ভাবনায় ছেদ পরে; মাতৃদেবী প্রতিবারের মত এক দাবী তোলায় চেষ্টারত; বিষয়বস্তু - আমার কর্মক্ষেত্রে ঈদের ছুটি কবে থেকে নির্ধারিত হবে ? কারণ, গৃহস্থালী কর্মে আগে থেকেই একটু হাত লাগাতে হবে; না হলে চাঁদ মামা হুট করে সন্ধ্যাকাশে বাঁকা হাসি দিলে চুড়ান্ত অপ্রস্তুতিতে পাকশালাতে হাঁড়িতে-পাতিলে-বাসনে ঠোকাঠুকি, ঝালে-ঝোলে মাখামাখি, শিল-নোড়াতে হাতাহাতি- সে এক তথৈবচ অবস্থা!
আর আমি ? প্রতিদিন দু’ঘন্টার জ্যাম পার হয়ে আযানের আগে আগে বাড়িতে পা দেই! মাঝে মাঝে হাতে যা সময় থাকে তাতে তো দু’মিনিটের ম্যাগীও সম্ভব নয়। অবশ্য ছুটির দিনে উদ্ভট কিছু একটা বানিয়ে সারা সপ্তাহের ফাঁকিবাজি পুষিয়ে নেই কিছুটা । বছরের পর বছর চুলার পাশে দাঁড়িয়ে শেষ বেলায় চপ-বেগুণী-পেঁয়াজু ভেজে ভেজে মাতৃদেবীও বিরক্ত। তাই অবধারিত ভাবে ইফতারীতে খাদ্যাভাসের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন। দু’য়েক সময় রসনা তৃপ্ত করতে বাইরে থেকে আনিয়ে দেখা গেল বেসনে ডুবিয়ে কচকচে নোট মচমচে করে ভেজে খেলেও এর চেয়ে বেশী স্বাদ হওয়ার কথা। দোকানের পেঁয়াজুতে মসুর নয় খেসারী ব্যবহৃত হয় অনেক আগে থেকেই কিন্তু আজকাল মনে হয় হয় ডাল নয় আটা দিয়েই পেঁয়াজুর রেসিপি চলছে! তাই কষ্টে-সৃষ্টে ঘরোয়া পরিবেশে ঘরের খাবারেই ফিরে আসতে হয় আর কি।
ওদিকে পিতৃদেবের হাঁশফাঁশ জান ইফতারীর সময় রুহআফজাতে তৃপ্তি খোঁজে একটু। সংযমের মাসে বাজারের হালচালে কোন সংযম খুঁজে পাননা তিনি। রোজা আসলেই ছোলা-বুট-পেঁয়াজ-বেগুণ-আলু অনেকটা মণি-মুক্তো-হীরে-জহরত সমতুল্য হয়ে যায়। সাজানো ফলমূলের দোকান যেন দূর থেকে দেখতেই ভাল লাগে বেশী তাঁর । পেঁয়াজ বেশী করে এনে রাখলে ভাল, এই শশাগুলো ভাল নয়, টমেটো আরো লাগবে, ধনে পাতা না হলে চপ বানানো যাবে না, বিস্কুটের গুড়া তো আনাই হয় নি, একটু গাজরও লাগবে, লেবু না হলে পোলাও-গরুর মাংস ভূনা খেতে মজা হবে না , এই যাহ! ডিম কম পরে গেল - এক ফালি চাঁদ বাঁকা হাসি দিয়ে তার কর্তব্য শেষ করলেও পিতৃদেব বাজার আর ঘরের মাঝে ম্যারাথন দৌড়ে পরে যান।
