ড. এম কিং ১৯৫০ এর দশকে আমেরিকার মূল ভূমিতে অবস্থিত তেল কোম্পানি গুলোর উৎপাদন হ্রাস বৃদ্ধি সমন্ধে সঠিক ভবিষ্যৎবানি করতে পেরেছিলেন। তার এ তত্ত্বটি সেসময় দ্যা হুবার্ট পিক থিওরি নামে পরিচিতি পায়। এ তত্ত্বের মাধ্যমে সে সময় তিনি ভবিষ্যৎবানি করে ছিলেন ২০০০থেকে ২০১০ সালের মাঝে বিশ্বের তেল উৎপাদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌছাবে। তার পর হতে উৎপাদনের মাত্রা ক্রমেই কমতে থাকবে। বিগত কয়েক দশকে তেলের উৎপাদন ও দাম বাড়ার দিকে খেয়াল করলে যে কারো পক্ষে অনুমান করা সম্ভব অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনিতিতে বড় ধরনের আরো একটি মন্দাকাল ঠেকাবার জন্য এখনি নবায়ন যোগ্য শক্তি খাতটিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার রয়েছে। সেই সাথে কোন ধরনের বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে অথবা এজন্য প্রযুক্তির আর কি কি উন্নয়ন দরকার রয়েছে তা ঠিক করতে সকলকে এক যোগে কাজ করে যেতে হবে। পাঠক জড়িপের মাধ্যমে যায়যায় দিনের পক্ষ হতে আজ সেরা দশ বিকল্প শক্তির সমাধান সমন্ধে আলোকপাত করা হলো।
১.ঘরে ঘরে সৌর শক্তি
একবার ভাবুনতো দেখি সারাদিন ইচ্ছে মত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরও মাসের শেষে কখনই আপনাকে এক টাকাও বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে না। হুম! কেবল সৌর শক্তিই পারে আপনার এই অদ্ভুত কল্পআকে বাস-বে রূপ দিতে। সৌর বিদ্যুৎ তন্ত্র তার ফটোভোল্টিক কোষের সাহায্যে সুর্যের আলোকে বিদ্যুতে পরিনত করে। সৌর পানি গরম করার যন্ত্রে পানি গরম করতে তাপ সংগ্রাহক প্যানেলের ব্যাবহার করা হয়। সৌর শক্তি সম্পূর্ন পরিচ্ছন্ন এবং নবায়ন যোগ্য। কিন্তু এ ধরনের যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য এক কালিন বড় ধরনের বিনিয়োগের দরকার। উন্নত বিশ্বও বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। আমাদে মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় আকারে এ ধরনের পদ্ধতি প্রচলনে এটিই মূল বাধা।
২. পারমানবিক শক্তি
পরমানুর কেন্দ্র যত ছোটই হোকনা কেন ক্ষুদ্র এই বস্ত পিন্ডটাকে এক সঙ্গে ধরে রাখতে এর ভেতর অসম্ভব পরিমানে শক্তি সঞ্চিত থাকে। নিরাপদ বিদ্যুতের আরো একটি সমাধান হলো এই পারমানবিক শক্তি। আমেরিকার মত বড় দেশে এখন মাত্র একশ’টি আনবিক শক্তি কেন্দ্র চালু আছে। দেশটির মোট বিদ্যুতে পাঁচ ভাগের এক ভাগ আসছে এসব শক্তি কেন্দ্র থেকে। চালু অবস্থায় এধরনের প্ল্যান্ট কোন রকমের বাতাস দূষণ ছাড়াই প্রচুর পরিমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু এসব পরমানু শক্তি কেন্দ্র থেকে ক্ষতিকর যে বর্জ্য উৎপাদিত হয় যুগ যুগ ধরে তা দূষণ ছড়াবার ক্ষমতা রাখে।
৩.সৌর খামার
