।
।
।। বাবা হতে চাই ।।(একটি নিষিদ্ধ ঘটনা)-১
.......পৃথিবীর ধ্বংস সম্বন্ধে জানে না।।
রাস্তার এই পাশে পৌছে গেছি।। চট্টগ্রাম শহরে ইদানীং ব্যাস্ততা অনেক বেড়ে গেছে।। আগে যেখানে হেল্পাররা ডেকে ডেকে লোক নিত, এখন সেখানে তাদের নিজেদেরও জায়গা পেতে কষ্ট হয়।। আমি এইপাশে আসার পর একটা বাস চলে গেলো যাতে হেল্পারটা কোনরকমে দাঁড়িয়ে আছে।। এখন আরেকটা বাসের জন্য অপেক্ষা আর যুদ্ধের প্রতিক্ষা।।
আজকে আমার চরিত্রের একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।। আগে যেখানে সামান্য কারণে হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে যেতো এবং আমার মন আমার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যেত আজকে সেখানে মাথা গরম হওয়ার সাথে সাথেই ঠাণ্ডা হয়ে গেলো।। আমার চরিত্রের এই পরিবর্তনটা অস্বাভাবিক।। স্বাভাবিক না এই কারণে যে, আমি অনেক আগ থেকেই এই পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করছিলাম।। কিন্তু মাথা গরম হলে অন্য কিছু মাথায় থাকে না।। আজকে হয়তো এই পরিবর্তনটা এই কারণে হয়েছে যে, আমার মাথায় ছিলো কাল আমি মারা যাবো।। মারা যাওয়াটা জীবনের একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও মানুষ তা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না।। তাই হয়তো মৃত্যুর কাছাকাছি এলে সব মানুষের চরিত্রেই অস্বাভাবিক কোন পরিবর্তন দেখা যায়।। আমি আমার......
- এই জিইসি, ওয়াসা, টাইগারপাস, কদমতলী, মার্কেট-মার্কেট।। (বাসের হেল্পারের ডাক)
অনেক যুদ্ধ করে বাসে উঠতে হল।। বাসের কোথাও তিল পরিমান জায়গা নেই।। তার উপর আবার কতগুলো মেয়ে উঠলো কোথা থেকে যেনো।। মনে হয় কোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে।। মাত্র ক্লাস শেষ হয়েছে।। চট্টগ্রাম এখন অনেক এগিয়ে গেছে।। আগে যেখানে মেয়েরা ভিড়ের মধ্যে বাসে উঠতে সংকোচবোধ করতো, এখন সেখানে মেয়ের জন্য ছেলেরাই উঠতে সংকোচবোধ করে।।
আচ্ছা আমি এইসব নিয়ে ভাবছি কেনো?? আমাকেতো আমার ‘বাবা হতে চাই’ নিয়ে আরো ভাবতে হবে।। আমি কিন্তু বাবা হলে আমার সন্তানকে কখনো শাসন করবো না।। তাকে তার মত করে চলতে দিবো।। সে যেটা ইচ্ছা সেটা আমার থেকে নিতে পারবে।। আমি যেভাবে টাকার কষ্ট পায়েছি তাকে তা পেতে দিব না।। দরকার হলে তাকে একটা ডেবিট কার্ড বানিয়ে দিবো যেটা দিয়ে সে যখন ইচ্ছা তখন টাকা উঠাতে পারবে।। তার গায়ে কখনো হাত তুলবো না।। কখনো তার মতের বিরুদ্ধে কিছু করবো না।। তার ইচ্ছাটাকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিবো।। ধুর! কালতো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।। আমি ভবিষ্যতের কথা কেনো ভাবছি?? আমাকেতো ভাবতে হবে কিভাবে বাবা হওয়া যায়।। আমি আমাকে...
- ভাইয়া, আপনি বসবেন নাকি আমি বসবো ??
