
মুহাম্মদ ‘আব্দ আল-ওয়ালি(১৯৪০-১৯৭৩)
ইথিওপিয়ায় জন্ম গ্রহণকারী, ইয়েমেনী ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার মুহাম্মদ ‘আব্দ আল-ওয়ালি কায়রোতে পড়ালেখা করেন। পরে তিনি গোর্কি ইন্সটিটিউট হতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য মস্কো যান। ১৯৬২ সালে ইয়েমেনে সফল বিপ্লব সম্পন্ন হবার পর তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন। এবং একে একে বেশকিছু সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। এরমধ্যে রয়েছে মস্কো এবং বার্লিনে নিযুক্ত ইয়েমেনের চার্য দ্যা এফেয়ার। সবশেষে তিনি ইয়েমেনের এভিয়েশনে ডিরেক্টর জেনারেল পদে আসীন ছিলেন। আরব উপদ্বীপ জুড়ে ‘আব্দ আল-ওয়ালি সবচেয়ে সুপরিচিত কল্পকাহিনী লেখকদের মাঝে অন্যতম একটি নাম। তাঁর লেখার মাঝে প্রতিফলিত হয়েছে জীবনের করুণতম পরিস্থিতিতে ও প্রচণ্ড লাঞ্ছিত অবস্থায় মানুষের আচরণ। একইভাবে ঠাই পেয়েছ সংবেদনশীলতার সঙ্গে অকাট্যভাবে সমস্যার উত্তরণের উপায় সমূহ, তার একাকীত্ব এবং শৈল্পিক সমর্পণ, আরো ফুটে উঠেছে অবদমিত অবস্থায় মানুষের আচরণের বৈপরীত্য, উঠে এসেছে তার সম্ভাবনা আর সামর্থ্যের কথা; মহান উদ্যেগ আর তার অকৃতকার্যতার কথা। বিমান দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যুর মধ্যদিয়ে তাঁর অসাধারণ বৈচিত্রমণ্ডিত কর্মময় জীবনের ইতি ঘটে। তিনি তিনটি গল্প গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, দ্যা ল্যান্ড, সালমা (১৯৯৬), সামথিং কলড লংগিং (১৯৭২), এবং আঙ্কেল সালেহ্ (১৯৭৮), সেই সঙ্গে দু’টি উপন্যাস লিখেছেন, দ্যা ডাই স্টেঞ্জারস এবং সানা: এন ওপেন সিটি। মৃত্যুর পর ১৯৮৭ সালে বৈরুতে তার লেখা সমূহ সংগ্রহাকারে একত্রে প্রকাশিত হয়।
কয়েদি
আল-সাঈদ মাজিদ, আল-কাল’আস জেলখানার গেটের দিকে মুখকরে সে বসে ছিল। সিঁড়িতে বসে দেখছিল, পায়ে শিকল পড়িয়ে কয়েদিদের ভেতরে নিয়ে আসার দৃশ্য। ব্যথায় তার মুখটা বিকৃত হয়ে ছিল। তবুও ক্লান্ত হবার আগ পর্যন্ত একটানা কয়েদি গুনছিল। অথবা সম্ভবত সে খুব বেশী দূর গুনতেই পারতোনা, কিন্তু কয়েদির সংখ্যা বেড়েই চলছিল ...........বিশ...........ত্রিশ..........চল্লিশ। এই দেখে মনে প্রচণ্ড ধাঁধা লাগার পর সে মাথা চুলকাতে শুরু করে। এমন দৃশ্যে তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। এদের কারো চোখে জল আছে সে দাবি কেউ করতে পারবে না। শিকল জুড়ে দেবার সময় একটানা গৎবাঁধা তালে হাতুড়ি ওঠানামা করছে, সেই ভারে নিচে থাকা পাথরটা মাটির ভেতরে অনেক খানি সেঁধিয়ে গেছে। এই দৃশ্যে সে এবার দৃষ্টি স্থির করলো। বন্যার মতো কয়েদি আসা শেষ হলে পর দ্রুত সে সিঁড়ি থেকে নীচে নেমে এলো। ভেরে ঢুকেপড়া শেষ লোকটাকে সে অমায়িক ভাবে বলতে চেষ্টা করলো।
“দয়া করে বলবেন কি, আর কেউ বাইরে আছে কিনা ?”
