৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ
পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির কথা তার হঠাৎ মনে পড়ল। ক্লারা বোকা নয়। সে খুব ভালো করেই লক্ষ্য করেছিল, প্রথম দেখায় অফিসারটি কীভাবে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল এবং কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে কীভাবে চোরের মতো বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিল। ক্লারা পুরো ব্যাপারটায় বেশ মজাই পেয়েছে। লোকটার চেহারায় একটা সুন্দর কমনীয়তা আছে—রুক্ষ বা উদ্ধত পুরুষালী ভাব নয়, বরং একটু কমবয়সী শান্ত ছেলেদের মতো একটা নরম ভাব আছে। তাছাড়া লোকটা কাজের বাইরে একটাও বাড়তি কথা বলেনি বা কোনো সস্তা ফ্লার্ট করার চেষ্টা করেনি, এই দূরত্ব বজায় রাখার সচেতন ভদ্রতাটুকু ক্লারার বেশ ভালো লেগেছে।
গতকাল বিদায় নেওয়ার সময় শামিত তাকে একটা স্লিপ বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিল, “মিস ক্লারা, আপনার অ্যাকাউন্ট সচল হয়েছে, তবে সিকিউরিটির জন্য একটা ফাইনাল ভেরিফিকেশন বাকি আছে। তবে সেজন্য আপনার কষ্ট করে আর ব্যাংকে আসতে হবে না, আমাদের কলসেন্টারে আগামীকাল একটা ফোন করলেই ওরা সাথে সাথে সমাধান করে দেবে।”
ক্লারার মতো একজন স্মার্ট মেয়ের জন্য ওই ফোনকলটা করা দুই মিনিটের ব্যাপার মাত্র। অথচ, ঠিক দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিটে, লাঞ্চ ব্রেকে ক্লারা নিজেকে আবিষ্কার করল ক্যাভেনডিশ ব্যাংকের অটোমেটিক কাচের দরজার সামনে। সে নিজেই ভালো করে জানে না কেন সে কলসেন্টারে ফোন না করে সরাসরি এখানে হেঁটে চলে এসেছে। ইলি শহরের ছোট ছোট পাথরে বাঁধানো রাস্তা ধরে হেঁটে আসতে আসতে সে নিজেকেই প্রশ্ন করছিল—তাহলে কি তার নিজের মনস্তত্ত্বের গভীরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম কৌতূহল তৈরি হয়েছে? এক অচেনা তরুণ ব্যাংকারের চাহনিতে দেখা অকৃত্রিম মুগ্ধতা কি তাকে অবচেতনেই টেনে আনল?
ব্যাংকের ভেতরে ঢুকে সে আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা চলে গেল শামিতের কর্নার ডেস্কে।
শামিত তখন মাত্রই একটা পেপার ব্যাগ থেকে তার লাঞ্চের ঠান্ডা স্যান্ডউইচটা বের করে একটা কামড় বসাবে ভাবছিল। ঠিক সেসময়ই ডেস্কে ছায়া দেখে সামনে তাকিয়ে সে যেন আকাশ থেকে পড়ল! দ্বিতীয়বারের মতো তার হৃৎপিণ্ডটা একটা বড়সড় লাফ দিল। যে মেয়েটিকে সে মন থেকে তাড়ানোর জন্য গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে নিজেকে নানারকম যুক্তি-তর্ক দিয়ে প্রবোধ দিচ্ছিল, সে কি না ঠিক পরদিনই আবার তার সামনে হাজির! তাও আবার সোজা তার ডেস্কে এসে দাঁড়িয়েছে!
“হাই মিস্টার শামিত,” ক্লারা ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল। “ভাবলাম ফোন করার চেয়ে সামনাসামনি এসে বাকি কাজটা শেষ করাই ভালো হবে।”
শামিতের মনে হলো তার সারা শরীর দিয়ে একটা বরফ-ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে এল। একজন মানুষ ফোনের সহজ উপায় ছেড়ে কেন ব্যাংকে হেঁটে আসবে, তাও আবার সরাসরি তার কাছেই? তার মানে... তার মানে কি মেয়েটারও তাকে মনে ধরেছে? এটা কি আদৌ সম্ভব? ইউরোপের এক রূপসী শ্বেতাঙ্গ তরুণী তার মতো এক তুচ্ছ, অতি সাধারণ বাঙালি যুবকের প্রতি আকৃষ্ট হবে?