দুটি উপায়ে সৌর খামার থেকে প্রচুর পরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সৌর তাপ প্ল্যান্ট গুলোতে আয়না দিয়ে সুর্যের আলোকে ঘনিভুত করা হয়। তাই এর আরেক নাম ঘনিভুত সৌর শক্তি পদ্ধতি। এধরনের পদ্ধতির সাহায্যে পানি থেকে তৈরী করা বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘুরানো হয়। অন্যটিতে আলোক কোষ ব্যবহার করে সরাসরি সুর্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পরিচ্ছন্ন নবায়ন যোগ্য এ শক্তির অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো সুর্য সব সময়ের জন্য আকাশে থেমে থাকে না। তার মানে রাতে অথবা মেঘলা দিনে এর থেকে সরবরাহ পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে এধরনের খামার গড়ে তুলতে দরকার শত কোটি টাকার বিনিয়োগ।
৪.বায়ু খামার
আমেরিকার মত দেশে বায়ু শক্তি দিয়ে বিশ্বের সবচাইতে বড় বয়ুচালিত জেনারেটর ঘুরানো হচ্ছে। দেশটিতে বায়ু শক্তি ব্যাবহার করে সর্বমোট আঠারো হজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ পরিমান বিদ্যুৎ গড়ে আমেরিকার আধা কোটিরো বেশী বাসা বাড়িতে সরবরাহের জন্য যথেষ্ট। দেশটির শক্তি বিভাগের ভবিষ্যতবানী অনুসারে ২০৩০ মধ্যে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার পাঁচ ভাগের এক ভাগ বায়ু শক্তির সাহায্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎদিয়ে পুরন করা হবে। বিশ্বের অন্যান্য জাতী রাষ্ট্র গুলো অন-ত জন সংখ্যা বিচারে হলেও এদিক দিয়ে আমেরিকার থেকে এগিয়ে আছে। ডেনমার্কের কথাতেই আসাযাক। এরই মধ্যে দেশটি তাদের মোট বিশভাগ শক্তির যোগান দিতে শুরু করেছে বাতাস থেকে। পরিচ্ছন্ন শক্তির এ উৎস থেকে দূষণের কোন সম্ভাবনা নেই। তবে বড় বেশী চিন-ার বিষয় হলো এধরনের বায়ু খামার গুলো পাখি ও বাদুরের চলায় পথে স্থায়ি বাধা তৈরী করে। আর টারবাইন গুলোও স্থানিয় পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর নয়।
৫.ভূ-উত্তাপ শক্তি
ভূ-ত্বকের নিচে অসম্ভব ধরনের শক্তি বন্দি হয়ে আছে। আগ্নেয় গিরির আগ্ন্যুৎপাতে যার কিছুটা নজির আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই। এই ভূ-উত্তাপ শক্তি ব্যাবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সহ ঘরদোড় রাস্তা ঘাট উষ্ণ রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট ভূ-উত্তাপ শক্তি বা জিওর্থামাল শক্তি উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে দু হাজার আট শত মেগাওয়াটই আমেরিকাতে উৎপাদিত হচ্ছে। যা দেশটির জাতীয় উৎপাদনের অর্ধেকের দেড় শতাংশের সমান। সম্পূর্ন নিরাপদ পরিচ্ছন্ন এ শক্তি প্রচুর পরিমানে মজুদ আছে। দিন রাত সব সময়ই এর সরবরাহ পাওয়া সম্ভব। কিন' এ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে বিশাল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগের দরকার হবে।
৬. স্রোত ও প্রবাহমান পানি থেকে শক্তি
পানির নিচে হুবহু বায়ু কলের মতই কাজ করে এমন যন্ত্রদিয়ে পানির স্রোত বা প্রবাহ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। নদী, সাগর বা জোয়ার ভাটার স্রোত কাজে লাগিয়ে এবং খালের মত কৃত্রিম জল পথে প্রবাহ তৈরী করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে কোন ধরনের দূষণ হবার সম্ভনাই থাকেনা। কিন্তু বায়ু ও সৌর প্রযুক্তি থেকে এটি অন্তত পনের বছর পিছিয়ে আছে। আন্যদিকে এধরনের অবকাঠামো নির্মান করে স্রোতে বাধা দেবার প্রভাব সমন্ধে এখনো কিছু স্পষ্ট জানা যায়নি।
