somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দ্য লটারি: শার্লি জ্যাকসন

৩০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২৭ জুনের সকালটা ছিল একদম পরিষ্কার আর ঝলমলে। ভর গ্রীষ্মের এক সতেজ ওম চারদিকে; ফুলের দল ফুটে আছে থোকায় থোকায়, আর ঘাসগুলো একেবারে গাঢ় সবুজ। সকাল দশটা নাগাদ গ্রামের লোকজন পোস্ট অফিস আর ব্যাংকের মাঝখানের চত্বরটায় জড়ো হতে শুরু করল। কোনো কোনো বড় শহরে মানুষের ভিড় এত বেশি যে এই ‘লটারি’ শেষ করতে দুদিন লেগে যায়, শুরু করতে হয় ২৬ তারিখ থেকেই। কিন্তু এই গ্রামে শ-তিনেক মানুষের বাস, পুরো লটারি শেষ করতে বড়জোর ঘণ্টা দুয়েক লাগে। তাই সকাল দশটায় শুরু করলেও কাজ মিটিয়ে দুপুরের খাবারের আগে আগেই সবাই বাড়ি ফিরে যেতে পারে।

বাচ্চাগুলোই এল সবার আগে। গরমের ছুটি শুরু হয়েছে মাত্র, তাই এই অবাধ স্বাধীনতার স্বাদটা কেন যেন ঠিক হজম হচ্ছিল না ওদের। দুরন্ত খেলায় মেতে ওঠার আগে ওরা কিছুক্ষণ চুপচাপ এক জায়গায় দলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল; ওদের আলাপে ঘুরেফিরে সেই ক্লাসরুম, মাস্টারমশাই, বইপত্র আর বকাঝকার গল্প। ববি মার্টিন এর মধ্যেই পকেট পাথরে ঠাসা করে ফেলেছে। তাকে দেখে অন্য ছেলেরাও দেরি করল না, বেছে বেছে সবচেয়ে মসৃণ আর গোল পাথরগুলো দিয়ে পকেট ভরাতে লাগল তারা। ববি, হ্যারি জোনস আর ডিকি ডেলাক্রোয়া, গ্রামের লোকজন যাকে ‘ডেলাক্রয়’ বলে ডাকত, শেষমেশ চত্বরের এক কোণে পাথরের বিশাল এক স্তূপ বানিয়ে ফেলল এবং অন্য ছেলেদের হামলা থেকে সেটা পাহারা দিতে শুরু করল। মেয়েরা একটু তফাতে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল, আর মাঝেমধ্যেই কাঁধের ওপর দিয়ে আড়চোখে ছেলেদের দেখছিল। একদম ছোট ছোট বাচ্চাগুলো ধুলোর মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছিল অথবা বড় ভাই-বোনের হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।

খানিক বাদে পুরুষরা আসতে শুরু করল। তারা নিজেদের বাচ্চাদের ওপর নজর রাখছিল আর নিজেদের মধ্যে চাষবাস, বৃষ্টি, ট্রাক্টর আর ট্যাক্স নিয়ে কথা বলছিল। পাথরের স্তূপটা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে ওরা রসিকতা করছিল, উচ্চৈঃস্বরে হাসার বদলে ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল মৃদু হাসি। এর কিছুক্ষণ পরেই বিবর্ণ ঘরোয়া ফ্রক আর সোয়েটার পরে মহিলারা এসে জুটল। একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় আর টুকটাক পরনিন্দা-পরচর্চা করতে করতে তারা গিয়ে দাঁড়াল স্বামীদের পাশে। কিছুক্ষণ পর মায়েরা নিজেদের বাচ্চাদের ডাকাডাকি শুরু করল। বাচ্চারা আসতে চাইছিল না, চার-পাঁচবার ডাকার পর অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওরা এল। ববি মার্টিন মায়ের ধরার হাত ফসকে হাসতে হাসতে আবার পাথরের স্তূপের দিকে দৌড়ে গেল। বাবার কড়া ধমক শুনে সে সুড়সুড় করে ফিরে এসে বাবা আর বড় ভাইয়ের মাঝখানে জায়গা নিল।

