রংপুর
নোহালী গ্রাম
১৯৭৪ সাল
ছুটে চলেছে কাকচক্ষু জল তিস্তা। সৌম্য, শান্ত কিন্তু উচ্ছল। নদীর ধারে বট-পাকুড়ের ফল খেতে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে হরিয়ালের দল। বড় বড় গাছপালা আর পাখিদের কলতানে মুখরিত গোটা গ্রাম। অতিথি পাখিদের কলরবে ঘুম ভাঙলো গ্রামের প্রবীন বৃদ্ধ আকালু শেখের। অন্যরকম এক সকালের অনুভূতি। আকাশে উড়ছে শঙ্খ কিংবা হলুদ ডানার চিল। তিরিশ বিঘা জমির মালিক আকালু শেখের মনে তখন অনাবিল শান্তি।
এই শান্তি বেশিদিন টিকলো না। হঠাৎ নদী ভাঙ্গনে নিস্ব হয়ে গেলেন আকালু শেখ। তার তিরিশ বিঘা জমির স্থানে এখন নদীর কল কল জলের উচ্ছাস। প্রমত্ত তিস্তা তার বাপ দাদার ভিটার উপর দিয়ে খল খল হাসিতে ভেসে চলেছে। শুন্য চোখে চেয়ে থাকেন আকালু শেখ।
তার ঠিক দুবছর পর, ১৯৭৬, ভেসে উঠলো চর। নতুন আশায় বুক বাঁধলেন আকালু শেখ। চরে বুনলেন কাউন আর চিনা। আরেক রাতের ব্যাবধানে তাও ভাসিয়ে নিয়ে গ্যালো তিস্তা! হায়রে প্রমত্ত তিস্তা, আর কতবার নিস্ব করবি?
তিস্তা নদীঃ ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী। তিস্তা সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি বিভাগের প্রধান নদী। একে সিকিম ও উত্তরবঙ্গের জীবনরেখাও বলা হয়। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর বাংলাদেশে প্রবেশ করে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে এটি দেবী পার্বতীর স্তন থেকে উৎপন্ন হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নদীটির বাংলা নাম তিস্তা এসেছে ‘ত্রি-সে্রাতা’ বা ‘তিন প্রবাহ’ থেকে। সিকিম হিমালয়ের ৭,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে এই নদীটি সৃষ্টি হয়েছে। এটি দার্জিলিং -এ অবস্থিত শিভক গোলা নামে পরিচিত একটি গিরিসঙ্কটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দার্জিলিং পাহাড়ে তিস্তা একটি বন্য নদী এবং এর উপত্যকা ঘনবনে আচ্ছাদিত। পার্বত্য এলাকায় এর নিষ্পাশন এলাকার পরিমাণ মাত্র ১২,৫০০ বর্গ কিলোমিটার। পার্বত্য এলাকা থেকে প্রথমে প্রবাহটি দার্জিলিং সমভূমিতে নেমে আসে এবং পরে পশ্চিমবঙ্গের (ভারত) দুয়ার সমভূমিতে প্রবেশ করে। নদীটি নিলফামারী জেলার খড়িবাড়ি সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
অষ্টাদশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত এই ধারাটি বিভিন্ন নদীপ্রবাহের মাধ্যমে গঙ্গা নদীতে প্রবাহিত হতো। ১৭৮৭ সালের অতিবৃষ্টি একটি ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি করেছিল এবং সেই সময় নদীটি গতিপথ পরিবর্তন করে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী নদীবন্দরের দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদে পতিত হয়। তিস্তা নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিমি, তার মধ্যে ১১৫ কিমি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত।
তিস্তার মাসিক গড় পানি অপসারণের পরিমাণ ২,৪৩০ কিউমেক। তিস্তা একসময় করতোয়া নদীর মাধ্যমে গঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল এবং এর অংশবিশেষ এখনও বুড়ি তিস্তা নামে পরিচিত।
এখনকার তিস্তাঃ নীলফামারীর দোয়ানিতে ব্যারেজ দেয়া হয় তিস্তার প্রমত্ততাকে উত্তরবঙ্গের ধুলি ধুসর এলাকাকে সুজলা সুফলা করে তোলার জন্য। সেচ দেয়া হতো নদী তীরবর্তী এলাকা গুলিতে। ঠিক তার ৭০ কিলোমিটার উজানে ভারতের গজলডোবা নামক স্থানে হঠাৎ তৈরী করলো বাঁধ! উচ্ছল দূর্বার গতিকে রোধ করে দেয়া হলো, মুখ ঘুরিয়ে নেয়া হলো ক্যানেল তৈরী করে। জল রঙের ক্যানভাসে আঁকা তিস্তা এখন ধুকে ধুকে চলছে। নদীর উভয়পাশের জনপদ যেখানে সম্পূর্ণ রূপে নির্ভর ছিলো তিস্তার উপর, এখন তারা কুলে দাঁড়িয়ে হাহাকার করে। মাইলের পর মাইল শুধু চর আর চর। মেরে ফেলা হচ্ছে তিস্তা কে। বর্ষার একটু বর্ষনেই নামে প্রবল ঢল ও বন্যা! গভীরতা কমে যাওয়ায় উঠে আসে গতি পথ ছেড়ে মানুষের বাড়ির উঠানে, কৃষকের ক্ষেতে, চলাচলের রাস্তায়।