৭. বৈদ্যুতিক গাড়ি
পুরোটাই বিদ্যুতে চলে এমন গাড়ি গ্যাসলিনে চলা গাড়ির থেকে চারগুন বেশী কার্যকর, আর হাইব্রিড গাড়ি থেকে দ্বিগুন। কালো ধোঁয়া দূরে থাক বিদ্যুতে চলা গাড়ি থেকে কোন ধরনের ধোঁয়াই বের হয়না। এধরনের গাড়ির খরচ কম। এধরনের প্রযুক্তি প্রচলনে এখনো পর্যন- সবচেয়ে বড় বাধা হলো এর ব্যাটারি প্যাক। সাথে দাম কমাবার বিষয়টিও রয়েছে। কমবেশী সব পরিসি'তিতে গাড়ি চালু রাখার জন্য ব্যাটারির স'ায়িত্ব বাড়াবার জন্যও চেষ্টা চলছে। অতিরিক্ত গরম হয়ে যাতে আগুন ধরে না যায় এবং শিতেও যাতে ব্যাটারির কর্যকারিতা অক্ষুন্ন থাকে সে ব্যাপারেও আগেভাগে নিশ্চিত হতে চাইছে বানিজ্যিক কোম্পানি গুলো।
৮. হাইড্রোজেন পরিবহন
ঘাইড্রোজেন ফুয়েল সেলে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় বিদুৎ উৎপাদিত হয়। এর সাহায্যে চলে একটি বৈদ্যতিক মোটর। এদরনের ইঞ্জিন দিয়ে ধোয়ার বদলে পানি নির্গত হয়। গ্যাসলিনের গাড়ির চাইতে হাইড্রোজেন চালিত গাড়ি দ্বিগুন কার্যকর। তবে মূল সমস্যা হলো অনেক বেশী হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য প্রকৃতিক গ্যাস ব্যাবহার করতে হবে। যে কারনে কার্বন উৎপাদনের সম্ভাবনা থেকেই যায়।
৯. ঘরোয়া বায়ু শক্তি
কেবল মাত্র একটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহের উপযোগী করে তৈরী করা ছোট আকারের টারবাইন ব্যাবহার করা হয় এধরনের প্ল্যান্টে। এদের উৎপাদন ক্ষমতা এক থেকে পঁচিশ কিলোওয়াটের মধ্যে সিমাবদ্ধ। আমেরিকার বায়ু শক্তি এসোসিয়েসনের মত অনুসারে আশি ফুট টাওয়ারের ওপর দশ থেকে পঁচিশ ডায়ামিটার পাখা স্থাপন করলে ভাল ফলাফল পাওয়া সম্ভব। এর সাহায্যে পানির মোটর চালানো সহ বাতি জ্বালানো ও অন্যান্য কাজ করা যায়। বায়ু শক্তি বিনামূল্যের হলেও এর টারবাইন গুলো সব সময় বিজ্ঞাপনে বলা কথা অনুসারে কাজ করে না। আর প্রায়ই এগুলো বিকট শব্দ করে।
১০. সাগরের তাপ শক্তির রূপান্তর
সাগরের উপর দিকের পানি সূর্যের আলোয় উষ্ণ হয়। অন্যদিকে এর নীচে দিকের পানি থাকে শীতল। অল্প তাপে ফুটতে শুরু করে এমন তরল ব্যাবহার করে সাগরের উপর দিকের পানি হতে তাপ সংগ্রহ করে বিশেষ প্ল্যান্টের সাহায্যে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। তার পর এই গ্যাসকে আবার সাগরের গভীরে পাঠিয়ে শিতল করে বারবার ব্যাবহার করা হয়। প্রতিদিন সূর্য শক্তির এক শতাংশের দশভাগের একভাগেরো কম পরিমান শক্তি সাগর শুষে নিচ্ছে। এই শক্তিকে পুরোপুরি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে তা হবে আমেরিকার মত বড় দেশের প্রতিদিন ব্যবহার করা বিদ্যুৎতের চেয়ে বিশগুন বেশী। কিন- এধরনের চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে অনেক টাকার দরকার।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুন, ২০১১ সকাল ১০:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