সে গেটের দিকে তাকিয়ে রইলো।
সেই কয়েদি তার কথা না বুঝলেও খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো, “না, আর কেউ বাকি নেই।”
মাজিদ এমন ভাবে মাথা ঝাঁকাল, যেন এই জবাবটিই সে শুনতে চেয়েছিল।”
এবার কারাগারের উঠোন কয়েক ডজন নতুন বাসিন্দায় ভরে উঠলো। এদের সবাই নিজের জন্য সঙ্গে কম্বল আর কাপড় চোপড় বয়ে বেড়াচ্ছিল, ঢোকার পথে সেগুলোই কেড়ে নিয়ে তল্লাসি করা হয়েছিল। লোকেরা সবাই সরু বদ্ধ কারাকক্ষে নিজের জন্য একটু জায়গার খোঁজ করছিল। পুরাতন কয়েদিরা তড়িঘড়ি করে নিজেদের বদ্ধ প্রকোষ্ঠে ঢুকে পড়ার জন্য সাধছিল, কিন্তু এসব বাদদিয়ে আল-সাঈদ মাজিদের চোখ চারপাশের এই অদ্ভুত দৃশ্যে মজেছিল। ময়লা ছেড়াজামা আর খালিপায়ে যেসব কয়েদি তাদের দিকে স্বাগত জানাবার মতোকরে হাসিমুখে তাকিয়ে ছিল, তাদের চারপাশে সে ধীরে ধীরে ঘুড়ে বেড়াতে লাগলো। লোকগুলো তারচাইতে আলাদা এটা বুঝতে পারার পর সে কাউকে আর তারপাশে জায়গা সাধল না।
আস্তে করে হেটে সে কারাগারের সিঁড়িতে ঠায় দাড়িয়ে থাকা হাজ আহমেদ আল-হাদ্দাদের কাছে গেল, সেও কারাগারে নতুন আগতদের দেখছে। এগিয়ে এসে সে বয়েসি বন্ধুকে কাছে পেয়ে উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরল। আর তারপরই শুরু হলো শব্দের ঝনঝনানি আর প্রশ্নের পর প্রশ্ন, যদিও তার বেশীর ভাগেরই কোন সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যাচ্ছিলোনা।
মাজিদ বললো, “তুমি কি জানতে ? তাদের সবাই তরুণ।”
সে আল-হাদ্দাদের জবাবের অপেক্ষা করেনি। ওর দিকে তাকিয়ে সে চিন্তুকের মত মাথা চুলকাতে লাগলো, যেন ওর মাথার ওপর গজানো পাকা চুল গুনছে।
হঠাৎ আল-হাদ্দাদ বলে উঠলো, “ঘাইথা বিন্ত আল-ধীব তাদের এখানে পাঠিয়েছে-ঘাইথা বিন্ত আল-ধীব।”
যেমন করে কয়েদিরা নিজেদের মাঝে হাসাহাসি করে তেমনি করে সে গলা চড়িয়ে কথা বলছিল।
মাজিদ স্থির ভঙ্গিতে কথাবলে তার বন্ধুকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। “ ওরা সবাই সানার – খোদাই ভাল জানেন আর কে কে বাইরে আছে।”
মসজিদের সিঁড়িতে তাদের এই কথোপকথনে কেউই খেয়াল করছিল না। ধীরে ধীরে কয়েদিরা নিজেদের মাঝে পরিচিত হয়ে উঠলো, এবং মাজিদ, তাদের মধ্যে সবচেয়ে নম্র হিসেবে, সবার বন্ধু হয়ে উঠল।
ঠোঁটে সব সময় অবাক করা এক হাসি লেগে থাকায় মাজিদকে চাওয়া মাত্র কেউ কিছু দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কারো দিকে তাকিয়ে সে বলে, “একটা সিগারেট আর দিয়াশলাই হবে।” ব্যাস এটুকুই। তারপর সে কোনোএক কোনে হেলান দিয়ে আপন মনে ধোয়ার স্বাদনিতে ব্যাস্তহয়ে পড়ে।
