টাকা-পয়সা সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখবে নাকি খালি হাতটাই মানুষকে দেখাবে এ নিয়ে দবিরের নিজস্ব কারণ আছে। দেখুন তো কারণটা কনভিন্সিং হয় কিনা। দবির যেকারণে এই খেলাটা খেলে সেটার জন্য একজন লেখকের সুক্ষ্ম দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ বলছি। লেখকের একটা রেপুটেশন আছে। সে ভাবছে, মানে আমি ভাবছি, যখন সেকেন্ডে চারের অধিক পথচারী দবিরকে অতিক্রম করে তখন প্রাপ্ত টাকা-পয়সা সামনে বিছানো চাদরে অথবা স্রেফ রাস্তায় ছড়িয়ে রাখাটা তার কাছে লাভজনক মনে হয়েছে। অধিকমাত্রায় পথচারী থাকা মানে তাদের কোন দিকেই খেয়াল না থাকা। দবিরের তখন মিহি স্বরে গান গাইতে হয়। আল্লাহ আর নবীর নামে। এ-দুনিয়া ফানা হবে কিছুই রবে না। কিন্তু টাকা-পয়সার কনসেন্ট্রেশন চোখের পলকে এই দ্রুতবেগের গাদাগাদি পথের যাত্রীদের নানামুখী বিভ্রম দেয়। কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনে এক টাকার কয়েন - যা প্রায় সবার পকেটের তলানীতে প্রতিদিন কয়েকটা জমা পড়বেই এবং ভিক্ষুককে অর্পন ছাড়া অন্য কোন সুবিধা ক্রয়ে যার ব্যবহার ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে।
দবিরের চোখ ততটা অন্ধ নয় যতটা সে প্রকাশ্যে দেখায়। মিরপুরের গার্মেন্টস পল্লীর এই মোড়টাতে চরাই-উৎরাই আছে। ঝুঁকে চলা ধাবমান শ্রমিকদের মধ্যে নারীরা বেশী দুই টাকার নোট ছুড়ে মারে। এই যেমন উঁচু হিলের স্যান্ডেল পায়ের পথচারী পেয়ারা বেগম প্রতিদিন দুই টাকা দেবে। পেয়ারার নাম পেয়ারা না, কিন্তু দবিরের আক্কেলপুরের পেয়ারার মতই মনটা নরম। সাদা পাকা দাড়ীর মধ্যে থেকে একটা দুই টাকার নোট বের করে দিয়েছিল পেয়ারা - বলেছিলো, চাচা, আপনার দাড়িও তো টাকা খাওয়া শুরু করেছে। দবিরের মনে হয়, সেই আগের মত, ত্রিশ বছর আগের মত, ঠিক পেয়ারার মত। তার লুংগির কোছা থেকে এক টাকার নোট গড়িয়ে পড়লে হেসে খুন হয়েছিল।
তবে সফেদা, রাশিদা আর কেসমতের গ্রুপটাকে আসতে দেখলে দবিরের সতর্ক হতে হয়। আক্কেলপুরের বাসিন্দা এই গ্রুপটা দবিরকে দেখলেই টিটকারী মারে। কেসমত তো প্রতিবার বলে, এইরম অন্ধ সাইজা থাকলে আল্লায় দেখবি ঠিকই আন্ধা বানাইয়া দেবে!
সফেদা, রাশিদা খিলখিল করে হাসে। একদিন দশটাকার নোট ভাঙাতে এসে দুইটাকা মেরে দিয়েছিল কেসমত। আন্ধা-নাটক ভাঙার দুরূহ প্রতিফল হবে ভেবে দুইটাকা জলাঞ্জলী দিয়েছিল দবির। আল্লায় চাইলে এমন অনেক দুইটাকা আসবে, সেজন্য নিজের না-দেখতে পাওয়া যোগ্যতাকে খাটো করতে পারে না।
তবে গার্মেন্টসে প্রবেশের সময় শেষ হয়ে গেলে পথচারী কমে আসে। দবিরের তখন ছড়ানো ছিটানো নোটগুলো গুনে রাখতে হয়। একদম খালি হাতে চাইতে বসে। এ সময়ের পথচারীরা যথেস্ট সময় পায় সবকিছু দেখার। অন্ধ ভিখেরীর শূণ্য থালা কাউকে কৃপা করতে প্ররোচনা দেয়। দবিরের তখন প্রতি পয়সার হিসাব থাকে। গোনা অর্থের গায়ে লেগে যায় নতুন প্রাপ্ত কয়েন। দবির মনে মনে অঙ্ক কষে। একশতেত্রিশ। তারপরে ডাক ছাড়ে, আন্ধারে দয়া করেন বাবারা!
