somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গার্মেন্টসের ভিতরে লুকানো বাস্তবতা—যা আমরা কখনো দেখি না

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সকাল ৬টা। ঘুম ভাঙার আগেই যেন জীবন তাকে টেনে তোলে। রহিমা চোখ খুলেই কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়—
আরেকটা দিন, আবার সেই একই লড়াই।

রহিমা একজন গার্মেন্টস কর্মী। বয়স মাত্র ২২, কিন্তু মুখে ক্লান্তির রেখা যেন ৪০ ছুঁয়ে গেছে। ঢাকার এক বস্তিতে তার ছোট্ট ঘর—মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে তার সংসার। বাবা ছিলেন রিকশাচালক, তিন বছর আগে এক দুর্ঘটনায় চলে গেছেন। তখন থেকেই সংসারের হাল ধরেছে রহিমা।

চুলে তেল দেওয়ার সময়টুকুও আজকাল বিলাসিতা মনে হয়। তাড়াহুড়ো করে মুখে পানি দিয়ে, একটা পুরোনো শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়ে। সকালের নাস্তা? বেশিরভাগ দিনই সময় হয় না। একটা শুকনো রুটি পলিথিনে নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়—কারখানায় গিয়ে খাবে ভেবে।

বাসে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ পাশের একজন বলে ওঠে,
—এই জীবন কবে শেষ হবে বলো তো?
রহিমা শুধু মৃদু হেসে দেয়। উত্তরটা তারও জানা নেই।

কারখানায় ঢুকতেই শুরু হয় অন্য এক জগৎ। শত শত সেলাই মেশিন একসাথে চলছে—যেন শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। সুপারভাইজারের কড়া নজর, টার্গেটের চাপ, সময়ের হিসাব—সব মিলিয়ে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ।

রহিমার কাজ হলো শার্টের বোতাম লাগানো। দিনে প্রায় ৮০০-১০০০ পিস শেষ করতে হয়। হাতের আঙুলে কেটে গেছে অনেকবার, কিন্তু থামার সুযোগ নেই। একটু দেরি হলেই বকা, কখনো কখনো বেতন কাটাও।

দুপুরে ৩০ মিনিটের বিরতি। সেই সময়টুকুতে সে ব্যাগ থেকে শুকনো রুটিটা বের করে। পাশে বসা সহকর্মী সুমি জিজ্ঞেস করে,
—তুই কিছু খাস না কেন?
রহিমা হেসে বলে,
—বাড়িতে মা আর ভাইয়ের জন্য একটু বেশি রাখতে হয়।

কথাটা শুনে সুমি চুপ হয়ে যায়। কারণ এই গল্পটা শুধু রহিমার না—এই কারখানার প্রায় সবারই।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, তারপর রাত। ওভারটাইম ছাড়া বেতন দিয়ে সংসার চলে না। তাই রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করাটা এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। চোখ জ্বালা করে, মাথা ব্যথা করে—তবুও মেশিন থামে না।

একদিন হঠাৎ রহিমার হাত মেশিনে কেটে যায়। রক্ত বের হতে থাকে। সে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু সুপারভাইজার বলে,
—এতো ছোট কাটা! কাজ চালাও, টার্গেট মিস করা যাবে না।

রহিমা কিছু বলে না। শুধু মনে মনে ভাবে—“আমার ব্যথার দাম কি সত্যিই এত কম?”

রাত ১১টার দিকে বাড়ি ফেরে। দরজা খুলতেই ছোট ভাই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে,
—“আপা, আজকে আমি ক্লাসে প্রথম হয়েছি!”
এই একটা মুহূর্তেই যেন সব ক্লান্তি ভুলে যায় সে। চোখে পানি আসে, কিন্তু মুখে হাসি।

মা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। চোখে গর্ব আর কষ্ট—দুটোই মিশে আছে।

ঘুমানোর আগে রহিমা ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবে—
“আমার জীবন কি শুধু এই মেশিনের শব্দেই শেষ হয়ে যাবে? নাকি কোনো একদিন আমিও একটু শান্তি পাব?”

কিন্তু প্রশ্নের উত্তর আসে না।
শুধু ভোর হয়… আবার নতুন দিন শুরু হয়…
আর সেলাই মেশিনের শব্দে ঢাকা পড়ে যায় হাজারো রহিমার না বলা গল্প।

আমরা যখন নতুন জামা কিনে খুশি হই, তখন হয়তো একবারও ভাবি না—এই জামার প্রতিটি সেলাইয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে কারো না বলা কষ্ট, না ফেরা স্বপ্ন, আর অসংখ্য ত্যাগের গল্প।সকাল ৬টা। ঘুম ভাঙার আগেই যেন জীবন তাকে টেনে তোলে। রহিমা চোখ খুলেই কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়—আরেকটা দিন, আবার সেই একই লড়াই।

রহিমা একজন গার্মেন্টস কর্মী। বয়স মাত্র ২২, কিন্তু মুখে ক্লান্তির রেখা যেন ৪০ ছুঁয়ে গেছে। ঢাকার এক বস্তিতে তার ছোট্ট ঘর—মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে তার সংসার। বাবা ছিলেন রিকশাচালক, তিন বছর আগে এক দুর্ঘটনায় চলে গেছেন। তখন থেকেই সংসারের হাল ধরেছে রহিমা।

