১.
আসুন তর্কের জায়গাগুলো চিন্থিত করি ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রশ্নে। নিজের ধর্মে আন্তরিক হলে অন্য ধর্মের প্রতি কি আদৌ শ্রদ্ধাশীল হওয়া যায়? ধর্ম যখন অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বলে, তখন সেই ধর্মেরই যদি কনট্রাডিকটরী কিছু বিষয় থাকে এমন যা অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে দেয় না, সেটা একান্তই ধর্মের সমস্যা। আমরা ব্যক্তিগত জীবনে এই জটিলতা কাটিয়ে উঠে সেখানে ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজমের চর্চা শুরু করি তখনই, যা অত্যন্ত সরল ভাবেই আমাদের মাঝে চলে এসেছে মানুষের পৃথিবী আর সভ্যতাকে আজকের এই জায়গায় উন্নীত করে। একটা ধর্ম অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে বলে নিজের ভেতরে অশ্রদ্ধার এলিমেন্ট রেখে যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান তৈরী করেছে এটা অনেক আগে থেকেই নির্ণিত। এবং মানুষ সে জায়গাটা থেকে মুক্তির জন্যই ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজমের চর্চা করে এসেছে। মূলত বলতে পারেন, রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র চিত্রণের আগেই মানুষের মধ্যে ধর্ম নিরপেক্ষতার চেতনা তৈরী হয়েছে। এবং এই ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজম বলতে আমরা কি বুঝি? এটা হচ্ছে নিজের মত করে স্বধর্মের পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে ব্যাখ্যা করে সহাবস্থান সূচিত করার একদম নিজস্ব ধারা। যদি গর্ব করতে হয় আজকের সভ্যতা নিয়ে তবে তা করতে হবে মানুষের এই ধর্ম নিরপেক্ষতার মৌলিক চরিত্রের কারণেই যা ভিন্নমূখী মতাদর্শের টানপোড়নে এখন ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করছে। কারণ অতীতকালে অধিকাংশ রাষ্ট্রই ধর্ম নির্ভর ছিল। আর যদি বর্তমান সভ্যতায় আমাদের এই অবস্থানকে অন্ধকার যুগ বলেন তা হচ্ছে ঐ ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজমকে রাষ্ট্রীয় চরিত্র সরূপে আসীন না করতে পারার জন্যই।
২.
বাঙালী চীনপন্থী বা মস্কোপন্থীরা তাদের শ্রেণী শত্রু নির্বাচনের নিজস্ব ধারায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কযুক্ত হয়ে গেছিল এটা নিশ্চিত হওয়া যায়, যা আসলে এ দেশের সংস্কৃতিনির্ভর চেতনা থেকে সমাজবাদীদের আন্ডাস্টান্ডিং এর একটা বিশাল গলদ, এটা সেই সময়ের তাদের ভাবনা নিয়ে ভাবেন আর আওয়ামী বুর্জোয়ারা কতদূর কি করতে পারে তা আগেভাগে বুঝে ফেলার সক্ষমতা বোঝেন – এটা বুর্জোয়াদের হাতে একছত্র ক্ষমতা তুলে দেয়ার রাস্তাকেই কেবল প্রশস্ত করেছে। যতদূর জানা যায় সেসময় আওয়ামী লীগের ভেতরে বিশাল একটা অংশ ছিল বামপন্থী – কেন তারা নিজেদের সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে নাই – সে জবাবদিহি তাদেরকেই করতে হবে। সেক্ষেত্রে স্বাধীণতা আন্দোলনের চেতনা হিসাবে বামদের অন্য কিছু ভাবার সুযোগ নেই। যদি আলাদাভাবে পাকিদের সাথে ফাইট করে সেটা স্বাধীণতা চেতনাই – আর স্বাধীনতার চেতনা মানেই আওয়ামী চেতনা এটা মানার মত মতিভ্রম আমার এখনও হয় নাই।
৩.
