প্রথম পর্ব : Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব : Click This Link
আমার দু'সপ্তাহের সফরে বুকিত বিনতাং গিয়েছিলাম দু'বার । বুকিত বিনতাং - Most Happening Place, এই এলাকায় সব কিছুতেই বড় বেশী উদ্দামতা, আধুনিকতা । শপিং মল, হোটেল, বার, খোলা রেস্তোরা, ওপেন এয়ার কনসার্ট- যদিও পুরো শহরটাই কমবেশী ঝলমলে তবুও এই এলাকার চাকচিক্যটা যেন একটু বেশীই। মিশ্র জাতির মানুষের সারাক্ষণ আনাগোনায় সরগরম থাকে বুকিত বিনতাং ; মালয়, চাইনিজ থেকে শুরু করে আরব, আমেরিকান, ইউরোপিয়ান, আফ্রিকানদের ছড়াছড়ি -সাদার সাথে কালো, কালোর সাথে সাদা, চোখে পরবে হরহামেশা।
এবার একটা পার্থক্য লক্ষ্য করলাম, মালয় মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ দেয়ার প্রবনতা কমে এসেছে। অবশ্য এই পরিবর্তনের ধাপটা আমি আগেরবার আমার হোস্টেলের মেয়েদের মাঝে দেখেছিলাম । বেশীর ভাগই পড়াশুনা বা চাকরী সংক্রান্ত ব্যাপারে অন্যান্য অঞ্চল থেকে কুয়ালালামপুর এসেছে। প্রথমদিকে তারা মাথায় স্কার্ফ ছাড়া ঘরের বার হতে বড্ড বেশী ইত:স্তত করত । হোস্টেল সুপারভাইজার কখনও আলোচনার জন্য এলে অথবা হোস্টেল হিসেবে ব্যবহৃত বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়িটি পরিস্কার করার জন্য তার ছোট ভাই নিজে কিনবা লোক নিয়ে প্রতি শনি বা রবিবারে এলে মেয়েরা মাথার স্কার্ফ খোঁজার জন্য ছুটোছুটি শুরু করে দিত; কেউ কেউ চটজলজি হয়ত হাতের কাছের টাওয়েল মাথায় দিত, কেউ তাও না পেলে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা বলত। আমি প্রথম প্রথম অবাক হয়ে কান্ড-কারখানা দেখতাম, তারপর আমার শুধুই একান-ওকান হাসি । সেই মেয়েদের অনেকের মাঝেই ধীরে ধীরে শহুরে ছাপ পরতে দেখেছিলাম। প্রায় দু'বছর পরে কুয়ালালামপুর এসে পার্থক্যটা আরো বেশীই ধরা দিল আমার চোখে। বুকিত বিনতাং এলাকাতে ঘোরাঘুরি করার সময় পাশ দিয়ে একটা ছোটখাট মেয়ে ধুমপান করতে করতে যেতে দেখে মেজাজটাই চড়ে গিয়েছিল। কষে একটা চড় লাগাতে পারলে ভাল লাগত । মেয়েটার বয়স বেশ কম মনে হচ্ছিল। কিছু কিছু কর্মকান্ড বয়সের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, কিছু কিছু স্বাধীনতার ব্যবহার অভিজ্ঞতার সাথে মিল রেখে করা উচিৎ বলেই মনে করি।
প্যাভিলিয়ন বলে একটা শপিং মল চালু হয়েছে শুনেছিলাম কিন্তু সেটা যে এত এলাহি ব্যাপার তা শপিং মলে পা না দিলে বুঝতে পারতাম না কিছুতেই। বিশাল ফুড কোর্টে গিয়ে কফি খেয়ে মলের অন্যান্য ফ্লোরগুলো ঘুরে দেখলাম। একটা মুভি দেখলে সময়টা ভালই কাটবে এই ভেবে মলের মুভি থিয়েটারে হানা দিলাম। চারপাশে বিশাল বিশাল সিনেমার পোস্টার, ঝুলে থাকা মনিটরে মুভির শিডিউল; কোন মুভি দেখব ঠিক করা কষ্টকর হয়ে গেল। তবে চিন্তা নেই, এখানে ফ্রন্ট ডেস্কে জানাতেই একটা চাইনিজ ছেলে খুবই নাটকীয়ভাবে মুভির কাহিনী বর্ণনা করা শুরু করে দিল। ঠিক হলো Gone Baby Gone মুভি দেখব। টিকেটও নিয়ে ফেললাম । কিন্তু হাতে আছে প্রায় ঘন্টা দেড়ক। অবশ্য এখানে একঘেয়ে লাগার সুযোগ একেবারেই নেই । মল থেকে রাস্তায় নেমে আসি। মলের সামনের চত্বরটা অসাধারণ; পুরো চত্বর জুড়ে টিউব লাইটের মত লাগানো আছে, হালকা নীলচে আলো ছড়াচ্ছে। ভাবুন তো রাতের বেলা এর উপর দিয়ে হেঁটে চলার অনুভূতিটা কতটা রোমান্টিক আর নাটকীয় হতে পারে !!!
