
আবু আল-মা‘আতি আল-নাজা (জন্ম ১৯৩৮)
মিশরীয় উপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার আবু আল-মা‘আতি আল-নাজা সার্বজনীন বিশ্ব মানবিক পরিস্থিতির বিস্তৃত অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন একজন লেখক। তার লেখনীর মাঝে মিশরের দ্বিতীয় প্রজন্মের ছোটগল্প লেখকদের মতই পরীক্ষামূলক কাজের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। তার বেশ কয়েকটা ছোটগল্প সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর মাঝে : এন আনইউজুয়াল মিশন (১৯৮০) এবং দ্যা লিডার (১৯৮১) এর নাম উল্লেখ করার মত। কাজের সুবাদে তিনি বেশ কয়েক বছর উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করেন। দ্যা মর্নিং (১৯৯৯) তার সর্ব শেষ সংগ্রহ। তাছাড়া ইতিমধ্যে মিশরের সাধারণ পুস্তক প্রকাশনা কাউন্সিল তার লেখার বেশীর ভাগই কয়েক খণ্ডে প্রকাশ করেছে : এর মধ্যে প্রথমটি, এ গার্ল ইন দ্যা সিটি ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়, এতে তার মোট তিনটি ছোটগল্প সংগ্রহ, এ গার্ল ইন দ্যা সিটি (১৯৯২); এন ইনস্ক্রুটেবল স্মাইল (১৯৬২); এবং পিপল এন্ড দ্যা লাভ (১৯৬৬) ঠাই পায়। দ্বিতীয় খণ্ড; ইলুসন এন্ড রিয়েলিটি (১৯৯৩) তে ইলুসন এন্ড রিয়েলিটি (১৯৭৪) এন আন ইউজুয়াল মিশন (১৯৮০) এবং এভরিওয়ান উইনস দ্যা প্রাইজ (১৯৮৪) এই তিনটি ছোটগল্প সংগ্রহ ঠাই পায়। রিটার্ন টু এক্সাইল নামের তৃতীয় খণ্ডটিতে দু’টি উপন্যাস, রিটার্ন টু এক্সাইল (১৯৬৯) এবং এগেনেস্ট দ্যা আননোন (১৯৭৪) ঠাই পায়। আল-নাজা আরবিয় গল্পের সমালোচনাও লিখেছেন, সেগুলো, মেনি ওয়েইজ টু সিঙ্গেল সিটি (১৯৯৭) নামের তার একটি বইতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
মানুষ এবং ভালোবাসা
প্রতিদিন পাবলিক বাসে চড়ে কাজে যেতে হয়, আপনি যদি এমন কেউ হন তাহলে খুব সহজেই ধরে নেয়া যায়, চেনা নেই জানা নেই এধরনের অপরিচিত লোকের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা কমবেশি সময় নিয়ে আপনাকেও এক সঙ্গে কাটাতে হয়, এক্ষেত্রে সঙ্গী বেছে নেবার ব্যাপারে হয়তো নূন্যতম স্বাধীনতাও আপনার নেই। এই ধরনের সম্পর্কের কোন নাম দেওয়া, অথবা তার সত্যি কারের বৈশিষ্ট্য বুঝে ওঠা খুবই কঠিন। প্রতিবারই আলাদা মুখ, জায়গা অথবা আপনি যে স্ট্যান্ড এর সামনে দাড়িয়ে আছেন তার অবস্থান অনুসারে তাদের পার্থক্যের ধরন নির্ভর করে। আপনি যতই স্বাভাবিক আচরণ করেন না কেন তাদের কারো কারো ব্যবহারে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ দেখতে পাবেন, এবং মাঝে মধ্যে তাদের কারো উপস্থিতির কথা আপনি একেবারেই ভুলে থাকতে পারেন।
