ঢাকা শহর রিকশার শহর, রিকশার ভাড়া নিয়ন্ত্রণের কোন ব্যবস্থা নেই; এটার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কেউ ভাবেনি নিশ্চয়ই । কতটুকু যাত্রপথে ১০ টাকা ভাড়া দিব আর কতটুকুতে ১৫ টাকা, বুঝতে পারিনা। একেকদিন একেক রকম ভাড়া দেই । আল্লাহ মাফ করুক, কাকে ঠকাচ্ছি আর কার সাথে ইনসাফ করছি কে জানে !
শহরে অনেক খোঁড়া-খুঁড়ি চলছে, আবার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যও বিশাল আয়োজন- আর তাই ধুলায় ধুলাময় পুরো শহর । পন্ডস এর এ্যাডের মত ঘটনা ঘটে প্রতিদিন - "কি ব্যাপার শাকিল ভাই, আপনি আমাকে চিনেন নাই ?" সানিয়া!!!...ও মাই গড!!!" ফেয়ার এন্ড লাভলী মেখে প্রতি সপ্তাহে নিজেকে বদলে ফেলার অঙ্গিকার নেই। ব্ল্যাক সানসিল্কে ধুলো ওড়ানো চুলে মেঘকালো চমক ফিরিয়ে আনি। ডেটল সাবানে হাত ধুতে ধুতে কাদার মত ময়লা দেখে নিশ্চিত হই, জীবানুমুক্ত হলাম। কসমেটিকস কোম্পানীগুলো ভালই ব্যবসা করছে এই ফাঁকে।
দিনের শুরু থেকে শেষ যখন এমন হয়, তখন মেজাজ খিঁচড়ে না গেলেই অবাক হতে হয়; কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এসব দেখে আমরা এতো বেশী অভ্যস্ত যে আর অবাক হইনা; আমরা অভ্যস্ত এই "এভাবেই" এর সাথে, সবকিছু "এভাবেই" চললেই আমরা ভাবলেশহীন থাকি । যেদিন রাস্তায় যানযট থাকে না, বাসায় ফেরার পর দিব্যি ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরতে দেখি, সেদিন এই '"অস্বাভাবিকতা" চমক জাগায়- কি ব্যাপার!!!
এই হলো বর্তমান প্রেক্ষাপট; আমাদের চিন্তা-ভাবনার সঠিক ভারসাম্য একটু একটু করে পরিবর্তন হচ্ছে; "স্বাভাবিক" আর "অস্বাভাবিক" -এর সংঙ্গা আমরা পরিবর্তন করে ফেলেছি । আমরা হাসিনার চিকিৎসা নিয়ে উৎকন্ঠিত,অথচ নিজেরা হসপিটালে নৃন্যতম সেবাটুকু পাইনা ! লোডশেডিং -এ হাত পাখা ঘুরাতে ঘুরাতে আমরা খালেদার মুক্তি নিয়ে শংকা প্রকাশ করি ; কিন্তু জ্যামে বন্দী থাকি প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা!!!
এরকম ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম। "এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান, নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার " ; শিশুরা বেড়ে উঠছে- তরুণ, যুবক; একটার পর একটা প্রজন্ম লাইনে দাঁড়িয়ে । হায়, "কেউ কথা রাখেনি" , স্বাধীনতার ৩৭ বছর কাটলো !
"আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে"; আমি একদম একমত হতে পারিনা আর এই কথার সাথে। উল্টো প্রশ্ন জাগে , দেশ কি দিচ্ছে ? হায়, দেশ ! দেশ কিভাবে দেবে ! দেয়ার কথা দেশকে যারা চালনা করে, যারা কর্ণধার, তাদের। যাদের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যায়, অথবা শিক্ষিত না হয়েও কোটিপতি হয়ে যায়,দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে, ছেলেভুলানো কথায় তরুণ প্রজন্মের কাছে "আইডল" হয়ে যায়- দেশের ভবিষ্যৎ মালিক বনে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর সেই সব তথাকথিত নেতা-নেত্রীদেরই তো অন্তত চক্ষুলজ্জার কারণে হলেও প্রতিদান স্বরূপ দেশের জন্য কাজ করা উচিৎ । অবশ্য কোন কাজ না করার পরও বছরের পর বছর এদেরকেই আমরা শাসনভার দেই, এদেরকে নিয়ে কলামের পর কলাম লিখি, পত্রিকায় কাটতি বাড়াই, চাল-ডালের দাম বেড়ে গেলে খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেই, কিন্তু এনাদের খবর জানার জন্য পত্রিকা পড়া ছাড়িনা। বাঙালী কি অনেক মহান জাতি ? নাকি আমরা ধর্মপরায়ণ আর তাই ক্ষমাশীল; কারণ ধর্মে বলা আছে। নাকি আমরা আদতে দূর্বল ?
আমরা বোধহয় আসলে প্রভূভক্ত কুকুর!!! জীবন-যাপন করছি কুকুরের মত, মনিব যখন যেভাবে হাড় ছুঁড়ে দিচ্ছে তাই দৌড়ে গিয়ে কুড়িয়ে নিয়ে চেটে-পুটে খাচ্ছি । বছর বছর একগাদা শাবক জন্ম দিচ্ছি; সবাই মিলে ঘেউ ঘেউ করে মনিবের নিরাপত্তায় উদ্বিগ্নতা জানিয়ে দিচ্ছি। সেই মনিবই গায়ে গরম মাড় ঢেলে দিলে শুধু কুঁই কুঁই করছি !! মনিব কিন্তু পিঠে হাত বুলিয়েও দেখে না!
এখানে কত মেধাবী ওলিগলিতে হারিয়ে যায়; মেধা বিকাশের পন্থাগুলোর দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, কিন্তু কোন পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়না ।
প্রকৃতি ভারসাম্য হারাচ্ছে ; কিন্তু আমরা এখনো কবিতায় লিখি সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা । ঋতু বৈচিত্রতা টের পাওয়া যায়না, কিন্তু মুখস্ত বিদ্যার মত এখনো পরিচয় দেই- ষড়ঋতুর দেশ।
কাকে দোষ দেয়া যায় ? সরকারকে ? রাজনৈতিক দলগুলোকে ? নাকি আমাদের ? আমরা সারা বছর তেনাদের নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কে, টক শোতে এতো বেশী ব্যস্ত থাকি নিজের কথা বলার বোধটুকুও বোধহয় মাথায় আসেনা ! আর সরকার জানে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই বেহাল ব্যবস্থার সাথে এতো বেশী পরিচিত যে এর ব্যতিক্রম হলে আমাদের "হজমের অসুবিধা" হয় ।
এই দেশ যেন আজ সত্যজিতের কালজয়ী সিনেমার মত "হীরক রাজার দেশ" -এ পরিণত হয়েছে। সেই মগজ ধোলাইকৃত জনগণ আমরা - বোধহীন, দাবিহীন, ভাবলেশহীন । শাসকগোষ্ঠি এদেশের রত্নভান্ডার লুটে নিচ্ছে , তবু আমাদের মুখে রাজার বন্দনা অহরহ। শাসকগোস্ঠিকে বাঁচাতে আমরা ঝাঁপিয়ে পরি, প্রয়োজনে নিজেরাই মারামারি-কাটাকাটি করি; কিন্তু আমাদের নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে কোন দাবী, চাহিদা শোনা যায়না, বরং শুধু শ্লোক আওড়াই- যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান !!!!
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



