
আগুন আর বরফ
(ইংরেজ কবি রবার্ট ফ্রস্ট-এর ফায়ার এন্ড আইস কবিতার অনুবাদ ও আমার কিছু কথা)
কেউ কেউ বলে পৃথবীর শেষ হবে
আগুনের হোলি খেলা খেলে
কেউ কেউ বলে এতো সব হারাবে বরফের তলে
আমি সেই স্বাদ পাই, আমারই ইচ্ছের বলে
তবুও তো বাঁধা আছি, যারা শুধু আগুনের কথা বলে।
কিন্ত যদি এই ধরণী বিলীন হয় দু'বারের মতোন
মনে হয়, আমি তখন এতো সব বরফ গলিয়ে ফেলার জন্য
অনুক্ষণ চারপাশে ঘৃণা ছড়াবো
আর সেই ঘৃণা ক্রমেই বাড়তে থাকবে
ফনাতোলা অজস্র নাগিনীর মতো

মানুষকে আগুন উপহার দেওয়ার জন্য সর্বজ্ঞ, সর্ব শক্তিমান জিয়াস কেন তার প্রাণপ্রিয় পুত্রকে ককেশাস পাহাড়ের চূড়ায় অনন্ত কালের তরে বেঁধে রেখে ছিলেন? কেন তিনি তাঁকে এসবের সব কিছু, খুলে বলেননি ?-যে এই আগুনই একদিন কার্বনের ধোয়ায় পৃথিবীর আকাশ বাতাস চারদিক, দশদিগন্ত ঢেকে দেবে। গলতে থাকবে মরুর বরফ। সাগরের পানি ফুঁসে উঠবে। কেন তিনি বলেননি এই আগুনই একদিন সমস্ত মানব জাতির ধ্বংস ডেকে আনবে। কেন তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে শেষবারের মতন শুধরে দেননি। একজন দায়িত্ববান পিতার কি সেটাই করণীয় নয় ?
আচ্ছা, পিতার রোষানলে না পড়লে প্রমিথিয়াস মানুষকে আর কী কী উপহার দিতেন? সেসব দিয়ে মানুষ কি আজকের এই ভয়ঙ্কর পরিবেশ বিপর্যয় বা আদৌ নিজের এই সম্ভাব্য ধ্বংস ঠেকাতে পারতো?...পারতো কি বিশ্বটাকে আবার নির্মল, প্রাণ চঞ্চল আর নতুন করে তুলতে?... পারতো কি? এমন একটি প্রশ্ন তো থেকেই যায়। যার জন্যে তিঁনি এতো ঝুঁকি নিয়ে পিতার রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে তুচ্ছাতিতুচ্ছ অসহায় মানব সন্তানের জন্যে জীবনদায়ী আগুন নিয়ে আসলেন, সেই আগুনের বিষবাষ্পই একদিন তাঁর সেই প্রাণপ্রিয় মানুষদের গ্রাস করবে; এটি জানার পরও কি প্রমিথিয়াস মাটির সেই অসহায় মানুষদের জন্য আর কিছুই কী করতেন না?
হায় ! বন্দি প্রমিথিয়াস আজো কি তুমি আমাদের হাতে অভিশপ্ত সেই আগুন তুলে দেবার দায়ে বরফ জমা ককেশাসের শুভ্র চূড়ায় বাঁধা পড়ে আছো ? আজো কি মৃত্যুর দেশ থেকে যম সদৃশ ঈগল এসে প্রতিদিন তোমার উদর চিরে আহার সারে !
আমাদের মত পরশ্রী কাতর, কুটিল মানবদের কথা ভেবে, পিতার ধনভাণ্ডার থেকে আগুন এনে দেবার জন্যে তোমার এই দশা হলো !
