
সকাল ৬টা। ঘুম ভাঙার আগেই যেন জীবন তাকে টেনে তোলে। রহিমা চোখ খুলেই কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়—
আরেকটা দিন, আবার সেই একই লড়াই।
রহিমা একজন গার্মেন্টস কর্মী। বয়স মাত্র ২২, কিন্তু মুখে ক্লান্তির রেখা যেন ৪০ ছুঁয়ে গেছে। ঢাকার এক বস্তিতে তার ছোট্ট ঘর—মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে তার সংসার। বাবা ছিলেন রিকশাচালক, তিন বছর আগে এক দুর্ঘটনায় চলে গেছেন। তখন থেকেই সংসারের হাল ধরেছে রহিমা।
চুলে তেল দেওয়ার সময়টুকুও আজকাল বিলাসিতা মনে হয়। তাড়াহুড়ো করে মুখে পানি দিয়ে, একটা পুরোনো শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়ে। সকালের নাস্তা? বেশিরভাগ দিনই সময় হয় না। একটা শুকনো রুটি পলিথিনে নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়—কারখানায় গিয়ে খাবে ভেবে।
বাসে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ পাশের একজন বলে ওঠে,
—এই জীবন কবে শেষ হবে বলো তো?
রহিমা শুধু মৃদু হেসে দেয়। উত্তরটা তারও জানা নেই।
কারখানায় ঢুকতেই শুরু হয় অন্য এক জগৎ। শত শত সেলাই মেশিন একসাথে চলছে—যেন শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। সুপারভাইজারের কড়া নজর, টার্গেটের চাপ, সময়ের হিসাব—সব মিলিয়ে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ।
রহিমার কাজ হলো শার্টের বোতাম লাগানো। দিনে প্রায় ৮০০-১০০০ পিস শেষ করতে হয়। হাতের আঙুলে কেটে গেছে অনেকবার, কিন্তু থামার সুযোগ নেই। একটু দেরি হলেই বকা, কখনো কখনো বেতন কাটাও।
দুপুরে ৩০ মিনিটের বিরতি। সেই সময়টুকুতে সে ব্যাগ থেকে শুকনো রুটিটা বের করে। পাশে বসা সহকর্মী সুমি জিজ্ঞেস করে,
—তুই কিছু খাস না কেন?
রহিমা হেসে বলে,
—বাড়িতে মা আর ভাইয়ের জন্য একটু বেশি রাখতে হয়।
কথাটা শুনে সুমি চুপ হয়ে যায়। কারণ এই গল্পটা শুধু রহিমার না—এই কারখানার প্রায় সবারই।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, তারপর রাত। ওভারটাইম ছাড়া বেতন দিয়ে সংসার চলে না। তাই রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করাটা এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। চোখ জ্বালা করে, মাথা ব্যথা করে—তবুও মেশিন থামে না।
একদিন হঠাৎ রহিমার হাত মেশিনে কেটে যায়। রক্ত বের হতে থাকে। সে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু সুপারভাইজার বলে,
—এতো ছোট কাটা! কাজ চালাও, টার্গেট মিস করা যাবে না।
রহিমা কিছু বলে না। শুধু মনে মনে ভাবে—“আমার ব্যথার দাম কি সত্যিই এত কম?”
রাত ১১টার দিকে বাড়ি ফেরে। দরজা খুলতেই ছোট ভাই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে,
—“আপা, আজকে আমি ক্লাসে প্রথম হয়েছি!”
এই একটা মুহূর্তেই যেন সব ক্লান্তি ভুলে যায় সে। চোখে পানি আসে, কিন্তু মুখে হাসি।
মা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। চোখে গর্ব আর কষ্ট—দুটোই মিশে আছে।
ঘুমানোর আগে রহিমা ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবে—
“আমার জীবন কি শুধু এই মেশিনের শব্দেই শেষ হয়ে যাবে? নাকি কোনো একদিন আমিও একটু শান্তি পাব?”