এদিক-সেদিক হাঁটাহাঁটি করতে করতে একটা রাস্তার মোড়ে চলে আসলাম । এই মোড়টাতে সব সময় কোন না কোন ইভেন্ট হয় - মূলত ওপেন এয়ার কনসার্ট । মিউজিকের আওয়াজ আর উৎসুক জনতার ভিড় বলে দিল এবারও একটা ধুম-ধারাক্কা কনসার্ট হচ্ছে । কখন পায়ের উপর ভর করে উচুঁ হয়ে, কখনও বা এর-ওর পাশ দিয়ে উঁকি-ঝুঁকি দিতে দিতে এক সময় একটা যুতসই জাযগাতে দাঁড়িয়ে গেলাম। চাইনিজ উপস্থাপিকার চটুল কথাবার্তা চলল কিছুক্ষণ তারপর একটা ব্যান্ড আসল- ওয়ান ফর অল, বোধহয় আমেরিকান ব্যান্ড । চার জনের অতি চমৎকার পরিবেশনা । আমার কাছে একটা ব্যাপার ভাল লাগছিল এখানকার শৃংখলতা । কনসার্ট হচ্ছে, অথচ পাশের রাস্তায় গাড়ি চলছে নিয়মমাফিক। কিছু লোক জন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে যার ভাল লাগছে না কিনবা ব্যস্ততা আছে সে চলে যাচ্ছে । দর্শনার্থীদের মাঝে উচ্ছ্বাস ছিল, উচ্ছৃংখলতা ছিলনা । অবশ্য কনসার্টের কাছেই পুলিশের গাড়ি ছিল। মিউজিকের তালে আর পরিবেশনায় এতটাই মশগুল ছিলাম মুভির দেখব কি দেখব না ভাবতে হলো ; তবে মুভিটা মিস্ করতে ইচ্ছে করলনা । তাই সরে আসলাম ওখান থেকে ।
রাস্তা পার হয়ে আসতেই দেখলাম. কতগুলো তরুণ-তরুণী ছোট্ট ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে হাসছে পথচারীদের দিকে তাকিয়ে । Free Hug -ব্যানারের লেখা পড়তেই খানিকটা ভড়কে গেলাম !!! একই অবস্থা পথচারীদেরও । কিন্তু তরুন-তরুণীদের বাহু মেলা আহ্ববানে অনেকেই ব্যাপারটা বুঝে গেল, মজাও পেয়ে গেল অনেকেই । চলতি পথে থেমে কেউ কেউ এদের সাথে কোলাকুলি করে আবার যার যার পথে হাঁটা দিচ্ছিল । নেহায়েতই মজা ছাড়া কিছুই নয় । তবে এখন একটু ভাবলে মনে হয় ঠাট্টাচ্ছলে করা এই কনসেপ্টটার বড় প্রয়োজন দুনিয়াতে। রাজনীতির রেষারেষি, ধর্ম নিয়ে টানা-হেঁচড়া, উন্নত বিশ্ব আর তৃতীয় বিশ্বের ইঁদুর-বেড়াল খেলা ; আমাদের মাঝে দুরত্ব বাড়ছে দিনকে দিন । একটু থেমে দু'পক্ষ জড়িয়ে ধরে, গলা মিলিয়ে দেখি না তিক্ততা কমে কিনা !