কিন্তু ক’দিন বা কয়েক সপ্তাহ পরে, কিছু একটা ঘটতেও পারে। দিনের পর দিন সেই একই চেনা মুখ দেখতে দেখতে এক সময় আপনার কাছে তাদের কারো কারো উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। এদের কেউ কেউ হয়তো খানিক আগে পরে আসতে পারে কিন্তু কালে ভদ্রে তাদের মুখোমুখি হওয়া একেবারেই এড়ানো সম্ভব নয়। এক সময় বুঝতে পারবেন তাদের সবাইকে বিশেষ করে তাদের পোষাক-পরিচ্ছদ দেখতে দেখতে আপনার চোখ সয়ে গেছে, এবং আগের মত কিছুই আপনাকে আর তেমন একটা অবাক করছে না। ক্ষণিকের সেই পাশাপাশি থাকার অনুভূতি, কখনো কখনো তাদের অনুপস্থিতি সেই অনুভূতির সঙ্গে জুড়ে গেছে। তখন আপনি বুঝতে পারবেন তাদের সাথে আপনার সম্পর্ক একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে কিন্তু আপনি সেটার অস্তিত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারবেন না আবার একই সঙ্গে মেনেও নিতে পারবেন না। এই পর্যায়ে এসে সম্পর্কটা স্থির হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশী। অথবা, আমার ক্ষেত্রে যেমনটা ঘটেছে, সেরকম ভাবে সেটা নতুন কোন অভিনব মাত্রা পেতে পারে। তবে কোন কারণে আমি সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, এমন কি এখন এই চূড়ান্ত মুহূর্তে নয় নম্বর বাসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেই নতুন দিকেই মোড় নিতে যাচ্ছে।
বাসে ওঠার পরপরই, প্রতিদিনকার সেই পরিচিত কয়েকটা মুখ দেখতে পেলাম-কুশল জিজ্ঞেস করে, সময় জানতে চাইলাম, বা বাসের ব্যাপারে অভিযোগের সুরে তাদের কাছে কিছু একটা বললাম। সময় গড়িয়ে যাবার সাথে সাথে ক্রমে পরিচিত সেই মুখ গুলো পেছনের ঘন কুয়াশার মাঝে হারিয়ে যেতে লাগলো, কেবল দু’জন ছাড়া, যাদের এক জনকে শুধু আমি আগে কোথাও দেখে ছিলাম। দু’জন নারী পুরুষের মুখ যাদের নাম আমার জানা নেই এবং পরে কখনো তাদের নাম গুলো জানা হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
তাদের দু’জনেই ছাত্র। প্রতিদিন স্টেশন স্কয়ার থেকে বাসে চড়ে ওরা বিশ্ববিদ্যালয় স্টপেজে নেমে যায়। কোন কোন দিন মেয়েটা আগে আসে, কোন কোন দিন ছেলেটা, এবং ধীরে ধীরে আকাঙ্ক্ষিত মুখ গুলোর সংখ্যা ক্রমেই কমতে কমতে চিন্তিত কিছু চাহনির মাঝে এসে ঠেকে। তারপর হঠাৎ-এবং প্রতিদিনই ঘটনাটা এই প্রথম বার ঘটছে বলে মনে হতে থাকে-উদ্বেগ ভরা সেই দৃষ্টি দীপ্তিমান চাহনিতে রূপান্তরিত হয়। কোমল আর সাবলীল ভঙ্গিতে তারা একে অন্যের সাথে করমর্দন করে, এবং পরস্পর এমনই নিচু স্বরে ফিসফিস করে কথা বলে, যা দেখে আপনার সন্দেহ হতে পারে সেকথা তারা নিজেরাই ঠিক মত শুনতে পারছে কিনা। বিশাল সেই স্কয়ারে জীবনের আর সব চিহ্নের মাঝে সেই মেয়েটির উজ্জ্বল চোখের চাহনি দেখার পর শব্দের ক্ষমতা নিয়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগে। এমন কি ওর দিকে তাকাবার পর দিনের সব কর্ম ব্যস্ততাও বাষ্পের মত উবে যায়। সুখী সেই চোখ দু’টোই যেন সব কিছুর মূল আকর্ষণ।
