ওয়েব এপ্লিকেশন নিয়ে কাজ করেন এমন তথ্য-প্রযুক্তিবিদ মাত্রই যে ওয়েব ২.০ টার্মটির সাথে পরিচিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। আন্তর্জালের সাধারণ ব্যবহারকারীদের টেকি-টার্মগুলো সবক্ষেত্রে জানা না থাকলেও ওয়েব ২.০ যুগে কিন্তু তাদের বিচরণ তুমুলভাবেই । ওয়েব ২.০ যুগের ওয়েব সাইটগুলো এর ব্যবহারকারীদের সুযোগ দিচ্ছে আরেক ব্যবহারকারীর সাথে সহজেই যুক্ত হতে; সাইট ব্যবহারকারী প্রয়োজনে তথ্য সংযোজন বা পরিবর্তন করতে পারেন; এ কারণেই ওয়েব ২.০ -এর জগতে ওয়েব-ভিত্তিক কম্যুনিটির আবির্ভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সোস্যাল নেটওয়ার্কিং, উইকি, ব্লগ, ভিডিও-শেয়ারিং সাইটগুলো।
ওয়েব ২.০ টার্মটির যোগসূত্র মূলত টিম ও’রেইলি (Tim O'Reilly)-এর সাথে। ও’রেইলি মিডিয়া (O'Reilly Media) এবং মিডিয়া লাইভ ২০০৪ সালে একটি সেমিনার আয়োজন করে এবং সেই সেমিনারের একটি ব্রেইনস্টোর্মিং সেসনেই এই নতুন টার্মটির সূত্রপাত ঘটে। যদিও মনে হচ্ছিল যে, ওয়েব ২.০ ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (ডব্লিউ. ডব্লিউ. ডব্লিউ) -এর নতুন ভার্সনকেই ইঙ্গিত করছে, তথাপি তাতে বিশেষ কোন প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত ছিল না, বরং তা সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং ভিজিটর/ব্যবহারকারিদের ব্যবহারগত দিক থেকে একটি সামগ্রিক পরিবর্তনকেই বোঝাচ্ছিল।
ক্লায়েন্ট এবং সার্ভার-সাইড সফটওয়্যারের সমন্বয়, কনটেন্ট সিন্ডিকেশন এবং নেটওয়ার্ক প্রটোকলের ব্যবহার ওয়েব ২.০ এর বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। একটি মানসম্মত ওয়েব ব্রাউজার প্লাগ-ইনস এবং সফটওয়্যার আপগ্রেড ও বর্ধিতকরণের মাধ্যমে কনটেন্ট এবং ব্যবহারকারির বিভিন্ন একটিভিটিজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ওয়েব ২.০ সাইটগুলো ব্যবহারকারীদের তথ্য জমা করা, তৈরী করা এবং প্রচার করার সুযোগ করে দিচ্ছে যা ওয়েব ১.০ যুগে সম্ভব ছিলনা।
ওয়েব ২.০ সাইটগুলো সাধারণত যে সকল বৈশিষ্ট্য ধারণ করে তা এনড্রিউ ম্যাকাফি সংক্ষেপে প্রকাশ করেন এভাবে - SLATES; অর্থ্যাৎ সার্চ, লিংকস, অথরিং, ট্যাগস, এক্সটেনশন, সিগন্যালস। সার্চ অপশন হলো যে কোন কি-ওয়ার্ড দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য চটজলদি খুঁজে পাওয়ার সুবিধা। লিংকস দিয়ে একই প্রকার তথ্যসমৃদ্ধ অন্য কোন লিংকের মাঝে যোগসূত্র। অথরিং হলো একজন ইউজার/ব্যবহারকারীর পক্ষে কোন তথ্য/কনটেণ্ট এর পরিবর্তন, সংযোজন এর ক্ষমতা। একজন উইকি ব্যবহারকারী প্রয়োজনে অন্য একজন ব্যবহারীর তথ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম। ব্লগের ক্ষেত্রে একজন ব্যবহারকারী নিজের পোস্টের তথ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম এবং অন্যান্যদের পোস্টে মন্তব্য করার সুবিধা পান। ট্যাগস হলো একটি কনটেন্ট -কে বিশেষ শব্দে বিভাগীকরণ, যা দিয়ে সার্চ করা যে কোন ব্যবহারকারীর জন্যও সুবিধাজনক হয়। এক্সটেসশন মূলত সফটওয়্যার’কে বোঝায় যা দিয়ে একটি ওয়েব ব্যবহার উপযোগী হচ্ছে। সিগন্যালস হলো মূলত আর.এস.এস (RSS) সুবিধা।