দ্রুত পায়ে ফিরে এসে পপর্কণ এর একটা জাম্বো সাইজ প্যাকেট কিনে থিয়েটারে প্রবেশ করলাম। আগেরবার থিয়েটারে মুভি দেখেছিলাম দু’বার. Suria KLCC-র মুভি থিয়েটারে । আগেও মনে এসেছ্লি, এবারও মনে হলো আমাদের বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের স্টার সিনেপ্লেক্স থিয়েটার কিন্তু তুলনা করলে ভালই মনে হয় আমার কাছে। একটা ছোট্ট মেয়ের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে একটু থ্রিল এবং অনেক বেশী পারিবারিক ইমোশন, সেই সাথে সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য মা-বাবার সুস্থ, দ্বায়িত্বশীল সঙ্গের প্রয়োজনীয়তা- এই নিয়ে Gone Baby Gone-এর চমৎকার কাহিনী কখনও যেমন পপর্কণ খাওয়ার গতি কমিয়ে-বাড়িয়ে দিল , আবার শেষের দিকে চোখে হালকা পানিও এনে দিল।
মুভি শেষে বের হয়ে বোঝা গেলো পেটে খিদে । বাংলাদেশেই এখন KFC আছে, Pizza Hutআছে, তাই এগুলো বাদ দিয়ে McDonaalds এ খেতে গেলাম । খাবারের নামটা মনে আসছেনা, তবে রোল করা রুটি, ভেতরে ভেজিটেবল, পেঁয়াজ, মেয়নিজ আর সাথে গোল মরিচ গুড়া মাখানো এক গাদা মচমচে আলু ভাজি (ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ) - ইয়াম্মিইইই...।
এরপরে আরেকদিন সন্ধ্যার দিকে এসেছিলাম বুকিত বিনতাং এলাকায়; সেদিন অবশ্য কোন কনসার্ট হতে দেখিনি, কোন Free Hug এর আহ্ববান -ও ছিল না । তবে খোলা রেস্তোরাগুলোতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, এমন কি তরুণ-তরুণীদের আয়েশ করে হুকো টানতে দেখে একটু ঝটকা খেলাম । শুনলাম এটা নাকি সীসা খাওয়া হচ্ছে । একটু মাথা চক্কর দিল । আমাদের ঢাকার বাতাসে এক সময় সীসার পরিমান বেড়ে যাওয়ায় পরিবেশবিদরা কত চিন্তা-ভাবনা শুরু দিল; স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়ে, জনসাধারণ, ট্রাফিক পুলিশ সবাই মুখে মাস্ক ব্যবহার আরম্ভ করল । আর এরা এখানে এমন আয়েশ করে সীসা খাচ্ছে !!! পরে জানলাম, এই সীসা সেই সীসা না, আরো সীসা আছে !!!
সেদিনই এক শপিং মলে ঢুঁ মেরে চোখ কপালে উঠে গেল (Starhill Gallery)। ভিডিও করা শুরু করেছিলাম কিন্তু সিকিউরিটি গার্ড এসে খুব সুন্দর করে জানালো নিষেধাজ্ঞা আছে। একটা শপিং মলের ওয়াশ রুমও যে এত দেখার মত হতে পারে তা ভেতরে না গেলে বুঝতাম না । ফুড কোর্টের একেক রেস্তোরার একেক ধরনের নির্মাণ শৈলী, কারুকাজ এদের নান্দনিক চিন্তাভাবনার চুড়ান্ত প্রকাশ যেন । অবশ্যই এই শপিং মলটি বিত্তশালী, শৌখিন ব্যক্তিবর্গের কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে।
আবার আগের কথার খেই ধরি। McDonaalds -এ ডিনার শেষ হলো; এবার ফেরার পালা । বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া তখনও চমৎকার। বেশ অনেকক্ষণ হাঁটাহাটি করলাম। রাতে যখন ঘুমুতে গেলাম তখনও চোখে ভাসতে লাগল সেই ভোরে এয়ারপোর্টে পা দেয়া থেকে শুরু করে অসাধারণ একটা সন্ধ্যা বেলা। দারুন এক ভাল লাগা নিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। পরের দিন আরো এক্সসাইটমেন্ট অপেক্ষা করছে - গ্যানটিং হাইল্যান্ড !!!
*************************************************
ছবি যেন, শুধু ছবি নয় : উপরের ইউ-টিউব ভিডিওটি আমার তোলা; প্যাভিলিয়ন মলের ভেতরে ।
১. প্যাভিলিয়ন মল -এ প্রবেশের পর বিশাল সিঁড়ি ।
২. টম ইয়াম : দারুণ চনমনে সুগন্ধযুক্ত সি-ফুড স্যুপ। এখানে গাজরের টুকরো মত যা ভাসছে, তা আসলে কোন ধরনের সামুদ্রিক মাছ । সেই সাথে ছোট ছোট চিংড়ি মাছ ভাসছে। রেস্তোরা ভেদে স্যুপের মিশ্রণে পরিবর্তন দেখা যায় ।
৩. Nasi Lemak(নাসি লেমাক ) এর অর্থ Rice in Cre am. Riceকে Coconut milk -এ steam করা হয় । এখানে সাথে আরো আছে, চিকেন ফ্রাই, শুটকি মাছ ভাজা, বাদাম সিদ্ধ, বাদামের তরবারী, পাপড় ভাজা। মালয়রা দুপুর এবং রাতের খাবারের সাথে পাপড় ভাজা খেতে পছন্দ করে ।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৮ সকাল ৯:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



