somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইস্টার ফ্রাইডে এবং যিসাসের শেষ যাত্রা: জেরুজালেমের স্মৃতিবিজড়িত পথে

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





আমার এই তিনটি ছবির সঙ্গে পৃথিবীর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বেদনাবিধুর ইস্টার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রতিটি ছবিই যেন এক একটি অধ্যায়, একটি যাত্রার, যা শুরু হয়েছিল নীরব প্রার্থনায়, অতিক্রম করেছে যন্ত্রণার পথ, আর শেষ হয়েছে পুনরুত্থানের বিশ্বাসে।
প্রথম ছবিটির পেছনে যে জায়গাটি দেখা যাচ্ছে এটি Gethsemane (গেথসেমানি)। জলপাই গাছের ছায়ায় ঘেরা এই নীরব উদ্যানেই ঈশা আঃ তাঁর জীবনের শেষ সময়গুলোর এক গভীরতম অধ্যায় অতিবাহিত করেছিলেন। এটি সেই ঐতিহাসিক ভূমি, যেখানে তিনি তাঁর ভক্তদের সঙ্গে জীবনের শেষ আহার করেছিলেন।
এখানে দাঁড়িয়ে তিনি একা, নিঃসঙ্গ প্রার্থনায় নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন আসন্ন যন্ত্রণা, বিশ্বাসঘাতকতা আর মৃত্যুর জন্য। ঠিক এই স্থান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর শেষ যাত্রা, যেখান থেকে তাঁকে রোমান সৈন্যরা ধরে নিয়ে যায় ক্রুশবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে।
অলিভ পর্বতের ঢাল বেয়ে নিচে তাকালে আজও সেই ইতিহাস যেন চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গেথসেমানির সেই নিঃশব্দতা পেছনে ফেলে এক দুপুরে আমি পা বাড়ালাম আল আকসা মসজিদের পাশের লায়ন গেট দিয়ে। সেখান থেকে ঢুকে পড়লাম আরেকটি ঐতিহাসিক রাস্তায় যার নাম Via Dolorosa। বাংলায় যার অর্থ ‘বিষাদের রাস্তা’। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে শতাব্দীর কান্না, যন্ত্রণা আর বিশ্বাসের ভার।

দ্বিতীয় ছবিটিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই এই সরু, পাথুরে গলিপথে। এখানে চারপাশে মানুষের চলাচল, দোকানের সাইনবোর্ড, দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা,তবুও দুই হাজার বছর আগের স্মৃতি এখানে স্পষ্ট । এই পথে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন অন্য এক সময়ে হেঁটে চলেছি। আমার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম।
কথিত আছে, যীশুখৃষ্ট কে ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য এই পথ দিয়েই টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
পথের ধারে ছোট ছোট ফলকে এখনও চিহ্নিত করা আছে সেই সব মুহূর্ত। কোথায় তিনি ক্লান্ত হয়ে একটু থেমেছিলেন, কোথায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলেন, কোথায় কোনো সহৃদয় মানুষ তাঁকে একফোঁটা পানি দিতে গিয়ে রোমান প্রহরীদের তিরস্কারের শিকার হয়েছিল।
আজও সেই পথ নিস্তব্ধ নয়। প্রতিদিন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা এখানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন, চোখ বুজে অনুভব করার চেষ্টা করেন সেই অশেষ যন্ত্রণার ইতিহাস। আর ইস্টারের সময়ে এই পথ যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। অনেকেই নিজের শরীরে কাঁটার মতো বেদনা বয়ে নিয়ে, পিঠে ক্রুশ বেঁধে, রক্তাক্ত পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন এই পুরো পথ,এক গভীর শ্রদ্ধা, অনুশোচনা আর বিশ্বাসের প্রকাশ হিসেবে।

এই বিষাদের পথ শেষ হয় খ্রিস্টানদের সবচেয়ে পবিত্র তীর্থভূমি Church of the Holy Sepulchre-এ। বাইরে থেকে গির্জাটিতে তেমন কোনো জাঁকজমক নেই, বরং একধরনের প্রাচীন, সংযত স্থিরতা। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানব ইতিহাসের এক গভীরতম বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু।
তৃতীয় ছবিটিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই চার্চের ভেতরে। এক বিকেলের আলো-আঁধারিতে ভরে আছে পুরো গির্জা ধূপের গন্ধ, প্রার্থনার মৃদু সুর, আর এক অদৃশ্য আবেগ যেন বাতাসে মিশে আছে।
গির্জার বড় হলটির নিচে, মাটির গভীরে একটি পাথরের টেবিলের মতো স্থান। বিশ্বাস করা হয়, এখানেই যীশুর দেহটি পরিষ্কার করা হয়েছিল।
আমি এবং আমার সঙ্গীরা দাঁড়িয়ে অভিভূত হয়ে দেখছিলাম-মানুষজন সেই পাথর ছুঁয়ে হাপুস নয়নে কাঁদছে। যেন এইমাত্র তারা এক প্রিয়জনকে চিরবিদায় দিয়েছে। এখানে কোনো দৃশ্যমান দেহ নেই, নেই কোনো নির্দিষ্ট চিহ্ন,তবুও অনুভব করা যায় এক গভীর উপস্থিতি, এক অদৃশ্য স্পর্শ।
কবরস্থানের বিশাল পাথরের চাঁই দেখা যায়, ছোঁয়া যায়। বিশ্বাস করা হয়, এই স্থানেই তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল। আর সেই সমাধির উপরেই পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে এই গির্জা।

