মাননীয় প্রধানমন্ত্রী'র কাছে একজন প্রতিবন্ধীর খোলা চিঠি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমার সালাম ও শুভেচ্ছা নেবেন। আপনাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক কিছুই করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস'ান, চলাফেরা, যোগাযোগ সহজ করা এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ব্যবস-া নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকার মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের প্রতি আপনার একটা সহানুভূতির কথা জেনেছি। তাই সাহস করে আজ কলম ধরেছি নিজের তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতা আপনাকে জানাবো বলে। যদিও আমার ভীষণ ইচ্ছে সাক্ষাতে আপনার সঙ্গে কথা বলার, ব্যাপারটা সহজ সাধ্য নয় ধরে নিয়েই এ চিঠি...। ছোটবেলা থেকেই আমি দগঁংপঁষধৎ উরংঃৎড়ঢ়যু' নামের এক ভয়ংকর রোগে আক্রান-, যা নিরাময়যোগ্য নয়। বেশিদূর পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারতাম না বলে সবাই যেনো কেমন করে তাকিয়ে থাকতো। আত্মীয়-স্বজনের বিয়ে, আচার-অনুষ্ঠানে যাওয়া কমিয়ে দিতে হলো। অথচ বাইরের দেশগুলোর পরিবেশটাই এমন সুস' সুন্দরভাবে বাঁচার জন্যে কিংবা প্রতিবন্ধীদের ভবিষ্যৎ মজবুত করার লক্ষ্যে প্রতিবন্ধীদের পরিবার এবং সেখানকার মানুষেরা অনেক বেশি সচেতন। যেমন- ঝরহমধঢ়ড়ৎব গঁংপঁষধৎ উরংঃৎড়ঢ়যু অংংড়পরধঃরড়হ’র ম্যানেজার পদে কর্মরত সেরিনা রো, ছোটবেলা থেকেই এ রোগে আক্রান-। অথচ ইলেকট্রিক হুইল চেয়ারে বসে সংসার ও কর্মস'ল স্বাভাবিকভাবেই চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি। তিরিশ বৎসর বয়সী কমিপউটার ইঞ্জিনিয়ার হ্যারির অবস'া আরো করুণ। কখনো তাদের ছেলে সুসহ হয়ে উঠবে না জেনেও মা-বাবা ধৈর্যহারা না হয়ে প্রতি পদে পদে নানাভাবে তাকে উৎসাহ যুগিয়েছে। আর আমার জীবনটা কেটেছে চারদেয়ালের আবদ্ধ ঘরে একটা চেয়ারে বসে। টিভির রিমোট চেপে চ্যানেল ঘোরানো বা বই ...... এমনি দম বন্ধ করা সময়ে আমার অন্ধকার জীবন আলোকিত করতে একজন এগিয়ে এল। সে মানুষটির প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসা আমার হতাশাগ্রস- জীবনকে আলোর মুখ দেখাল। আমি নতুন জীবন শুরু করতে চাইলাম। কিন' সেখানেও বাঁধ সাধলো আমাদের অসচেতন সমাজ। যে হাঁটতে চলতে পারে না সে কীভাবে বিয়ের স্বপ্ন দেখে? নানাজনের নানা কথার মধ্য দিয়ে শুরু হলো আমার ওপর এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। অবশেষে আমাদের বিয়ে হলো। তাও আমার বাবার অমতে। তিনি তখনো মেনে নিতে পারেননি তার পঙ্গু মেয়ে সংসারী হতে পারে কিংবা তারও অধিকার আছে আর দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপনের। আমার স্বামী যখনি আমাকে কোথাও ঘুরে বেড়াতে নিয়ে যেতো মানুষের চাহনি আমাদের বিব্রত করতো। বিয়ের পর প্রথমবারের মতো ঈদের মার্কেট দেখতে গেলাম। হুইলচেয়ারে যেনোবা আমি মানুষ নই এক আজব চিড়িয়া। এরপর ইচ্ছে থাকলেও কোথাও বেড়াতে যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি।আমি আবার বন্দি হয়ে পড়লাম চারদেয়ালের কুঠুরিতে। তবে চার বৎসরের বিবাহিত জীবনে আমার স্বামীর ভালোবাসার এতটুকু কমতি হয়নি। কিন' আদর যত্ন ভালোবাসা দিয়ে তো আর জীবনের বাস-বতাকে ঢেকে রাখা যায় না। আমার ভেতরে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে পড়েছিলো নতুন জীবনে প্রবেশ করে আমি একেবারেই স্বাভাবিক একটা জীবন যাপন করতে যাচ্ছ্ি। আর সবার মতোই ভালো থাকবো। অনতত হতাশায় ভুগতে হবে না। সেরিনা বা হ্যারির মতো পুরোপুরি না হোক, তাদের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক পরিবেশ কিছুটা হলেও আমার জীবনকে রাঙিয়ে দেবে। চারদেয়াল থেকে বেরিয়ে যখন সত্যিকার পৃথিবীর রূপ দেখলাম তাকে অনেক নির্মম মনে হলো। ধীরে ধীরে অনুভব করতে পারলাম স্বপ্ন দেখতে চাওয়াটাই