হঠাৎ নারীকন্ঠ শুনে চমকে উঠলাম।। দেখলাম আমার বামে একটু পেছনে একটা মেয়ে আমার দিকে একটু রাগ ও একটু কোমলতা নিয়ে তাকিয়ে আছে।। মেয়েটাকে দেখার সাথে সাথেই আমি থতমত খেয়ে গেলাম এবং মনের অজান্তেই দুঃখিত বলে বসে গেলাম সিটে।। থতমত খাওয়ার কারণ আছে।। মেয়েটিকে কেমন যেন আমার পরিচিত মনে হয়েছিল।। মেয়েটার অবাক মুখের রাগান্বিত চোখ আমার কাছে অনেক চেনা মনে হয়েছিল। মেয়ের মায়াবী চেহারার ঠোঁটের সাথে কয়েকটি চুল যেভাবে লেগেছিলো তা যেন আমার শত বছরের চেনা।। সে যেন আমার একলা রাতের দুষ্ট মনের সপ্নের নায়িকা।। আর এই জন্যই তাকে আমার চেনা লেগেছিলো ফলে আমি বিব্রত হয়ে গিয়েছিলাম।।
এইসব ভাবতে ভাবতে আমি লক্ষ্য করলাম আমার আশেপাশের মানুষজন আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে।। ওরা হয়তো এই কারণে তাকিয়ে আছে যে, একটা মেয়েকে বসতে না দিয়ে আমি সিটে বসে পড়লাম।। আসলে আমি যে ইচ্ছাকৃতভাবে সিটে বসিনি তাতো তারা জানে না।। আমি মনের অজান্তেই সিটে বসে গিয়েছিলাম।। এবার আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম।। মেয়েটা অসম্ভব বিরক্তিকর চেহারা নিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।। সেও হয়তো আমাকে আহাম্মক ভাবছে।। তবে নেগেটিভ হলেও তার মনে যে এই মুহুর্তে আমি আছি টা ভাবতে আমার খুব ভালো লাগছে।।
আমি এমনিতে খুব বুদ্ধিমান ছেলে(মানুষ বলে)।। কিন্তু সুন্দর মেয়ে দেখলে যে বুদ্ধি লোপ পায় তা আমি এখন বুঝলাম।। তবে বেশিক্ষন হতবুদ্ধি অবস্থায় থাকাটা উচিৎ হবে না।। তাই বুদ্ধি করে আমি ওঠে গেলাম এবং মেয়েটাকে বসতে দিলাম।। মেয়েটা বসার সময় আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে একটু রসিকতাময় হাসি নিয়ে তাকিয়েছিলো।। তখন আমি দেখলাম বাসের আশেপাশের মানুষ আমার দিকে আরো বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে আছে।। মাঝে মাঝে বৃহৎ স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়।। তাই আমি বাসের অন্যান্যদের দিকে না তাকিয়ে মেয়েটার দিকে মনোনিবেস দেওয়ার চেষ্টা করলাম।। আর সেই মুহুর্তেই আগামিকালের কথা মনে পরে গেলো।।
আমিতো আজকের পর আর বাঁচবো না।। তো ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম-পিরীতি দিয়ে আমার কি লাভ।। আমাকে এইসবের উর্ধে যেতে হবে।। আমি আজকের দিনের জন্য মহামানব হতে চাই।। আর মহামানবদের প্রেম-পিরীতির প্রতি লোভ থাকা চলে না।। তাই আমার মন না মানলেও আমি মেয়েটাকে নিয়ে না ভাবার চেষ্টা করলাম।। যদি পৃথিবী কাল ধ্বংস না হয় তবে অবশ্যই মেয়েটাকে আমি খুজে বের করবো এবং তার সহিত প্রেম করার চেষ্টা করবো।।(বিয়ের বয়স হয় নায়, তানাহলে জীবনসঙ্গী বানানোর কথা বলতাম)
- চাই বদ্দা, ভারাগুন লঁইওন।। (দেখি ভাইয়া, ভারাটা নিয়েন)
