somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি ঠিকানার খোঁজে

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটি ঠিকানার খোঁজে

অনুবাদ গল্প

ইব্রাহিম আসলান (১৯৩৯) খুব ব্যাপকভাবে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত, মিশরীয় ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার ইব্রাহিম আসলান কায়রোতে সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার প্রথম দিককার ছোটগল্প সংগ্রহ, দ্যা ইভিনিং লেক (১৯৭১), মিশর এবং আরবের ব্যাপক এলাকা জুড়ে একজন সফল সাহিত্যিক হিসেবে তাকে স্বীকৃতি অর্জনে সহায়তা করে। প্রতিদিনকার যাপনের খুটিনাটি অতি সাধারণ ঘটনার শারীরিক ও মানসিক পটভূমি তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রেখেছেন তার সমকালীন বিষয়ের লেখনিসমুহের মধ্যে। ১৯৯২ সালে, এ নাইট’স রোজারি, নামে তার আরও একটি গল্প সংগ্রহ বাজারে আসে। বার্ডস অব দ্যা নাইট (২০০০) এবং টেলস ফ্রম ফাদলাললাহ ‘উথমান (২০০৩) শিরোনামে তার দু’টি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়।
শেরিফ এলমুসা এবং ক্রিস্টোফার টিংলি-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন সোহরাব সুমন



মধ্য দুপুরের খানিক বাদে শুকনো ফিনফিনে একটা লোক সোজাসোজি পা ফেলে হাটছিলেন, দীর্ঘ যে সড়কটা শহরটাকে এফোড় ওফোড় দু’ভাগ করে বয়ে গেছে তার পায়ে চলা পথ ধরেই তিনি একাকী র্সন্তপনে আপন মনে হেঁটে চলছিলেন। সেই হাঁটা পথ ধরে সামনে পেছনে দু’দিকেই যাতায়াত করা লোকের ভীষণ ভিড় ছিল। আর আলকাতরার সেই তপ্ত সড়ক জুড়ে দ্রুত ধাবমান যানবাহনের ছাদ গুলো রোদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। শুকনো লোকটার পরনে ছিল রংচটা ধুসর রঙের স্যুট, আর হাতে ছিল ভাজ করা খবরের কাগজ। তার মাথায় একটাও চুল অবশিষ্ট ছিলো না। বেশকিছু সময় ধরে সে দীর্ঘ এই সড়ক ধরে হাটলেন, তারপর লম্বা থামে ঝুলন্ত ধাতব একটা ময়লার ঝুড়ির কাছে এসে থামলেন এবং সেখানে পৌঁছে হাঁটা পথের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে আড়াআড়ি পারহওয়া একজন খোঁড়া লোকের পথ আটকে তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। অবশেষে সেই খোঁড়া লোকটা খানিকটা হেলে দেয়ালে ঠেসদিয়ে তার পেছন দিকের একটা দোকানের জানালার নিচদিয়ে হামাগুড়ি খেয়ে পথচারিদের দিকে হাত বাড়িয়ে, তাদের দিকে শঙ্কা নিয়ে তাকিয়ে রইলো।

শুকনো লোকটা ঠায় দাড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে রইলো; তারপর সে খবরের কাগজটা হাতবদল করে বাম হাতে চালান করে দিলো আর ডান হাতে একটা রুমাল বের করে ধরলো। সেটা দিয়ে সে তার মুখ আর টেকো মাথার ঘাম মুছলো এবং দুর্বলভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর রুমালখানা পকেটে চালান করে দিয়েই আবার আগের মতই হাটা শুরু করে দিলো, তারপর আবারো থামলেন তিনি এবং এবার তিনি চোখ দু’টি কুঞ্চিত করে দাড়িয়ে রইলেন।

কিছু দূরে মোটা একটা লোক তার দিকে চেয়ে দাড়িয়ে রয়েছে, তার চোয়ালটা ঝুলে আছে, তাতে করে মুখটা একদমই খোলা আর চোখ বড়করে সে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

কিছুক্ষণ পরষ্পরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে রোগা লোকটা ঘন ঘন পিচঢালা পথ আর মোটা লোকটার দিকে বার বার চোখ ফেরাতে লাগলেন। স্থুল লোকটা দাঁত বের করে হঠাৎ হেসে ওঠার আগ পর্যন্ত একটানা এভাবেই চলছিলো। হাসতে হাসতে লোকটা তার এতটাই কাছাকাছি চলে আসলো যে একদম ছুই ছুই অবস্থা, এ অবস্থায় তিনি বললেন: “আপনাকে দেখে খুবই খুশি হলাম !”

