পাহাড়ে জুম ক্ষেতে এখন পাকা ফসল তোলার ভর মৌসুম। জুমিয়াদের ঘরে উঠছে জুমের সেই সোনালি ফসল। আর ফলানো ফসল ঘরে তুলতে পেরে জুমিয়া নারী-পুরুষের মুখে ফুটেছে হাসি। চোখে আশার আলো। জুম্ম নারীরা উৎফুল্ল মনে ব্যস্ত জুমের পাকা ধান কাটতে।
তিনটি পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের আদিবাসীদের জুম ক্ষেতে সবেমাত্র শুরু হয়েছে পাকা ধান কাটা। ধুম পড়েছে মারফা, বেগুন, ধানি মরিচ, ঢেঁড়শ, কাকরোল, কুমড়াসহ ইত্যাদি ফসল তোলার কাজ। এরপর ঘরে উঠবে তিল, যব এবং সব শেষে তোলা হবে তুলা। জুমে বীজ বপনের ৫ মাস পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের পর ফলিত ফসল দেখে হাসি ফুটে ওঠে জুম চাষীদের মুখে। এ মৌসুমে জুম ক্ষেত থেকে ফসল ঘরে আনতে শুরু হয় উৎফুল্ল জুমিয়া নারী-পুরুষের। কিছু কিছু জুমিয়া ঘরে নবান্ন উৎসবের আয়োজনও শুরু হয় এসময়। গত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ে বন্যা এবং ইঁদুরের উপদ্রবে জুমের পাকা ফসল ঘরে তুলতে পারেনি জুমিয়ারা। ফলে অভাব-অনটনে কেটেছিল সাম্প্রতিক বছরগুলো। এ মৌসুমে উপযুক্ত জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের কারণে এবং ইঁদুরের উৎপাত কমে যাওয়ায় ভালো ফলন হয়েছে। জুমের সোনালি ফসল ঘরে তুলতে পারায় জুম্ম নারী-পুরুষ ফিরে পেয়েছে মুখের হাসি। চোখে ফুটে উঠেছে আশার আলো।
জুম চাষের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। পার্বত্য আদিবাসীদের জীবিকার আদিম ও প্রধান উৎস এই জুম চাষ পদ্ধতি বেশ কষ্টসাধ্য। চাষের মৌসুমে প্রথমে নির্বাচিত পাহাড়টির জঙ্গল ও আগাছা বিশেষ কৌশলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বৃষ্টির পর নির্বাচিত জুমের জমিতে পুড়ে যাওয়া জঙ্গল ও আগাছার ছাই সারের কাজ করে। এর পর ছোট্ট ছোট্ট গর্তে একই সঙ্গে কয়েক ধরণের ফসল বোনা হয়। ধান, গম, ভূট্টা, আলু, কলা, তরমুজসহ জুমের জমিতে প্রায় সব ধরণের খাদ্য শষ্য ও শাক-সব্জি চাষ করা হয়।
জুম চাষে বন পোড়ানো নিয়ে বনজ-প্রানীজ সম্পদ ধ্বংস, ভূমি ক্ষয় ইত্যাদি সংক্রান্ত নানান ভ্রান্ত ও অতিরঞ্জিত ধারণা রয়েছে। এখানে জুমচাষের কিছু বিশেষত্ব উল্লেখ করছি -
১. জুমের আগুনে কখনো আগাছা বাদে কোনো বনজ বা প্রাণীজ সম্পদ নষ্ট করা হয়না।
২. বিশেষ কৌশলে আগুন ধরানো হয় বলে বনাঞ্চলে এই আগুন ছড়িয়ে পড়েনা।
৩. নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই পাহাড়িরা জুম চাষ করতে গিয়ে বন ও চাষ এলাকার কোনো বড় বা দামি গাছের ক্ষতি করেন না।
৪. জুম চাষে লাঙ্গল বা কোদাল ব্যবহৃত হয় না। জুমিয়ারা পাহাড়ে একটি ছোট্ট গর্ত খুঁড়ে একই গর্তে নানা রকম বীজ এক সঙ্গে বপন করেন বলে ভূমি ক্ষয় হওয়ারও প্রশ্ন আসে না।
৫. জুমের ফসলের বীজ সমতলের চেয়ে ভিন্ন। এসব ফসল উৎপাদনে কোনো ধরণের সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়না।
৬. জুমের শষ্য, ফল-মূল ও তরি-তরকারির আকার-আকৃতি সমতলের উৎপাদিত কৃষিজ পণ্যের চেয়ে ভিন্ন; এগুলো খেতে খুবই সুস্বাদু।
_______________________________________________
মুল লেখা: সুশীলপ্রসাদ চাকমা: পাহাড়ে জুমিয়াদের মুখে হাসি, ঘরে উঠছে...
তথ্যসুত্র; বিপ্লব রহমান: পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ (তিন)
ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: http://www.flickr.com

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



