somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাহমিদ রহমান
একজন অলস মানুষ; ভালোবাসি স্বপ্ন দেখতে, চিন্তা করতে, আর কবিতা লিখতে।পেশায় চিকিৎসক, তবে স্বপ্ন দেখি সাহিত্যের সাথে নিবিড় সখ্য গড়বার।ছাত্রজীবনে জড়িত ছিলাম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে, ভবিষ্যতে কাজ করতে চাই কন্যাশিশু নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে।

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৩)

২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ


পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির কথা তার হঠাৎ মনে পড়ল। ক্লারা বোকা নয়। সে খুব ভালো করেই লক্ষ্য করেছিল, প্রথম দেখায় অফিসারটি কীভাবে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল এবং কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে কীভাবে চোরের মতো বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিল। ক্লারা পুরো ব্যাপারটায় বেশ মজাই পেয়েছে। লোকটার চেহারায় একটা সুন্দর কমনীয়তা আছে—রুক্ষ বা উদ্ধত পুরুষালী ভাব নয়, বরং একটু কমবয়সী শান্ত ছেলেদের মতো একটা নরম ভাব আছে। তাছাড়া লোকটা কাজের বাইরে একটাও বাড়তি কথা বলেনি বা কোনো সস্তা ফ্লার্ট করার চেষ্টা করেনি, এই দূরত্ব বজায় রাখার সচেতন ভদ্রতাটুকু ক্লারার বেশ ভালো লেগেছে।

গতকাল বিদায় নেওয়ার সময় শামিত তাকে একটা স্লিপ বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিল, “মিস ক্লারা, আপনার অ্যাকাউন্ট সচল হয়েছে, তবে সিকিউরিটির জন্য একটা ফাইনাল ভেরিফিকেশন বাকি আছে। তবে সেজন্য আপনার কষ্ট করে আর ব্যাংকে আসতে হবে না, আমাদের কলসেন্টারে আগামীকাল একটা ফোন করলেই ওরা সাথে সাথে সমাধান করে দেবে।”

ক্লারার মতো একজন স্মার্ট মেয়ের জন্য ওই ফোনকলটা করা দুই মিনিটের ব্যাপার মাত্র। অথচ, ঠিক দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিটে, লাঞ্চ ব্রেকে ক্লারা নিজেকে আবিষ্কার করল ক্যাভেনডিশ ব্যাংকের অটোমেটিক কাচের দরজার সামনে। সে নিজেই ভালো করে জানে না কেন সে কলসেন্টারে ফোন না করে সরাসরি এখানে হেঁটে চলে এসেছে। ইলি শহরের ছোট ছোট পাথরে বাঁধানো রাস্তা ধরে হেঁটে আসতে আসতে সে নিজেকেই প্রশ্ন করছিল—তাহলে কি তার নিজের মনস্তত্ত্বের গভীরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম কৌতূহল তৈরি হয়েছে? এক অচেনা তরুণ ব্যাংকারের চাহনিতে দেখা অকৃত্রিম মুগ্ধতা কি তাকে অবচেতনেই টেনে আনল?

ব্যাংকের ভেতরে ঢুকে সে আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা চলে গেল শামিতের কর্নার ডেস্কে।

শামিত তখন মাত্রই একটা পেপার ব্যাগ থেকে তার লাঞ্চের ঠান্ডা স্যান্ডউইচটা বের করে একটা কামড় বসাবে ভাবছিল। ঠিক সেসময়ই ডেস্কে ছায়া দেখে সামনে তাকিয়ে সে যেন আকাশ থেকে পড়ল! দ্বিতীয়বারের মতো তার হৃৎপিণ্ডটা একটা বড়সড় লাফ দিল। যে মেয়েটিকে সে মন থেকে তাড়ানোর জন্য গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে নিজেকে নানারকম যুক্তি-তর্ক দিয়ে প্রবোধ দিচ্ছিল, সে কি না ঠিক পরদিনই আবার তার সামনে হাজির! তাও আবার সোজা তার ডেস্কে এসে দাঁড়িয়েছে!

“হাই মিস্টার শামিত,” ক্লারা ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল। “ভাবলাম ফোন করার চেয়ে সামনাসামনি এসে বাকি কাজটা শেষ করাই ভালো হবে।”

শামিতের মনে হলো তার সারা শরীর দিয়ে একটা বরফ-ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে এল। একজন মানুষ ফোনের সহজ উপায় ছেড়ে কেন ব্যাংকে হেঁটে আসবে, তাও আবার সরাসরি তার কাছেই? তার মানে... তার মানে কি মেয়েটারও তাকে মনে ধরেছে? এটা কি আদৌ সম্ভব? ইউরোপের এক রূপসী শ্বেতাঙ্গ তরুণী তার মতো এক তুচ্ছ, অতি সাধারণ বাঙালি যুবকের প্রতি আকৃষ্ট হবে?

ক্লারা কিন্তু আজ বেশ সহজ আর প্রাণবন্ত। সে টেবিলের ওপার থেকে শামিতকে জিজ্ঞেস করল, “বাই দ্য ওয়ে মিস্টার শামিত, তুমি কি ইলিতে নতুন? আগে তো দেখিনি।”

“হ্যাঁ, মাস ছয়েক হলো এই চাকরিতে জয়েন করেছি,” শামিত কোনোমতে নিজের স্বাভাবিক গলা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে বলল।

“ওহ, আচ্ছা। থাকো কোথায়? ইলিতেই?”

