।
।
।। বাবা হতে চাই ।।(একটি নিষিদ্ধ ঘটনা)১৮+
পরকাল সম্বন্ধে ভয়-ভীতি আমার ছেলেবেলা থেকেই।। কাল একুশে ডিসেম্বর, ২০১২।। পৃথিবীর নাকি শেষ দিন।। মায়ান না ছায়ান নামক কি যেন একটা সভ্যতা নাকি ছিল পৃথিবীতে এক কালে।। তাদের বানানো নাকি একটা পঞ্জিকাও ছিল, যেই পঞ্জিকার শেষ দিন ছিল একুশে ডিসেম্বর, ২০১২।। তার মানে, তাদের মতে এই দিনটাই হবে পৃথিবীর শেষ দিন।। বিজ্ঞানীরাও নাকি গবেষণা করে দেখেছে যে, তাদের এই তারিখটা ঠিক।। “2012” নামক একটা মুভিও নাকি বের করেছে হলিউডওয়ালারা ।। যাতে দেখানো হয়েছে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।।
আমার যতটুকু মনে পড়ে ২০০৩ সালেও এইরকম একটা ঘটনা ঘটেছিলো।। তখন আমি ছোট ছিলাম, তাই তেমন কিছু মনে নেই ভালো করে।। তবে একটা ঘটনা মনে আছে।। তখন আমাদের বাসায় ছিলো আমার এক খালাতো বোন।। তাকে আমি বলেছিলাম, “আপুনি, পৃথিবীতো ধ্বংস হয়ে যাবে, আমিতো আর বেশীদিন বাঁচবো না।।” আপুনি তখন আমাকে বলেছিলো, “ শোন, তুই যদি অন্য কোনো সময় মারা যেতিস তাহলে তোকে কবরে থাকতে হত কেয়ামত পর্যন্ত ।। তখন তোকে কবরেও কষ্ট পেতে হত আবার কেয়ামতের পরও কষ্ট পেতে হত।। আর এখন যদি একেবারে কেয়ামত হয়ে যায়, তাহলে আর কবরের শাস্তি তোকে পেতে হবে না।।” আপুনির কথাটা শোনে তখন আমার ভীতু মনও আনন্দে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলো।।
যদিও অনিবার্য কারণ বসত তখন তেমন কিছু হয়নি, তবে কাল কিছু একটা হবে বলে সবাই ধারণা করছে।। তখন ছোট ছিলাম, তাই মনে কোন ইচ্ছা ছিলো না।। কিন্তু এখন মোটামুটি বয়স হয়েছে।। তাই মৃত্যুর আগে আমার একটা ইচ্ছা পুরণ করা দরকার।। অনেকেরই অনেক ইচ্ছা থাকে জীবনে, যা মৃত্যুর আগে একবার হলেও পূরণ করার বাসনা থাকে মনে।। তবে আমার সেই ইচ্ছাটা একটু ভিন্ন।। আমি “বাবা হতে চাই”।। এবং আজকেই আমার সেই আশা পূরণ করতে হবে ।।
সকাল সকাল ভালো করে সেজে-গুজে বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে।। মিশন হচ্ছে “বাবা হতে চাই”।। প্রত্যেকটি কাজই মানুষকে মিশন হিসেবে গ্রহন করা উচিৎ।। তাহলে কাজটা অনেক আনন্দ সহকারে করা যায়।।
জ্যেষ্ঠ মাসের এইসকালে রোদ তার অসহ্য উত্তাপ দেওয়ার জন্য কেবল তৈরি হচ্ছে।। কস্মোপলিটন থেকে রহমাননগর যাওয়ার উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠলাম দামাদামি ছাড়াই।। রিকশা চলছে আর আমার মনের গাড়িও ভাবতে শুরু করেছে ‘বাবা হতে চাই’ প্রজেক্ট নিয়ে।।
আচ্ছা আমি যে বাবা হতে চাই, বাবাদের কাজ সম্বন্ধেতো আমি তেমন কিছু জানি না।। বাবাদের আসলে কাজটা কি ?? টাকা উপার্জন করা আর সন্তানদের লালন-পালন করা।। আর তো কোন কাজ নেই।। আচ্ছা! আচ্ছা! আরেকটা কাজ আছে।। বাজার করতে হয়।। অ না! না! ঘরে বড় ছেলে থাকলেতো তাও করতে হয় না।। যেমন আমার ঘরে আমি বাজার করি।। অবশ্য আমার বাবার আরেকটা কাজ ছিলো।। তা হল আমাকে লেখাপড়া করানো।। সারা দিন পড়াতে বসিয়ে রাখতো।। যতক্ষন অফিস ছিল না ততক্ষন নিজে বসে থেকে পড়াতো, আর যখন ছিলো তখন পড়া দিয়ে যেত।। পড়াতে পড়াতে অতিষ্ট