সেই তখন গ্রামের ছেলে শুক্কুর তারে ঢাকা নিয়ে আসলো আর এই জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বললো ফিফটি ফিফটি শেয়ার সেই থেকে দবিরের মোটামুটি নিশ্চিন্ত জীবন। আক্কেলপুরের জীবন ফিকে হয়ে সভ্যতার কাছাকাছি নাগরিক হয়ে উঠেছে। এই গার্মেন্টস গোষ্ঠী ছাড়াও দবির এখন নানামুখী মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। অনেক বেশি জানে সন্ধ্যার পথচারীদের। মোটাসোটা মহিলারা তাদের বারো-তেরো বছরের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বের হয়। সাথে একজন পেটমোটা পুরুষ। এ ফ্যামিলি। এদেরকে দেখলে দবির গান বন্ধ করে। আপা, সারাদিন কিছু খাই নাই! ব্যাস বললেই হলো, দশটাকা কমপক্ষে উঠে আসবে থালাতে। বাচ্চাকাচ্চাগুলো দুঃখিত হয়, মহিলাটি সমাজসেবায় তৃপ্ত হয় আর পুরুষটা খেকিয়ে ওঠে, সালার খয়রাতির জাত, মরলেও মিথ্যা কথা ছাড়বে না!
তবে দুপুরের দিকের সময়টা বেশ মজার। স্কুল-ড্রেসের ছেলেমেয়েরা কেউ কেউ গল্প জুরে দেয়। যেমন তামান্না। ওদের বাসা এই একটু কাছেই। স্কুল থেকে ফিরে পাশের দোকান থেকে আইসক্রিম কিনবে তারপর দবিরের সাথে গল্প জুরে দেবে। আইসক্রিম কেনার পরে ফেরত পাওয়া দুইটাকা দবিরের থালায় জমা পড়বে নিশ্চিত। একদিন বলে, আইসক্রিম খাবেন চাচা!
দবির খেতে চায়, গলা শুকিয়ে আছে। তামান্না অর্ধেক খাওয়া আইসক্রিম দবিরকে দিয়ে দেয়। এমন ঘটনা খুব কম ঘটে, তবে যেদিন তামান্নার আইসক্রিম খেতে ভাল লাগে না, সেদিন রাজভোগ জোটে। মাঝেমাঝে তার আইসক্রিম খাবার স্বাদ হয়। ইচ্ছে করলে আঠাস টাকা দিয়ে সে আইসক্রিম কিনে খেতে পারে। কিন্তু কিনে খাবার জন্য তার ভিক্ষাবৃত্তি নয়। টাকা থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের সব বিনোদনই তার ফ্রিই জোটে।
এইতো সন্ধ্যা গভীর হলে টিভির শো-রুমে সে নানান কিছু দেখতে পারে। একটা চ্যানেলে কেবল চিড়িয়াখানার প্রদর্শনী। মাঝেমাঝে সে ঢাকা চিড়িয়াখানায় বিনোদনভ্রমণকালিন ভিক্ষা করে। লোকজন তো আর জানে না সে বাঘ দেখতে এসেছে। চিড়িয়াখানায় টিকিন কেটে ঢুকতে হয় নি, ছেড়ে দিয়েছে গেটওয়ালা। চ্যানেলের বাঘ, সিংহ ঘুড়ে বেড়ায় খোলা জায়গায়, আর এইখানের গুলো বন্দী। দবির ক্রিকেট দেখে, টেনিস দেখে। এসব দেখে দেখে মুখস্থ করে ফেলে টেনিসের সিজেন। এছাড়া ক্রিকেটের সময় মিরপুর স্টেডিয়ামেও সে যেতে পারে। ভেতরে নয়, বাইরে। টিকিট কেটে দিব্যি চেয়ারে বসেই দেখতে পারে। কিন্তু সেটা তার জন্য বিলাস হয়ে যাবে। আফটর অল সে একজন কর্মঠ পেশাজীবি, যা কিছু ফ্রি তাই কেবল সে ভোগ করতে পারে।
দবিরের থালায় টাকা জমতে থাকলে সে পরিপক্ক হয়ে ওঠে না গুনেই। আন্দাজে বলে দিতে পারে টাকার পরিমান। জানে কখন টাকা লুকিয়ে রাখতে হবে, কখন প্রকাশ্যে। পথচারীর ব্যস্ততা ও ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ করতে শিখেছে। কনভিনসিং! মানে কারণটা বোঝা গেলতো?
তবে একটা কথা বলে রাখি। এর সাথে দবিরের অর্থ হাইডশোর খেলার কোন সম্পর্ক নাই। গল্প তো গল্পই, এর কোন বিশ্বাস নেই। যেমন দবির নামে কাউকে আমি চিনি না। পর্যবেক্ষণগুলো বিচ্ছিন্ন, অধারাবাহিক ও অপর্যাপ্ত। প্রায়শই দবিরদের দেখে আমি পয়সা ছিটাই না। বরঞ্চ পকেট খালি থাকলে দবিরের সামনে থাকা টাকাগুলো মেরে দিতে ইচ্ছ করে। যখন ভিড় থাকে তখন আমি ভুলেও এমন করতে চাইবো না।
কিন্তু নিরিবিলি কোন রাস্তায় কোন একদিন যদি দবিরকে এভাবে এত টাকা ছড়িয়ে বসে থাকতে দেখি আমি হয়তো ছিনিয়ে নেব। তবে দবির নিশ্চয়ই এ কারনে টাকা লুকিয়ে রাখে না।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



