Ethical Issues Concerning Representation of Narratives of Sexual
Violence of 1971
by Nayanika Mookherjee
********************************
আমি বীরাঙ্গনা চম্পা সম্পর্কে অবগত হই ভোরের কাগজে প্রকাশিত, বীরাঙ্গনা চম্পা মানসিক হাসপাতালে (ভোরের কাগজ ১৩/৫/৯৮) , এই শিরোনামের চল্লিশোর্ধ বয়সের চম্পার ছবিসহ একটি প্রতিবেদন থেকে ।
প্রতিবেদনটি অনেকটা এরকম ছিল -
" স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নিজের সম্ভ্রমকে বিসর্জন দিয়ে চম্পা বিগত বিশ বছর যাবৎ পাবনা মানসিক হাসপাতালে বন্দী জীবন-যাপন করছে। ১৯৭১ এর মধ্যবর্তী সময়ে চম্পা হারিয়ে যায় এবং মা-বাবা -কে হারিয়ে ফেলে। যখন সে সবাইকে খুঁজছিল তখন পাক-বাহিনীর এক দল তাকে অপহরণ করে ক্যাম্পে নিয়ে যায় । অন্যান্য বন্দী নারীদের সাথে চম্পাকেও সম্মুখীন হতে হয় পাকসেনাদের সেই অমানুষিক নির্যাতনের । বারবার এই অমানুষিক শারীরিক অত্যাচারের ফলে চম্পা তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে । সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে মুক্তিযোদ্ধারা এই ক্যাম্প দখল করে নেয় এবং বীরাঙ্গনাদের মুক্ত করে দেয়। চম্পার শরীরে বর্বরতার ছাপ সুস্পষ্ট ছিল এবং তার কোন বোধশক্তি ছিলনা ।
স্বাধীনতার পর চম্পাকে ঢাকাতে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রের তত্বাবধানে দুই বছরের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা দেয়া হয়। এই চিকিৎসার পরও সে সুস্থ-স্বাভাবিক না হলে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রের ম্যাট্রন, মীরা চৌধুরী, চম্পাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন ।
রেজিস্টার খাতায় উল্লেখিত চম্পাকে হাসপাতালে ভর্তির তারিখটি ২২শে অক্টোবর । পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিজোফ্রেনিক সমস্যায় আক্রান্ত চম্পা ছয় মাসে সুস্থ হয়ে ওঠে। রেজিস্টার খাতাতে এও লেখা ছিল যে, খুব সম্ভবত পাক-সেনারা তাকে ধর্ষণ করেছিল। চম্পাকে পরিবারে ফিরিয়ে নেবার অনুরোধ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চম্পার বাবা, আব্দুল গণিকে তাদের বরিশালের ঠিকানায় বহুবার চিঠি পাঠান । কোন প্রকার সাড়া না পেয়ে চম্পাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবার উদ্যোগে হাল ছেড়ে দেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সুস্থ হওয়ার পর এতগুলো বছর ধরে চম্পা হাসপাতালের রোগীদের সেবা-শুশ্রূষায় নিয়োজিত । চম্পা তার বাল্যকালের স্মৃতিচারণ করে এবং তার পরিবারের স্মৃতিগুলোও এখনও জীবন্ত তার কাছে । সাংবাদিক যখন তাকে পাকসেনাদের ক্যাম্পে বন্দীদশার কথা জানতে চান তখন অশ্রুসজল চোখে চম্পা তা বর্ননা করতে অসম্মতি দেন। যদিও চম্পা জানান যে তিনি বাকি জীবন এই হাসপাতালেই কাটিয়ে দিতে চান তবে এই সাক্ষাৎকারের শেষের দিকে আবেদন করেন যে জীবনের শেষ ক'টা দিন অন্তত স্বাভাবিক মানুষ-জনের মাঝে কাটাতে চান তিনি। চম্পা বারবার বলে যাচ্ছিলেন যে তিনি সুঁই-সুতার কাজ জানেন এবং অন্য যে কোন কাজও করতে পারবেন ; তাকে মুক্ত করার একটি ব্যবস্থা করতে তার আকুল আবেদন ছিল ।
চম্পাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কিছু উদ্যোগ ইত:মধ্যে নেয়া হয়েছিল । মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা ’র ((MBS, পরবর্তীতে এর নামকরণ হয় Organisation for the Realisation of Human Rights)পক্ষ থেকে আইনজীবি এলিনা খান চম্পার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে ঢাকাতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন; দু’দশক ধরে কষ্টগুলো চেপে রেখে চম্পা তার দিনগুলো অতিবাহিত করছিলেন পাবনা মানসিক হাসপাতালে । ”
