এটা গ্রামের কাছে
কুয়াশায় ঢেকে ছিল নদী
একটা গ্রামের কাছে
ফসলের মাঠ নিরবধি
একটা গ্রামের পথে
শুকনো পাতায় ঢেকে ছিল কিছু উঠোন বসত বাড়ীর
একটা গ্রামের পথে
শুনশান নীরবতা ছিল
কয়েকটা গ্রাম পেরিয়ে
আরেকটা গ্রামের শুরু হলো যেখানে

একটা গ্রামের পর
একেকটা গ্রাম- মেঠো পথ
গাছগাছালি ঢাকা বুনো পথ
পাখপাখালির কুহুতান
কিষাণির পথ চেয়ে থাকা
পাতা ঢাকা উঠোনের পর শুনশান নীরবতা
কলপাড়ে পড়ে আছে শূন্য কলস
ফাঁকা মাঠের ওপরে তাজা ঘাস জুড়ে
কৃষকের স্বপ্নেরা ভাসে
ফসলের ঢেউয়ের ওপাশে
আকাশের নীল গিয়ে মেশে
অদ্ভুত কুয়াশার চাদর ঢেকেছে সেই সীমানার চারিপাশ
একাটা গ্রামের পথে
সেইসব মানুষেরা সারা দিন হাঁটে

একটা গ্রামের পথে
আরো কিছু পথ এসে মেশে
একটা গ্রামের পথে
আরো অনেকটা দূরে-বহু দূরে
আরো কিছু গ্রাম দেখা গেছে
আরো দূরে আকাশেরা সেখানে দিগন্তে মিশেছে
প্রান্তরের বুনো অন্ধকার আর কুয়াশার চাদরে ঢেকেছে
তার সেই চেনা আঁচলের পাড়
একটা গ্রামের কাছে এসে
মনে কত প্রশ্ন জেগেছে
এই বেলা ভর দুপুরে

গ্রামের কত শত মানুষেরা- এখন কোথায় তারা ?
কোন খানে- কিসের আবডালে-তারা লুকিয়েছে সব ?
তাদের কারো কারো দেখা পেলে আরো কত
প্রশ্ন যে, হতো বলা কত কথা
জানা যেতো আরো কত কিছু !
কিন্তু সেই অচেনা লোকেদের সাথে
হয়নি তো দেখা- তাই বলাও হয়নি সেই সব কথা
কেবল বলেছে কথা সেই গাইড রিকশাওয়ালা
আমরা শুনেছি নিশ্চুপ থেকে
আর কেউই ছিল না তো কাছাকাছি-পাশে
পথের শেষে--খালবিল-ফসলের প্রান্তর আর দূরে নদী
আরো কিছু আলপথ-ডোবা-নালা এদিক সেদিকে
কোন কোন কৃষকেরা ফসল তুলছে, ভ্যান ভরে আছে সেই সবজির ভারে
আমরা শুনেছি সেখানে, কৃষকেরা ফিসফিস করে বলে
“এই ঘোর গ্রাম পথে-গ্রাম দেখতে
আবার নাকি কোন মানুষেরা আসে দেখতে আমাদের।”
একটা গ্রাম দেখে ফিরে আসার পথে
শুকনো পাতায় ঢাকা সেইসব উঠোনেরা কেবলই ডেকেছে কাছে.........
কোথায় ! কোথায় তারা সব ? যারা এতদিন ধরে এইসব বসত বাড়িতে থেকেছে ?