প্রতিবন্ধীদের জন্য গুরুতর অপরাধ। আমার স্বামীর একার পক্ষে সম্ভব হয়নি সমাজের এই কঠিন দেয়াল ভেদ করা। হয়তোবা সেও আমার মতোই হতাশাগ্রস-। এরি মধ্যে আমার ছোটবোনেরও একই রোগ ধরা পড়লো। আমার মাকে প্রাণপণ বোঝাতে চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে আমার মতো তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে না যায়। আমার মাও চেষ্টা করতে চান কিন' আবার বলে ওঠেন খুব বেশি হলে এসএসসি পর্যন- পড়াতে পারবো। ততদিনে ওর শরীরের অবস'া আরো খারাপ হবে। সবার সামনে দিয়ে ওকে কোলে করে আনা নেওয়া..... ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারো সমস্যা। পড়ালেখা চালিয়ে নিতে গিয়ে স্কুলে এবং আসা যাওয়ার পথে সবার এই তাকিয়ে থাকাকে কেন্দ্র করে সংকোচবোধ করে আমার বোন। মানুষের বিভিনন বাজে মনতব্য তাকে কাঁদায়। যা অনেক বৎসর আগে আমাকে সহ্য করতে হয়েছে। আমার বর্তমান শারীরিক অবসহা প্রচন্ড খারাপ,তবুও আপনাকে জানাবার ভীষণরকম তাগিদ থেকেই শরীরের ওপর জোর খাটিয়ে লিখতে বসেছি। শুধু আমিই নই বাংলাদেশে বর্তমানে দেড়কোটি প্রতিবন্ধী আছে আর এই সংখ্যা গড়ে আড়াইলক্ষ করে প্রতিবৎসর বাড়ছে। তারাও একি পরিবেশে বেড়ে উঠছে। বাইরের দেশগুলোর সেই পরিবেশ আমাদের দেশেও গড়ে তোলা অত্যানত প্রয়োজনীয়।
আপনি জনগণের ভালোমন্দ দেখার কঠিন দায়িত্ব নিয়েছেন। আপনি আমার মায়ের মতোনই। তাই আপনার কাছে আমার কিছু প্রশ্ন, আমি যদি আপনার মেয়ে হতাম সমাজের চোখ থেকে আমাকে এভাবে আড়াল করে রাখতে পারতেন? আপনিই বলুন, আমার সুস' ভাইয়েরা যদি পড়ালেখা করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারে আমাদের কি অপরাধ? কেনোইবা আমরা সবার মতোন থিয়েটারে গিয়ে সিনেমা-নাটক দেখতে পারি না? কিম্বা চাচা-মামা ঘনিষ্ঠ স্বজনের বিয়ের অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারি না? টিভিতে প্রায়ই এইডস সচেতনমূলক প্রচুর বিজ্ঞাপন দেখি।এইডস নিয়ে এতো প্রচার!? প্রতিবন্ধীদের জন্য কি এভাবেই আমাদের শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলোতে নাটক-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমন কিছু প্রচার করা যায় না? যা দেখেশুনে আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষই ভাবতে বাধ্য হতেন,তাদের ঘরেও একজন প্রতিবন্ধী থাকতে পারতো......আর যদিবা থাকতো তাদের সাথে কেমন ব্যাবহার করা উচিৎ--কেমন করে কথা বলা উচিৎ......আমরাও পারি পড়ালেখা করে আর দশজন সুস' ছেলেমেয়ের সাথে কাধেঁ কাধঁ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিতে। এটুকু যদি দেশের সাধারণ মানুষ অনুভব করতে পারে এবং সচেতন হয়ে উঠে তাতেই হয়তো প্রতিবন্ধীরা স্বাভাবিক জীবন-যাপনের প্রয়োজনীয় পরিবেশটুকু পাবে। তাই আপনার কাছে আমার আকুল আবেদন,আমাদের জন্য এমন কিছু করুন যাতে আমার মতো প্রতিবন্ধীরা আবারো স্বপ্ন দেখার সাহস অর্জন করে। কিছু একটা অবলম্বন করে বাঁচার সুযোগ পায়। আপনার অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করলাম। এ লেখা যদি কোনভাবে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে আমার কষ্ট সার্থক হবে।
আরো অনেক-অনেক কিছুই জানাবার ইচ্ছে অব্যক্ত রয়ে গেলো। এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে যেহেতু সম্ভব নয়, ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে অবশ্যই তা পূরণের ইচ্ছে রইলো। আপনার ভালো এবং সুস'তাই কাম্য। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার সমৃদ্ধি কামনায়।
সাবরিনা চৌধুরী,
C/O:রিয়াজ হায়দার চৌধুরী
চট্টগ্রাম প্রেসক−াব, জামালখান,
চট্টগ্রাম।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী'র কাছে একজন প্রতিবন্ধীর খোলা চিঠি
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিএনপির আবালীপনা।


চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।