তবে কখনো কখনো কোলাহলময় স্কয়ারটা কিছুক্ষণের জন্য হলেও মেয়েটার চাহনি টুকুন চুরি করতে সক্ষম হয় এবং সে ডানে বামে মুখ ঘুরায় বা তার রেশমি চুলে আঙ্গুল বুলায়, যদিও আশপাশে বাতাসের লেশ বলতে নেই। কখনো কখনো সে একপায়ে ভর দিয়ে দাড়িয়ে থাকে, অন্য পাটা আলতো করে মাটি ছুঁয়ে থাকে সেসময়। কিন্তু আমি খেয়াল করে দেখেছি, তার পাশে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটার প্রতি ওর মনোযোগ কখনই ম্লান হয় না; সোনালি রিমের চশমার আড়ালে, ছোট ছোট কর্কশ চুলের ছেলেটির চোখও মেয়েটিকে কখনই আড়াল হতে দেয় না, সেও অবিরাম তার দিকেই তাকিয়ে থাকে, এবং তার দৃঢ় গোলাকার মুখটাই যেন পুরো স্কয়ার জুড়ে মেয়েটার সব কিছু, এমন কি সারা বিশ্বের তুলনায়ও চূড়ান্ত কিছু।
যখন বাস এসে থামে আর লোকজন তাতে ওঠার জন্য বুনো উন্মত্ততায় মেতে ওঠে, তখন তাদের দেখে বোঝা যায় ক্ষণিকের জন্য তারা পরস্পরের প্রতি মনোযোগ হারিয়েছে। যাই হোক সেই দৃশ্য দেখে আমারও তেমন একটা ভাল লাগে না-নির্বোধ সেই হুলস্থূলের মধ্যে পড়ে তরুণ তরুণী তাদের সেই চেনা ছবির অদৃশ্য ফ্রেম খানা হারিয়ে ফেলে, তারপর একজন পর্যবেক্ষক সবার অলক্ষ্যে তাদের সেই দাড়িয়ে থাকার জায়গাটা আবিষ্কার করে। তার খানিক বাদেই তাদের হাত পা ছোড়াছুড়ি রত ডজন খানেক লোকের সেই গতানুগতিক ভীরের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়। তার পরপরই হয়তো তারা দু’টো সিটের ব্যবস্থা করে ফেলে নতুবা বাসের মাঝ বরাবর চলাচলের পথে একে ওপরের পাশে দাড়িয়ে থাকে, এরপর আবারো তারা আগেকার সেই রহস্য ঘেরা নিজেদের ফ্রেমটা খুঁজে পায়, একে ওপরের স্পর্শের নাগালে চলে আসায় বাসের ভেতরে যেন সেটা আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমি দেখতে পাই তাদের চারপাশের অন্যান্য যাত্রীরা, সম্ভবত মনের অজান্তেই, ওদের জন্য চারদিকে ঘুরিয়ে খানিকটা জায়গা ছেড়ে রাখে, স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের নড়াচড়ার সুযোগ করে দেয় এবং অন্যদিক দিয়ে সেটা তাদের চারদিক থেকে আসা লোকজনের ধাক্কা থেকে রক্ষা করে। তারপর কোন এক সময় ট্রাফিক বাতি জ্বলে ওঠার পর বাসটা ঝাঁকি দিয়ে থামে আর আঁটসাঁটও হয়ে থাকা যাত্রীরা দেহের প্রতিটা বাঁকে কাঁপন অনুভব করে। তরুণ তরুণীকে ঘিরে থাকা বৃত্তটা সংকীর্ণতর হয়ে আসে, আর তাদের ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ বাসের আর্ত চিৎকারের মাঝে হারিয়ে যায়। বার বার আমার দৃষ্টি থেকে তাদের হারিয়ে ফেলি, কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই আবারও এক গোছা চুল নজরে আসে বা দেখতে পাই ওদের কোন একজনের একটা হাত বাসের ছাদে চেপে রয়েছে, অথবা ছেলেটার মাথা ঝুঁকে এলে সোনালি রিমের পাশটা চোখে পড়ে, আর লোক জনের এত ভীরের মধ্যে আমি ওদের দু’জনার উপস্থিতি সম্বন্ধে বিশেষভাবে সজাগ থাকি। এমন কি যখন ওরা দু’জনে বাস থেকে নেমে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের ওপারে অদৃশ্য হয়েযায়, তখনও ওরা দু’জনে আমার মনের ভেতরে কিছু ক্ষণের জন্য রয়ে যায়।