স্কোয়ার ড্যান্স, কিশোর ক্লাব কিংবা হ্যালোইন অনুষ্ঠানের মতো এই লটারি পরিচালনার দায়িত্বও মিস্টার সামারসের ওপর। লোকটার প্রচুর সময় আর অফুরন্ত শক্তি, এসব জনহিতকর কাজে ঢেলে দেন। গোলগাল হাসিখুশি চেহারার এই মানুষটির কয়লার ব্যবসা আছে। মানুষ তাকে একটু করুণার চোখেই দেখে, কারণ তার কোনো সন্তান নেই আর গিন্নিটি সারাক্ষণ মুখঝামটা দেয়। হাতে একটা কালো কাঠের বাক্স নিয়ে যখন তিনি চত্বরে এসে পৌঁছালেন, গ্রামবাসীদের মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠল। তিনি হাত নেড়ে ডাক দিলেন, “আজ একটু দেরিই হয়ে গেল গো, সবাই এসেছ তো?” পোস্টমাস্টার মিস্টার গ্রেভস তার পিছু পিছু একটা তিনপেয়ে টুল নিয়ে এলেন। টুলটা রাখা হলো চত্বরের ঠিক মাঝখানে আর মিস্টার সামারস তার ওপর কালো বাক্সটা বসালেন। গ্রামের মানুষজন বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল, টুলটার আশেপাশে অনেকটা খালি জায়গা। মিস্টার সামারস যখন জিজ্ঞেস করলেন, “কেউ কি একটু হাত লাগাবে?”, সবাই যেন ইতস্তত করতে লাগল। শেষমেশ মিস্টার মার্টিন আর তার বড় ছেলে ব্যাক্সটার এগিয়ে এল বাক্সটা শক্ত করে ধরে রাখতে, যাতে মিস্টার সামারস ভেতরের কাগজগুলো ভালো করে ওলটপালট করতে পারেন।

লটারির সেই আদি আসবাবপত্রগুলো কবেই হারিয়ে গেছে। টুলের ওপর রাখা এই কালো বাক্সটা নাকি গ্রামের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ ওল্ড ম্যান ওয়ার্নার জন্মানোরও আগে থেকে চলছে। মিস্টার সামারস মাঝেমধ্যেই নতুন একটা বাক্স বানানোর কথা বলেন, কিন্তু এই পুরনো বাক্সের সাথে যে ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে, তাতে হাত দিতে কেউ রাজি নয়। লোকমুখে শোনা যায়, এই বাক্সটা নাকি আগের সেই বাক্সের কিছু অংশ দিয়ে বানানো হয়েছিল—যেটা তৈরি হয়েছিল একদম শুরুতে, যখন প্রথম কিছু মানুষ এখানে এসে বসতি গড়েছিল। প্রতি বছর লটারি শেষ হলে মিস্টার সামারস নতুন বাক্সের আলাপ তোলেন, কিন্তু প্রতিবারই কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে যায়। কালো বাক্সটা দিন দিন আরও জরাজীর্ণ হচ্ছে; এখন আর এটাকে পুরোপুরি কালো বলা যায় না, একপাশটা ফেটে ভেতরের কাঠের রঙ বেরিয়ে এসেছে, কোথাও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে আবার কোথাও ছোপ ছোপ দাগ।