“না, শহরের ভেতরে তো বাড়িভাড়া খুব চড়া। তাই একটু বাইরে একটা গ্রামে থাকি—সোহাম।”

“আই সি! সোহাম বেশ সুন্দর আর শান্ত জায়গা। যাই হোক, থ্যাঙ্কস অ্যাগেইন!”

ক্লারা সিট থেকে উঠে দাঁড়াল, আবারও সেই চোখধাঁধানো সবুজাভ চোখের হাসিটা দিল, তারপর হালকা পায়ে হেঁটে বের হয়ে গেল ব্যাংক থেকে। শামিত ডেস্কে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। চারপাশের কাস্টমারদের গুঞ্জন, সহকর্মীদের কিবোর্ডের খটখট শব্দ—সব যেন দূরে কোথাও হারিয়ে গেল। তার চেনা ছকবাঁধা পৃথিবীটা তখন ওলটপালট হয়ে গেছে।

সে কি পারত না আজ মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করতে—‘তুমি কোথায় কাজ করো?’ কিংবা আরেকটু সাহস বাড়িয়ে বলতে—‘আজ সন্ধ্যায় কি আমার সাথে ভিক্টোরিয়ান ক্যাফেতে এক কাপ কফি খাওয়ার সুযোগ হবে?’

কিন্তু না। শামিত কোনো উপন্যাসের নির্ভীক নায়ক নয়, সে রক্তমাংসের এক বাস্তববাদী মধ্যবিত্ত মানুষ। ক্যাভেনডিশ ব্যাংকের কঠোর নিয়মকানুন এবং এদেশের কর্পোরেট আইনের অনুচ্ছেদগুলো তার মগজে খোদাই করা আছে। কাস্টমারদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার স্বার্থে তাদের সাথে কোনো রকম ব্যক্তিগত বা রোমান্টিক সম্পর্ক গড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটাকে বলা হয় ‘গ্রস মিসকনডাক্ট’ বা প্রফেশনাল ব্রিচ অফ ট্রাস্ট। কেউ এই নিয়ম ভাঙলে তাকে কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যায়। আর এই দেশে কর্পোরেট চাকরি থেকে একবার বরখাস্ত হওয়া মানে তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে এমন এক স্থায়ী কালো দাগ লেগে যাওয়া, যার পর কেউ আর কোনোদিন তাকে একটা সামান্য রেফারেন্স লেটারও দেবে না।

তার ওপর ইলি অত্যন্ত ছোট আর রক্ষণশীল শহর। শ্বেতাঙ্গ প্রধান এই শহরে সে যদি কোনো সাধারণ ক্যাফেতে বা পাবে ক্লারার সাথে বসে দুয়েকবারও ডেট করে, কোনো না কোনো সহকর্মীর চোখে তা পড়বেই। আর সেই খবর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মিস্টার হ্যারিসনের কানে পৌঁছাতে চব্বিশ ঘণ্টাও লাগবে না।

শামিতের পিএসডব্লিউ (Post-Study Work) ভিসার মেয়াদ আছে আর মাত্র বারো মাস। ক্যাভেনডিশ ব্যাংক তাকে আগেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা জুনিয়র কর্মীদের স্পন্সরশিপ বা স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা দিতে পারবে না। অর্থাৎ, এই বারো মাসের মধ্যে তাকে নতুন এমন একটা ব্যাংক বা কোম্পানি খুঁজতে হবে যারা তাকে ভিসা স্পন্সর করবে। এই দোলাচলের মধ্যে যদি সে চাকরি হারায়, তবে শূন্য হাতে, লক্ষ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা আর দেশের স্বজনদের একরাশ হতাশা মাথায় নিয়ে তাকে দেশে ফিরতে হবে।

সোহামের নির্জন ঘরে যখন রাতে সে একা হয়ে যায়, তখন সেই চরম ভয়ংকর দৃশ্যটার কথা ভাবলে শামিতের মেরুদণ্ড দিয়ে এক অজানা আতঙ্কের ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায়। তাই ক্লারার ওই সবুজ চোখ দুটো যত মায়াবীই হোক না কেন, শামিতের জন্য তা এক নিষিদ্ধ স্বর্গ।

(চলবে)


সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৫
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক সংকট: মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫২

প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর। এই স্তরেই শিশুর ভাষা, গণিত, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, সামাজিকতা ও জীবনদক্ষতার ভিত নির্মিত হয়। যে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা যত শক্তিশালী, সেই দেশের অর্থনীতি, সামাজিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রিয়েলিটি আপনারা মাইনে নেন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩০



নরেন্দ্র মোদীকে আপনি যতই অপছন্দ করেন না কেন, তার একটা একটা প্রশংসনীয় গুণ আছে। সে বিশেষজ্ঞদের উপদেশ নিতে এবং সেই অনুযায়ী নিজের অপছন্দের কাজটা করতেও পিছপা হয় না।
সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এভাবেই নাকি এখন চলে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



চাবি সহযোগে তালা খোলা অতিশয় সহজ
কিন্তু আজকাল প্রায়শই গুলিয়ে ফেলি তালগোল!
এটা নিয়ে নিত্য বাহাসে ভেঙে যায় পাখিদের পার্লামেন্ট!
অতঃপর গোপনে সেরে ফেলি সহজ বোঝাপড়া!

প্রতিদিন যে পথে আসি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না।

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:২৬

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না। আর এগুলো কোন কিছুই তার বানানো না। একেকটির বয়স শত বছর থেকে কিছুর ইতিহাস হাজার বছরের ও।
যদিও সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৩)

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৩

৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ


পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×