ওদের দু’জনের খাতিরেই নয় নম্বর বাসটার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নতুন একটা মাত্রা পেয়েছে। এখন দিনের এই সময়ে এসে সেটা আশার উজ্জ্বল আলো বিকিরণ আর স্মৃতি রোমন্থন ঘটাতে শুরু করে দেয়। দু’জন তরুণ তরুণীর সেই ছবি গুলো এমন কি দিনের বাদবাকি সময়েও আমার মাথায় ঘোরাফেরা কারে, কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের সেই ছায়া মূর্তি সব সময় আমার ভাবনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
অনেক দিন ধরে ভাবছি কেবল আমি একাই সেই প্রেম কাহিনীর একমাত্র মুগ্ধ অনুসারী ও দ্রষ্টা, যার কিছু দৃশ্য চিত্রায়নের জন্য নয় নম্বর বাসটাকে বেছে নেয়া হয়েছে। পরে, একদিন দিন সকালে বাসে ওঠার পর দেখি, লোক চলাচলের পথটার মাঝামাঝি একটা সিট খালি রয়েছে, সেদিনই প্রথম বুঝতে পারলাম থিয়েটারে আমার চারপাশে ভীর করে থাকা অন্য যাত্রীরাও সমান মনোযোগ দিয়ে রোমান্টিক সেই দৃশ্যের চিত্রায়ন দেখছে। যদিও সেই তরুণ তরুণীর কেউই একে অপরকে রেখে তখনো খালি সিটটার দিকে এগোয়নি, কতগুলো অস্থির হাত সিটটা দেখিয়ে বলছিল অন্তত মেয়েটার সেখানে বসেপড়া উচিত। সে কিছু সময়ের জন্য উসখুস করল, হতে পারে তখনো সে তার বন্ধুর পাশেই দাড়িয়ে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু ইশারায় তার সেই বন্ধু আপনা থেকেই তাকে সেখানটায় গিয়ে বসতে বলল। বাসে দাড়িয়ে থাকা যুবতী মেয়েদের বসার জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া একটা সাধারণ ভদ্রতা হিসেবে ধরা হয়, কিন্তু মেয়েটি বসার পরই তার পাশে বসে থাকা ছেলেটি উঠে দাড়িয়ে তার সেই বন্ধুকেও ইঙ্গিতে তার বান্ধবীর পাশেই বসতে বলল। কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে সে বসতে রাজি হয়। সম্ভবত সে ভেবেছে যুবা বয়সের লোকটা এর পরের স্টপেজেই নেমে যাবে এবং লোকটি আসলে সেখানে নামেনি এটা বুঝতে পারার পর সে অবাক হলো। ঠিক সেই সময় আমি কাছের মুখ গুলোর দিকে নজর বুললাম, তরুণ, যুবা বৃদ্ধ, সবাই সেই একজোড়া কপোত কপোতীর দিকে চোরা চাহনিতে তাকিয়ে রয়েছে। আমি খুব বুঝতে পারছিলাম সেই বন্ধু যুগলের উপস্থিতি তখন তাদের সিট ছাড়িয়ে বিনা তারে আজব এক মোহে সবাইকে বেধে ফেলেছে। তাদের নড়াচড়া, এদিক সেদিক তাকানো, অনর্গল ঠোঁট নেড়ে কথা বলা, অথবা চোখের পলক ফেলা এর সব কিছুর সঙ্গে বাসের আর সব যাত্রীরা নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে।