মিস্টার মার্টিন আর ব্যাক্সটার টুলটার ওপর বাক্সটা চেপে ধরে রইল যতক্ষণ না মিস্টার সামারস হাত দিয়ে ভেতরের কাগজগুলো ভালো করে মিশিয়ে দিলেন। পুরনো অনেক রীতিনীতি মানুষ ভুলে গেছে বা বাদ দিয়ে দিয়েছে। আগে কাঠের টুকরো ব্যবহার করা হতো, মিস্টার সামারস অনেক বুঝিয়ে সেখানে কাগজের চিরকুট চালু করেছেন। তার যুক্তি ছিল, যখন গ্রাম ছোট ছিল তখন কাঠের টুকরো ঠিক ছিল, কিন্তু এখন লোকসংখ্যা তিনশো ছাড়িয়েছে, সামনে আরও বাড়বে। তাই এমন কিছু দরকার যা এই কালো বাক্সে সহজে এঁটে যায়। লটারির আগের রাতে মিস্টার সামারস আর মিস্টার গ্রেভস মিলে চিরকুটগুলো তৈরি করে বাক্সে ভরেন, তারপর সেটা মিস্টার সামারসের কয়লা কোম্পানির সিন্দুকে সারারাত তালাবন্ধ থাকে। পরদিন সকালে সেখান থেকেই চত্বরে আনা হয়। বছরের বাকি সময় বাক্সটা কখনো গ্রেভস সাহেবের গোয়ালঘরে, কখনো পোস্ট অফিসের ধুলোবালির মধ্যে, আবার কখনো মার্টিনদের মুদি দোকানের তাকে অবহেলায় পড়ে থাকে।

লটারি শুরুর ঘোষণা করার আগে মিস্টার সামারসকে আরও অনেক হ্যাপা সামলাতে হয়। ফর্দ বানাতে হয়, পরিবারের প্রধান কে, কার অধীনে কয়জন সদস্য, ইত্যাদি। পোস্টমাস্টার আনুষ্ঠানিকভাবে মিস্টার সামারসকে লটারি কর্মকর্তা হিসেবে শপথ পড়ান। পুরনো মানুষদের মনে পড়ে, এককালে এই কর্মকর্তা লটারি শুরুর আগে এক ধরণের সুরহীন মন্ত্র আওড়াতেন; কেউ বলত তিনি এক জায়গায় স্থির হয়ে মন্ত্রটা পড়তেন, কেউ বলত তিনি মানুষের ভিড়ের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতেন। কিন্তু বহুবছর আগে এই প্রথা উঠে গেছে। এমনকি বাক্সে হাত দেওয়ার আগে প্রত্যেককে একটা নির্দিষ্ট কায়দায় সালাম দেওয়ার নিয়ম ছিল, সেটাও সময়ের সাথে বদলে গেছে। এখন কেবল প্রত্যেকের সাথে দুটো কথা বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়। মিস্টার সামারস এসব কাজে বেশ পটু; পরিষ্কার সাদা শার্ট আর নীল জিন্স পরে, কালো বাক্সের ওপর আলগোছে হাত রেখে যখন তিনি গ্রেভস বা মার্টিনদের সাথে কথা বলছিলেন, তাকে বেশ গম্ভীর আর গুরুত্বপূর্ণ দেখাচ্ছিল।

মিস্টার সামারস যখন কথা শেষ করে গ্রামবাসীদের দিকে ঘুরলেন, ঠিক তখনই মিসেস হাচিনসন হন্তদন্ত হয়ে চত্বরে এসে ভিড়ের পেছনে ঢুকলেন। কাঁধের ওপর সোয়েটারটা ফেলে রাখা। পাশে দাঁড়ানো মিসেস ডেলাক্রোয়াকে ফিসফিস করে বললেন, “একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম আজ কী দিন!” দুজনেই মৃদু হাসল। মিসেস হাচিনসন বলতে লাগলেন, “ভাবলাম আমার বুড়োটা বুঝি পেছনের উঠোনে কাঠ কাটছে, তারপর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাচ্চাকাচ্চা কেউ নেই। তখনি মনে পড়ল আজ ২৭ তারিখ, আর তাই দৌড়ে এলাম।” তিনি অ্যাপ্রনে হাত মুছলেন। মিসেস ডেলাক্রোয়া বললেন, “ঠিক সময়েই এসেছ। ওরা এখনও বকবক করেই যাচ্ছে।”

