somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘণ্টা বাঁধবে কে ? ( অনুবাদ গল্প)

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ইয়াহিয়া তাহের ‘আব্দুল্লাহ(১৯৪২-১৯৮১)
মিশরিয় ছোট গল্পাকার ইয়াহিয়া তাহের ‘আব্দুল্লাহের
জন্ম লাক্সোর এর কাছাকাছি কারনাক নামক স্থানে। কাল্পনিক বর্ণনা আর পটুত্বের জন্য স্বশিক্ষিত এই লেখক মিশর সহ সারা আরব বিশ্বে লেখক সমাজের কাছে অন্যতম শ্রদ্ধার পাত্র। নিজের রচনা করা এই সব কল্পকথা সমূহ তিনি সেখানকার কফি হাউস গুলোতে নিয়মিত পাঠ করতেন। নিজস্ব ধ্যান ধারনা, রচনা শৈলী, মৌলিকত্ব তার রচনা সমূহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর তার এইসব কাজের উৎস হলো মিশরিয় লোক গাথা, আরব ঐতিহ্য ও সাহিত্যে রসের নির্যাস আর সেই সব অসীম প্রেরণা থেকে উৎসারিত। ১৯৮১ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাবার আগেই তাঁর একটি উপন্যাস: চোকার এন্ড ব্রেসলেট (১৯৭৫) ও কয়েকটি গল্প সংগ্রহ: থ্রি লার্জ ট্রিজ প্রোডিউসিং অরেঞ্জ(১৯৭০), দ্যা ড্রাম এন্ড দ্যা চেস্ট(১৯৭৪), দ্যা প্রিন্সেস অব টেল(১৯৭৮), এবং ইমেজেস ফ্রম আর্থ, ওয়াটার এন্ড সান(১৯৮১) প্রকাশ পায়। ১৯৮৪ তে জেনিস জনসন ডেভিসের ইংরেজি অনুবাদে তাঁর একটি গল্প সংগ্রহ দ্যা মাউন্টেইন অব গ্রিন টি এবং ১৯৯৭ তে মেরি তিহানের অনুবাদে চোকার এন্ড ব্রেসলেট উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। তঁর সেই অকাল প্রয়াণে আরবি ছোটগল্পের জগতে সত্যিকারের সত্যিকারের বড় আকারের একটি ক্ষতি সাধিত হয় যা কখনই পূরণ হবার নয়।

ঘণ্টা বাঁধবে কে ?

