somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গ্যাস নিয়ে গ্যাসলাইটিং: কোনটা আসল সংকট, কোনটা কৃত্রিম?

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এই প্রশ্ন করলে সবাই একবাক্যে বলবেন গ্যাস সংকটের কথা। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, ফলে লোডশেডিং বেড়েছে বহুগুণ। কলকারখানা হোক বা বাসাবাড়ি, মানুষ কোথাও ঠিকমতো গ্যাস আর বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। কমপক্ষে দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও সমস্যার দৃশ্যমান কোনো সমাধান এখনো চোখে পড়ছে না। ফলে হতাশা আর অনিশ্চয়তা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ  সরকারকে বকে যাচ্ছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে জুন মাসে বাড়ানো বর্ধিত বিলের চাপ, আর বাজারে আগুন লাগার মতো ঘটনা। শাকসবজি সহ প্রায় সবকিছুর দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বেশিরভাগ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছেন। কিন্তু  পদত্যাগ করলেই কি সমাধান হয়ে যাবে? আসলে গ্যাস নিয়ে  কেন এই সংকট, আর কেনই বা সরকারের আচরণে একধরনের নির্লিপ্ত ভাব দেখা যাচ্ছে ? 

সরকারের দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশের একটা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লেগে সমস্যা হয়েছে। সেটা ঠিক করতে সময় লাগছে, আর গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। বাকি যা আছে তা দিয়ে সরবরাহ করে চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। আগস্ট মাসের বারো তারিখ পর্যন্ত সময় লাগবে বলে জানানো হচ্ছে গ্যাস সংকট সমাধান হতে।

সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র ছয় মাস হলো। এলএনজি টার্মিনাল কেন আরেকটা নেই, বা কীভাবে কী হচ্ছে, সেটা তাদের পুরোপুরি বোঝার কথা না। তবে জ্বালানি সচিবদের তো সবকিছু জানার কথা। সমস্যা হয়েছে ঠিক একই সময়ে, যখন পেট্রোবাংলা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখছিল। দেশের মানুষ যখন গ্যাসের তীব্র সংকটে ভুগছে, ঠিক তখনই পেট্রোবাংলা বলছে গ্যাসের দাম আরও বাড়ানো হোক। আগে ছিল শুধু বিদ্যুৎ, এখন সাথে যোগ হবে গ্যাসও। এই খবরে নেটিজেনরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন।

তাহলে কি কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা চলছে? পরে দেখলাম পেট্রোবাংলা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে। এদিকে এনসিপি নেতা নাহিদ নাকি পেট্রোবাংলা ঘেরাও দেবেন যদি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। এই ভয়েই কিনা পেট্রোবাংলা পিছিয়ে গেছে, সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে যেটা সন্দেহজনক , যখন গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে তখনই দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা। এটা কিন্তু সরকারকে বিপাকে ফেলার জন্য যথেষ্ট। গ্যাস সংকট সমাধান হওয়ার পরও তো দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব আসতে পারত।

এই ঘটনা যেন আমাদের গত মার্চ এপ্রিল মাসের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখন তীব্র ডিজেল , পেট্রোলের সংকটে যখন মানুষের লাইন বাড়তে থাকল, দাম বাড়ানোর পর থেকেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। গ্যাস বলি আর পেট্রোল/ ডিজেল বলি, সবকিছুর দামই ইরান যুদ্ধের কারণে বেড়েছে।  এলএনজির জন্য জি টু জি ভিত্তিতে চুক্তি ছিল, ফোর্স মেজার দেখিয়ে সেখান থেকে মার্চের পর  এলএনজি আসছে না। সরকার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি বেশি দামে কিনে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। এলএনজি কিনতে নাকি সরকারের প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে বলে বিভিন্ন মিডিয়াতে এসেছে।

ফলে আজ হোক বা কাল, সরকার গ্যাসের দাম ভোক্তা পর্যায়ে বাড়াবেই, এটা অনেকটাই অনুমান করা যায়। এখন থেকেই সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করা উচিত। গ্যাস আর বিদ্যুৎ দুটোরই দাম পরপর বাড়লে ছোট ব্যবসায়ী আর অনলাইন উদ্যোক্তাদের অবস্থা আরও খারাপ হবে। এলপিজি গ্যাসের দাম তো এমনিতেই বেশি। রেস্টুরেন্ট ব্যবসা থাকবে ঠিকই, কিন্তু মানুষ খাওয়ার সক্ষমতা হারাবে।