মিসেস হাচিনসন ভিড় ঠেলে দেখার চেষ্টা করলেন এবং দেখলেন তার স্বামী আর বাচ্চারা একদম সামনের দিকে দাঁড়িয়ে। মিসেস ডেলাক্রোয়ার হাতে একটা টোকা দিয়ে তিনি ভিড় চিরে সামনে এগোতে লাগলেন। মানুষজন হাসিমুখেই তাকে পথ করে দিল। দু-একজন নিচু স্বরে টিপ্পনি কাটল, “ওই যে বিল, তোমার গিন্নি এসে পড়েছেন।” মিসেস হাচিনসন স্বামীর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই মিস্টার সামারস হাসিমুখে বললেন, “ভেবেছিলাম তোমাকে ছাড়াই শুরু করতে হবে, টেসি।” মিসেস হাচিনসন হেসে জবাব দিলেন, “সিঙ্কে এঁটো বাসন ফেলে রেখে কি আসা যায় জো, তুমিই বলো?” ভিড়ের মধ্যে হাসির একটা হালকা রোল বয়ে গেল।

“আচ্ছা, এবার কাজের কথায় আসি,” মিস্টার সামারস গম্ভীর গলায় বললেন, “সব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলি চলো, যাতে আবার কাজে ফিরতে পারি। কেউ কি বাকি আছে?”

“ডানবার,” বেশ কয়েকজন চিৎকার করে উঠল। “ডানবার, ডানবার।”
মিস্টার সামারস ফর্দ মিলিয়ে দেখলেন। “ক্লাইড ডানবার, হ্যাঁ। ওর পা ভেঙেছে না? ওর হয়ে কে নাম তুলছে?”
“আমিই তুলব বোধহয়,” এক মহিলা বলে উঠলেন। মিস্টার সামারস তার দিকে ফিরলেন। “বউ তুলছে স্বামীর হয়ে। তোমার কি সাবালক কোনো ছেলে নেই জেনি?” যদিও মিস্টার সামারস বা গ্রামের সবাই উত্তরটা জানে, তবুও কর্মকর্তা হিসেবে নিয়মমাফিক প্রশ্নটা তাকে করতে হয়। মিসেস ডানবার উত্তর দিলেন।
“হোরাসের বয়স তো মোটে ষোলো। তাই এই বছর বুড়োটার হয়ে আমাকেই নামাতে হবে।”
“ঠিক আছে,” মিস্টার সামারস ফর্দে একটা নোট রাখলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “ওয়াটসনদের ছেলে কি নাম তুলছে এবার?”
লম্বামতো এক ছেলে ভিড়ের মাঝ থেকে হাত তুলল। “এখানে। আমি আমার মায়ের আর নিজের হয়ে তুলছি।” ছেলেটা বেশ নার্ভাসভাবে চোখ পিটপিট করছিল। ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ কেউ বলে উঠল, “সাবাস জ্যাক,” বা “ভালো হলো, তোমার মায়ের অন্তত একটা বেটাছেলে তো আছে।”
“বেশ,” মিস্টার সামারস বললেন, “তাহলে সবাই এসে গেছে। ওল্ড ম্যান ওয়ার্নার এসেছেন?”
“আছি,” এক বৃদ্ধের গলা শোনা গেল। মিস্টার সামারস মাথা নাড়লেন।
মিস্টার সামারস গলা পরিষ্কার করে ফর্দের দিকে তাকালেন। চত্বরের ভিড়টা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। "সবাই তৈরি তো?" তিনি ডাক দিলেন। "এবার আমি নাম পড়ব, আগে পরিবারের কর্তারা আসবেন। বাক্স থেকে একটা করে কাগজ তুলে নেবেন। যতক্ষণ না সবার নাম ডাকা শেষ হচ্ছে, কেউ কাগজ খুলে দেখবেন না। সব পরিষ্কার তো?"