শেষকৃত্যের ওখান থেকে এই আলোটা আসছে, হায় আমার আমির। ধনি লোকটা কিনা আজই মারাগেল, এবং আজ রাতেই আবার আমাকে তার জীবন থেকে তোমার জন্য এমন একটি তেতো ফল তুলে আনতে হবে যা সম্ভবত তোমার কাছে দারুণ সুমিষ্ট ঠেকবে, চোখে ঘুম এনে দেবে।
যেদিন সে আসমানি কিতাব মুখস্থ করেছিল:
তার মা তার ফোঁড়ানো কানে নীল রঙ্গের একটি পুতি এঁটে দিয়ে বলল “সেই সব দুষ্ট নারী এবং পুরুষ যারা হিংসা করে তাদের উদ্দেশ্যে,” এবং এটা বলেই সে ঘরের মেঝে জুড়ে লবণ ছিটিয়ে দিল। লোকটা যখন পুটুলিটা নিয়ে আসে, তার মা সেটার গিঁঠ আলগা করতে করতে বলছিল, “এগুলো মুসলেমের ধনসম্পদের অংশ” এবং এর ভেতরে থাকা জিনিস গুলো তিনি মহিলার চোখের মেলে ধরলেন: তার মধ্যে রয়েছে, সোনার সুতোয় নক্সা আঁকা লাল জুব্বা, আর রূপার সুতোয় নক্সা করা তারবুস( tarbush), উটের চামড়ার হলদে চটি, সবুজ কোমর বন্ধনী এবং কালো ডোরা আঁকা সাদা কাফতান।
সাবির যখন-তার নাম-শেখের পোশাক পড়ে লোকটার সঙ্গে বাইরে যাচ্ছিল তখন তার মা কপালে চুমু খেয়ে বললো, “হে প্রভু,” এবং আনন্দে তার মাথার কালো কাপড় দিয়ে চোখের জল মুছলও।
মসজিদ ‘আব্দুল্লাহর ভেতরে:
সাবির দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে মোনাজাত ধরে স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানালো। এর পর প্রার্থনা শেষ করে সে তার প্রভু ও শিক্ষক শেখ সোলায়মানের হাতে চুমু খেল, এরপর তার ডান হাত থেকে তলোয়ার আর গ্রামের লোকেদের নেতৃত্ব গ্রহণ করলো- যদিও বয়সে সে ছিল খুবই তরুণ।
মা-বাবার ঘরে:
বিসারার থালাখানা একপাশে ঠেলে দিয়ে সে মাকে বললো, “মা, অনেক খেয়েছি,” আর এই বলেই সে নিজের গালে এবং গলা বরাবর হাত বুলাতে বুলাতে আপন মনে ভাবতে শুরু করে দিল, “তুমি কখনো ট্রেনে চড়ে কায়রো শহরটা পারিদিবে না। আর এই শহর পারি না দিতে পারলে আল-আজহারেও ঢুকতে পারবে না সাবির । আর এই সীমান্তে বসেই বাকিটা জীবন পার করে দিবে। সিরিয়া আর মরক্কোর পুত্র বলে খ্যাত এই জায়গাটিতেই বাকিটা জীবন পার করে দিবে।”
এইটুকু ভেবেই সাবির স্রষ্টার কাছে মনে মনে আকুতি জানাতে লাগলো, “কেন, হে প্রভু, তুমি আমার পিতাকে অন্যের জমি আর গোলাঘরের পাহারাদার করে পাঠালে, সারাদিন গুলতি নিয়ে অন্যের শস্যখেত থেকে পাখি তাড়াবার জন্য কেন তুমি তাকে পাঠালে খোদা ?
আবারো এক সময় তার মা-বাবার ঘরে:
সে মাকে বললো, “আমার ক্ষুধা লেগেছে, মা,” এবং গাল থেকে হাত সরিয়ে সে ভাবতে শুরু করে দিল, “সুবোধ ছেলে, শেখের ছিনিয়ে আনা সম্পত্তি বাগিয়ে নেবার আগ পর্যন্ত পাখির ডানার পেছনে লেগে থাকার অন্য আর কিছু বিকল্প হতেই পারে না। আসমানি কিতাব তোমার মুখস্থ, এই জিনিস পাঠ করার সময় তোমার কোথাও একটুও আটকায় না, বরং খুবই চমৎকার লাগে ঈশ্বরের বাণী। এই একই জিনিস মড়ার সৎকারে আর বিয়েতে সমান কাজে লাগে। সময়কে কাজে লাগাও আর নিজের ভাগ্যকে বিড়ম্বিত হতে দিওনা। আপনাকে নিজ গ্রামের গণ্ডির ভেতর সীমাবদ্ধ করে রাখ আর বিয়ে এবং মৃতের দাফনে কোরান পাঠ করে বেড়াও। যথেষ্ট টাকা কামাবার পর, চড়ে বেড়াবার জন্য একটা জন্তু কিনে নাও তারপর এই একই কাজে দূরদূরান্তে বেরিয়ে পড়,আর আজকে যে কিনা শুধু একটা দু’টা রশুনেই সন্তুষ্ট কাল সে মধুতে ডুবিয়ে রুটি খাবে। আর আজকে যে কিনা কেবল একটি ডিমেই তুষ্ট রয়েছে একদিন সে হাসের মাংস খাবে।”