নদীর স্বাভাবিকতা ধরে রাখতে যেখানে চার হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র দুইশো কিউসেক পানি। মাছগুলো চলে গেছে নদী ছেড়ে। আগে যেখানে ডিম পাড়তে উজানে চলে আসতো মাছের ঝাক, গভীরতা কমে যাওয়ায় এখন তার আর আসে না। যারা আসে তারা সারা বছর পথ চেয়ে থাকা অভুক্ত জেলেদের জালে বন্দী হয়ে বিপন্ন করে তুলছে প্রজাতি। কয়েকটি তো হারিয়েই গেছে! কোন রকমে তির তির করে এগিয়ে ভাটিতে ব্রহ্মপুত্রে মেশে।
নদীর এপার ওপার করতো শত শত নৌকা। সেই খানে এখন মাইলের পর মাইল চর। যোগাযোগ ব্যাবস্থার এহেন দূর্দশায় গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ জন। কেউ এখন আর গায় না, "মাঝি বাইয়া যাও রে..."
ক্যানো এমন হচ্ছে?
সুজলা সুফলা হয় এখন ভারত। মহানন্দা নদী বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে আবার গিয়ে ঢুকেছে ভারতে। বাংলাদেশের অংশে তার মৃতপ্রায় অবস্থা থাকলেও ভারতে ঢোকার পরপরই হয়ে যায় প্রমত্তা! কিভাবে!
তিস্তার পানি বাঁধ দিয়ে ক্যানেল বানিয়ে দেয়া হচ্ছে মহানন্দা নদীর ভারত অংশে! বাংলাদেশের ব্যারেজ পর্যন্ত বাঁধকে পাশ কাটিয়ে যে পানি আসে সেটা ছোট্ট বালিকার চুলের ফিতার সাথে তুলনা করা যায়।
বাংলাদেশের ব্যারেজের আগে তিস্তায় পড়া চর! পানির অভাবে মৃত তিস্তা!
কি আছে তিস্তা চুক্তিতে?
তিস্তা চুক্তিতে মূলতঃ তিনটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে-
প্রস্তাব ১ : ভারতের গজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ২০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৮০ ভাগ পানি বাংলাদেশ ও ভারত সমভাবে ভাগ করে নেবে।
প্রস্তাব ২ : ভারতের গজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ২০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৮০ ভাগ পানি ১৯৮৩ সালে প্রস্তাবিত এডহক চুক্তি অনুযায়ী ৩৬:৩৯ অনুপাতে বাংলাদেশ ও ভারত ভাগ করে নেবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাবে ৩৮ শতাংশ আর ভারত পাবে ৪২ শতাংশ।
প্রস্তাব ৩ : ভারতের গজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ১০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৯০ ভাগ পানি ১৯৮৩ সালের এডহক চুক্তি অনুযায়ী ৩৬:৩৯ অনুপাতে বাংলাদেশ ও ভারত ভাগ করে নেবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাবে ৪৩ শতাংশ আর ভারত পাবে ৪৭ শতাংশ।
সেখানে ভারত এই তিনটি পয়েন্টের একটাও মানবে না। তারা বলছে ভারতের গজলডোবা ও বাংলাদেশের দোয়ানীতে সেচ প্রকল্পের কমান্ড এরিয়ার অনুপাতে পানি বণ্টন করা হবে। বাকি থাকবে যা তাই দিয়ে নদী চলবে। তা সেচ প্রকল্প ভারতের অংশে কততুকু আর বাংলাদেশের কতটুকু? গজলডোবায় সেচ প্রকল্পের কমান্ড এরিয়া ৫.৪৬ লাখ হেক্টর আর দোয়ানীতে ১.১১ লাখ হেক্টর। যার অর্থ নদীর জন্য নূন্যতম যদি ১০% পানি রাখা হয়, তা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত ১:৫ অনুপাতে পানি পাবে! মানে বাংলাদেশ ১৫% আর ভারত ৭৫%! এর মাঝেও আছে শুভঙ্করের ফাঁকি! নদীর জন্য যে ১০% রাখা হয়েছে তার মাঝে ভারতের দাবী ৮% আর বাংলাদেশ কে দেবে ২%। টোটাল দাঁড়ায়, ভারত ৮৩% আর বাংলাদেশ ১৭%!