এই বিষয়ে আমার পরিষ্কার দ্বিমত আছে। কারণ ঐ সবচেয়ে কম নিরাপদ শক্রু বেছে নেয়ার জন্য। যেখানে সম্ভাবনা থাকছে সেখানে পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। ধর্ম নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার সমর্থকদের স্বাধীণতার শত্রু হিসাবে চিন্থিত করা যায় খুব সরলাংকে। যারা ৭১ এ দেশের বিরোধীতা করেছে ধর্ম নির্ভর রাষ্ট্রের বিশ্বাসের কারণে তারা আজও এদেশে ধর্ম নির্ভর রাষ্ট্র কাঠামোর কথা বলে। ব্যাস, এখন ঘৃনা প্রকাশ উৎসব শুরু হয়ে গেল। একটা দলীয় চেতনা শক্তিশালী করার দায়িত্ব তার সমর্থকদের – সে হিসাবে রাজাকার এখন শত্রু নয়, শত্রু ধর্মবাদীরা, কিন্তু কেন রাজাকার এসে যাচ্ছে বারবার আক্রমনের পরিভাষায়! সেটা হচ্ছে সংস্কৃতিগত অভিযোজনের কারণে, এটা ভাষার নির্মাণে একীভূত হয়ে একটা বিপ্লবী চেতনা তৈরী করে বলে, যার মূল লক্ষ্য ঐ ধর্মবাদী আন্দোলনকারীরাই যারা কালক্রমে জংগীবাদের বিকাশ ঘটায়, অন্য ধর্মকে প্রান্তিক করে ফেলে। সেখানে আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সবাইকে গালি দেয়া যায় না, কারণ সেক্ষেত্রে তাদের ভয়ংকর সরূপটাকে দৃষ্টির আড়াল করা হয়ে যাবে। এটা কোনভাবেই হতে দেয়া যায় না।
৪.
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস গাছে গাছে লেখা যা পড়ার জন্য লেখাপড়া জানতে হয় না। আকাশে লেখা, বাতাসে লেখা, জীবন্ত ইতিহাসের নির্মাতারা আশেপাশে ঘোরে। তা জানতে এই নিরক্ষর, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বিদ্যা জানতে হয় না, তারা জানে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ দেশের স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের একশ খন্ড পড়ে ইতিহাস জানতে হয় না, ইতিহাস জানতে হয় রক্ত-প্রবাহমনতায় উৎসে। কে জানে না বাংলাদেশের স্বাধীণতার ইতিহাস? কোন বাঙালী জানে না? একদল নিজেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে যারা রাজাকার নামে পরিচিত। পাকিস্থান চিন্থিত শত্রু কিন্তু ঘরের পাশের রাজাকারটিকে সরাসরি শত্রু হিসাবে চিন্থিত করা যায়নি। এই বর্ণচোরারা এখন স্পষ্ট, তাদের আমরা দেখতে পারি। তাদের ইতিহাস জানতে নেখাপড়া জানতে হয় না। এখন নিজেরাই তাদের পরিচয় ফলাও করে প্রচার করে। এই ইতিহাস যে জানে না, সে ঐ রাজাকারেরই ঔরসজাত হতে পারে, তার চেতনাজাত হতে পারে, সুকৌশলে যাকে বাংলার আকাশ বাতাস চোখ মেলে দেখতে দেয় নি, জন্মের পরে দিয়েছে আরবীয় খেজুর আর আরবীয় ভাষা! সে এ ইতিহাস জানবে না যার চোখ বন্ধ করা রাখা হয়েছে। যাকে ভাবতে দেয়া হয়েছে কেবল একটা ইসলামিক ইউটোপিয়ার স্বপ্ন! সে এ ইতিহাস জানবে না।
৫.
সেই নবপ্রজন্মের জন্যও আমার ঘৃনা বুড়া ধাড়ী আজম-নিজামীর মতই। বলবেন দোষ কি! দোষ নাই কোন। দোষ আমার। আমি ঘৃনা প্রকাশ করিনি, এটাই আমার দোষ। যত বেশী ঘৃনা সে দেখবে তত বেশী ইতিহাস জানতে সে উদগ্রীব হবে। সে ফিরে যাবে ৭১ এ ! সঠিক ইতিহাস আদৌ লেখা হোক বা না হোক, লাইব্রেরীতে কোন দলিল থাক বা না থাক, আমার ঘৃনা প্রকাশই তার ইতিহাস জানার চাবিকাঠী!
৬.
জামাল ভাস্করের এ সম্পর্কিত লেখার পরিপ্রেক্ষিতে। বোঝা না গেলেও এইটা পাল্টাযুক্তি না, এইটা কিছু বিষয় স্পষ্টীকরণ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