চুলে তেল দেওয়ার সময়টুকুও আজকাল বিলাসিতা মনে হয়। তাড়াহুড়ো করে মুখে পানি দিয়ে, একটা পুরোনো শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়ে। সকালের নাস্তা? বেশিরভাগ দিনই সময় হয় না। একটা শুকনো রুটি পলিথিনে নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়—কারখানায় গিয়ে খাবে ভেবে।

বাসে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ পাশের একজন বলে ওঠে,
—এই জীবন কবে শেষ হবে বলো তো?
রহিমা শুধু মৃদু হেসে দেয়। উত্তরটা তারও জানা নেই।

কারখানায় ঢুকতেই শুরু হয় অন্য এক জগৎ। শত শত সেলাই মেশিন একসাথে চলছে—যেন শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। সুপারভাইজারের কড়া নজর, টার্গেটের চাপ, সময়ের হিসাব—সব মিলিয়ে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ।

রহিমার কাজ হলো শার্টের বোতাম লাগানো। দিনে প্রায় ৮০০-১০০০ পিস শেষ করতে হয়। হাতের আঙুলে কেটে গেছে অনেকবার, কিন্তু থামার সুযোগ নেই। একটু দেরি হলেই বকা, কখনো কখনো বেতন কাটাও।

দুপুরে ৩০ মিনিটের বিরতি। সেই সময়টুকুতে সে ব্যাগ থেকে শুকনো রুটিটা বের করে। পাশে বসা সহকর্মী সুমি জিজ্ঞেস করে,
—তুই কিছু খাস না কেন?
রহিমা হেসে বলে,
—বাড়িতে মা আর ভাইয়ের জন্য একটু বেশি রাখতে হয়।

কথাটা শুনে সুমি চুপ হয়ে যায়। কারণ এই গল্পটা শুধু রহিমার না—এই কারখানার প্রায় সবারই।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, তারপর রাত। ওভারটাইম ছাড়া বেতন দিয়ে সংসার চলে না। তাই রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করাটা এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। চোখ জ্বালা করে, মাথা ব্যথা করে—তবুও মেশিন থামে না।

একদিন হঠাৎ রহিমার হাত মেশিনে কেটে যায়। রক্ত বের হতে থাকে। সে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু সুপারভাইজার বলে,
—এতো ছোট কাটা! কাজ চালাও, টার্গেট মিস করা যাবে না।

রহিমা কিছু বলে না। শুধু মনে মনে ভাবে—“আমার ব্যথার দাম কি সত্যিই এত কম?”

রাত ১১টার দিকে বাড়ি ফেরে। দরজা খুলতেই ছোট ভাই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে,
—“আপা, আজকে আমি ক্লাসে প্রথম হয়েছি!”
এই একটা মুহূর্তেই যেন সব ক্লান্তি ভুলে যায় সে। চোখে পানি আসে, কিন্তু মুখে হাসি।

মা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। চোখে গর্ব আর কষ্ট—দুটোই মিশে আছে।

ঘুমানোর আগে রহিমা ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবে—
“আমার জীবন কি শুধু এই মেশিনের শব্দেই শেষ হয়ে যাবে? নাকি কোনো একদিন আমিও একটু শান্তি পাব?”

কিন্তু প্রশ্নের উত্তর আসে না।
শুধু ভোর হয়… আবার নতুন দিন শুরু হয়…
আর সেলাই মেশিনের শব্দে ঢাকা পড়ে যায় হাজারো রহিমার না বলা গল্প।

আমরা যখন নতুন জামা কিনে খুশি হই, তখন হয়তো একবারও ভাবি না—এই জামার প্রতিটি সেলাইয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে কারো না বলা কষ্ট, না ফেরা স্বপ্ন, আর অসংখ্য ত্যাগের গল্প।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৫৩
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের ওভারব্রীজ

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৪

বেশ অনেকদিন আগের কথা। আমি কোন এক দুর্ঘটনায় পা এ ব্যাথা পাই। হাসপাতালে ইমারজেন্সি চিকিৎসা নেই। কিন্তু সুস্থ হতে আরো অনেক দেরী। সম্ভবত চিটাগাং রোডে (নারায়ণগঞ্জ) এ রাস্তা পার হবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৈচিত্রে ভরা মহাবিশ্ব, তবে মানুষ কেন একই রকম হবে?

লিখেছেন মিশু মিলন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৩৯



এবার শেখরনগর কালীপূজার মেলায় গিয়ে সন্ধ্যার পর ভাগ্নি আর এক দাদার মেয়েকে বললাম, ‘চল, তোদের অন্য এক জীবন দেখাই।’
সরু গলি দিয়ে ওদেরকে নিয়ে গেলাম পিছনদিকে যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি দাঁড়ানো সম্ভব নয়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:১৫


ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন , তখন তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের ক্লান্ত অভিমান। একটা মুসলিম দেশ, কোটি কোটি মুসলিম মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহর সুন্নাতের পরিবর্তে রাসূলের (সা.) বিভিন্ন মতের অনুমোদন সংক্রান্ত হাদিস বাতিল হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৭



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ৪৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৪৩। পৃথিবীতে অহংকার প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে (অকল্যাণ)।কূট ষড়যন্ত্র এর আহলকে(এর সাথে সংযুক্ত সকল ব্যক্তি) পরিবেষ্ঠন করে। তবে কি এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।
ইউনূস ক্ষমতা দখল ছিল লুটের উদ্দেশ্যে। কেন শিশুদের টিকা দেয়া হয় নাই? তাদের দায়িত্ব ছিল টিকা পৌঁছে দেওয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×