আল-ক্বাল‘আ জেলের সবচেয়ে শান্ত শিষ্ট পাগলাটে স্বভাবের কয়েদি হওয়ায়, তাকে শিকল পড়ানো হতো না। শোনা যায় তাকে কেউ কখনো পাগলের মতন প্রলাপ বকতে বা গান গাইতে পর্যন্ত শুনেনি-তবে প্রতিবার ধোয়া টানার সময় পুরনো এক করুন সুরে গুনগুনিয়ে উঠতো সে। যার বেশীরভাগ কথাই হয়তো সে ভুলে বসে আছে।
মাথা ঠান্ডা থাকলে সে তার পাশে বসার জন্য কাউকে না কাউকে বেছে নিত, তারপর তারদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করতো, “সব তরুণেরা এখানে কেন ? তুমি কি করে ছিলে ? বাকি আর কে আছে বাইরে ?” এমন আরো অনেক প্রশ্নই সে করতো, কিন্তু সেসবের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতো না। হঠাৎ উঠেগিয়ে সে অন্য আরকারো পাশে গিয়ে বসতো.......আর সেই একই, অঝোরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন চলতেই থাকতো।
কয়েদিরা মাজিদের ইতিহাস শুনে বিস্মিত হতো। এখানকার অন্য সব কিছুর সঙ্গে মাঝেসাজে তার কথাও সবাই আলোচনা করতো, কিন্তু পুরো গল্পটা কারোরই জানা ছিলনা, অফুরন্ত সেই গল্পের দীর্ঘ বয়ানে আসল সত্যটাই যেন ঢাকা পড়ে আছে। একদিন কেউ একজন আলাপচারিতার সময় বলে ওঠে, “একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে, বিয়ে করার পর সেই মেয়ের বেইমানি টের পেয়ে মাজিদ পাগল হয়েযায়। মেয়েটাকে প্রচণ্ড রকমের ভালবাসার কারণে, সে ওকে ছেড়ে কখনই থাকতে চায়নি, আর তাই প্রচণ্ড স্নায়ু চাপে ভুগে একসময় তার স্মৃতি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।”
অন্যেরা বলে বেড়ায় মাজিদ ছিল খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক যুবক, যে কিনা তার শাসক পরিবারের মাঝে নিজের মতোকরে পথ তৈরিকরে নিতে চেয়েছিল। কেননা সে ছিল হাসিমাইট১ গোষ্ঠীর লোক, নিজেকে পরিপূর্ণ একজন ইমাম২ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ফ্রিডমপার্টির৩ সদস্যদের সঙ্গে সে যোগাযোগ গড়ে তোলেন, তাদের গোপন মিটিংএ যোগদিতে থাকেন, এবং যাবতীয় দুঃখ, দারিদ্র আর সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে কথা বলতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে এই খবর ইমামের কানে পৌঁছে, তিনিই মাজিদকে পেলে পুষে বড় করেছেন, এবং এক সময় মাজিদকে নিজের খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা তার আগে থেকেই ছিল। মাজিদের বিদ্রোহের কথা জানতে পেরে তিনি তাকে আটক করেন এবং পাগল হবার আগপর্যন্ত মারধর আর অত্যাচার করতে থাকেন। আর এরপর তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন, যেখানে সে প্রায় আজ বারোটা বছর ধরে আটক আছেন। তাকে অনেক বেশী শান্ত, ভাবুক আর দয়ালু বলে মনে হতো, কেবল বিরল কিছু মুহূর্ত ছাড়া-যখন সে রাগে চিৎকার করে গায়ের কাপড় চোপড় ছিড়তে ছিড়তে কাছে থাকা অন্য কয়েদিদের উপর হামলে পড়তো।
.