বাংলাদেশে এখন রেমিট্যান্সের জোয়ার চলছে। রপ্তানি থেকেও ডলার আসছে। রেপো রেট বেশি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা এলসি খুলছেন খুবই কম, ফলে ডলার তেমন খরচ হচ্ছে না। জনগণকে সুবিধার দেয়ার জন্য বেশি দামে গ্যাস কিনলে সমস্যা কোথায়? সরকার যে বাজেট ঘোষণা করেছে, রাজস্ব আদায় অনেক কমে যেতে পারে গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ালে। দরকার পড়লে ভর্তুকি বাড়িয়ে দিক, অন্তত গ্যাসটা মানুষ যেন ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ড প্রোগ্রাম এক দুই বছর পিছিয়ে দেয়া হউক । এই প্রোগ্রামের সময়টাই ভুল ভাবে বাছাই করা হয়েছে । একদিকে ইনফ্লেশন কমানোর চেষ্টা চলছে রেপো রেট বাড়িয়ে, অন্যদিকে বাজারে মানি সাপ্লাই বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। কোনো ইনকাম মাল্টিপ্লায়ার তো হচ্ছেই না, বরং আরও অর্থনীতি খারাপ হচ্ছে। এমন হাই ইনফ্লেশনের সময় নাকি আবার পে স্কেল দেবে। এটাও আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী পিছিয়ে দিক। মানুষকে একটু স্বস্তি কীভাবে দেয়া যায়, সরকারের সেই চেষ্টা করা দরকার। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল যেসব কারণে, সেসব ক্ষেত্রে ভালো কোনো পদক্ষেপ দেখছি না।

বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকার সাধারণ মানুষের পকেট কেটে প্রিপেইড মিটারের অস্বাভাবিক রেন্ট চার্জ প্রথমে ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ এবং পরবর্তীতে এক লাফে ২০০ টাকায় উন্নীত করে। এই যে জোরজুলুম করে মিটার রেন্ট চার্জ আদায় করা হচ্ছিল, মানুষ তা থেকে মুক্তি চেয়েছিল। শুধু মিটার রেন্টেই ক্ষান্ত হয়নি, ২০২৩ সালে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দামও ১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা করা হয়।

অন্যদিকে পেট্রোবাংলা হিসাব দেখাচ্ছে যে প্রতি ইউনিটে তাদের খরচ নাকি প্রায় ২৯ টাকা , সরকারকে তাই বিশাল ভর্তুকি গুণতে হচ্ছে। প্রিপেইড মিটার বসানোর পর যেখানে গ্রাহকের বিল বকেয়া থাকার সুযোগই নেই, সেখানে বছরের পর বছর ধরে জ্বালানি খাতের এই বিপুল লোকসান আসলে কোথায় যাচ্ছে, নাকি চুরি ও অপচয়ের দায়ভার সাধারণ মানুষের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে?

পত্রিকা: 'গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেট্রোবাংলার-বিবিসি বাংলা

গ্যাসের দাম বাড়ালে পেট্রোবাংলা অবরোধের হুঁশিয়ারি এনসিপির- ইত্তেফাক ডিজিটাল ডেস্ক


সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৩
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই আন্দোলনের সম্ভাবনাময়, রৌদ্রোজ্জ্বল মুখগুলো ডানপন্থার অনুরাগী হচ্ছে! দায় কার?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৩



জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সেই আইকনিক ফটো--যেখানে দেখা যাচ্ছিল একটা ভার্সিটির ফাস্ট কি সেকেন্ড ইয়ারের মেয়ে পুলিশের গাড়ি আটকাচ্ছে, ওর ভার্সিটির এক বড় ভাইকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে বিলের কোনো রসিদ নেই

লিখেছেন রাজসোহান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৪



ঢাকার পাইপলাইন গ্রাহকদের একটা বড় অংশ এই জুলাইয়ে জানিয়েছেন, দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টার বেশি গ্যাস তাঁরা পান না। সেই এক-দুই ঘণ্টাও আসে গভীর রাতে কিংবা ভোরের আগে। ফলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি।

একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট : পর্ব- ১

ভুমিকা
১.১ গবেষণার পটভূমি
একবিংশ শতাব্দীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্রদলকে সামলাতে না পারলে ক্যাম্পাসগুলো সহিংসতায় পূর্ণ হবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮


রাতে রংপুর, সকালে জগন্নাথ। আজকে জগন্নাথে ছাত্রদলের হামলার শিকার একযোগে সব বিরোধী দল। এসব কি ছাত্রদলের কাজ? নাকি ছাত্রদলের ভেতর ছাত্রলীগ প্রবেশ করেছে? জকসু জিএসের জীবন আশংকাজনক। দেশে যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস নিয়ে গ্যাসলাইটিং: কোনটা আসল সংকট, কোনটা কৃত্রিম?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২১


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এই প্রশ্ন করলে সবাই একবাক্যে বলবেন গ্যাস সংকটের কথা। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, ফলে লোডশেডিং বেড়েছে বহুগুণ। কলকারখানা হোক বা বাসাবাড়ি, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×