সেদিনের সেই সকালের পর থেকেই আমি ওদের নিয়ে অন্য সব যাত্রীদের আগ্রহের ব্যাপারে সতর্ক হলাম, আর তাদের সেই আগ্রহের দৃশ্যটাও কিন্তু তারচেয়ে মোটেই কম চমকপ্রদ নয়। সত্যি বলতে কি এটাও সেই নাটকেরই একটা অংশ হয়ে গেলো, যতক্ষণ পর্যন্ত সময়টা পেরিয়ে না যায়, ততক্ষণ দর্শকেরাও আকর্ষণীয় অংশ হয়ে ওঠে। যাত্রীদের কেউ একবার সেই যুগলের কাছাকাছি কোথাও বসার সুযোগ পেলে সেটা তারা সহজে ছাড়ার নামটি পর্যন্ত নেয় না, যাদের যাত্রা শেষ হয়েছে তারা আর একটি বারের জন্য দেখে নিতে চায়, যদিও সামান্য দূরে সরে আসার পর তাদের যে কেউ স্বাধীনভাবে মন্তব্য করার সুযোগ পায়। এবং ঠিক থিয়েটারের মতই পর্দা নামার পর দর্শকরা চলে যেতে থাকে, আর অপরিচিতেরা সেই নাটক সম্পর্কে মন্তব্য ছুড়ে দেয়, ঠিক তেমনি করে বাসের যাত্রীরাও তাদের মধ্যে কারো কারো কথা শুনতে পায়। এবং একক দৃশ্যের এই প্রেম কাহিনী, প্রতিবার কিছুটা বদলালেও কখনই একঘেয়ে বলে মনে হয় না, সব সময় সেটাই সবার আলাপ আলোচনার মূল বিষয়ে পরিণত হয়। নানান মত পথের লোকেদের মধ্যে সেতু বন্ধ তৈরি করতে এটা যাদুর মত কাজে দেয় এবং এমন একটা বাসের যাত্রীদের মাঝে কঠিন একতার জন্ম দেয়, বড় ধরনের কোন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবার পরেই কেবল তা অর্জন করা সম্ভব।
একেবারে বেখাপ্পা ভাবে, ছেলে আর মেয়েটাকে আমাদের সবার প্রতি বিস্মৃত বলেই মনে হয়, যারা কিনা আমাদের প্রত্যেকের মনের ভেতরে একেবারে গেঁথে গেছে। মনে হয় কল্পিত সেই ফ্রেমটা তাদেরকে আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। মাঝে মাঝে এমনও ঘটতে দেখা গেছে যুবকটা জানালা খোলার জন্য হাত বাড়িয়েছে এবং তার পরপরই আবার সেটা ঠেলেদিতে ভুলে গেছে বা সেই হাতটা সোজা চলে গেছে সঙ্গীর কাঁধে। অথবা মেয়েটার কানে কানে চুপিচুপি কিছু একটা বলার জন্য তার আরো কাছাকাছি হয় সে এবং তারপর একটানা সেই ফিসফিসানি চলতেই থাকে। তারা যখন বাসের মাঝ খানটায় যাতায়াতের পথে ওপর দাড়িয়ে থাকে এবং সেই সময় বাসটা ঝাঁকুনি খাবার পর ছেলেটা তার হাত দিয়ে মেয়েটার কাঁধ ঘিরে ধরে, যাতে সে পড়ে না যায় এবং মেয়টিও তার এতটাই কাছাকাছি হয়, যেন ছেলেটার মতই সেও ভুলে বসে থাকে যে বাসটা আবারও সম গতিতে ঠিকঠাক চলতে শুরু করেছে।
সম্ভবত এতসব কারণে- অথবা অন্য আর কোন কারণ ছাড়াই, এপর্যন্ত একসঙ্গে তাদের বাস ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে এতসব ঘটনা ঘটেছে-যথেষ্ট আকর্ষণ নিয়ে অনুসরণ করার এক পর্যায়ে সেই প্রেম কাহিনীর বিরুদ্ধে একবার বাসটা প্রথম বারের মত প্রতিবাদ জানায়। ব্যাপারটা আসলেই খুব অবাক করা কিছু, যে বাসটা কানাকানির বেশী কখনই তার মোহের প্রকাশ ঘটায়নি, সেটাই আবার তার বিরোধীদের প্রতি চিৎকার করে ঘোষণা দিতে পিছপা হয়নি।
ঠিক যেমনটা মাঝে মধ্যেই থিয়েটারে ঘটতে দেখা যায়, সেখানকার মতই চিৎকারটা প্রথমে আসে পেছনের সারি থেকে, ঠিক কোথা থেকে সেটা বলতে গেলে প্রায় কেউই বুঝে উঠতে পারেনি, এবং কে যেন শুধু বলে উঠলো, “ওরা অনেক দূর এগিয়েছে !”
“ওরা এখন কোথায় আছে সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছে ?”