মাজিদ ছিল সেই সৌভাগ্যবানদের মাঝে একজন যাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য বাইরে থেকে লোক আসতো। সেই সব দর্শনার্থীদের সম্বন্ধে কখনই সে কাউকে কিছু বলতো না, আর তার সঙ্গে দেখা করতে কে আসে সেটি কেউ কখনই দেখেনি। এমন কি যে সংবাদ বাহক এসে চিৎকার করে তাকে ডাকতো, “সাঈদ মাজিদ! সাঈদ মাজিদ, তোমার কাছে একজন লোক এসেছে দেখা করতে।” মাজিদ তখন তার সেই করুন সুর তুলে তড়াকরে মুহূর্তে দরজা গলে বাইরের দিকে মিলিয়ে যায়। তারপর হাতে কাট, সিগারেট আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ফিরে আসেন। মাঝে মধ্যে কাপড়ও নিয়ে আসতে দেখাযায়। একদিন এক কয়েদি সবাইকে বলে মাজিদের সঙ্গে আসলে দেখা করতে আসেন তার মা। তার পরিবারের টাকা রয়েছে বলেই তার জন্য খাবার আর কাপড়ের, সিগারেট আর কাটের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারছেন তারা। কারাগারে মাজিদের অন্যতম আকর্ষণের জিনিস হলো এই কাট। প্রায়ই তাকে অন্যসব কোঠার সামনে দাড়িয়ে কয়েদিদের ফেলে দেয়া কাটের ভাঙ্গা টুকরো কুড়াতে দেখাযায়। তারপর মসজিদের প্রিয় কোনে আবার গা এলিয়ে দিয়ে বোটা আর প্রশাখা গুলো মুখে পুরেদিয়ে আপনমনে জাবরকাটতে শুরু করে।
কাট পাবার ইচ্ছা তাকে দুর্দমনীয় করে তুললে পর, কখনো কখনো সে অন্য কয়েদিদের হাতে থেকে কাট কেড়ে নেবার চেষ্টা করে তাদের বিরক্ত করতে শুরু করে। তখন তারা বিরক্ত হয়ে লাথিদিয়ে তাকে কারা কক্ষের বাইরে ফেলেদেয়। কিন্তু তারপরও সে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাঙ্গা টুকরো গুলো কুড়াতে থাকে আর একাজ করতে গিয়ে কুড়াতে আসা অন্য পাগল কয়েদিদের সঙ্গে তাকে বিরোধে জড়াতে হয়।
একবার এক কয়েদি দাবি করে সে মাজিদের শিশুকাল থেকেই তাকে চেনে, সেই সময় তার নাম ছিল আব্দুল্লাহ মাজিদ। আজ থেকে বিশ বছর আগে সেই কয়েদি ধামারে কাজ করতো বলে দাবি করেন। সেই সময় সে নাকি ধর্মীয় প্রথা অনুসারে বিচারের জ্ঞান-গরিমা আর ঐতিহ্যের দিকদিয়ে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি জানান, সেসময় মাজিদ ভালো কাট আরো বেশী পছন্দ করতেন। আরতাই তার অতিথিশালায় গণ্যমান্য ব্যক্তি আর জ্ঞানি-গুনি, বিচারক আর শেখদের নিয়মিত আসর বসতো। মাজিদ সেই আসরে অভিজাত দামি সাদা রঙ্গের পোশাক পরে হাজির হতেন, আর আসরের ফাঁকে প্রায়ই তিনি পাগড়ি বদলে আসতেন। তার সংগ্রহে অনেক পাগড়ি ছিল যার প্রতিটিই ছিল খুবই মূল্যবান, পরিচ্ছন্ন আর পরিপাটি। এই কয়েদির মতে তার পাগল হবার সত্যিকারের কারণ আসলে কাত’এ মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি। কেননা প্রতিদিন ঘুম ভঙ্গার পর হতে মাঝরাত অবধি সে এই কাত চিবায়। এই গল্পের সত্যাসত্য নিয়ে বলার মত কেউই সেখানে নেই, এমনকি আল-মুজায়িন পর্যন্ত, দীর্ঘদিন ধরে সে এখানে আছে, এবং এখন সে কারাদপ্তরে নকীবের কাজ পেয়েছ। তার কথা হলো, সে আসার অনেক আগে থেকেই মাজিদ এখানে ছিল, তারপর এক সময় তার বোধবুদ্ধি ফিরে আসে, এবং তাকে মুক্তি দিয়ে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মুজায়িন জানায়, মুক্তির পর তার মা তাকে খুব আনন্দের সঙ্গে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু এর কিছু দিন বাদেই সে আবার এই কারাগারে ফিরে আসে। এই নিয় একটা গুজব রটে, সে নাকি তার মাকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিল। তারপর থেকে মাজিদ আর ছাড়া পায়নি।