তারপর একদিন প্রকৃতি মাতা তার অবিশ্বস্ত ঋতু বৈচিত্র্যের পসরা মেলে হাজির হলো :
সেই সময় একদিন প্রচণ্ড শীতে শেখ সাবিরের দু’দুটা ভোকাল কর্ডই আক্রান্ত হল। এরপর আসলো বৃষ্টির দিন, এসময় তার ভোকাল কর্ড প্রখর হল এতেকরে শ্বাসনালী গেল ভেঙ্গে।
ম্যাচের কাঠি সরু করে তাদিয়ে দাঁতের ফাঁকে সেঁধিয়ে থাকা মাংসের আঁশ বের করতে করতে নিজেকে সে আবার বলতে লাগলো, “মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনি চিন্তার রাজ্যে আঁধার ভড়করে আর তক্ষুনি সে মনে মনে নিজের আত্মাটাকে এমন ভাবে চিবাতে থাকে যেন বৃদ্ধা মহিলার মতই তাকেও ঘরে তুলে রাখা হয়েছে।”

একদিন শনিবারে সে একজন জ্ঞানি মানুষের কাছে গেলেন :
তিনি বললেন, “সব রোগেরই একটা কারণ আছে এবং সব কারণেরই একটা আদি কারণ আছে। ভাইয়েরা আমার, এমন এক অসুখ আছে যেটা কেবল দহনের দ্বারাই উপশম সম্ভব, এবং এমন রোগ আছে যা কেবল কেমিস্টের বিক্রি করা ওষুধেই উপশম হতে পারে। তেমনি ভাবে গাছগাছড়ার চিকিৎসায় সেটা ভাল করা সম্ভব যেটা কেবল আমিই জানি কেনা না আমি এতে দক্ষ। কালে পিপড়ার কথাই বলা যেতে পারে, তাদের খুব সহজেই ঘর ছেড়ে বাইরে নিয়ে আসা যায় যদি আমার আঙ্গুলে মোড়ানো একটুকরো কাগজে স্রস্টার বাণী লিখেদেই আর সেটা যদি তুমি তোমার ঘরের দরজায় আঠাদিয়ে সেটে দাও।
“একইভাবে আমি জ্বিনও তাড়াতে পারি, কাঁকড়া বিছার বিষও। রাতে ভূতপ্রেত দেখে ভয় পাওয়া মানুষের মনের ভয়ও দূরকরতে পারি। হে আমার গ্রামবাসী, ও বন্ধুরা, পোকামাকড় আর সাপের কামড়ের ভয় নেই আর।