বানিয়ে ফেলেছিলো আমার জীবনটা।। সবসময় পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে।। কখনো দ্বিতীয় হওয়া যাবে না।। এমনকি পরীক্ষার হলে রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আমাকে পাহাড়া দিত।। কারণ আমি নাকি পরীক্ষার হলে পারা উত্তর না লিখে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি।। আর আমার মতে আমার বাবা ছিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিপ্টা।। স্কুলে যাওয়ার সময় খালি ৫ টা টাকা দিত।। তাও আবার মাঝে মাঝে দিত না।। আর আমার মত বাবার হাতের মার মনে হয় এই দুনিয়ায় কেউ খায় নাই।। সে কি মার।। ছোটো খাটো জিনিস নিয়ে মারতো।।
যেমন রবার বা পেন্সিল হারিয়ে ফেললে।। আর আমার বাবার মুখের একটা ডায়লগ তো সবসময় মনে থাকবে।। আমার যে কোন মাস্টারকে বাবা বলতো “আপনাকে ছেলে দিচ্ছি, আপনি দরকার হইলে ওর সব মাংস রেখে দিয়েন, আমাকে শুধু হাড় গুলো দিলেই হবে।।” কি নিষ্ঠুর বাবা।।
আচ্ছা আমি আমার বাবাকে নিয়ে ভাবছি কেন?? আমিতো নিজে বাবা হতে চাই।। তার মানে যেটা বুঝলাম বাবা হওয়াটা এতো কষ্টের না বরং সুখের।। ইচ্ছা মতো সবার উপর রাজত্ব করা যায়।। একটু ......
-রাস্তার ইয়ুঁত নামিবেন না অণ্ডে নামিবেন।। (রাস্তার এইপাশে নাকি ঐপাশে নামবেন?)
হঠাৎ চমকে উঠলাম।। দেখলাম রহমাননগর এসে গেছি।। আমি মেইন রোডের এই পাশে।। আর আমার কাঙ্খিত বাস রাস্তার ঐ পাশ দিয়ে যাবে।। তবুও ভাবলাম বেচারা জ্যামের মধ্যে এতো কষ্ট করে ঐ পাশে যাবে।। তার চেয়ে ভালো আমি হেঁটে চলে যাব।।
-সাইড করে থামাও।।
-এডে ন্যা??(এইখানে??)
-হুম এইখানে।।
আমি সুন্দরভাবে নামলাম।। রিকশাওয়ালাও দাঁড়িয়ে আছে।। আমি এতোটা আহামরি লম্বা না।। তবুও আমার সাথে রিকশাওয়ালাকে অস্বাভাবিক খাটো লাগছে।। এই লোক কিভাবে রিকশা চালায় খোদাই জানে।।
-ভাই কত দেব??
-৪০ টিঁয়া দন্না।। (৪০ টাকা দেন না।।)
-কি বলেন ৪০ টাকা।। ভারা তো ২০ টাকা।।
-না বদ্দা।। ৪০ টিয়া দন পরিবো।।(না ভাই ৪০ টাকা দিতে হবে।।)
মেজাজটা হঠাৎ করে গরম হয়ে গেলো।। মনটা বলল বেটাকে ঠাস করে একটা থাপ্পড় মারি।। রিকশাওয়ালারা সুন্দর করে টাকা চাইলে দিতে ইচ্ছা করে কিন্তু দিতেই হবে বললে মাথাটা গরম হয়ে যায়।। অন্য কোনো সময় হলে ঠিকই মেরে দিতাম।। কিন্তু কালতো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে আর আমিও মারা যাব তো এখন মারামারি করে কি লাভ ?? টাকা পয়সা দিয়েই বা কি লাভ?? ওরও বা ৪০ টাকা দিয়ে কি লাভ?? মরেই যেহেতু যাব টাকার মায়া এখন থেকে ছেড়ে দিলাম।। মানিব্যাগ টা বের করে ওকে বললাম,
- এই নাও ৪০ টাকা।। এই নাও আরও ২০ টাকা।। ঠিক আছে??
এই কথা বলে হাঁটতে শুরু করলাম।। রাস্তা পার হতে হবে।। রিকশাওয়ালা আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।। আমার হঠাৎ করে রেগে যাওয়া চেহারার সাথে ৬০ টাকার হিসাবটা সে হয়তো মিলাতে পারছে না।। সে মোটামুটি ভরকে গেছে।। ও মনে হয় পৃথিবীর ধ্বংস সম্বন্ধে জানে না।।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