অন্যসব পাগল অধিবাসীদের মতই, সেও এই কারাগারের জটিল এক ধাঁধা হয়েই রয়ে গেছে। তার অতীত সম্বন্ধে নিশ্চিত করে কেউই কিছু বলতে পারছে না, সবার কাছে সে এক অপার বিস্ময়ের বস্তু যার কোন অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নেই। কম বেশী সবার নাকের গোঁড়া থেকেই সে দু’একবার কাত কেড়ে নিয়েছে। তারপরও অন্যসবার কাছে সে বন্ধুর মতো।
একদিন একটা অন্য রকম ঘটনা ঘটলো। কয়েদিদের কেউ কেউ কাত চিবচ্ছিলও, অনেকে রাতের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত ছিল, এমন সময় গলা চড়িয়ে নকীব বলতে শুরু করলো: “সবাই নিজ নিজ জায়গায় থাক ! কয়েদিরা, সবাই নিজ নিজ জায়গাতে থাক !”
এমন সময় মুগুর হাতে একদল সৈনিক ঢুকলো। মাটিতে আঘাত করতে করতে তারা রাগি স্বরে চিৎকার জুড়ে দিল, “এদিকে এসো ! তাড়াতাড়ি কর ! একে একে সবাই নিজের জায়গা ছেড়ে চলে এসো !” এই কথায় কয়েদিরা তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠলো, কারা উঠোন জুড়ে শুরু হলো শিকলের একটানা মাতম। স্রোতের মতো ধাক্কা এসে লাগার আগপর্যন্ত সবাই নিজের জায়গা টুকু অতি যত্নে আঁকড়ে থাকতে সচেষ্ট ছিল- এসময় করো কারো হাত থেকে সদ্য হাতে নেয়া কাত মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। কারারক্ষীদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে জেলখানা জুড়ে সত্যিকারের ভীতি ছড়িয়ে পড়লো। একজন কয়েদি সাহস করে কথা বলতেগিয়ে মুখ থেকে থুতু বেরিয়ে আসলো, তাড়া করে সে বলল, “আপনাদের যেমন ইচ্ছে করুন..........কিন্তু সঙ্গে খানিকটা পানি নেয়া যাবে কি ?” রক্ষী চিৎকার করে উঠলো, “কোন পানি না, এমনকি অন্য আর কিছুই না !” এই বলে সেই রক্ষী লোকটার পেছনে লাথি চড়ালো। লোকটা কাঁকিয়ে উঠে মাটিতে গোত্তা খেয়ে পড়লো।
এরপরও রক্ষীটি সেই একই কায়দায় লোকটির প্রতি হাকদিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু অন্য কয়েদিরা এরই মধ্যে তাদের এই বন্ধুকে কক্ষে পুড়ে নেয়। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে তার জলশূন্য পাত্রটা নর্দমায় গিয়ে পড়ে।
সেই লোকটার দিকে দুশ্চিন্তা মাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে, মাজিদ জেলখানার পাগলা গারদ অংশেরদিকে পাচালিয়ে দ্রুত হেটে যেতে লাগলো, সেখানে পৌঁছার আগেই তাকে থামতে হলো, সে কারা উঠানের চারপাশটায় চোখ বুলাতে শুরু করলো, পরিত্যক্ত সেই উঠানে এখন সৈনিক ছাড়া আর কেউই নেই, সেই সব সৈনিকেরা সমানে চিৎকার করছে, “সবাই জানালা বন্ধকর আর কেউ বারে তাকাবে না !”