রোগা লোকটাও একপা পিছুহটে গিয়ে, ময়লার ঝুড়িটার খুব কাছাকাছি চলে আসলো। এই অবস্থায় আবার তারা দৃষ্টি বিনিময়ের পর, সেও বিড়বিড় করে বলে উঠলো, “আপনাকে দেখে খুবই খুশি হলাম, স্যার !”

মোটা লোকটা এবার গলা চড়িয়ে বলল, “তুমি কি আমাকে চিনতে পারছো না ?”

রোগা লোকটা তার দিকে আবাররো ভালো করে তাকালো। মৃদু হেসে, সে জবাব দিলো, “না, হুবহু কিছু মনে পড়ছে না, যদিও আপনার মুখটা আমার পরিচিত বলেই মনে হচ্ছে।”

স্থুলকায় লোকটা কেবল শার্ট প্যান্ট পরা অবস্থায় ছিলেন, সেই সঙ্গে কয়েকটা প্যাকেট বগল দাবা করে হাঁটছিলেন, এবার সে বললেন ভালো করে স্মরন করতে চেষ্টা করুন, আপনি আসলে আমাকে চিনেন। আমি সাঈদ আল-বিলতাগি।”

একথা শুনে রোগা লোকটার চোখের পাতা কেঁপে কেঁপে উঠলো, তারপর সে বললো, “সত্যি, আমি খুবই দুঃখিত, খুবই দুঃখিত...”

“তুমি কি এতক্ষণ ধরে সত্যিই আমাকে চিনতে পারোনি .....সত্যিই চিনতে পারোনি....?” বিরক্তির সঙ্গে মোটা লোকটা মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে বলতেই লাগলো, “আমার জিহ্বার ডগায় সব সময় তোমার নাম লেগেই আছে, তোমার নামটা একদম আমার জিহ্বার আগায়....”

রোগা লোকটা এবার বলল, “আমার নাম ‘আরিফ, ‘আরিফ আল-সাক্কা।”

মোটা লোকটা এবার প্যাকেট গুলোর ভির থেকে তার হাত বের করলেন, এবং রোগা লোকটার হাত ধরে সজোরে ঝাকাতে লাগলেন, আর চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “‘আরিফ আল-সাক্কা। হ্যা, ‘আরিফ আল-সাক্কাইতো। তুমিই সেই লোক। সেই আগের মতই আছো দেখছি, আহলা ওয়া সাহলান। অন্য রকম দেখতে হলেও আমি কিন্তু তোমাকে ঠিকই চিনতে পারতাম।

কিন্তু এটা কিকরে সম্ভব তুমি আমাকেই চিনতে পারছো না ? তুমি কি সাঈদ আল-বিলতাগিকে ভুলে গেছো, যে কিনা ক্লসে সব সময় তোমার পেছনের বেঞ্চেই বসতো ? ঠিক তোমার পেছন দিকটায় ?

“আপনি আমার সঙ্গে স্কুলে পড়েছ, জনাব ?”

“অবশ্যই, আমি তোমার সঙ্গে স্কুলে পড়েছি !” এই কথা বলে তার কাধে হাত রেখে, মোটা লোকটা ফিসফিস করে বলল, “তোমার বয়স হয়েছে, তাই হয়তো ভুলে গেছ।”

“আমি তো পড়েছি সেই ফারুক স্কুলে।”

মোটা লোকটা এবার হো হো করে হেসে উঠলো। তার কপালের পাশ থেকে টপ টপ করে কয়েক ফোটা ঘাম, গাল গড়িয়ে গলা হয়ে বুকের উন্মুক্ত প্রান্তে এসে থামলো। এবার সে বলল, “ফারুক স্কুল ? আমি বলিনি বয়সের কারণে তুমি অনেক কিছুই ভুলে গেছ ? তারপর সে আরো জোরে বলতে লাগলো, “ভালো কথা, কেমন আছো তুমি ?”