আকাশের তারারা যখন তার সৌভাগ্যের কথা বলে গেল :
সে সৌকের দিকে গেল এবং মাছ বাজারের ব্যবসায়ী শেখ শামারদালি’র সভায় প্রবেশ করলো। এবং শেখকে অভিবাদন জানালো। শামারদালিও খুব উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তার জবাব দিল, সে উঠে দাড়িয়ে অচেনা এই লোকের সঙ্গে হাত মেলালো এবং তার পাশে থাকা মখমলে ঢাকা বেঞ্চিতে বসতে দিল।; সে তার জন্য একটা নারগিলা ও কফি আনার ফরমায়েশ দিলেন এবং এখানে তার আসার কারণ জানতে চাইলেন।
“ভাল কথা”, জবাবে সাবির বলল, “কেমন দারে মাছ বেচাকেনা হচ্ছে ?”
শামারদালি বললেন, “আমি আধ রৌপ্য মুদ্রায় কান্তারটা কিনে এক রৌপ্য মুদ্রায় বিক্রি করেছি।”
সাবির বলল, “আমি আধ রৌপ্য মুদ্রায় তোমার কাছে দুই কান্তার বিক্রি করবো। তুমি ঠিক এরকম কত কান্তার কিনতে চাও ?”
শামারদালি বললেন, “তোমার কাছে যা আছে তার সবই কিনবো।”
সাবির বলল, “আমার কাছে অনেক বেশী পরিমাণে আছে।”
শামারদালি বললো, “সৌকের জন্য যেটুকুন দরকার হয় তার অর্ধেক কিনে নিব, ধরুন দশ কান্তারের মত।”
সাবির বললো, “লোকে বলে, ‘শুরু থেকেই যেটা স্থির করা হয় সেই কথা শেষ পর্যন্ত রাখাই উত্তম’ এবং আমি আপনাকে বলবো, সেই অর্ধেকের দাম এখনই মিটিয়ে দিন, চুক্তি অনুসারে দুদিনের মধ্যে আমি সেই পরিমাণ মাছ আপনাকে সরবরাহ করবো, এর আন্যথা হলে তার জন্য আমি ক্ষতি পূরণ সহ আমার গর্দান দিতে বাধ্য থাকবো।”
মাছ ব্যবসায়ী শেখ বলে উঠলেন, “আমি এই চুক্তিতে রাজি আর টাকাও প্রস্তুত রয়েছে।”
সাবির বললো, “স্রস্টার অসীম দয়া-সাক্ষীর সামনে নোটারি করা হোক।”
এবং এটা হল সেই চুক্তিনামা,
হে আমার আমির
প্রভুর আশীর্বাদে আমরা সাক্ষীগণ, সাক্ষ্য দিতেছি যে, ওমুকের পুত্র সাবির, মাছের ব্যপারি ওমুকের পুত্র ক্ষমতাবান শেখ শামারদালি এর কাছ হইতে প্রতিদিন দশ কান্তার মাছ বিক্রয় করিবে। ওমুকের পুত্র শামারদালি এর জন্য কান্তার প্রতি সিকি রৌপ্য মুদ্রা হারে ওমুকের পুত্র সাবির বরাবর মূল্য পরিশোধে বাধ্য থাকিবেন। এই চুক্তি চন্দ্রমাস ব্যাপিয়া বলবত থাকিবে এবং ক্রেতা বিক্রেতা এই উভয়ের সম্মতিতে ইহা পুনরায় নবায়ন করা যাইবে। চুক্তি সম্পন্ন হইবার পরপরই ক্রেতা অগ্রিম বাবদ বিক্রেতাকে কথিত রৌপ্য মুদ্রার অর্ধেক পরিশোধ করিবেন এবং চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দিনের মাথায় ইহা কার্যকর হইবে, এবং যদি কোন কারণে বিক্রেতা ক্রেতা বরাবর চুক্তি অনুসারে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হন তাহা হইলে যাবতীয় ক্ষতি পূরণ সহকারে নিজ গর্দান প্রদান করিবেন।
মা-বাবার ঘরে :
মা বললেন, বাছা আমার, “বাতাস বেচে তুমি রূপা নিয়ে এলে।”
জবাবে সাবির বললো, “ওমা, আমি মাছ বিক্রি করবো; যারা বাতাস বেচে সেই বাতাসের দামে তাদের রূপা দেয়া হয়না।”
মা বললেন, “বাছা,তুমি এমন জিনিস বেচে আসলে যেটা তোমার নেই।”
সাবির বললো, “জলে নামলেই মাছ পাওয়া যায়, মা।”
জবাবে মা বললেন, “কিন্তু তুমি সেই মাছের মালিক নও, বাছা।”
এবার সাবির তার মাকে জিজ্ঞেস করলো, “তাহলে জলের সব মাছের মালিক কে, মা ?”
মা তার জবাবে বলল, “কেউই না বাছা, কেউই সেগুলোর মালিক নয়।”
সাবির এবার তার মাকে বলল, “আমার কোমর বন্ধনীতে টাকা গুলো বাধা রয়েছে, আমি মিস্ত্রীদের পাড়ায় যাবো, সেখানে গিয়ে একজন মিস্ত্রীকে তুঁতকাঠ দিয়ে আমার জন্যে একটি নৌকা বানিয়ে দিতে বলবো। তারপর সেটা আমি টাকাদিয়ে কিনে নিব। এই কাজ করার জন্য যেসব জেলে রয়েছে তাদের তীরের চারপাশে ঘুরে ঘুরে মাছ ধরার বদলে নৌকা নিয়ে জলে নেমে জালদিয়ে মাছ ধরতে বলবো, তারা জল থেকে মাছ ধরে এনে তীরে এক জায়গায় স্তূপ করবে, এর জন্য তারা প্রতিদিন আমার কাছ থেকে মজুরী পাবে। যেসব কুলি মাছ বয়ে গাড়িতে তুলে দিবে,তাদের পরিশ্রম আর ঘামের মূল্য হিসেবে যথাযথ পারিশ্রমিক দিব। নদী তীর থেকে মাছ বয়েনিয়ে সৌকে পৌঁছে দেবার জন্য ড্রাইভারকেও পারিশ্রমিক দেয়া হবে। আর এইভাবেই আমি চুক্তির শর্ত কানায় কানায় পূরণ করে ঘাড় থেকে তরবারি তফাতে রাখবো।
এতসব শুনে মা বলল, “ হায় খোদা, তোমার মনকে সংযত কর, বাছা আমার।”