মানুষজন এতবার এই কাজটা করেছে যে নিয়মকানুনগুলো আর কেউ মন দিয়ে শুনছিল না। বেশির ভাগ মানুষই চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুকনো ঠোঁট জিব দিয়ে ভেজালো, কেউ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল না। মিস্টার সামারস হাত উঁচিয়ে বললেন, "অ্যাডামস।" ভিড় থেকে এক লোক বেরিয়ে সামনে এল। "কেমন আছো স্টিভ," সামারস বললেন। অ্যাডামস উত্তর দিল, "এই তো জো, ভালো।" ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ম্লান আর স্নায়বিক একটা হাসি হাসল। অ্যাডামস বাক্স থেকে একটা কাগজ তুলে তড়িঘড়ি ভিড়ের মধ্যে নিজের জায়গায় ফিরে গেল। পরিবারের সবার চেয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের দিকে না তাকিয়েই স্থির হয়ে থাকল সে।

"অ্যালেন," মিস্টার সামারস পড়লেন। "অ্যান্ডারসন... বেনথাম।"

"মনে হয় যেন আগের লটারিটা এই সেদিনের কথা, কত দ্রুত সময় যায়," পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে মিসেস ডেলাক্রোয়া ফিসফিস করে মিসেস গ্রেভসকে বললেন। গ্রেভস উত্তর দিলেন, "সময় তো আর কারও জন্য বসে থাকে না।"

"ক্লার্ক... ডেলাক্রোয়া।"

"ওই যে আমার বুড়োটা যাচ্ছে," মিসেস ডেলাক্রোয়া বললেন। স্বামী বাক্সের দিকে যাওয়ার সময় তিনি দম বন্ধ করে তাকিয়ে রইলেন।

"ডানবার," মিস্টার সামারস ডাকলেন। মিসেস ডানবার ধীরপায়ে বাক্সের দিকে গেলেন। ভিড়ের মধ্যে থেকে এক মহিলা বলে উঠল, "যা না জেনি, এগিয়ে যা।"

"এবার আমাদের পালা," মিসেস গ্রেভস বললেন। তিনি দেখলেন মিস্টার গ্রেভস বাক্সের একপাশ দিয়ে ঘুরে এসে মিস্টার সামারসকে গম্ভীরভাবে কুশল জানিয়ে একটা চিরকুট তুলে নিলেন। ততক্ষণে ভিড়ের মধ্যে প্রায় সব পুরুষই তাদের বড় বড় হাত দিয়ে ছোট ভাঁজ করা কাগজগুলো নাড়াচাড়া করছে। মিসেস ডানবার তার দুই ছেলেকে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইলেন, তার হাতে ধরা সেই চিরকুট।

"হার্বার্ট... হাচিনসন।"

"যা না বিল, সামনে যা," টেসি হাচিনসন স্বামীকে ঠেলে দিলেন। পাশে দাঁড়ানো মানুষজন হেসে উঠল।

"জোনস।"

ওল্ড ম্যান ওয়ার্নারকে অ্যাডামস বললেন, "শুনেছি উত্তরের গ্রামের লোকজন নাকি লটারি তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে।"

ওয়ার্নার একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করে খেঁকিয়ে উঠলেন, "এক গাদা আস্ত পাগল! ছোকরাদের কথা শুনে নাচছে সব, ওদের কাছে কিছুই আর ভালো লাগে না। কিছুদিন পর দেখবে ওরা গুহায় ফিরে গিয়ে বাস করতে চাইবে। লোকে আর কাজকাম করবে না, ওইভাবেই পড়ে থাকবে। পুরনো প্রবাদ আছে না—'জুনে লটারি, ধানে মই।' লটারি তুলে দিলে তো শেষে আমাদের বুনো ঘাস আর ওক ফল খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে। লটারি তো চিরকালই ছিল," তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়েই যোগ করলেন। "জো সামারসকে ওখানে দাঁড়িয়ে সবার সাথে হাসাহাসি করতে দেখাটাই সহ্য হয় না।"