রোগা লোকটা হাসলো, “ভালই তো আছি।”

মোটা লোকটা ঘাড় বাঁকিয়ে ঘুরালো। সে এবার আরো সতর্কভাবে রোগা লোকটার দিকে তাকালো।

“কিন্তু এমকি হয়েছে যে তোমাকে দেখে এত বয়স্ক মনে হচ্ছে ?”

“পরিস্থিতিই এর জন্য দায়ী”

“পরিস্থিতি ? এতটা প্রসন্নভাবে কিকরে তুমি একথা বলতে পারলে, মিয়া ?

একথা শুনে রোগা লোকটা হেসে উঠলো। সে গুলিয়ে ফেলার স্বরে বলতে শুরু করলো, “প্রসন্ন ? প্রসন্ন বলতে তুমি কি বুঝাতে চাইছো ?”

“ আমি কি বুঝাচ্ছি ? আমি বলতে চাইছি এব্যপারে তুমি কি করে এতটা শান্তু আছো, বুড়ো শয়তান কোথাকার ? আমার চোখে দেখা সবচাইতে পাজি লোক হচ্ছ তুমি, সেটা জানো, তোমার মত বদনচ্ছার লোক জীবনে আর একটাও আমি দেখিনি কোথাও ?”

“একথা বলোনা !”

“এই ! এদিকে তাকাও ! আমার দিকে ! তুমি ছিলে সত্যি কারের একটা ক্ষুদে শয়তান। ভালই হলো, পথে আজ অনেক দিন পর আবার তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো !”

এমন সময় সে ঠেসদিয়ে বুকে ধরে রাখা প্যাকেটের একটা তোড়া সে মাটিতে ফেলে দিলো। ক্লান্ত বোধ করায় সে সামান্য কাত হলো, তাতে করে তার মাথাটা সোজা গিয়ে ঠেকলো রোগা লোকটার বুকে। এবার সে বলল, “শোন, ম্যাবরুকের কথা কি তোমার এখনো মনে আছে ?”

“ম্যাবরুক ? এই ম্যাবরুকটা আবার কে ভাই ?”

“কলো কদাকার ছেলেটা, ভাই। মনে নেই ! যে ছেলেটার টিফিন রোজ রোজ তুমি খেয়ে নিতে ?”

“আমার সব মনে আছে, তুমিই করতে কাজটা !”

“অবাক ঘটনা তো ! এসবের কিছুই আমার মনে নেই।”

“যে ভাবেই হোক, ওকে তোমার মনে পড়ার কথা ?

“কি ?”

“কাজটা ছিল খুবই মজার।”

আবার সে চারপাশে তাকালো। তারপর বয়ে আনা প্যাকেট গুলোর দিকে তাকালো: “আমি বাচ্চাদের জন্য কিছু কাপড়চোপড় কিনেছি। শোন। তুমি অবশ্যই বিয়ে করেছ, তাই না।”

“কে ?”

“তুমি।”

“খোদা, না। কখনই আমি বিয়ে করিনি।”

মোটা লোকটা এবার চিৎকার দিয়ে উঠলো, “একথা কিছুতেই আমি বিশ্বাস করি না !” “ এটা তুমি আমাকে কি বললে, ‘আরিফ ? একথা কিছুতেই আমি বিশ্বাস করি না...”

“হায় খোদা, আমার যে করার আর ভাবার জন্য আরো অনেক কিছু ছিলো।”

“অন্য কিছু ? কি সেসব, মিয়া ? সেসব আসলে কি ?” ভুরু কুঁচকে সে বলল, “আর্থিক কোন বিষয় ?”

“না, আসলে সেরকম কিছু না।” এই বলে রোগা লোকটা হাসতে হাসতে বলতে লাগলো, “অন্য ধরনের ব্যাপার।”

“এখনো বিয়ে করে না থাকলে সেরকম কিছুই হবে বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। তবে আমি তোমার কথা একেবারেই বিশ্বাস করতে পারছি না ! আমি পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেছি তোমার মুখে এ ধরনের কথা শুনে !” তারপর সে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, “এবার তোমার মায়ের কথা বলো, তিনি কেমন আছেন ?”

“তুমি দীর্ঘজীবি হও, তিনি আজ অনেক দিন হয় আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন।”

“আসলেই, আমাদের ক্ষমতা বলতে আসলেই কিছু নেই, খোদাতায়লা উনার আত্মার চিরশান্তি প্রদান করুন, অথবা স্রষ্টাবিনে কারোই আসলে সেই ক্ষমতা নেই। শোন, এবার বলো এখন তুমি কোথায় কী কাজ করছো ?”