“দেখলেন ভাইয়েরা, লোক জনের রুচি বোধের দিকে কোন নজর নেটই ওদের।”
অবশ্যই সেই বক্তব্য পুরো বাসের প্রতিনিধিত্ব করেনা। কিছু চেহারাতে সেই চিৎকার কারীর প্রতি নীরব বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছিলো। প্রতিবাদের ভাষা জোরালো হবার সঙ্গে সঙ্গে, সেটা আরো শক্তভাবে সামনের সারির দিকে সংক্রমিত হলো, এবং এবার আমি সেই অদৃশ্য ফ্রেমে ঝুঁকে থাকা দু’জনার কথা ভাবতে লাগলাম, সমবেদী সেই মুখ গুলোর করার আর কিছুই রইলো না। চিৎকার শুনতে পাবার পরও ওরা বিরক্তি গোপন করার চেষ্টা করছে।
বাসের সবাই তখনো শুধুই দু’জন তরুণ তরুণীর প্রতি তাদের স্বতন্ত্র আগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। এরপর থেকে আমাদের সবার আগ্রহ আবার নতুন ধরন পেল, যখন সবাই দেখলও একদিন, দু’দিন, তারপর তিনদিন গড়িয়ে যাবার পরও তারা আর এলোনা। তিনদিন পর থেকে আমরা বুঝতে পারলাম এই পরিবর্তন মোটেই স্বাভাবিক নয়: এরপর থেকে আমরা সবাই ওদের জন্য শূন্যতা বোধ করতে লাগলাম।
এই প্রথম বারের মত বাসের ভেতরের বিভিন্ন অংশে তাদের সমর্থক আর বিরোধীদের মধ্যে সংলাপ শুরু হলো। এধরনের মেকি ঘনিষ্ঠতার বিরোধিতা করেন পাশের এমন এক জনকে আমি বললাম, “দেখেছেন ? গত তিন দিন ধরে এরা আর এই বাসে করে যাচ্ছেনা।”
“আমিও এমনটাই আশা করে ছিলাম। ওদের দু’জনার আন্তরিক কোন সম্পর্ক নেই।”
“আপনি সেটা কেমন করে নিশ্চিত হলেন ?”
“ওদের কারো হাতেই তো আংটি ছিলনা।”
“এখনো ওরা ছাত্র।”
“হতে পারে ছেলেটা মেয়েটাকে বোকা বানাচ্ছে।”
“আমার সেরকম কিছু মনে হয়নি। ছেলেটাকে যথেষ্ট আন্তরিক বলে মনে হয়েছে, এবং.....”
“এখন আপনিও মেয়েটার মত করেই ভাবতে শুরু করেছেন।” লোকটা হেসে উঠলো, “আপনিও কি ছেলেটার প্রেমে পড়ে গেলেন নাকি ভাই ?”
“সারাটা বাসই ওদের দু’জনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।”
“ওরা যদি একে ওপরের বাগদত্তা হতো তাহলে আর এনিয়ে কেউ আর বিরক্তি প্রকাশ করার সুযোগ পেত না।”
“ওরা একে ওপরকে ভালোবাসে এটুকুই কি যথেষ্ট নয় ?”
“ওদের কাছে সেটা যথেষ্ট হলেও এই বাসের জন্য নয়।”
“বাসের সবাই কে কেন এভাবে ওদের ব্যাপারে নাক গলাবে হবে ?”
“ওরাই প্রথম অনাহূতের মতন বাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে নিজেদের নাকটা গলিয়ে দিয়েছে।”
এই কথা শোনার পর আমরা দু’জনেই এক সঙ্গে হেসে উঠলাম।
দেখতে দেখতে আরো অনেক গুলো দিন চলে গেলো, তবু ওরা আর ফিরলো না। সমস্ত বাস জুড়ে কিছু একটা হারাবার হতাশা ছেয়ে থাকে। উৎসুক লোকেদের চোখে বিষাদের ছাপ। সমর্থক আর বিরোধীদের মাঝের দেওয়ালটা কি যেন এক অপরাধ বোধের কারণে ভেঙ্গে পড়লো। আমাদের ভেতর আলাপচারিতা চলতেই লাগলো, যেন এই এক জনের মুখ থেকেই আর সবার মনের কথা প্রকাশ পাচ্ছে: “আপনার কি মনে হয় আবারো ওরা ফিরে আসবে ?”