"কোনো কোনো জায়গায় তো লটারি বন্ধ হয়ে গেছে," মিসেস অ্যাডামস বললেন।

"তাতে অমঙ্গল ছাড়া আর কিছুই হবে না," ওয়ার্নার জেদ ধরে বললেন। "সব কটা অপদার্থের দল।"

"মার্টিন।" ববি মার্টিন দেখল তার বাবা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। "ওভারডাইক... পার্সি।"

"ওরা কি আর একটু তাড়াতাড়ি করতে পারে না?" মিসেস ডানবার তার বড় ছেলের কানে কানে বললেন। "আর একটু তাড়াতাড়ি করলে হতো না?"

"প্রায় শেষ হয়ে এসেছে মা," ছেলেটা সান্ত্বনা দিল।

মিস্টার সামারস নিজের নাম ডাকলেন এবং নিয়ম মেনে সামনে গিয়ে একটা কাগজ তুললেন। এরপর ডাকলেন, "ওয়ার্নার।"

"এই নিয়ে সাতাত্তর বছর লটারিতে নাম দিচ্ছি আমি," ওল্ড ম্যান ওয়ার্নার ভিড় চিরে যাওয়ার সময় বললেন। "সাতাত্তর বার।"

"ওয়াটসন।" লম্বা ছেলেটা ভিড় ঠেলে কাঁচুমাচু হয়ে সামনে এল। কেউ একজন বলল, "ঘাবড়াস না জ্যাক।" মিস্টার সামারস বললেন, "সময় নিয়ে তোলো বাবা।"

"জানিনি।"

দীর্ঘ একটা দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা। মিস্টার সামারস কাগজ উঁচিয়ে বললেন, "ঠিক আছে সবাই, এবার খোলো।" এক মুহূর্ত কেউ নড়ল না, তারপর সবাই একসাথে ভাঁজ করা কাগজগুলো খুলল। হঠাৎ সব মহিলারা একসাথে কথা বলে উঠল, "কার নাম উঠল? ডানবারদের? নাকি ওয়াটসনদের?" এরপর ভিড় থেকে আওয়াজ এল, "হাচিনসন। বিল হাচিনসন পেয়েছে।"

"যা, বাবাকে গিয়ে বল," মিসেস ডানবার তার ছেলেকে পাঠালেন।

মানুষজন হাচিনসনদের দিকে তাকাতে শুরু করল। বিল হাচিনসন চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিজের হাতের কাগজের দিকে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ টেসি হাচিনসন চিৎকার করে মিস্টার সামারসকে বললেন, "তুমি ওকে ঠিকমতো সময় দাওনি। আমি নিজের চোখে দেখেছি। এটা মোটেও ঠিক হয়নি!"

"শান্ত হও টেসি," মিসেস ডেলাক্রোয়া বললেন। মিসেস গ্রেভসও সুর মেলালেন, "আমরা সবাই তো একই সুযোগ পেয়েছি।"

"চুপ কর টেসি," বিল হাচিনসন নিচু স্বরে বললেন।

"শোনো সবাই," মিস্টার সামারস গম্ভীর গলায় বললেন, "কাজটা খুব দ্রুত হয়ে গেছে। এবার আরও কিছুটা তাড়াতাড়ি করতে হবে। বিল, এবার তুমি হাচিনসন পরিবারের হয়ে নাম তুলবে। তোমাদের পরিবারে কি আর কোনো ঘর আছে?"

"ডন আর ইভা আছে তো!" টেসি চিৎকার করে বললেন। "ওদেরও নাম তোলানো হোক!"

