somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে ?

৩০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গত রোজার ঈদে বাংলাদেশে একটা সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল, নাম "বনলতা এক্সপ্রেস"। হুমায়ূন আহমেদের "কিছুক্ষণ" উপন্যাস অবলম্বনে বানানো, মোশাররফ করিম আর চঞ্চল চৌধুরীর মতো মানুষরা অভিনয় করেছেন। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া, সম্পূর্ণ পারিবারিক একটা ছবি। মুক্তির মাত্র আঠারো দিনে এক লাখেরও বেশি মানুষ দেখেছে। সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা সবখানে হাউসফুল। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সফল ছবি হিসেবে নাম লিখিয়েছে। শুধু একটাই জায়গায় ব্যতিক্রম ছিল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সেখানকার মানুষ ছবিটা দেখতে পারেনি, কারণ দেখার জায়গাটাই আর নেই।

একসময় এই জেলার নয়টি উপজেলায় পনেরোটি সিনেমা হল ছিল। সবকটি এখন বন্ধ। পুরো একটা জেলার মানুষ ঈদে সিনেমা দেখতে পারেনি, কারণ হলটাই নেই। এই পরিস্থিতিতে "ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি"র কিছু তরুণ ভাবল, হল না থাকলে কী হবে, ঈদুল আজহায় বিকল্প একটা ব্যবস্থা করা যাক। স্কুলের মাঠে সিনেমা দেখানোর উদ্যোগ নিল। অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হলো, তারিখও ঠিক হলো। "ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা" নামে এরকম প্রদর্শনী তারা নিয়মিতই করে, কোনো টিকিট নেই, কোনো বাণিজ্য নেই, শুধু সিনেমা দেখা।

কিন্তু বিপত্তি ঘটল ফেসবুকে। জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের কিছু ছাত্র পোস্ট দিল যে এই সিনেমা দেখানো যাবে না। পোস্টারে ক্রস চিহ্ন দিয়ে প্রচারণা চলল। সিনেমার নির্মাতা তানিম নূর, যার নিজের পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। স্পষ্ট জানালেন যে সেন্সর পাওয়া যেকোনো ছবি দেশের যেকোনো প্রান্তে দেখানো বৈধ অধিকার। কিন্তু সেই কথায় কেউ কান দিল না। জেলা প্রশাসক বললেন পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে। প্রদর্শনী স্থগিত। প্রধান শিক্ষকও ভয় পেয়ে অনুমতি বাতিল করলেন। আর তথ্য মন্ত্রণালয় চুপ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় চুপ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের নবনির্বাচিত বিএনপির এমপিও পুরোপুরি নীরব।

এখানে একটু থামা দরকার। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মানে কী সেটা যারা জানেন না, তাদের জন্য বলছি। এই সেই মাটি যেখান থেকে উঠে এসেছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁ, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁর মতো ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বকালের সেরা সংগীতজ্ঞরা। এখানে জন্মেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ, যার "তিতাস একটি নদীর নাম" নিয়ে ঋত্বিক ঘটক কালজয়ী সিনেমা বানিয়েছেন। কবি আল মাহমুদ আর কায়কোবাদের মাটি এটা। সারা বিশ্বে এই জেলা পরিচিত ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে। সেই মাটিতে আজ হুমায়ূন আহমেদের গল্পের একটা সাধারণ সিনেমাও দেখানো যাচ্ছে না।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সাহস এলো কোথা থেকে? এটা কি হঠাৎ হলো? মোটেই না। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলো এদের স্রেফ ভোটব্যাংক হিসেবে পুষেছে, সুবিধা দিয়েছে আর মাথায় তুলে নাচিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে আগে ছিল আওয়ামী লীগের এমপি, এখন বিএনপির এমপি, কিন্তু মানসিকতার কোনো বদল নেই। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রাইমারি স্কুলের পরিচালনা কমিটিতে একজন মাদ্রাসা শিক্ষক রাখা বাধ্যতামূলক করেছে। আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত জেলা কমিটিতেও মাদ্রাসার প্রতিনিধি রাখার বিধান জারি করেছে। যেখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই এমন তোষণ চলে, সেখানে সিনেমা হল বন্ধ হবে না তো কী হবে?