MBS কর্তৃক চাম্পাকে ঢাকাতে নিয়ে আসার পর ১৬ই জুন ১৯৯৮ এ ভোরের কাগজে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে চম্পার তৎকালীন ছবিও প্রকাশ করা হয় ; ছবিতে চম্পার চেহারায় অস্বস্তি সুস্পষ্ট ছিল । প্রতিবেদনে বলা হয় –
” ২৬ বছর পর চম্পা মানসিক হাসপাতাল থেকে বার হয়ে আসে MBS -এর উদ্যোগে; এই মানবাধিকার সংস্থাটি চম্পাকে সুযোগ করে দিয়েছে ২৬ বছর পর মুক্ত আকাশের নীচে আলো-বাতাসের সংস্পর্শে আসার । যদিও চম্পা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং যে কোন কাজ করতে সক্ষম তারপরও চম্পাকে অন্যরকম দেখাচ্ছিল। মানসিক রোগীদের সাথে কাজ করার কারণে চম্পার মানসিক বিকাশ যথাযথ ছিলনা। সুস্বাস্থ্যের অধিকারিনী হওযা স্বত্ত্বেও চম্পাকে অনেক অসুস্থ মনে হচ্ছিল । সে খুব একটা কথা বলেনি এমননি যেটুকু বলছিল তাও জড়িয়ে যাচ্ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয় চম্পা কিভাবে হঠাৎ হাসপাতালেই থাকার সিদ্ধান্ত নেয় এবং MBS -এর সদস্যদের কাছে ঢাকা আসতে অস্বীকৃতি জানায়। শুধুমাত্র এই শর্তেই তাকে রাজি করানো হয়েছিল যে যদি সে ঢাকা থাকতে পছন্দ না করে তবে তাকে হাসপাতালে ফিরে আসতে দেয়া হবে। ”
আমি চম্পার সাথে দেখা করি ১লা জুন ১৯৯৮ –এ ; প্রথম প্রতিবেদনটি লেখার এবং দু’টি প্রতিবেদন প্রকাশের মাঝামাঝি সময়ে। পাবনা মানসিক হাসপাতাল মানসিক রোগীদের জন্য বাংলাদেশের একটি অন্যতম আশ্রম এবং ইদানীংকালে মুদ্রণ সংস্থাগুলো এর সুবিধাবলী এবং বিভিন্ন ব্যবস্থা যেমন এখানকার কর্মী ছাটাই এবং পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া স্বত্ত্বেও রোগীদের ছাড়পত্র প্রদান নিয়ে কঠোর সমালোচনা করছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্যদিকে এই দাবি করছে যে এসব অব্যবস্থাপনার কারণ মূলত অপর্যাপ্ত সরকারী আর্থিক সহায়তা। পাবনার মূল শহরের বাইরে অবস্থিত এই সংস্থাটি পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাহীনতায় জর্জরিত ছিল।
হাসপাতালের মূল ভবনে আসার আগে আমি রিকশায় প্রায় মিনিট বিশেক এর আশেপাশে চক্কর দিলাম। চারপাশটা মনে হচ্ছিল যেন সবজি ফেলে যাওয়ার জন্য অথবা যানবাহন রাখার জায়গা। হাসপাতালে পৌঁছার পর হাসপাতালের ডিরেক্টর আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন একজন ম্যাট্রন –এর সাথে এবং আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন পার্শ্ববর্তী ঘরে চম্পার সাথে দেখা করার জন্য । শুরুতে সে অসম্মত ছিল আমার সাথে সাক্ষাতে এই ভেবে যে আমি ঢাকা থেকে এসেছি এবং বিরবির করছিল যে সে এখান থেকে যেতে চায় না । যখন আমি তাকে বললাম যে আমি শুধুই তার সাথে কথা বলতে এসেছি , তাকে ঢাকা নিয়ে যেতে নয়, তখন সে অনেক নিশ্চিত হলো এবং আমাকে পুরো হাসপাতালের আশেপাশে ঘুরে দেখাতে চাইলো এমনকি কিছু মানসিক রোগী যারা তার বন্ধুও বটে, তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে চাইল ।
সে খুব পরিস্কার ভাবে জানালো যে, এই মানসিক হাসপাতালে কিভাবে আসল তা সে নিজেও জানেনা; তবে সে স্বরণ করল তার গ্রামে কাটানো বাল্যকাল এবং তার স্বল্প জ্ঞানে গন্ডগোলের আবছা স্মৃতি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কোন স্মৃতি সে মনে করতে পারে না । চম্পা জানায়, অনেকেই তাকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা জিগেষ করে কিন্তু সে কোন কিছুই মনে করতে পারেনা। সে বার বার বলে, হয় সে গ্রামে তার পরিবারের কাছে ফিরে যাবে নয়তো এই মানসিক হাসপাতালেই কাজ করবে। পরিচিত মানুষজন থেকে দূরে ঢাকাতে গিয়ে, অপরিচিত পরিবেশে কাপড় সেলাই, হস্তশিল্প বা অন্যের সন্তানদের দেখাশোনা করার চেয়ে বরং এই হাসপাতালেই কাজ করতে সে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করবে। সে বারবার বলছিল এই মানসিক হাসপাতালই তার ঘর, এখানেই তার বন্ধু আছে এবং এখানকার মানুষেরাই তার যত্ন নেয়।
***********************
চলবে ...
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



