
এম.জে আকবর
এল.কে আদভানির দুর্নীতি বিষয়ক প্রচারণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার জন্য তলব করে নেবার পর সানাটা’র সাংবাদিককে কিছু পরশ্রীকাতর কর্মী খামে ভরে ৫০০টাকার নোট এগিয়ে দেয়। কথাটি শোনার পর থেকেই বুঝতে পারছিলাম না এরকম একটি গল্প শুনতে বসে ঠিক কোন জায়গাটিতে আমাকে হাসতে হবে আর কখন কাঁদতে হবে। এই ব্যাপারে জনাব আদভানির একদমই কোন দোষ ছিলনা; তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ পরিস্থিতির স্বীকার। তারপরও দেখা যাচ্ছে এই বুনো জন্তু ধরার চোরাগর্তটির খানিকটা হলেও গভীরতা রয়েছে।
কিন্তু পচন ধরা একটি বাসি কেক এর কাছাকাছি এসে এই হাসি জমাট বাধতে শুরু করে আর এই কেকটি হলো স্বয়ং মিডিয়া। সত্যি বলতে কী সেই সাংবাদিক কে তলব করেই সেখানে নেয়া হয়েছিল, দাওয়াত দিয়ে নয়। আগে থেকেই দরদাম করে রাখা ৫০০ টাকাই তাদের প্রত্যেক কে দেয়া হয়। কিন্তু কথাটা শুনে তখনই পেটে মোচর দেয় যে এদের কেউই সেই টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানায়নি। অবশ্যই এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটা সানাটার ভেতরকার চলমান দরদামের চিত্র। কিন্তু এও ভাবতে বসে যাবেন না এই বিচ্ছিন্নতা কেবল সানাটার ভেতরই সীমাবদ্ধ। জীবন যাত্রার সঠিক মান বজায় রাখতে গিয়ে সাংবাদিকদের যাবতীয় খরচাপাতির প্রশ্নে দিল্লির মতন এমন দুর্নীতিগ্রস্থ শহর ভারতে খুব কমই আছে। সম্ভবত মিডিয়া গোষ্ঠীর সবচেয়ে নৈরাশ্য জনক আর একমাত্র অন্ধকার দিক হলো অবিরাম খুঁতধরা, আর ব্যক্তিগত কোন বিষয় হলে তখন কেনইবা সেই রিপোর্টাররা এত কমদরে নিজেদের বিকিয়ে দিবেন ?
এই ঘটনার মাধ্যমে ভারতের রাজনীতিবিদগণের চেয়ে সে দেশের সাংবাদিকদের চরিত্রই বেশী প্রকাশ পেয়েছে। এতে আমার নিজের হাপিত্যেশ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সমস্যাটি কেবল প্রলোভনে পা দেওয়া গুটি কতক ভাড়াটে সাংবাদিকের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবেনা। সংবাদপত্রের মালিকরাও প্রতিনিধিদের বেতন দেবার বদলে তাদের টাকাদিয়ে ভাড়া করার সুযোগ নিতে চাইবে। এধরনের লেনদেন খুব জটিল কিছু নয়: এতে করে মালিকেরা খরচ কমাতে চাইবে কেনোনা তাদের জানা আছে তাদের প্রতিনিধি স্থানীয় ব্যবসায়ী বা প্রশাসনের কাছ থেকে দু’পয়সা কামিয়ে নিবে। ভাড়াটে খবর বস্তুনিষ্ঠ লেখনীর মত শক্তিশালী কোন অস্ত্র নয়। এর মাধ্যমে ভাল কিছু না লিখেই অনেক বেশী টাকা কামিয়ে নেয়া যায়। অল্প সময়ের মধ্যে এই রোগ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য।
আর এই কারণে, সময়ের এক ফোর আর অসময়ের দশ ফোর এই কথায় গুরুত্ব দিতে হবে। আমি যথাযথ যুক্তির সঙ্গে এর সমর্থন করি আর যেসব রিপোর্টার, সাব-এডিটর, সম্পাদক এধরনের খাম পকেটস্থ করার স্বপ্ন দেখেন না সেই সব সহকর্মীদের ব্যাপারে আমি খুবই গর্ব বোধ করি। সম্প্রতি টেলিভিশন সংবাদের এক সম্পাদক ভয়ানক এক হুমকি প্রতিরোধ সহ উপর মহলের লাভজনক চাটুকারিতার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোম্পানিটির মালিক পক্ষ তাকে এই কাজে পুরোপুরি সমর্থন যুগিয়েছে। এটা ভাল সাংবাদিকতা এবং দৃঢ় শেয়ার হোল্ডার ও মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের জন্য সত্যিকারের নিশ্চয়তা।
সব রাজনীতিবিদই দুর্নীতিগ্রস্থ নয়। ড.মনমোহন সিং এবং আদভানি এই উভয়ে বিগত পাঁচ দশক জুড়ে জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন; তার নামে এই পর্যন্ত একবিন্দু কালি পর্যন্ত লাগেনি। কিন্তু মিডিয়া এবং রাজনীতির টাকা কামাবার দৌড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়: সংসদ এবং সংবাদমাধ্যম, এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে হারিয়ে যাবে। প্রথমটিকে জনগণের ব্যাপক পরীক্ষার আওতায় থাকতে হয়। দ্বিতীয়টির জন্য দরকার ব্যাপক বিতর্কের।