সাক্ষীদের সঙ্গে ধূর্ত কথোপকথন :
দেখতে দেখতে মাস গড়িয়ে গেল, এবং সাবির শামারদালি কে বলল, “আসুন এবার চুক্তিখানা নবায়ন করি।”
সেই মাসের পর আরো একটা মাস পার হলো, তারপর আরেকটা মাস, তারপর আরো একটা, আর এবার সাবির এবার সাবির তার আয়ের টাকা থেকে দুইটা নৌকা কিনল এবং এরপর সে শামারদালিকে বলল, “এবার আর চুক্তি নবায়ন করতে চাইনা।”
একথা শুনে শামারদালি তাকে বলল, “কেন চুক্তি নবায়ন করতে চাইছো না ?”
জবাবে সাবির বলল, “এই চুক্তি আমার জন্য বৈধ নয়, শামারদালি। চলুন নতুন করে একটা চুক্তি লিখি। আর সেটাতে আপনার আজকের আয়ের অর্ধেকহারে আমাকে দিবেন বলে উল্লেখ থাকবে।” তারপর মাসের পর মাস পেরিয়ে যেতে লাগলো। এর মধ্যে সাবির আরো একটা মাছধরার নৌকা কিনেছে, আর এরপর তীরে হেটে হেটে যে সব জেলেরা মাছ ধরে তাদের ডেকে এনে বলেছে, “নৌকায় করে মাছ ধরে আন, দু’পায়ে সারা দিন তীরে হেটে হেটে মাছ ধরার চেয়ে তা অনেক ভাল।” বছর দেড়েক পরে, শামারদালি কে বলল, “এখন থেকে তুমি আয়ের সিকিভাগ নেবে, শামারদালি।”
একথা শুনে শামারদালি তাকে বলল, “তোমার কী হয়েছে, খুলে বলো দেখি।”
সাবির তাকে বলল, “বন্ধু তুমি বেঞ্চি থেকে না উঠেই যথেষ্ট কামিয়ে নিচ্ছ।”
বছর খানেক পর, সাবির তার আর শামারদালির মধ্যকার চুক্তি প্রত্যাহার করেনিলো, এবং এরপর থেকে সাবির যে দরে মাছ বিক্রি করতো শামারদালিকেও সেই দরে মাছ বিক্রি করতে হতো, তারা সমান ভাবে বাজারে ভাগ বসালো। কিন্তু সাবির মাছের দাম কমিয়ে দিল, আর তারপর থেকে একাধারে দাম কমাতেই থাকলো, তাই আগ্রহী ক্রেতারা সব শামারদালির কাছ থেকে একে একে বিদায় হলো। শামারদালির অবস্থা এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকলো যে একপর্যায়ে সে কোনরকমে তার বাদবাকি পুঁজি কোমরে গুজে সৌক থেকে ভাগলো। বাকিটা জীবন সে মালটার এক লোকের সরাইখানাতে কাটিয়ে দিল।

