পরিমাণে উৎপন্ন হলেও শেষ পর্যন্ত বিপরীত কণিকারা ধ্বংস হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, ইলেক্ট্রো উইক থিওরীর প্রধান সমস্যা একই কাঠামোতে দুই ধরণের ইলেক্ট্রনের উপস্থিতি, নিউট্রিনোর ভর, এইসব দুর্বলতা সত্ত্বেও সবচেয়ে শক্তিশালী অনুমাণ সুপারসিমেট্রিক থিউরী, এটার পরীক্ষণের সাফল্য কামনা করতেই হয়।
তবে যখন সস্তা বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে অনুমিত ১৭০ গিগা ইলেক্ট্রন ভোল্টের হিগস বোসনখেয়ে কণিকার ভর কিভাবে ০.৫ মেগা ইলেক্ট্রন ভোল্ট হয় এই সংক্রান্ত জটিলতাগুলোকে উপেক্ষা করা হয় তখন গোলমাল বাধবেই।
হকিংয়ের অনুমাণ যথার্থ, বিজ্ঞানের মূল সূত্রগুলো বুঝবার জন্য বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু বৈজ্ঞানিক সূত্রগুলোর যথার্থতা বুঝতে হলে কিঞ্চিৎ সময় নষ্ট করে হলেও একটু গভীর পড়াশোনার প্রয়োজন।
রোমান্টিক মহাকাশবাদী মানুষের নিবন্ধ পড়েও বিব্রত হলাম। তারার জন্ম রহস্য আমাদের জানা নেই, কিন্তু তারা একবার জন্ম নিলে এটা ঠিক কি প্রক্রিয়ায় ধ্বংস হবে এ সংক্রান্ত অনুমাণ আমাদের আছে। মৃত্যু বর্ণিল, যেকোনো তারকার পতনই কৌতুহলউদ্দীপক, এবং অনেক বেশী মানুষের নজর তারকার পতন এবং ধ্বংস দেখতে উন্মুখ।
তবে দুঃখজনক সত্য হলো আমরা তারাদের ধ্বংস কিংবা তারাদের বর্ণচ্ছটার অন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় বিবেচনা করতে পারি না এই ফটোগ্রফিক প্লেটগুলোও কিয়দংশে তুলির কারসাজি, অবশ্য মোনালিসার ভ্রুবিহীন ছবি দেখেও হাজার পাতা লেখা হয়েছে অতীতে, অনাগত ভবিষ্যতেও হাজার পাতা লিখবে মানুষ মোনালিসা বিষয়ে।
তবে দুঃখজনক হলো যখন পপুলার সায়েন্সের অনুবাদ করতে গিয়ে মানুষ গ্রহগুলোকে স্বপ্রভায় ভাস্কর অনুমাণ করে নেয়। গ্রহগুলো নিজস্ব জ্বালানীর অভাবেই অনুজ্জল, তাদের নিজস্ব আগুণ নেই, তাই তারা পরের আগুণে আলোকিত হয়ে উঠে। বৃহঃস্পতিও অনেকাংশেই নিজে জ্বলে উঠতে পারলো না বলেই দেবতার বাসস্থান হয়েই কাটিয়ে দিচ্ছে তার সৌরজগতকাল। এমন ভাবেই পপুলার সায়েন্সের চর্চাকারী ছদ্মবৈজ্ঞানিকেরাও বিজ্ঞানময়তার চর্চা করেও নিজস্ব অনুভুতি এবং চর্চার অভাবে অন্য মানুষের উক্তি আর উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন গ্রন্থের সমালোচনা এবং সংকলিত অংশ পড়েই গ্রহদের মতোই পরের আলোতে ভাস্কর জীবন যাপন করছেন।
তাদের নিজস্ব আলো হোক, তারা স্ব মহিমায় ভাস্কর হয়ে উঠুন, এবং অন্তত যখন কোনো বিজ্ঞানপ্রবন্ধ লিখেন তখন নিজে যাচাই করে দেখুক তার বক্তব্যের যথার্থতা। নয়তো আমাদের বিজ্ঞানকে ধর্ম মনে করা বিজ্ঞানবাদীদের বাঁদর নাচই দেখতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