আর.এস.এস নিয়ে জানার আগে জেনে নেয়া যাক ওয়েব-ফিড সম্পর্কে। ওয়েব-ফিড হলো একধরনের ড্যাটা-ফরম্যাট যা ওয়েব-ব্যবহারকারীদের নিয়মিত আপডেটেড কনটেন্ট সম্পর্কে জানান দেয়। কনটেন্ট এর লেখক একটি ওয়েব-ফিড -এর সুবিধা রাখলে তা একজন ওয়েব-ব্যবহারকারী সহজেই সাবস্ক্রাইব করতে পারেন। অনেকগুলো ওয়েব-ফিড’কে একটি নিদির্ষ্ট স্পটেই এক্সেস যোগ্য করার প্রক্রিয়াটিকে এগ্রিগ্যাশন বলে যা সম্পন্ন হয় একটি এগ্রিগ্যাটর এর মাধ্যমে। ওয়েব-ফিড, যা অনেকসময়ই সিন্ডিকেশন-ফিড হিসেবে পরিচিত, সাধারণত এক্সএমএল (XML) নির্ভর।
আর.এস.এস টার্মটি আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই ওয়েব-ফিড বা ওয়েব-সিন্ডিকেশন হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন সব ফিড-ফরম্যাট মাত্রই আর.এস.এস নয়। আর.এস.এস -এর পূর্ণরূপ হলো ”রিয়েলি সিম্পল সিন্ডিকেশন (Really Simple Syndication)”, অবশ্য কখনও কখনও ”রিচ্ সাইট সামারি (Rich Site Summary)” -ও বলা হয়। আর.এস.এস. ফরম্যাটও এক্স.এম.এল (XML) নির্ভর। যদিও মার্চ ১৯৯৯ এর আগেই আর.এস.এস ফরম্যাটের আগমন ঘটে, কিন্তু এর বহুল পরিচিতি, ব্যবহারের প্রসার ঘটে মূলত ২০০৫ থেকে ২০০৬ সময়কালে।
একটি আর.এস.এস ডক্যুমেন্ট মূলত একটি কনটেন্ট এর পুরো অংশ বা সংক্ষেপ প্রদর্শন করে এবং মেটা-ডাটা যেমন তারিখ ও কণ্টটেন্ট -এর লেখক পরিচিতি উল্লেখ করে। আর.এস.এস ফিড সাধারণত আর.এস.এস. রিডার, ফিড-রিডার অথবা এগ্রিগ্যাটর জাতীয় সফটওয়্যার দ্বারা এক্সেস করা যায়। এধরনের সফটওয়্যারগুলো ওয়েব, পিসি অথবা মোবাইল নির্ভর হতে পারে।
যে সকল ক্লায়েন্ট-সাইড/ওয়েব ব্রাউজার প্রযুক্তি ওয়েব ২.০ -এর ডেভেলপমেন্টে ভূমিকা রাখে সেগুলোর মধ্যে জাভাস্ক্রিপ্ট, এক্স.এম.এল(এ্যাজাক্স), এ্যাডোবি ফ্ল্যাশ এবং জাভাস্ক্রিপ্ট/এ্যাজাক্স ফ্রেমওয়ার্ক (যেমন ইয়াহু উই.আই লাইব্রেরি, জে-কোয়েরি ইত্যাদি) উল্লেখযোগ্য। এ্যাজাক্স প্রোগ্রাম জাভাস্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে ওয়েব-সার্ভার হতে যে কোন নতুন ড্যাটা আপলোড এবং ডাউনলোডের কাজটি করে একটি পুরো পেইজের রি-লোড প্রক্রিয়াটিকে এড়িয়ে গিয়ে, যা এ্যসিনক্রোনাস (asynchronous) বলে পরিচিত।
এডোবি ফ্ল্যাশ হলো ওয়েব ২.০ এর আরেকটি প্রযুক্তি। ফ্ল্যাশ দিয়ে এমন অনেক কিছুই করা যায় যা সাধারণভাবে এইচ.টি.এম.এল দিয়ে সম্ভব নয়। ফ্ল্যাশের অনেক দূর্দান্ত ব্যবহারের মধ্যে একটি হলো এর অডিও-ভিডিও ফাইল প্লে করার সুবিধা। এর কারণেই জনপ্রিয় সাইট ইউ-টিউব তৈরী হয়েছে, যেখানে ভিডিও মাধ্যমকে যুক্ত করা হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড এইচ.টি.এম.এল সাথে।