যীশু ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর জেরুসালেমের খৃস্টানরা এখানে নানারকম ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করতো। ৬৬ খৃস্টাব্দে জেরুজালেম রোমান অধিকৃত হওয়ার পর এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। রোমান সম্রাট হার্ডিয়ান এখানে প্যাগান মন্দির নির্মাণ করেন। এর অনেক পর দৃশ্যপঠে আবির্ভূত হন সম্রাট প্রথম কন্সটাটাইন তিনি ৩১২ খৃষ্টাব্দে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়ে নতুন ধর্ম সম্পর্কে আগ্রহী হন এবং বেশ কিছু উপাসনালয় স্থাপন করেন এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই চার্চটি।

যুগে যুগে এই চার্চের দখল নানা শক্তির হাতে হাতবদল হয়েছে। কেউ গড়েছে, কেউ ধ্বংস করেছে, আবার কেউ সংস্কার করেছে। ভাঙা-গড়ার এই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়েই আজও টিকে আছে খ্রিস্টানদের সবচেয়ে পবিত্র এই ধর্মীয় স্থাপনাটি।
আরও বিস্ময়কর হলো এই চার্চের চাবির দায়িত্ব আজও মুসলিম পরিবারের হাতে। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর বিন খাত্তাব জেরুজালেম বিজয়ের পর খ্রিস্টানদের উপাসনালয় সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দেন। পরে সালাউদ্দীন আইয়ুবর সময় এবং অটোমান যুগে সম্রাট সুলাইমানের সময় এই প্রথা আরও সুসংহত হয়।
আজও নুসাইবাহ ও জোদেহ পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন সকালে চার্চের দরজা খুলে দেন এবং সন্ধ্যায় তা বন্ধ করেন। এটা এক অনন্য ঐতিহ্য, যা জেরুজালেমে ধর্মীয় সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক বিরল দৃষ্টান্ত।
একই চার্চের ভেতরে খ্রিস্টানদের বিভিন্ন সম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন আচার, প্রার্থনা ও বিশ্বাস নিয়ে প্রার্থনা করেন তবুও শান্তিপূর্ণভাবে তাদের সহাবস্থান এই দৃশ্য সত্যিই বিস্ময়কর।

খ্রিস্টান সম্প্রদায় যীশুর এর পুনরুত্থান দিবসকে ইস্টার হিসেবে পালন করলেও মুসলমানদের কাছে এই ঘটনার ব্যাখ্যা ভিন্ন। ইসলাম ধর্মে ঈসা আ. এর মৃত্যু সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
“এবং তারা চক্রান্ত করেছিল, আল্লাহও কৌশল করেছিলেন, আর আল্লাহ কৌশলীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলে নিচ্ছি এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য হতে তোমাকে পবিত্র করছি। আর তোমার অনুসারীদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিচ্ছি। অতঃপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতভেদ রয়েছে, আমি তার মীমাংসা করে দেব।”
— (সূরা আলে-ইমরান: ৫৪–৫৫)
এই ভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে বিশ্বাস, আত্মত্যাগ এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা সব ধর্মেই এক অমোঘ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
জেরুজালেমের এই পথগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে তাই মনে হয়েছে ইতিহাস, ধর্ম আর মানুষের বিশ্বাস ভিন্ন হলেও, বেদনা আর আশার গল্পগুলো কোথাও যেন একসূত্রে গাঁথা।

দিলু নাসের
লন্ডন
৩ এপ্রিল. ২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৪
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের ওভারব্রীজ

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৪

বেশ অনেকদিন আগের কথা। আমি কোন এক দুর্ঘটনায় পা এ ব্যাথা পাই। হাসপাতালে ইমারজেন্সি চিকিৎসা নেই। কিন্তু সুস্থ হতে আরো অনেক দেরী। সম্ভবত চিটাগাং রোডে (নারায়ণগঞ্জ) এ রাস্তা পার হবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৈচিত্রে ভরা মহাবিশ্ব, তবে মানুষ কেন একই রকম হবে?

লিখেছেন মিশু মিলন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৩৯



এবার শেখরনগর কালীপূজার মেলায় গিয়ে সন্ধ্যার পর ভাগ্নি আর এক দাদার মেয়েকে বললাম, ‘চল, তোদের অন্য এক জীবন দেখাই।’
সরু গলি দিয়ে ওদেরকে নিয়ে গেলাম পিছনদিকে যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি দাঁড়ানো সম্ভব নয়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:১৫


ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন , তখন তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের ক্লান্ত অভিমান। একটা মুসলিম দেশ, কোটি কোটি মুসলিম মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহর সুন্নাতের পরিবর্তে রাসূলের (সা.) বিভিন্ন মতের অনুমোদন সংক্রান্ত হাদিস বাতিল হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৭



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ৪৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৪৩। পৃথিবীতে অহংকার প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে (অকল্যাণ)।কূট ষড়যন্ত্র এর আহলকে(এর সাথে সংযুক্ত সকল ব্যক্তি) পরিবেষ্ঠন করে। তবে কি এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।
ইউনূস ক্ষমতা দখল ছিল লুটের উদ্দেশ্যে। কেন শিশুদের টিকা দেয়া হয় নাই? তাদের দায়িত্ব ছিল টিকা পৌঁছে দেওয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×