কোন কোন সৈনিক খোলা জানালার দিকে পাথর ছুড়ে মারছে।
এইসব কিছু ঘটতে সময় লেগেছে মাত্র মিনিট খানেক, কিন্তু ভয়ানক সেই কয়েক মিনিট জেলখানার বন্দীদের কাছে শতবছরের মতো ঠেকছে। মাজিদ নিরিবিলি এককোণে চলে গেলো। আর পাগলদের দিকে সৈনিকেরা তেমন একটা নজর দেয়নি।
হঠাৎ আলো নিভিয়ে দেয়া হলো এবং চারদিক ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেলো।
কয়েদিদের মন আতঙ্কে ছেয়ে গেলো।
কি ঘটেছে ? কি ঘটতে যাচ্ছে ?
সবগুলো কক্ষে ফিসফিস করে এই একই কথা কানাকানি হচ্ছে। অন্ধকার স্বত্বেও কেউ কেউ জানালার ফাঁটল দিয়ে উকিমেরে বাইরে দেখতে চেষ্টা করছে। কিন্তু এমনভাবে সেখানে পাথর এসে লাগছে যেন সৈনিকেরা ওদের চোখগুলো আপনা থেকেই দেখতে পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিলো।
পুরোপুরি একটা অন্ধকার উঠান। সবার মনে ভয়ানক এক আতঙ্ক বাসা বেধেছে। ফিসফিস করে একজন কয়েদি বলে উঠলো, “আর মনে হয় সূর্য উঠবে না।” আরেকজন গলা কাঁপিয়ে মজা করতে চাইলো, “জায়গাটাকে ঠায় দাড়িয়ে থাকার জন্য আদেশ দিয়েছে সৈনিকেরা, আমি স্পষ্ট শুনেছি।” কিন্তু এমন মজার কথা শুনেও কেউই হাসলো না।
জেলের ভেতরের দরজা খোলাহলো আর সবাই শিকলের ঝনঝনানি শুনতে পাচ্ছিলো। হাতুড়ির শব্দ চারদিকে অসুস্থের মতন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো। শরীরে চাবুকের কষাঘাত আর করুন আর্তনাদ কানে আসছিলো।
একজন সেই হাতুড়ির শব্দ শুনে নতুন আসা কয়েদির সংখ্যা গুনার চেষ্টা করছিলো।
এক......দুই.......তিন.......
একটা তীব্র চিৎকারের পর হতে সে আর গুনতে পারলো না, “যথেষ্ট হয়েছে, আর না ! তোমরা আমাকে ধরে এনেছো সেটা ঈশ্বর ভাল করেই জানেন ! আমাকে আর মেরো না ! আর না !
“চুপকরে থাক,বেয়াদপ !” পাহারাদার তেড়ে আসলো।
“বেজন্মাটাকে আচ্ছা করে পেটা !” আরেক জন চিৎকার করে উঠলো।
এভাবে আঘাতের পর আঘাত চলতেই লাগলো। ওরা সবাই কাউকে টেনে নেবার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলো, লোকটার শিকল ছিঁড়ে গিয়েছিল বলে তাকে এভাবে টেনে হেঁচড়ে নেয়া হচ্ছে।
মার খেয়ে লোকটা ভয়ানক চেঁচাচ্ছিলও, আর মেরো না, তোমাদের দোহাই লাগে, যথেষ্ট হয়েছে !”