শেখ হাসিনা সারাদেশে চৌষট্টি জেলায় আড়াইশোটি মডেল মসজিদ বানিয়েছেন। অথচ তিনশোটি সংসদীয় আসনে যদি একটা করেও আধুনিক সিনেমা হল বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বানাতেন, তাহলে আজকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষকে স্কুলের মাঠে সিনেমা দেখতে যেতে হতো না, আর সেই মাঠ থেকেও এভাবে তাড়া খেতে হতো না। তিনি ২০১৬ সালে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্সের সমমান দিয়েছেন, পাঠ্যবই থেকে বাদ দিয়েছেন অসাম্প্রদায়িক লেখা। ফল এখন চোখের সামনে।

যে মাটি থেকে একদিন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সুরের মূর্ছনা বিশ্বজয় করেছিল, আজ সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াই নিজের চত্বরে সংস্কৃতির ন্যূনতম আলোটুকু থেকে বঞ্চিত। একটি সুস্থ পারিবারিক সিনেমা প্রদর্শনের আয়োজনও যেখানে স্রেফ কয়েকটা ফেসবুক পোস্টের দীর্ঘশ্বাসে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখানে সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব কতটা প্রকট তা সহজেই অনুমেয়। অথচ এই সাংস্কৃতিক স্থবিরতা নিয়ে স্থানীয় এমপি নীরব, দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলো নির্বাক এবং জেলা প্রশাসন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ভয়ে পিছু হঠছে।

প্রায়শই গণমাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষকে সামান্য বিষয় নিয়ে দাঙ্গায় জড়াতে দেখে যারা অবাক হন, তারা আসলে সমস্যার উপরিভাগটাই দেখছেন। সুস্থ বিনোদন ও মননশীলতার চর্চা যখন একটি সমাজে হারিয়ে যায়, তখন মানুষের ভেতরের ক্ষোভ আর শক্তি নেতিবাচক পথে চালিত হয়। প্রগতির দরজা বন্ধ করে দিলে সমাজ যে সহিংসতা আর অন্ধকারের দিকেই ধাবিত হবে বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া তারই এক নির্মম উদাহরণ।

সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই ভুলে গেছে সবাই, শুধু জুলাই ভোলেনি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮


জুলাই কোটা আন্দোলনের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। গত দুই বছরে দেশে অনেক কিছু বদলেছে। সমাজের অনেক কুৎসিত দিক নতুন করে সামনে এসেছে। অনেক মানুষকে নতুন করে চেনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ ঈদের দ্বিতীয় দিন

লিখেছেন সামিয়া, ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৬



হঠাৎ বৃষ্টি নামছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন আজ।
আমি শ্বশুরবাড়ির বারান্দায় বসে আছি এক মগ কফি হাতে নিয়ে সামনে ভেজা আকাশ। বাতাসে কেমন কাঁচা মাটির গন্ধ। এই গন্ধটা অদ্ভুতভাবে মানুষকে অতীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এ ডিসেকশন অব এ স্করপিয়ন

লিখেছেন আদম_, ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ১০:৪২



একজন বৃ্শ্চিক জাতক গান ভালোবাসে- গান সব রাশির জাতকরাই ভালোবাসে, তবে বৃশ্চিকের চয়েসটা ভিন্ন। বৃশ্চিক ভালোবাসে কোয়ালিটি, জেনুইনটি, অথেনটিসিটি। আউল-ফাউল জিনিস বৃশ্চিককে গেলানো যাবেনা- বৃশ্চিক গলার্ধকরণ করেনা খেলোয়ার জাহান... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাতের আঁধারে কাঁদিছে যাঁহারা তাঁহাদের খোঁজ পিছে

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ৩০ শে মে, ২০২৬ রাত ১২:৪১

বিত্তবানের সুখের সায়রে দুঃখের তরী মিছে।
তাঁরা, যাঁহাদের কাছে শত সুখ আছে তাঁহাদের দাম দিছে।
রাতের আঁধারে কাঁদিছে যাঁহারা তাঁহাদের খোঁজ পিছে।
তাঁরা, যাঁহাদের ঠোঁট হাসিতে মাতিছে তাঁহাদের খোঁজ নিছে।
— শ্রাবণ আহমেদ ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফামস স্ট্যাচু অফ দ্যা টাউন মিউজিসিয়ান অফ ব্রেমেন

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ৩০ শে মে, ২০২৬ রাত ১:৫৬



দুই বছর আগে গিয়েছিলাম, জার্মানির ব্রেমেন শহরে। সেখানে গিয়ে দেখা হয়েছিল ছোটবেলায় গল্পে শোনা চরিত্র গুলোর সাথে। গল্পের সেই চরিত্রগুলোকে কেউ সাজিয়ে রেখেছে এভাবে এই শহরে, যাওয়ার আগে জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×