“ভাল কথা, সত্যি বলতে কি-আমি এখন বিশেষ কোন কাজ করছি না।”

“তোমার মতন কথাই তুমি বললে তাহলে ! তুমি কোন কিছুতেই আসলে সুস্থির হতে পারতে না কখনো। কিন্তু তোমার কি আসলেই ম্যাবরুকের কথা একেবারেই মনে নেই ? সেই কালো ছেলেটার কথা, ভাই ?”

“মনে হয় আমাদের সঙ্গে কালো করে একটা ছেলে ছিলো। কিন্তু আমি এখন সেকথা....”

“এবারো একেবারে তোমার মতো করেই বললে ! কিন্তু আগেও তুমি কোন কিছুতেই একেবারে স্থির হতে পারতে না। কিন্তু একথা কে বিশ্বাস করবে বলো এতদিণ ধরে আমাদের দু’জনার মধ্যে কোন রকম যোগাযোগই ছিলোনা ? বলো দেখি, হুম ? কিন্তু এখন তুমি থাকো কোন দিকটায় ?

“আমি থাকি আল-আগুউজাতে।”(কায়রোর একটা জায়গার নাম)

“খুবই ভালো কথা, আমি থাকি তোমার আল-হিমলিয়া আল-গাদিদা’এ।”(কায়রোর একটা জায়গার নাম) এই বলে সে হাসিতে ফেটে পড়ে আবারো বলতে লাগলেন, “তোমাকে দেখার পর আমার বিশ্বাসই হয়নি ! যে এই সেই ‘আরিফ, তোমাকে খুবই ব্যাস্ত দেখাচ্ছিলো ? এটা আমার বিশ্বাসই হয়নি, আমি অন্য কেউ বলে ভেবে ছিলাম। সত্যিই আমি খুবই অবাক হয়েছি।”

রোগা লোকটি মৃদু হেসে বলল, “কেন ?”

“কেন ? সারাটা জীবনই ধরেই তুমি সেরা এক ভাঁড় হয়েই রইলে, আর এখন আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন ? কেন সেটা তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো, মিয়া ? শোন, তোমার কি মনে আছে আমরা যেবার কৃত্রিম জলাধার দেখতে গেলাম সেই ঘটনা ?”

“সেই কৃত্রিম জলাধার ?”

“সেবার আমাদের সঙ্গে স্কুলের একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তাকে ফেলে এক দৌড়ে আমরা খাবার যোগাড় করে নিয়ে এলাম ?”

“ সে অনেক দিন আগের কথা, এখন কি তোমার ওসব মনে আছে ?”

“অনেক অনেক দিন আগেকার কথা, তখন আমরা পাহারে গিয়ে খেলতাম, একবার তুমি লাফদিতে গিয়ে ব্যথাপেলে। তারপর কেমন করে আমরা সেখান থেকে নিচে নেমে এলাম সে কথা কি তোমার একেবারেই মনে নেই ?

“আমি লাফ দিয়ে ছিলাম, তাও আবার পাহাড়ের ওপর থেকে ! আমি ?”

“হ্যা !”

“কিন্তু কেন ?”

“সে কথা আমি কিকরে বলবো। আমরা দু’জনে আপন মনে পাহাড়ের ওপরে খেলছিলাম, হঠাৎ তুমি কিনারে গিয়ে হাসতে হাসতে লাফিয়ে পড়লে।”

“আমি কি খুব ব্যাথা পেয়েছিলাম ?”

“অবশ্যই, প্রচণ্ড ব্যাথা পেয়েছিলে সেবার।”

“কোথায় ছিলো সেই পাহাড়টা ?”

তাদের পাশদিয়ে তখন ব্যাস্ততাহীন মন্থরগতিতে এক মহিলা হেটে যাচ্ছিলো, মোটা লোকটা সেদিকে তাকালো, আটসাট সংক্ষিপ্ত পোষাকের কারণে তার পিঠের বেশীর ভাগ অংশই দেখা যাচ্ছিলো। চোখদু’টি পিটপিট করে সে বলল, “একে নিয়ে তুমি কি ভাবছো বলো, হুম ?”