ওয়েব ২.০ ওয়েব ইন্টারফেস ডিজাইন -এ বিশাল পরিবর্তন সাধন করেছে। পাল্টে গেছে একটি ওয়েব সাইটের সাদামাটা প্রচলিত চেহারা কিংবা রঙের ব্যবহার। বিশেষত ওয়েবসাইট প্রচার নির্ভর কোন প্রতিষ্ঠানের লগোতে লেগেছে ওয়েব ২.০ এর হাওয়া। skype – এর লগো ওয়েব ২.০ -এর একটি উদাহরণ হতে পারে। ফন্ট ব্যবহারেও ডিজাইনাররা অনেক আধুনিক রুচির পরিচয় দিচ্ছেন। বলা চলে গ্রাফিক্স জগতে ওয়েব ২.০ এখন একটি ভিন্ন মাত্রা বহন করে। একটি ওয়েব-বাটনে, ব্যানারে বা কোন ইমেজে গ্র্যাডিয়েন্ট, শেডিং, মিরর, গ্লাসি জাতীয় স্পেশাল ইফেক্ট ব্যবহারে ওয়েব সাইটগুলো দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠছে। ফ্ল্যাশ এ্যানিশেনও একটি বাড়তি আকর্ষণ বটে। আগ্রহী ডিজাইনাররা গুগল.কম -এ সার্চ দিলে প্রচুর সাইট পাবেন যেখানে ওয়েব ২.০ লগো, ব্যানার, আইকন স্যাম্পল আছে। ওয়েব ২.০ সাইট টেম্পপ্লেটও পাবেন একটু গুগল-সার্চ করলেই।
ধারণা করা হয় যে ওয়েব ২.০ এর পরবর্তী ভার্সন ওয়েব ৩.০ এর ভিত্তি হবে এপিআই(API) অর্থ্যাৎ এপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস। এপিআই হলো একধরণের ইন্টারফেস যা একজন ডেভেলপারকে নানা ধরনের এপ্লিকেশন সহজেই তৈরীতে সাহায্য করে। অনেক ওয়েব ২.০ সাইটেই এপিআই ফিচারটির কারণে একজন প্রোগ্রামার সাইটির ডাটা এক্সেস করার সুবিধা পান। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো, ফেসবুকের এপিআই সুবিধাটির কারণে অনেকেই এখন ফেসবুকে গেম, কুইজ, পণ্যের প্রচার ইত্যাদি এপ্লিকেশন তৈরী করতে পারছেন।
এতো কিছুর পরও অনেকেই ওয়েব ২.০ টার্মটিকে অমূলক মনে করেন। কেউ কেউ ধারণা করেন, এই টার্মটি আসলে বছর বছর হওয়া একটি কনফারেন্স ছাড়া ভিন্ন কোন অর্থ বহন করে না। ২০০৯ সালের ২০ থেকে ২২শে অক্টোবর পর্যন্ত সান ফ্রান্সিসকো -তে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ওয়েব ২.০ সামিট। গত বছরের কনফারেন্সের আলোচ্য ছিল 'ওয়েব যখন বিশ্বের মুখোমুখি', আর এবারের কনফারেন্সের বিষয় 'ওয়েবই যখন বিশ্ব'।
কনফারেন্সে ১৫-১৮ বছর বয়সের টিন-এজদের মধ্যে একটি প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে জরিপ চালিয়ে দেখা যায় যে, সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট হিসেবে টুইটারের থেকেও ফেসবুক -ই চাহিদার শীর্ষে। মাইস্পেস -এর ব্যাপারে কারো আগ্রহই দেখা যায়নি। সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগলই পছন্দের হলেও ইয়াহু সার্চও ব্যবহার করে থাকে অনেকে। প্রায় সবাই বিভিন্ন খবরাখবর জানতে অনলাইন নিউজ সাইট, ব্লগ এবং ইউ-টিউব এর উপরই নির্ভরশীল।
ওয়েব ২.০ নিয়ে ও’রেইলি'র পরবর্তী কনফারেন্সটি হতে যাচ্ছে ২০১০ সালে।
*** *** *** *** ***
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অল ডেবিট এন্ড ক্রেডিট গোওস টু আঙ্কেল গুগল, আমি খালি উছিলা মাত্র !
লেখাটি সামান্য কাটছাঁটের পর সি-নিউজ, ডিসেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
*** *** *** *** ***
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