আমাদের বর্তমান অল ইন্ডিয়া রেডিও(এয়ার) এবং দূরদর্শনের কাঠামোয় ভাড়াটে খবর কে এই বিতর্কের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এদের প্রধান সম্পাদক সম্প্রচার ও তথ্য ইউনিয়ন মিনিস্টার। সাংবাদিকগণ এয়ার এবং দূরদর্শনকে নিজেদের কাজের মেয়াদের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। এই কলাম লেখার সময় আমি যে খবরটি শুনলাম তার অংশ বিশেষ এখানে তুলে ধরছি: এয়ার বিশ্বস্ততার সঙ্গে এই সত্য উপস্থাপন করছে যে সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি দশভাগ বেড়েছে, বছর খানেক ধরে সরকার মূল্যস্ফীতির এই হার কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে, তাই এখনো মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এই খবরে বিস্ময়ে সৃষ্টি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।
অবশ্যই,এটা খুবই মামুলি একটা উদাহরণ। সরকারী সাংবাদিকেরা কারোপ্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করে কোন প্রকার সময় অপচয় করেন না। ক্ষমতাবান দলের পরিবর্তনে, তাদের চাপ এবং প্রতিনিধিত্বও বদলে যায়।
এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে পুরোমাত্রায় স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। এর নিরিখে তাদের যুক্তি মেনে নেবার মত। যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে নিজস্ব মিডিয়াতে সম্পাদনা নীতিমালায় অনেক বেশী অধিকার সংরক্ষণ করে। এটা আসলেই এক ধরেনর প্রবঞ্চনা। মন্ত্রীগণ নিজেদের টাকায় এই এয়ার এবং দূরদর্শন প্রতিষ্ঠা করেন নি; লোকসানের জন্য সরকারি কোষাগারের বাইরে থেকে তাদের টাকা আনতে হবেনা। তাদের হাতে ট্যাক্সের পয়সা রয়েছে আর তাই দিয়ে তারা এটিকে নিজস্ব ব্যক্তিগত ক্ষমতার উৎসে পরিণত করে।
দূরদর্শন একটি গণমাধ্যম, এটি সরকারের কোন চ্যানেল নয়; জনগণের লাভা লাভ ভালমন্দ দেখাই এর প্রধান দায়িত্ব, সরকারের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া এর কাজ নয়। প্রেস কাউন্সিলের নতুন চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের অবসর প্রাপ্ত স্পষ্টভাষী বিচারপতি মারকেনদে কাতজু। ইতোমধ্যে তিনি নিজের কিছু সতর্ক মন্তব্যে এই বিতর্ককে উসকে দিয়েছেন। তিনি এই বিতর্ক উসকে দিয়েছেন এই কারণে যে বর্তমান মিডিয়ার এই সঙ্কট আবেগ মুক্তির সুযোগকে আরও বেশী অবারিত করবে।
না সংসদ, না গণমাধ্যম, কোনটাই নিয়ন্ত্রণের ধারনাকে পছন্দ করে না; সুপ্রিম কোর্ট তাদের জায়গাতে প্রবেশ করতে চাইছে এটা অনুভবের পরপরই এমপিরা তাদের ঠেকাতে উদ্যত হয়। নিজস্ব সুযোগ ভোগ করে মিডিয়া অনেক বেশী ঈর্ষাকাতর। কিন্তু যদি উভয়েই তাদের অধিকার পুনরুদ্ধার করতে চায়, তাহলে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্যের প্রতি আরেক বার ফিরে তাকাতে হবে, এবং এমন একটা স্বনিয়ন্ত্রণের উপায় বের করতে হবে যার মাধ্যমে আপোষ কারীরা শাস্তি পাবে। অন্যথা, এক সময় হাসির আর কোন সুযোগ থাকবেনা, আর এর জন্য ঢের কাঁদতেও হবে সবাইকে।
লেখক দিল্লি থেকে প্রকাশিত সানডে গার্ডিয়ান এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত ইন্ডিয়া অন সানডে’র সম্পাদক।
অনুবাদ-সোহরাব সুমন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