ক্লারা কিন্তু আজ বেশ সহজ আর প্রাণবন্ত। সে টেবিলের ওপার থেকে শামিতকে জিজ্ঞেস করল, “বাই দ্য ওয়ে মিস্টার শামিত, তুমি কি ইলিতে নতুন? আগে তো দেখিনি।”
“হ্যাঁ, মাস ছয়েক হলো এই চাকরিতে জয়েন করেছি,” শামিত কোনোমতে নিজের স্বাভাবিক গলা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে বলল।
“ওহ, আচ্ছা। থাকো কোথায়? ইলিতেই?”
“না, শহরের ভেতরে তো বাড়িভাড়া খুব চড়া। তাই একটু বাইরে একটা গ্রামে থাকি—সোহাম।”
“আই সি! সোহাম বেশ সুন্দর আর শান্ত জায়গা। যাই হোক, থ্যাঙ্কস অ্যাগেইন!”
ক্লারা সিট থেকে উঠে দাঁড়াল, আবারও সেই চোখধাঁধানো সবুজাভ চোখের হাসিটা দিল, তারপর হালকা পায়ে হেঁটে বের হয়ে গেল ব্যাংক থেকে। শামিত ডেস্কে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। চারপাশের কাস্টমারদের গুঞ্জন, সহকর্মীদের কিবোর্ডের খটখট শব্দ—সব যেন দূরে কোথাও হারিয়ে গেল। তার চেনা ছকবাঁধা পৃথিবীটা তখন ওলটপালট হয়ে গেছে।
সে কি পারত না আজ মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করতে—‘তুমি কোথায় কাজ করো?’ কিংবা আরেকটু সাহস বাড়িয়ে বলতে—‘আজ সন্ধ্যায় কি আমার সাথে ভিক্টোরিয়ান ক্যাফেতে এক কাপ কফি খাওয়ার সুযোগ হবে?’
কিন্তু না। শামিত কোনো উপন্যাসের নির্ভীক নায়ক নয়, সে রক্তমাংসের এক বাস্তববাদী মধ্যবিত্ত মানুষ। ক্যাভেনডিশ ব্যাংকের কঠোর নিয়মকানুন এবং এদেশের কর্পোরেট আইনের অনুচ্ছেদগুলো তার মগজে খোদাই করা আছে। কাস্টমারদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার স্বার্থে তাদের সাথে কোনো রকম ব্যক্তিগত বা রোমান্টিক সম্পর্ক গড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটাকে বলা হয় ‘গ্রস মিসকনডাক্ট’ বা প্রফেশনাল ব্রিচ অফ ট্রাস্ট। কেউ এই নিয়ম ভাঙলে তাকে কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যায়। আর এই দেশে কর্পোরেট চাকরি থেকে একবার বরখাস্ত হওয়া মানে তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে এমন এক স্থায়ী কালো দাগ লেগে যাওয়া, যার পর কেউ আর কোনোদিন তাকে একটা সামান্য রেফারেন্স লেটারও দেবে না।
তার ওপর ইলি অত্যন্ত ছোট আর রক্ষণশীল শহর। শ্বেতাঙ্গ প্রধান এই শহরে সে যদি কোনো সাধারণ ক্যাফেতে বা পাবে ক্লারার সাথে বসে দুয়েকবারও ডেট করে, কোনো না কোনো সহকর্মীর চোখে তা পড়বেই। আর সেই খবর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মিস্টার হ্যারিসনের কানে পৌঁছাতে চব্বিশ ঘণ্টাও লাগবে না।
শামিতের পিএসডব্লিউ (Post-Study Work) ভিসার মেয়াদ আছে আর মাত্র বারো মাস। ক্যাভেনডিশ ব্যাংক তাকে আগেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা জুনিয়র কর্মীদের স্পন্সরশিপ বা স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা দিতে পারবে না। অর্থাৎ, এই বারো মাসের মধ্যে তাকে নতুন এমন একটা ব্যাংক বা কোম্পানি খুঁজতে হবে যারা তাকে ভিসা স্পন্সর করবে। এই দোলাচলের মধ্যে যদি সে চাকরি হারায়, তবে শূন্য হাতে, লক্ষ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা আর দেশের স্বজনদের একরাশ হতাশা মাথায় নিয়ে তাকে দেশে ফিরতে হবে।
সোহামের নির্জন ঘরে যখন রাতে সে একা হয়ে যায়, তখন সেই চরম ভয়ংকর দৃশ্যটার কথা ভাবলে শামিতের মেরুদণ্ড দিয়ে এক অজানা আতঙ্কের ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায়। তাই ক্লারার ওই সবুজ চোখ দুটো যত মায়াবীই হোক না কেন, শামিতের জন্য তা এক নিষিদ্ধ স্বর্গ।
(চলবে)


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