এই পুরাতন জীর্ণ ঘরদোর ফেলে তারা কি--শহরে বা বিদেশ গিয়েছে ?
আজ তাই তাদের সেই পরিচিত টিনের চালে প্রতিদিন একটু একটু করে জং ধরছে
ঝরা পাতার পরতে পরতে সেইখানে অনেক হাহাকার আজো জমে আছে
আবার কি তারা সব একে একে কোন দিন এইখানে ফিরে আসবে
এতদিন যারা এই গ্রাম ছেড়েছে .....
একটা গ্রাম দেখে ফিরে আসছি
কিন্তু কেবলই মনে হচ্ছিল ফেরা যাচ্ছেনা
কেননা গ্রামটা যেনও ক্রমশই আমাদের খুবকরে জড়িয়ে ধরেছে
তার সেই পুরাতন উঠনের শুকনো পাতায় ঢাকা মায়া
আমাদের আরো বেশী বিবশ করেছে
ভেবেছিলাম পেছনে ফেলে এসেছি শহরেরে মেকী কৃত্রিমতা
কিন্তু এই এখানেও দেখা গেলো সব কিছু গ্রাম্য দোকানে এসে একে একে প্যাকেটে ঢুকেছে
(কোন কিছুতেই যেনও নেই সেই পুরাতন স্বাদ, যাই কিনি যাই খাই শহুরে গন্ধ-লাগছে বিস্বাদ)
ওরকম আরো কিছু প্যাকেট মোড়কে আমাদের চেতনাকে বন্দী করেছে গ্রামের সেই চায়ের দোকান
দোকানি বলেছে কিছু দীর্ঘশ্বাস ফেলে--তারপর আর একটি বারও পেছনে না ফিরে
নড়বড়ে রিক্সার হুডে ভর দিয়ে আমরা সেই অচেনা গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছি...

একটা গ্রাম দেখে ফিরে আসছি
এমন সময় আসে ফোন--
বিদেশি গেস্ট আসছে, আমাদের ওখানের স্কুল দেখবে বলে...
গ্রামটা তখনও হাতছানি দেয়--যেনও আমাকে বলতে চাইছে--
যারা চলে গেছে তারা আবার কবে ফিরবে; আবারও কবে ফিরে আসবে
এখানে যে কেবলই পাতা ঝরছে, পাতারা প্রতিদিন ঝরে পড়ছে
ঝরা সেই পাতাতে পাতাতে দিন দিন উঠোন ঢাকছে, ঢাকছে টিনের চাল
পড়ে আছে খর বিচালি; একা তাল গাছ--তারা থেকে থেকে
প্রতিদিন আরো বেশী একলা হয়েছে...

নিকনো উঠোন সেই কবে থেকে ঢেকে আছে; প্রতিদিন আরো ঢাকছে
কেবলই শুকনো পাতায়, তাদের ভঙ্গুরতায় প্রতিদিন ঢেকে যাচ্ছে
ঢেকে থাকা পাতারা পঁচে যাচ্ছে
সেই উঠোন গুলোতে চলাচলের চিহ্ন নেই কোন, নেই কোন পায়ের ছাপও
কোন পথে এইখানে মানুষ আসছে গেছে--ঘরদোর, কলপাড় এমনি পড়ে আছে
টিনের চাল গুলোতে দিন দিন আরো বেশী জং বাড়ছে
নতুন করে প্রতিদিন শিশিরে ভিজছে আরো বেশী জং পড়ছে
আঙ্গিনার আবডাল কলাপাতার বেড়া গুলো ভেঙ্গে পড়ছে
আর ভেঙ্গে পড়ছে
মাথা হীন একটা তাল গাছে, কে জানে কবে থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এই পথের পাশে, জানিনা কার অপেক্ষায় !

কবে কোন ঝড় এসে মেঘের আবেশে বিদ্যুৎ মেখে তার এই দশা হয়েছে...
একটা গ্রাম দেখে ফিরে আসছি--বুক ভরা ব্যথা নিয়ে
শূন্যতা............. কেবলই শূন্যতা..........আরো দূরে দিগন্ত রেখা
তারও পরে আরো অনেক শূন্যতা
কত কিছু যে আরো হয়ে ওঠেনি দেখা
একটা গ্রাম দেখে পরিচিত শহরেই আবার ফিরে এসেছি
আমাদের পুরাতন আবাসে
মুক্ত আকাশ ফেলে প্রিয় এই পাখির খাঁচাতে
কত বেশী ঘরকুনো আমি
তাই সেই সবুজের গ্রাম ফেলে শহরের ঘরটাকেই আরো বেশী
ভালবেসেছি

আমি, আমার ভাগ্নে বনি আর রাফি ১১/০১/১২ তারিখে গোপালগঞ্জ শহর থেকে কিছু দূরে অচেনা একটা গ্রাম ঘুরে আসার পর, গ্রাম দেখার সেই সব স্মৃতি নিয়ে ১০/০২/১২ তারিখে লেখা কবিতা।
আরো ছবি দেখতে এই খানে ক্লিক করুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