তাবৎ দুনিয়ায় যখন পালা-পার্বনে নানা রকম ছাড় উৎসব চলে তখন আমাদের গুনতে হয় "টাকা, টাকা, আরো টাকা! এর চেয়েও বেশী টাকা" ! এর থেকে পরিক্রাণ পাওয়ার উপায় অবশ্য আমার কাছে আছে! সিন্ডিকেট ! ছোলা-বুট-পোলাওয়ের গন্ধ বাতাসে ভাসার আগেই মজুদ গড়ে তুলতে হবে ঘরে ঘরে ! সিন্ডিকেট শব্দটা বিতকির্ত তাই এর নতুন নামকরণ জরুরী – স্টক-হোম ! (আমার ধারণা স্টকহোম শহরের নামকরনের পিছনে এরকমই কোন ইতিহাস আছে!) ।
কমর্ক্ষেত্রে যোগদানের আগেই ম্যানাজার বাবু বলেছিলেন, এখানকার অভিধানে ঈদ বোনাস বলে কোন শব্দ এখনও সংযোজিত হয়নি ! কথাটা শুধু শুনেছিলাম, উপলব্ধি করিনি ! এখন তিরিশ দিনের মজুরি সপ্তাহ খানেক আগে পাওয়ার পর দেখলাম, কেমন জানি খালি খালি লাগে- একটা খচখচে অনুভূতি! ওদিকে অফিসের পিয়ন সালাম দিয়ে বখশিস চায়; রিকশাওয়ালা বলে, ”আফা , ঈদের আগে কিসু কমুনা...দিয়েন ইট্টু বাড়ায়...” ! কই যাই! কই পাই! বড় কষ্টে আছি আইজুদ্দিন !
এতোসব কুরুক্ষেত্রের সাথে যোগ হয় ঊনত্রিশ আর ত্রিশ রোজার দ্বিধা-দ্বন্দ। সারা বছর যে চাঁদকে প্রেমিক-প্রেমিকা-কবি-ভাবুক আর নাসা ছাড়া কেউ তাকিয়ে দেখে না, সেই চাঁদ দেখার জন্য গুরুগম্ভীর কমিটি! তারপরও চাঁদ উঠুক বা নাই উঠুক, কারো জন্য খানিক দ্বিধা নিয়ে, কারো জন্য বিরক্তি, তাড়াহুড়ো নিয়ে, কারো জন্য বিশাল ছুটি-ছুটি আমেজ নিয়ে, কারো জন্য গুরুপাক খাবরের সুঘ্রাণ নিয়ে, নতুন জামার রঙ নিয়ে - শেষ পর্যন্ত ঈদ আসে ।
বাড়ী যাওয়ার তাড়া নিয়ে ঈদ আসে
দূর প্রবাসে আত্মীয়-স্বজন-পরিজনহীনতায়, নি:সঙ্গতায়, মন খারাপ করা ঈদ আসে
যাকাতের কাপড় নিয়ে, ধার্য করা ফিতরা নিয়ে ঈদ আসে
ঝলমলে শপিংমলে ঈদ আসে
উচ্চবিত্তে, মধ্যবিত্তে, নিম্নবিত্তে ঈদ আসে
হাঁড়িতে-পাতিলে-বাসনে-কোসনে ঈদ আসে
প্রাসাদে-মহলে ঈদ আসে, বস্তিতে ঈদ আসে
টিভি চ্যানেলে সাত দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা নিয়ে ঈদ আসে
তরল পানীয়ের ঊল্লাসে ঈদ আসে
চিমসে যাওয়া পেটে ঈদ আসে
রুগ্ন শিশুর জ্বল জ্বলে চোখে ঈদ আসে
দুষ্টু মেয়ের তুল তুলে গালে ঈদ আসে
তুমি-আমি চাই বা না চাই ঈদ আসে
তোমার জন্যই, আমার জন্যই বছর ঘুরে ঈদ আসে।
ঈদ মোবারক ।।
[পুনশ্চ : শুভেচ্ছা কার্ডটি রাসেল ভাই এর পাঠানো ছিল; ভাল লাগল; শুধু শুধু গুগল সার্চ দিতেও হলো না আর। সবার সাথে শুভেচ্ছা বার্তা ভাগাভাগি করলাম]
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০০৮ রাত ৮:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