প্রমিথিয়াস আজো কি তুমি আমাদের হাতে অভিশপ্ত সেই আগুন তুলে দেবার দায়ে ককেশাসের শুভ্র চুড়ায় বাঁধা পড়ে আছো ? নাকি, মুক্তি মেলার পর দ্বিতীয়বারের মতো আবার নিজের কোন চরম বিপর্যয় এড়াতে, পিতার রক্ত চক্ষু আর কঠোর শাসনের ভয়ে গা ঢাকা দিয়ে আছো। এতসব আমার জানা নেই। অন্যেরাও জানে কিনা তাও আমার কিছুই জানা নেই। দৈবের মন বোঝার সাধ্যও আমার নেই । কারো আছে কিনা তাও জানিনা ! তবে, এটা জানি যে, এমন ক্ষমতা বুঝি খুব কম লোকেরই আছে । আর তাদের ব্যবসায়ীক মানসিকতা বোধ হয় অন্য আট-দশ জন সাধারণ ব্যবসায়ীর চেয়ে দশ কি বার কাটা উপরে। তানাহলে এতসব মন বোঝার কৌশল কবেই চারধারে ছড়িয়ে পড়তো।
আচ্ছা ! প্রমিথিয়াস যাদের হাতে প্রথম আগুন তুলে দিয়ে ছিলেন তারাও কি সেই আগুন নিয়ে এই একই ধরনের ব্যবসা ফেঁদেছিলেন ? সেসময় এখনকার মতোন এত ব্যবসা আর পণ্যায়ন প্রথা চালু থাকলে বোধ হয় বিশ্বজুড়ে আগুন এত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পরতে পারতো না , হয়তো রয়ালটি দেবার ভয়ে আবিষ্কারক ইঞ্জিনের ভেতর আগুন নামের কোন বস্তুর ঠাই পর্যন্ত দিতে কুণ্ঠা বোধ করতেন। তার সেই আবিষ্কৃত যন্ত্রকে আগুন হতে শত শত হাত দূরে রাখতে চেষ্টা করতেন। বেঢপ জ্বালানির ভারে ন্যূজ হতে দিতেন না কিছুতেই !

এখন প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক, তাহলে কেমন হতো আগুন বিহীন সেদিন কার সেই সব ইঞ্জিন ? নিঃশ্বাস আটকে আসা ঘনকালো ধোয়ার বদলে, ভারি হয়ে আসা ধোয়াসার বদলে, সেইসব ইঞ্জিনের সাইলেন্সর পাইপের ফুঁটো দিয়ে আজকে এখন আমরা কী বের হতে দেখতাম? এমন ইঞ্জিন তৈরি করার এখন কি আর একেবারেই সুযোগ নেই! কোনই উপায় নেই ?
যদি বলি আছে ! তাহলে বলতে হয় আমরা কেন সেই সুযোগটাকে অতিশিঘ্র কাজে লাগাচ্ছি না ?
গোটা কতক তেলের খনি, জবড়জং কলকারখানা আর মটর গাড়ি , অতি ভোগবাদী মানসিকতা, আর ব্যবসায়ীদের দিন দিন পুঁজি জড়ো করার চাকা টাকে সচল রাখতেই কী এমন সব কাজকারবার পরিচালিত হচ্ছে ? নাকি এই ধরনের কাজে আমাদের আবিষ্কারক উদ্ভাবকদের বড় ধরনের কোন সীমাবদ্ধতা রয়েছে?
নাকি কেউ এসব কাজে টাকা-কড়ি যোগান দেবার রাস্তাটা গোপনে আটকে বসে আছে। এধরনের সম্ভাব্য বাঁধা গুলো দূরকরে আমাদের এখনি কি এমন কোন পরিবেশ বান্ধবযন্ত্র বানানোর কাজে লেগে যাওয়া উচিত নয় ? যা আর এক ফোটাও তেল খাবেনা । যেগুলো বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন পুড়িয়ে চলার শক্তি যোগাবে না। একটি বারও ধোয়ার বিষ বাষ্পের সঙ্গে কার্বন আর জীবের জন্য ক্ষতিকর উপাদান ছড়াবেনা। বরং তারবদলে বাতাসে ছেড়ে দেবে অক্সিজেন, বাতাসকে দেবে সজীবতা, আমরা প্রকৃতির কাছ থেকে আবার পাবো নির্মল প্রাণের আশ্বাস।
এই ধরণীতে মানুষ বেঁচে থাকবে, বংশ পরম্পরায়, আমাদের এই ধরত্রী মাতা, বসুন্ধরা টিকে থাকবে অনন্তকাল .........
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুন, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