“সেটা আমার জানা নেই, তবে ফিরতেও পারে।”
“খুব চমৎকার ওরা দু’জন।”
“আপনি বুঝতে পারছেন, এই বাসে আমার আর চড়তে মন চাইছে না।”
“আমিও অন্য বাসে ওঠার কথা ভাবছি।”
“তাহলে কেন এটাতে উঠতে গেলেন ?”
“ওরা আবার ফিরেও আসতে পারে।”
“আসলে দু’জন প্রেমিক প্রেমিকার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই হয়না।”
“লোকে কেন যে সুন্দর জিনিস ধ্বংস করে দেবার ব্যাপারে এত সিদ্ধ হস্ত হয় ?”
“এই সেই বাস যেখানে.....”
“মনে হয় ওরা চির জীবনের জন্য আলাদা হয়ে যায়নি। হতে পারে মামুলি একটা ঝগড়া হয়েছে শুধু।”
“সবই সম্ভব, কিন্তু এতে এই বাসটার কিছু যায় আসেনা।”
এরপর দেখতে দেখতে আরো কিছু দিন গড়িয়ে গেল, ওরা তবু ফিরে এলো না। নয় নম্বর বাসটা এখন আর দশটা বাসের মতই সাধারণ একটা বাস, এবং বাসের সবাই এখন সাধারণ যাত্রী ছাড়া অন্য কিছু নয়। এত দিন অদৃশ্য যে সুতোটা আমাদের সবাইকে জড়িয়ে ছিলো সেটা এখন ছিন্ন হয়ে গেছে, এবং সেই পুরাতন আগ্রহটাও সবার দৃষ্টি থেকে বিদায় হয়েছে, তার বদলে সেখানে এখন প্রতিদিনকার গৎবাঁধা অতিসাধারণ চাহনি। বাসটা এখন সাধারণ একটা জায়গাতে পরিণত হয়েছে যেখানে সবাই আত্মপক্ষ সমর্থন করে একে অপরকে গালমন্দ করছে।
অনেক বার আমি অন্য পথে যাতায়াত করার কথা ভেবেছি, কিন্তু সেটা আর করা হয়ে ওঠেনি। কেন করিনি সেটা আসলে আমার নিজেরও জানা নেই। একদিন সকালে সেই মেয়েটাকে দেখতে পেলাম-তখনও ওর নাম জানা ছিলোনা-আমার ডান পাশে বসে ছিলো মেয়েটা। কেন এর আগে ওর উপস্থিতি টের পেলাম না ? সত্যি সত্যিই সেই মেয়েটা, এবং এবার সে একা। আমি প্রায় জিজ্ঞেস করে বসছিলাম সেই ছেলাটা কোথায় এবং আজকে সে কেন সঙ্গে আসেনি। সম্ভবত এর আগেও মেয়েটা একাই এই বাসে উঠেছিলো, তা হয়তো আমি দেখতে পাইনি। ওর ভেতরে কোন পরিবর্তন দেখতে পেলাম না, কিন্তু তার পরও ছেলেটার সঙ্গে যেই মেয়েটা আসতো তার থেকে পুরোপুরি আলাদা লাগছিলো ওকে। ওর চোখ গুলো বিচিত্র ভঙ্গিতে আড়াল হয়ে ছিলো। হাত দু’টা দু’পাশে এবং বাতাসে চুল গুলো উড়ছে। আমি বুঝতে পারলাম ছেলেটির জায়গাতে এবার আমি বসে আছি। ওর চুলের দিকে চেয়ে দেখলাম, তারপর আমাদের চারপাশের লোকজনের দিকে তাকালাম, আমি যে সেই ছেলেটার জায়গায় বসে রয়েছি যদি সেটা অন্য যাত্রীরা বুঝতে পারে, একথা ভেবে আমার অস্বস্তি বোধ হচ্ছিলো। আমি কল্পনা করলাম, কেউ কেউ ওরপাশে আমাকে বসা দেখতে পেয়ে বিরক্ত হচ্ছে আর সেটা বুঝতে পেরে আমি আবার নিজের সিটে ফিরে এসেছি। মেয়েটা আগের মতই মাথা নুইয়ে বসে রইল এবং ধীরে ধীরে আরো অনেকেই তাকে আবিষ্কার করলো। সমবেদনা জানাতে সবাই একে অপরের মুখ গুলো কাছাকাছি