রোগা লোকট হাসলো কিন্তু জবাবে কিছুই বলল না। মোটা লোকটা আবারো তার থুতনি দিয়ে বুকের কাছে সেঁটে ধরা প্যাকেট গুলোর দিকে ইঙ্গিত করলো, এবং বলল, “বাচ্চাদের জন্যে কিছু জামাকাপড় কিনেছি।”

“তোমার কি আবার বাচ্চাকাচ্চাও আছে, তো কজন শুনি।”

“এই নিয়ে তিনজন, সামিরা, ‘আব্দু আর মুরসি, খুব শীঘ্রই অন্য আরেক জনও আসার পথে।”

“খুবই চমৎকার খবর ! চমৎকার !”

“শোন, আমি তোমাকে আমার ঠিকানা দিয়ে যাচ্ছি, একদিন বাসায় এসে বেড়িয়ে যেও। তখনই বাচ্চাদের সবাইকে দেখতে পাবে, ভাই।”

“অবশ্যই যাব, বাকিটা আল্লার ইচ্ছা।”

“দেখলে তোমাকে দেখে আরো কত কিছুই না মনে পড়ছে। তোমার কি মুরসি ইফ্ফেন্ডি নামের আমাদের সেই স্কুল শিক্ষকের কথা মনে আছে, ভাই ? কি জঘন্য ভাবেই না সে পেটাতো ! অবশ্য তুমিও ছিলে সাক্ষাত ক্ষুদে একটা শয়তান ! ঠিক আছে আজ তাহলে যাই, আহলান ওয়া সাহলান।”

রোগা লোকটা মুখ টিপে হাসলো। তার চোখের চারধারে জালের মতো ভাঁজ খেলে গেলো। মোটা লোকটা প্রায় চিৎকারের করে বলল, “শুধু হাসাহাসি, লাফালাফি, খেলাধুলা আর মারামারি ! কি শাস্তিটায় না তুমি পেয়েছিলে তার বদলে !” তারপর সে আবারো গলা চড়িয়ে বলল, তোমার সামনের বেঞ্চিতে বসা ছেলেটার পিঠে একবার দোয়াতের কালি ঢেলে দিয়ে ছিলে মনে আছে !”

“সেই ময়লার বাক্সটার কাছে দাড়িয়ে, দু’জনে এবার তাদের সর্ব শক্তিদিয়ে অসহায়ের মতন হাসলো।

মোটা লোকটার হাসির আর্তচিৎকার থেকে থেকে ওঠানামা করছিলো, একই সময় রোগা লোকটা হাসতে গিয়ে যেন তীব্র ঝাঁকুনি খেয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিলো, তাতে করে সে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছিলো আর নীচের ঠোঁকে বার বার আপনা আপনি কামড় বসে যাচ্ছিলো।

মোটা লোকটা চেঁচিয়ে উঠলো, “প্রত্যেক দিন তোমার ঠিক ডানপাশটাতেই আমি বসতাম আর তোমার কান্ডকারখানা সব দেখতাম।”

রোগা লোকটা খবরের কাগজটা আরো শক্ত করে ধরলো, এবার তার চোখ দু’টি জলে ভরে গেলো।

“আসলেই তুমি বসে বসে আমার সেই পাগলামো দেখতে ?”

“হ্যাঁ। আমি দেখেছিলাম, তুমিই ওর পিঠে কালি ঢেলে পালিয়ে ছিলে। সে ব্যপারে আমিই নালিশ করেছিলাম।”

এই বার সে মোটা লোকটার ঘাড়ে সজোড়ে চাপড় মারলো, “সত্যি, তুমিই কি এই কাজটা করে ছিলে ?”

“হ্যাঁ। আমিই তোমার ব্যাপারে নালিশ জানিয়ে ছিলাম। তখন আমরা খুবই ছোট ছলাম।”

“সব শুনে হেড স্যার কী করলো ?”

“যা পিটিয়ে ছিলো তোমাকে।”

“তিনি কি আসলেই আমাকে পিটিয়ে ছিলেন ?”