কিন্তু প্রশ্নের উত্তর আসে না।
শুধু ভোর হয়… আবার নতুন দিন শুরু হয়…
আর সেলাই মেশিনের শব্দে ঢাকা পড়ে যায় হাজারো রহিমার না বলা গল্প।
আমরা যখন নতুন জামা কিনে খুশি হই, তখন হয়তো একবারও ভাবি না—এই জামার প্রতিটি সেলাইয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে কারো না বলা কষ্ট, না ফেরা স্বপ্ন, আর অসংখ্য ত্যাগের গল্প।সকাল ৬টা। ঘুম ভাঙার আগেই যেন জীবন তাকে টেনে তোলে। রহিমা চোখ খুলেই কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়—আরেকটা দিন, আবার সেই একই লড়াই।
রহিমা একজন গার্মেন্টস কর্মী। বয়স মাত্র ২২, কিন্তু মুখে ক্লান্তির রেখা যেন ৪০ ছুঁয়ে গেছে। ঢাকার এক বস্তিতে তার ছোট্ট ঘর—মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে তার সংসার। বাবা ছিলেন রিকশাচালক, তিন বছর আগে এক দুর্ঘটনায় চলে গেছেন। তখন থেকেই সংসারের হাল ধরেছে রহিমা।
চুলে তেল দেওয়ার সময়টুকুও আজকাল বিলাসিতা মনে হয়। তাড়াহুড়ো করে মুখে পানি দিয়ে, একটা পুরোনো শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়ে। সকালের নাস্তা? বেশিরভাগ দিনই সময় হয় না। একটা শুকনো রুটি পলিথিনে নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়—কারখানায় গিয়ে খাবে ভেবে।
বাসে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ পাশের একজন বলে ওঠে,
—এই জীবন কবে শেষ হবে বলো তো?
রহিমা শুধু মৃদু হেসে দেয়। উত্তরটা তারও জানা নেই।
কারখানায় ঢুকতেই শুরু হয় অন্য এক জগৎ। শত শত সেলাই মেশিন একসাথে চলছে—যেন শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। সুপারভাইজারের কড়া নজর, টার্গেটের চাপ, সময়ের হিসাব—সব মিলিয়ে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ।
রহিমার কাজ হলো শার্টের বোতাম লাগানো। দিনে প্রায় ৮০০-১০০০ পিস শেষ করতে হয়। হাতের আঙুলে কেটে গেছে অনেকবার, কিন্তু থামার সুযোগ নেই। একটু দেরি হলেই বকা, কখনো কখনো বেতন কাটাও।
দুপুরে ৩০ মিনিটের বিরতি। সেই সময়টুকুতে সে ব্যাগ থেকে শুকনো রুটিটা বের করে। পাশে বসা সহকর্মী সুমি জিজ্ঞেস করে,
—তুই কিছু খাস না কেন?
রহিমা হেসে বলে,
—বাড়িতে মা আর ভাইয়ের জন্য একটু বেশি রাখতে হয়।
কথাটা শুনে সুমি চুপ হয়ে যায়। কারণ এই গল্পটা শুধু রহিমার না—এই কারখানার প্রায় সবারই।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, তারপর রাত। ওভারটাইম ছাড়া বেতন দিয়ে সংসার চলে না। তাই রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করাটা এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। চোখ জ্বালা করে, মাথা ব্যথা করে—তবুও মেশিন থামে না।
একদিন হঠাৎ রহিমার হাত মেশিনে কেটে যায়। রক্ত বের হতে থাকে। সে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু সুপারভাইজার বলে,
—এতো ছোট কাটা! কাজ চালাও, টার্গেট মিস করা যাবে না।
রহিমা কিছু বলে না। শুধু মনে মনে ভাবে—“আমার ব্যথার দাম কি সত্যিই এত কম?”
রাত ১১টার দিকে বাড়ি ফেরে। দরজা খুলতেই ছোট ভাই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে,
—“আপা, আজকে আমি ক্লাসে প্রথম হয়েছি!”
এই একটা মুহূর্তেই যেন সব ক্লান্তি ভুলে যায় সে। চোখে পানি আসে, কিন্তু মুখে হাসি।
মা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। চোখে গর্ব আর কষ্ট—দুটোই মিশে আছে।
ঘুমানোর আগে রহিমা ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবে—
“আমার জীবন কি শুধু এই মেশিনের শব্দেই শেষ হয়ে যাবে? নাকি কোনো একদিন আমিও একটু শান্তি পাব?”
কিন্তু প্রশ্নের উত্তর আসে না।
শুধু ভোর হয়… আবার নতুন দিন শুরু হয়…
আর সেলাই মেশিনের শব্দে ঢাকা পড়ে যায় হাজারো রহিমার না বলা গল্প।
আমরা যখন নতুন জামা কিনে খুশি হই, তখন হয়তো একবারও ভাবি না—এই জামার প্রতিটি সেলাইয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে কারো না বলা কষ্ট, না ফেরা স্বপ্ন, আর অসংখ্য ত্যাগের গল্প।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