আনছিলো। কেন আমি এই অপয়া সিটে বসতে গেলাম ? আমি আবারো কল্পনা করলাম, এখন যদি এই সিট আমি ছেড়ে দেই তাহলে যে এখনো তাকে চিনতে পারেনি সে এসে এখানটায় বসবে। সবাই কেন এমন করে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে ? মেয়েটিই শুধু এর কিছু বুঝতে পারেনি। সে তখন সময়ের অন্য একটা ফ্রেমে নিজেকে বন্দি করে রেখেছিলো, সেই ফ্রেম তাকে কোন নড়াচড়া দেখতে দিচ্ছে না। এবং এর ভেতরে সে সম্পূর্ণ একা। অন্য আর কেউ নেই। বাসটা তার চেনা সড়ক ধরে এগিয়ে চলছে, যাত্রীদের মধ্যে যাদের সেই ঘটনা জানা রয়েছে তাদের সবাই নেমে যাবার আগে অন্তত শেষ বারের মত ঘুরে ওকে দেখে নিচ্ছে। আমি তাদের কারোরই চোখাচোখি হচ্ছিলাম না, এবং জানালাটা আমাকে আড়াল করছিলো। তবে তারপরও আমি বাসটাকে রাস্তার মাঝ দিয়ে যেতে দেখলাম, ভেতরের চোখ গুলো তখন আরো কাছাকাছি চলে আসছিলো, তারা সব এক হয়ে যেতে চাইছিলো, সব গুলো চোখ আর মাথা মিলে বিশাল একটা মাথার ওপর বিরাট একটা চোখে পরিণত হলো, যেন বাসের প্রতিটা ইঞ্চি জায়গা দখল করে রয়েছে সেটা, এমন ভাবে যাতে করে মেয়েটা আর এক চুলও নড়তে না পরে।
সেদিনের পর থেকে মেয়েটা একাই বাসে করে ভ্রমণ করতে লাগলো। এমন অসংখ্য চোখ তার দিকে আর তাকানোও বন্ধ করে দিল, এবং সবার দৃষ্টির সেই সহানুভূতি আর দুঃখ ম্লান হয়ে উদাসীনতায় গিয়ে ঠেকলো। এবার চারিদিক থেকে আসা সবার চোখের পলক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো, সবাই এবার নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এমন কি এরপর থেকে আমি নিজেও প্রায়ই তাকে চিনতে ভুল করতে লাগলাম, এবং একারণে হঠাৎ কাছাকাছি চলে আসলে তাকে দেখে আমি চমকে উঠতাম, অন্য মেয়েদের থেকে ওকে খানিকটা নাজুক আর অপরিস্ফুট বলে মনে হতো। ওকে দেখে কেন আমি বুঝতে পারিনি এতটা মলিন হয়ে গেছে সে, হনুর হাড় সামান্য বেরিয়ে এসেছে, এবং কপালও অল্পবিস্তর প্রশস্ত হয়ে আছে ?
এবং তার পরও, গতানুগতিক ভাবে যখন অন্য সব লোকজনের ভীর ঠেলে পথ চলি, দুর্বোধ্য একটা স্বপ্ন আমার মাথার ভেতরে খেলা করতে থাকে। কোন একদিন হয়তো আবারো ওদের সঙ্গে দেখা হবে, তখন আমরা আবার এক সঙ্গে হাঁটবো। যদিও এরই মাঝে অনেক গুলো মাস পেরিয়ে গেছে এবং মেয়েটি আর আগের মত তার প্রাণচঞ্চল তারুণ্য নিয়ে এই বাসে চড়ে না, ওরা যেখানেই থাক না কেন, আজো আমি ওদের কথা ভাবি, বিশেষ করে যখন কোন মেয়ে আর ছেলেকে এক সঙ্গে হেটে যেতে দেখি।
হিলারি কিলপেট্রিক এবং নওমি শিহাব নেই এর ইংরেজি অনুবাদ হতে
সোহরাব সুমন
গল্পটি জলভূমি সাহিত্য,শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