আমি মানিবেগ বের করলাম এবং ৫ টাকা দিয়ে বললাম মার্কেট যাবো।। সে ভাড়া নিয়ে চলে গেলো।। আমি যে এই পাঁচ টাকা দিলাম, টাকাটা আসলে আমার বাবার।। আচ্ছা! আমার বাবাতো এখন আর আগের মতো কিপটা নেই।। তিনি এখন আমাকে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা দেয়।। আমি ব্যচেলার থাকি।। আমার থাকা-খাওয়ার সকল খরচ উনিই বহন করেন।। এমনকি আমি যে একখানা প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ি এবং চার মাস পর পর সেখানে যে এক গাধা করে টাকা দিতে হয় তাও তিনি বহন করেন।। আর নবাবজাদা আমি কষ্টের কারণে দুইখানা টিউশনি ছেরে দিয়েছি।।
আচ্ছা আমি যদি টাকা উপার্জন করি তাহলে কি আমার বাবাকে এতো টাকা দিবো?? বাবা বাদ। আমি যদি বাবা হই তাহলে কি আমার সন্তানের পড়ালেখার জন্য এতো টাকা দিবো?? আমার বাবার বেতন সম্পর্কে আমার ধারণা নেই।। আমার পিছনে ভার্সিটির টাকা সহ মাসে প্রায় ১০,০০০ টাকা খরচ হয়।। আমার ছোট দুই ভাইবোনের জন্য আরো ১০,০০০ টাকা ধরলে মোট খরচ করে ২০,০০০ টাকা।। যা আমার মনে হয় বাবার বেতনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ।। আমি যদি আমার সন্তানের পিছনে আমার বেতনের দুই তৃতীয়াংশ টাকা খরচ করি... কি আবোল-তাবোল বলতেছি, সন্তানের পিছনে এতো টাকা খরচ করলে আমি করবো কি?? আমি কামাই করবো আর আমার ছেলে খরচ করবে?? অসম্ভব।। নিজে টাকা আয় করে যদি নিজেই আয়েশ করতে না পারি, তাহলে টাকা আয় করে কি লাভ।। তো আমি একটা জিনিস বুঝলাম না, আমার বাবা কেনো আমাদের পিছনে এতো টাকা খরচ করছে।। তবে কি একটা বয়সের পর মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটে?? অর্থাৎ বাবা হওয়ার জন্য একটা বয়স লাগে, যা আমার এখনো হয়নি।। আর ভালো বাবা হতে হলে হয়তো উপার্জিত টাকার সুষ্ট ব্যাবহার করাও জানতে হয়।। যা আমার বাবা সবসময় করে আসছে।। যখন বাবা উপার্জন কম ছিলো তখন আমাকেও কম টাকা দিয়েছে আর এখন যখন উপার্জন বেশি এখন সেই ভাবেই টাকা দেয়।।
এমন সময় আমি লক্ষ্য করলাম সেই মেয়েটা আমার দিকে কেমন যেন আড়চোখে তাকাচ্ছে।। আমি নিজের দিকে তাকালাম।। আমার চেহারা বা কাপড়-চোপড়ে কোন খুত নেই তো!! পেন্টের চেইনও দেখলাম।। সবই তো ঠিক আছে।। তো এমন সুন্দরী একটা মেয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে কেনো?? অবশ্য আমি দেখতে এতোটা খারাপ না যে কোন মেয়ে আমার দিকে তাকাবে না।। ধুর!! আমি এইসব চিন্তা করছি কেন??
আমি আমার আসল চিন্তাধারায় ফেরত যেতে চাচ্ছিলাম কিন্তু তাও হচ্ছিল না।। কারণ মেয়েটা বারবারই আমার দিকে তাকাচ্ছিল এবং আমারও চিন্তাধারায়ও বেঘাত ঘটছিল।। এখন তো দেখছি একটা সুন্দরী মেয়ে আমাকে এক দিনের মহামানব হতে দিবে না।। তবে কি শুনেছিলাম যে “প্রত্যেক পুরুষের সফলতার পিছনে কোন না কোন নারীর হাত থাকে আবার ঐ নারীর কারণেই অনেক পুরুষ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়” তাই ঠিক।। এই নারী কি আমাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করাচ্ছে?? এমন সময় আমার জন্য সুখবর নিয়ে এলো বাসের হেল্পার।। সে ডেকে ডেকে বলছে যে বাস নাকি ‘নিউ মার্কেট’ পৌছে গেছে।। আর এটা শোনামাত্রই আমি নারীর প্ররোচনাকে উপেক্ষা করে বাস থেকে নেমে পড়লাম।।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