"মেয়েরা বিয়ের পর স্বামীর পরিবারে নাম দেয় টেসি, তুমি তো সেটা জানোই," মিস্টার সামারস শান্তভাবে বললেন।

"এটা মোটেও ঠিক না," টেসি গজ গজ করতে লাগলেন।

বিল হাচিনসন আক্ষেপ করে বললেন, "আমার আর কোনো পরিবার নেই জো। ওই তিন বাচ্চা আর আমরা দুজন। এটাই আমাদের সংসার।"

"তা হলে পরিবারের পক্ষ থেকে তুমিই আছ," সামারস বুঝিয়ে বললেন। "আর ঘরের পক্ষ থেকেও তুমিই। ঠিক তো?"

"হ্যাঁ," বিল উত্তর দিলেন।

"কয়টা বাচ্চা বিল?" মিস্টার সামারস নিয়মমাফিক জিজ্ঞেস করলেন।

"তিনজন। বিল জুনিয়র, ন্যান্সি আর ছোট্ট ডেভি। আর আমি আর টেসি।"

মিস্টার গ্রেভস পাঁচটা চিরকুট বাক্সে ভরে দিলেন। বাকি কাগজগুলো তিনি মাটিতে ফেলে দিলেন, বাতাস সেগুলো উড়িয়ে নিয়ে গেল।

"সবাই শোনো," টেসি হাচিনসন আশেপাশে লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন।

"তৈরি বিল?" মিস্টার সামারস জিজ্ঞেস করলেন। বিল তার স্ত্রী আর বাচ্চাদের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নাড়লেন।

মিস্টার গ্রেভস ছোট ডেভির হাত ধরে বাক্সের কাছে নিয়ে এল। ছোট বাচ্চাটা হাসতে হাসতে বাক্স থেকে একটা কাগজ তুলল। মিস্টার গ্রেভস সেটা তার ছোট্ট মুঠি থেকে বের করে ধরে রাখলেন। ন্যান্সি আর বিল জুনিয়রও তাদের কাগজ তুলে নিল। ন্যান্সি তার স্কার্ট সামলে আলগোছে কাগজটা নিল, আর বিল জুনিয়র ঘাবড়ে গিয়ে প্রায় বাক্সটাই উল্টে দিচ্ছিল। সবশেষে টেসি হাচিনসন থমথমে মুখে গিয়ে একটা চিরকুট ছোঁ মেরে তুলে নিলেন। বিল হাচিনসনও সবার শেষে হাত বাড়িয়ে একটা কাগজ তুললেন।

চত্বরটা নিঝুম হয়ে গেছে। এক মেয়ে ফিসফিস করে বলল, "ন্যান্সির যেন না হয়।" সেই আওয়াজ যেন ভিড়ের শেষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছে গেল।

"আগের মতো কিছুই আর নেই," ওল্ড ম্যান ওয়ার্নার স্পষ্ট গলায় বললেন। "মানুষও আগের মতো নেই।"

মিস্টার গ্রেভস ছোট ডেভির কাগজ খুলে ধরলেন, সাদা। ভিড়ের মধ্যে একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল। ন্যান্সি আর বিল জুনিয়রও তাদের কাগজ উঁচিয়ে ধরল, দুজনেরই সাদা। ওরা হাসতে হাসতে ভিড়কে কাগজ দেখালো।

"টেসি," মিস্টার সামারস নিচু স্বরে ডাকলেন। বিল হাচিনসন তার স্ত্রীর হাত থেকে জোর করে কাগজটা ছিনিয়ে নিলেন। সেই চিরকুটের মাঝখানে একটা কুচকুচে কালো দাগ, মিস্টার সামারস আগের রাতে পেন্সিল দিয়ে যেটা এঁকেছিলেন। বিল হাচিনসন সেটা উঁচিয়ে ধরতেই ভিড়ের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।

"ঠিক আছে সবাই," মিস্টার সামারস বললেন। "চলো তাড়াতাড়ি শেষ করি।"