শিকলে প্রচন্ডভাবে হাতুড়ি পেটাবার শব্দ চলতেই লাগলো।
তারা সবাই ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষ খোলার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। শত শত কয়েদিদের মধ্যে থেকে একজন প্রচণ্ড আক্ষেপ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলো, “ওরা আমাদের মেরেই ফেলবে, আমি তোমাদের বলে রাখছি ওরা আমাদের মেরেই ফেলবে।”
বন্ধুরা তাকে চুপ করাতে চেষ্টা করে, কিন্তু সে পাগলের মতো সেই একই প্রলাপ বকতেই থাকে। একজন সৈনিক এসে সেই কক্ষের দরজায় মুগুর দিয়ে আঘাত করে। “তুই কি চুপ করবি না আমি এসে তোকে শেখাবো এখানে কিকরে থাকতে হয় ?”
তার সেই চিৎকারে কয়েদিরা নীরবে কাঁদতে থাকে।
অন্য কয়েদিরা মেঝেতে লাফিয়ে পড়ে কম্বল দিয়ে মাথা ঢেকে, কান বন্ধ করার চেষ্টা করতে থাকে।
তারা ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষের মেঝেতে কয়েদিদের পতনের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলো। দেহ গুলোকে টেনে-হেঁচড়ে নেয়া হচ্ছিলো। “হয়েছে, বললাম তো !” “তোমরা আমাকে ব্যথা দিচ্ছ, আমাকে এবার হাটতে দাও !” ভূগর্ভস্থ কারা কক্ষের মেঝেতে দেহ গুলো ছুড়ে ফেলা হচ্ছিলো।
দেখতে দেখতে আরো অনেক গুলো দীর্ঘ নিশ্চুপ ক্ষণ পেরিয়ে গেলো। তারপর একসময় ভূগর্ভস্থ কারা কক্ষের দরজা সজোরে বন্ধকরে দেওয়া হলো। সৈনিকেরা মুগুর পিটিয়ে শব্দ করেই যাচ্ছিলো। এদের কেউ কেউ তখনো জানালার দিকে পাথর ছুড়ছিল। তারপর আবার নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কোথাও একটা ফিসফিসানি শুনতে পাওয়া যায়, “ওরা আমাদের বেরকরে নিয়ে পেটাবে।”
“আমাদের কাউকে কাউকে মেরেও ফেলতে পারে।”
“আল্লাহ না করুক ! হয় তো ওরা কেবল নতুন কয়েদি আনছে।”
“কিন্তু ওদের সবাইকে কেন এভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত করা হলো ?”
“মনে হয় এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ।”
“তোমার কি মনে হয়, ওরা কারা ?”
এমন করে আবছা প্রশ্ন চলছিলো। “আমরা জানি ওদের সংখ্যা অনেক।”
“হতে পারে, কেবল পাঁচ ছ’জন।”
“তুমি কি শিকলের শব্দ শুনতে পাচ্ছ না ? বাছা, অন্তত দশ জনের বেশী না হয়েই যায় না !”