“অত কিছু আজ আর মনে নেই আমার।” রাস্তার ওপর জুতোর তলা দিয়ে একটা পা ঠুকতে ঠুকতে সে বলল, “মনে হয় কিছু একটা আঁচ করতে পেরে তার আগেই তুমি দৌড়ে পালিয়ে ছিলে।”

পথচারীরা তাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় তাকিয়ে তাকিয়ে এই দু’জনকে এক নজর ভালো করে দেখছিলো। রোগা লোকটা হাতেথাকা খবরের কাগজটা ময়লার বাক্সে ছুড়ে ফেলেদিলো, “ আমি কী আসলেই স্যারের নাগাল থেকে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিলাম ?”

“হ্যাঁ। তুমি লাফিয়ে পড়েছিলে। আমাদের ক্লাশটা ছিলো ওপর তলায়।”

“না, না, তখন আমাদের ক্লাস ছিলো নিচতলাতে, লাফিয়ে ভাগার কোন প্রশ্নই ওঠে না।”

এবার সে তার হাতটা মোটা লোকটার কাঁধে রাখলো। “সেই পিচ্চিটা আমার সঙ্গে কী করেছিলো ?”

“কোন পিচ্চিটার কথা বলছো ?”

“আরে যে পিচ্চিটার সারাটা পিঠে আমি কালি ঢেলেছিলাম ?”

“কান্না ছাড়া তার আর কি কোন গতি ছিলো। হ্যাঁ ! হ্যাঁ ! কাঁদতে কাঁদতে ওর চেহারা একদম নীল হয়ে গিয়েছিলো।”

আকষ্মিক প্রচন্ড গা ঝাড়া দিয়ে, লোকটা মাথা ঝাকিয়ে বলে বসলো, “ও কি কেঁদেছিলো ?”

“হুম। কাঁদতে কাঁদতেই তো মায়ের কাছে সব বলে দিলো।”

“কোথায় থাকে, ও এখন।”

“জানিনা। মনে হয় এত দিনে মরে ভুত হয়ে গেছে।”

রোগা লোকটা এবার দুর্বল স্বরে বলল, “আমাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হলো, জানো।” সে পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলো।

সে সময় মোটা লোকটা বুকের সঙ্গে ঠেস দেওয়া প্যাকেট গুলো ঠিক করতে করতে বলল, “তুমি ছিলে সাক্ষাত একটা শয়তান। হাসতে খেলতে আর ....করতে গিয়ে কি শাস্তটিায় না তুমি পেয়েছিলে তার বদলে !” যানবাহনের শব্দ যেনো বাতাসকে ভেঙ্গে খান খান করে দিচ্ছিলো। নাদুস নুদুস লোকটা এবারো চেঁচিয়ে বলে উঠলো, “ দেখেলে ! এরা ট্রাফিক লাইট আটকে বসে আছে।”

বোকার মত শেষ কথাটা বলে, হাঠাপথ থেকে নেমে গিয়ে, লাফিয়ে একটা বাসে উঠে পড়লো সে। এরই মধ্যে সেটা আবার চলতে শুরু করে দিয়েছে। হালকা পাতলা লোকটা ঘুরে সেদিকে তাকালো। সে দেখতে পেলো এক জোড়া সাহায্যের হাত এগিয়ে এসে সেই স্থূল লোকটাকে ভীড় ঠেলে গাড়িতে উঠতে সাহয্য করছে। সেই হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, সে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো, “ ঠিকানা ! তুমি আমাকে কোন ঠিকানা দাওনি।”

এই কথাটা বলার পরপরই গাড়িটা সজোরে চলতে শুরু করলো। এই দৃশ্যের দিকে চেয়ে সে ঠায় দাড়িয়েই রইলো, আর তার মুখে আগের বারের চাইতেও আরো বেশী পরিমানে ভাজ দেখা দিলো। তার লম্বা আঙ্গুল গুলো দিয়ে সে থুতনিটা ছুয়ে দেখছিলো। কোন এক পথচারির আলতো স্পর্শে তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। আর পাশদিয়ে যাবার সময় সে কেবল গভীর করে ভাঁজ আঁকা স্বচ্ছ জ্বলজ্বলে সেই চোখ দু’টির দিকে এক নজর তাকায়। তারপর ফিনফিনে শরীর নিয়ে লোকটা মাথা ঝাঁকিয়ে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে কয়েক পা পিছিয়ে আসে। ময়লার ঝুড়িটায় খানিক ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়, তারপর সেই বাসটা সড়কের যে দিকটায় দূর দিগন্তে মিলিয়ে গিয়েছিল, সেই দিকে এক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ১:১৩
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৪০




সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×