এভাবে সৌকে সাবিরের আরকোন প্রতিযোগী অবশিষ্ট রইলোনা।

কাঁধে জাল নিয়ে সারাদিন পায়েহেটে নদী তীরে মাছ ধরে, এমন সব জেলেকে সে একটা করে নৌকা কিনে দিল, এবং সে জেলেদের ছোট মাছ না ধরার জন্য এই বলে সতর্ক করে দিল, “আজকের প্রতিটা ছোট মাছই আসছে দিনে তিমির মত বড় হবে।”
এবং সে পুরানো দিনের মাপজোকের পদ্ধতিও বদলে দিলেন, এবং সব যানবাহনকে সৌকের পথে পথে জানিয়ে দিতে বললেন : “আজ থেকে কিলোর মাপে বিকিকিনি হবে এবং ওক্কাতে আর কোন ধরনের লেনদেন হবেনা।” এবং বিভিন্ন ধরনের মাছের পরিচিতি জানতে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসেন, এবং তাকে উপযুক্ত মজুরি দেবার আশ্বাস দেন, তাকে, “যাচাই বাছাই করে প্রতিটি মাছের নাম ঠিক করে দিতে ও দাম বেধে দিতে বলেন, যাতে করে মাছ বেচাকেনার মাঝে প্রভু আর মনিব বলে কিছু না থাকে।”
সাবির তার লোকজনকে, “সৌকের চাহিদা অনুসারে অর্ধেক মাছ বিক্রি করে দিয়ে, এবং বাদবাকিটা লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখতে বলেন।”
সাবির নিজেকে বলতে থাকেন, “আজকে আমি আমার বুদ্ধির জোরেই এই পর্যায়ে আসতে পেরেছি, বনের রাজা সিংহের মত একচ্ছত্র সৌক শাসন করছি।

সময়ের সঙ্গে সাবিরের কথোপকথন :

বাড়ির বেলকনি থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে সাবির সময়কে বলল:
“স্বাদু এবং লোনা জলের মাছেদের রাজা¬-আমার বয়স হয়েছে।
“সৌকের উন্নতি আর ব্যবসা বাণিজ্যের স্রষ্টা-এবং তারপরও আমি একা।
“চলমান নৌকা, জেলে, মুটে, ড্রাইভার, গাড়ি, খচ্চর, গাধা, এবং রং করার ব্রাশ এই সব নিয়েই আমার ব্যবসার শুরু-এবং আজো আমি সেই ব্যবসাই ধরে রেখেছি।
“একটা কালো আর একটা সাদা ঘোড়া মিলে সব সময় আমার বাহন টেনেনিয়ে যায়-এবং একই ভাবে সাদা দিন আর কালো রাত আমার সময়টাকে বয়ে বেড়াচ্ছে।
“তারা আমার কাছেই পথের দু’পাশে ঠায় দাড়িয়ে থাকে, রাজাকে পাহারা দেবারজন্য চাবুক হাতে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে-এবং আমি চলে আসার পরেও তারা সেখানেই অপেক্ষা করতে থাকে।
“যতক্ষণ পর্যন্ত আমার ধনভাণ্ডারে অর্থ থাকবে আমাকে মিছে কথা বলতেই হবে-রূপার মত শীতলভাবে।
“হায় সময়, কেবল তোমাকেই আমি জয় করতে পারিনি-এই একটি জায়গাতেই কেবল তুমি রাজার মত রাজত্ব করছো।
“আমার ধনভাণ্ডারের সোনা-রূপা দিয়ে আমি তোমার অপরূপ সুন্দর কন্যাকে বিয়ে করে নিজের ঘরনি বানাবো, হায় সময়, আমার মৃত্যুতে সেও হয়তো মলিন বসনে আমার জন্যে শোক করবে। যদি আমি এতে ব্যর্থহই, তাহলে হয় তো বেশ্যা হিসেবে কোন একদিন তার গর্ভ পুত্রসন্তানের ভারে ফুলে ফেঁপে উঠবে আর আমার শেষ কথা হলো সৌকের অনির্বাণ শিখার জিহ্বা এখানকার অতিথিদের চিরদিন আমার কথাই বলবে।”
-ডেনি জনসন-ডেভিসের ইংরেজি অনুবাদ হতে সোহবার সুমন

৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×