মাজিদের চেয়ে সেই রাত্রিতে বেশী কেউ আর কিছু জানতে পারেনি, সে তার সেই গোপন কোনে লুকিয়ে থেকে চুপি চুপি সবই দেখেছে।
সকালে সৈনিকেরা কয়েদিদের ভূগর্ভস্থ কারা কক্ষের দরজার কাছে ঘেষতে বারণ করে দিয়ে যায়, যেখানে কিনা নতুন আসা কয়েদিদের রাখা হয়েছে।
কী ঘটেছে সেটা জানতে, একেকটি কক্ষ অন্য কক্ষের কাছে উন্মুখ হয়ে আছে, কেউ কিছুই জানে না, কেবল অনুমান করছে।
মাজিদ আগে যেমন ছিল ঠিক তেমনি শান্ত ভঙ্গিতে চলাফেরা করতে লাগলো, যদিও তার চেহারার দুখের ছায়া পড়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর সে ভূগর্ভস্থ কারা কক্ষের দরজার সামনে দিয়ে, তার সেই অস্বাভাবিক সুর তুলতে তুলতে পারি দিল, এবং সে তখন ভেতর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ পেল। “আমাকে একটা সিগারেট দাও............আমি একটা সিগারেট চাই।”
মাজিদ এমনভাবে হেটে চলে গেলো জেনো এর কিছুই শুনতে পায়নি। মসজিদের কাছাকাছি পরিচিত কয়েক জন কয়েদির সামনে দিয়ে যাবার সময়, সে কাতর কণ্ঠে বলে উঠলো, “ইস, আমার একটা সিগারেট দরকার।”
একজন তাকে একটা সিগারেট দিল। সেটা নিয়ে সে অন্য আরেক জনের দিকে ঘুরলো, বলতে লাগলো, “আমাকে কি আরেকটা সিগারেট দেবে ? আরো অনেক অনেক সিগারেট।”
সঙ্গীদের সঙ্গে এমন ভয়ংকর রাতনিয়ে কথা বলাতে কয়েদিরা তাকে ভৎসনা করতে লাগলো।
তখন অন্য আরেকজন কয়েদির কাছে গিয়ে মাজিদ বললো, “ওহ, আমার একটা সিগারেট দরকার, অনেক, অনেক সিগারেট।”
ওরা তাকে কয়েকটা সিগারেট দিলো, তারপর আরো বেশী চাইতে গেলে থামতে বললো।
সে ওদের ছেড়ে অন্যদের কাছে গেলো। এভাবে সে সিগারেট জমাতে শুরু করল। এমন কি যে সব সৈনিক জেলখানার ভেতরে সিগারেট বিক্রি করে তাদের কাছে গিয়েও সে, হাসিমুখে বলতে লাগলো, “আমাকে একটা দাওনা ?” তখন সেই সৈনিক তাকে তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি এমনিতেই দিয়ে দেয়।
তারপর একসময় খুব সতর্কতার সঙ্গে ডানবাম দেখে নিয়ে, কেউ তাকে আর দেখছে না এটা পুরোপুরি নিশ্চিত হবার পর, ভূগর্ভস্থ সেই কারা কক্ষের দিকে পা বাড়য়। সৈনিকেরা তখন অন্য কয়েদিদের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল, কেউ যাতে কোন ক্রমেই সেদিকে পা বাড়াতে না পারে, সেটা নিশ্চিত হবার জন্যে। মাজিদের দিকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে চোখ রাখা হয়নি। ভূগর্ভের সেই দরজার কাছে এসে সে মাটিতে ঝুঁকে পড়ে, তারপর দরজার কিনারার সরু ফাঁক গলে হাত খানা সেঁধিয়ে দেয়। এই ছিদ্রদিয়ে একে একে নিচের বন্দিদের হাতে সিগারেট পৌঁছে দেয়। তারপর সোজা হয়ে দাড়িয়ে শরীরের ধুলা ঝাড়তে থাকে।
কেউ একজন তখন ভূগর্ভের ভেতর থেকে বলে উঠে।
“ধন্যবাদ আপনাকে.....ধন্যবাদ.........আমাদের এখন দিয়াশলাই দরকার।”
এবং মাজিদ তখন দেশলাইয়ের খোঁজে পা বাড়ায়।
১. কন্যা ফাতিমার দিকদিয়ে নবীজির বংশধর
২. ইয়েমেনের ঐতিহ্যগত শাসক
৩. ইমামদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও তাদের তাবেদারতন্ত্রের জাঁতাকল থেকে মুক্তি পবার লক্ষণীয়ে ইয়েমেনের “ফ্রিডম পার্টি” বা “পাটি অব লিবারেল” ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৯ সালের দিকে ইমামদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠায় সফল হয় এই দল।
লিন্ডা জয়োসি এবং নওমি শিহাব নেএ এর ইংরেজি অনুবাদ হতে
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