গ্রামের মানুষ অনেক নিয়মকানুন ভুলে গেলেও পাথর মারার কথা ভোলেনি। ছেলেদের সেই পাথরের স্তূপ তৈরিই ছিল। মাটিতেও এখানে-সেখানে পাথর পড়ে আছে। মিসেস ডেলাক্রোয়া এত বড় একটা পাথর তুললেন যে দুই হাত লাগল তার। মিসেস ডানবার হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, "আমি তো দৌড়াতে পারছি না, তোমরা যাও, আমি আসছি।" ছোট ডেভি হাচিনসনের হাতেও কেউ কয়েকটা নুড়ি পাথর ধরিয়ে দিল।

টেসি হাচিনসন এখন চত্বরের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে। গ্রামের মানুষ যখন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল, সে মরিয়া হয়ে হাত বাড়ালো। "এটা ঠিক না," সে বলতে চাইল। একটা পাথর তার মাথার পাশে এসে সজোরে লাগল।

ওল্ড ম্যান ওয়ার্নার চিৎকার করছেন, "জলদি, সবাই হাত চালাও!" স্টিভ অ্যাডামস আর মিসেস গ্রেভস সবার সামনে।

"এটা ঠিক না, এটা মোটেও ঠিক না," মিসেস হাচিনসন চিৎকার করতে লাগলেন, আর পরমুহূর্তেই সবাই হিংস্রভাবে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই ভুলে গেছে সবাই, শুধু জুলাই ভোলেনি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮


জুলাই কোটা আন্দোলনের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। গত দুই বছরে দেশে অনেক কিছু বদলেছে। সমাজের অনেক কুৎসিত দিক নতুন করে সামনে এসেছে। অনেক মানুষকে নতুন করে চেনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ ঈদের দ্বিতীয় দিন

লিখেছেন সামিয়া, ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৬



হঠাৎ বৃষ্টি নামছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন আজ।
আমি শ্বশুরবাড়ির বারান্দায় বসে আছি এক মগ কফি হাতে নিয়ে সামনে ভেজা আকাশ। বাতাসে কেমন কাঁচা মাটির গন্ধ। এই গন্ধটা অদ্ভুতভাবে মানুষকে অতীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এ ডিসেকশন অব এ স্করপিয়ন

লিখেছেন আদম_, ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ১০:৪২



একজন বৃ্শ্চিক জাতক গান ভালোবাসে- গান সব রাশির জাতকরাই ভালোবাসে, তবে বৃশ্চিকের চয়েসটা ভিন্ন। বৃশ্চিক ভালোবাসে কোয়ালিটি, জেনুইনটি, অথেনটিসিটি। আউল-ফাউল জিনিস বৃশ্চিককে গেলানো যাবেনা- বৃশ্চিক গলার্ধকরণ করেনা খেলোয়ার জাহান... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাতের আঁধারে কাঁদিছে যাঁহারা তাঁহাদের খোঁজ পিছে

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ৩০ শে মে, ২০২৬ রাত ১২:৪১

বিত্তবানের সুখের সায়রে দুঃখের তরী মিছে।
তাঁরা, যাঁহাদের কাছে শত সুখ আছে তাঁহাদের দাম দিছে।
রাতের আঁধারে কাঁদিছে যাঁহারা তাঁহাদের খোঁজ পিছে।
তাঁরা, যাঁহাদের ঠোঁট হাসিতে মাতিছে তাঁহাদের খোঁজ নিছে।
— শ্রাবণ আহমেদ ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফামস স্ট্যাচু অফ দ্যা টাউন মিউজিসিয়ান অফ ব্রেমেন

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ৩০ শে মে, ২০২৬ রাত ১:৫৬



দুই বছর আগে গিয়েছিলাম, জার্মানির ব্রেমেন শহরে। সেখানে গিয়ে দেখা হয়েছিল ছোটবেলায় গল্পে শোনা চরিত্র গুলোর সাথে। গল্পের সেই চরিত্রগুলোকে কেউ সাজিয়ে রেখেছে এভাবে এই শহরে, যাওয়ার আগে জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×