রাজনিতীঃ
"তবে দুই দেশের 'বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের' ইতিহাস টেনে রাজ্য সরকারের সেচ দপ্তরের মন্ত্রী সুভাষ নস্কর ওই খসড়ার নোটে লিখেছেন, যেহেতু বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশ, তাই শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানির ২৫ শতাংশ বাংলাদেশকে দিলেও রাজ্যের কোনো ক্ষতি নেই।"
দাদাদের মহান দয়ায় যে আমরা ২৫% পাবো সেই তো আমাদের মহা ভাগ্য!
আর মমতা দিদি আমাদের ২৫% এর বেশি দিবেনই না! আপোষহীন হিসেবে তার সুনাম-দূর্নাম উভয়ই রয়েছে। তারা আমাদের জন্য মাছের মায়ের পুত্রশোকের মতো শোকের সাথে যে ১৭% থেকে ২৫% ভিক্ষা দিতে রাজি হয়েছেন সেটা নিয়ে আমাদের দুইদিন ব্যাপী রাষ্ট্রীয় উৎসব করা উচিত! আমাদের নপুংশক রাষ্ট্রযন্ত্র বরাবরেই মতোই ব্যার্থ হয়েছে কুটনৈতিক কলাকৌশলের কাছে। বড় দাদা দিদিরা যা বলেছেন, নতজানু হয়ে মেনে নিতে চেয়েছিলেন তারা। সিং সাহেব এয়েচেন আমাদের দেশে। মুরগীর বিরিয়ানী ও এঁকোটা আস্ত ডিম খেয়েই তবে তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। তবে বাংলার নদীমাতৃকার নদী আমরা পাবো কিনা জানিনা। হয়তো দাদাদের চোখ রাঙ্গানিতে করিডোরের মতো বিনা পয়সায় ধমকের জবাবে প্যান্ট ভরে হিসু করে দিয়ে সই করে ফেলবো তিস্তা চুক্তি আর হিসুর পানিতে সয়লাব করার চেষ্টা করবো তিস্তার দুকুল!
পরিবেশ আর অন্যান্য কথা বাদই দিলাম, অন্তত দেশের কয়েক লাখ জনগন, যাদের জীবন জিবিকা তিস্তার উপর নির্ভরশীল। আমাদের খাদ্যভান্ডার উত্তরবঙ্গের কৃষি ও কৃষকের কথা চিন্তা করে হলেও রুখে উঠুন এই নপুংশক মানুষের মতো চুক্তি করার বিপক্ষে। আমাদের ভবিষৎ, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের দাঁড়ানোর মাটি টি যে আমাদেরই শক্ত করে দিয়ে যেতে হবে!
সূত্রঃ
১। তিস্তা নদী- উইকি
২। মরে যাচ্ছে তিস্তা - পরিমল মজুমদার।
৩। ভারতের এক পেশে তিস্তা চুক্তির খসড়া- সচল জাহিদ।
৪। অকৃত্রিম বন্ধু ভারত - ০১ : নদ-নদী - ০১ : ভারতের তিস্তা-মহানন্দা শোষণ - দেবাশিস্ মুখার্জি
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে আগস্ট, ২০১৫ রাত ১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



