[মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]
..............পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:
আমরা গত কয়েকটা সংখ্যায় যে শিরোনামের আওতায় আলোচনা করলাম তা ছিল: কুর’আনের বৈশিষ্ট্য এবং এর প্রতি আমাদের কর্তব্য। ঐ শিরোনামের আওতায় আলোচনার সারাংশ হচ্ছে এরকম:
এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট ও সাদামাটা তা হচ্ছে মুসলিমদের মনে করিয়ে দেওয়া যে, সত্যিকার অর্থে কুর’আন কী। উসমান ইবনে আফফান (রা.) ও আল হুজাইফা (রা.) বলেছিলেন যে, পবিত্র হৃদয় সম্পন্ন একজন ব্যক্তি যখন কুর’আনের বহু বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ অনুধাবন করতে পারবেন, তখন তিনি আরো অধিক হারে কুর’আন পাঠ করার ইচ্ছা পোষণ করবেন - তিনি কুর’আন শিক্ষা করতে চাইবেন; তখন তিনি আগ্রহ ভরে কিভাবে কুর’আনের নিকটবর্তী হওয়া উচিত এবং কুর’আনকে বোঝার চেষ্টা করা উচিত তা জানতে চাইবেন। তখন তিনি বিশ্বস্ততার সাথে সঠিক উপায়ে কুর’আনকে প্রয়োগ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। যখন তিনি তা করবেন, ইনশা’আল্লাহ্, তার উপর কুর’আনের কাঙ্খিত প্রভাব বাস্তবায়িত হবে, ঠিক যেভাবে রাসূলের (সা.) সাহাবীদের উপর এর কাঙ্খিত প্রভাব পরিলতি হয়েছিল।
এরপর আমাদের যে আলোচনায় যে অধ্যায় আসবে তার শিরোনাম হচ্ছে:
কুর’আনিক প্রজন্ম : সঠিকভাবে কুর’আনের নিকটবর্তী হবার এবং সঠিকভাবে কুর’আন বোঝার ফলাফল
পবিত্র কুর’আন, যারা বিপথগামী ছিল তাদের বিশ্বাস, আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন করতে বলেছিল। তা তাদের সত্যিকার সুখ ও সেই জীবনযাত্রার পথ নির্দেশনা দিতে এসেছিল - এ জীবনে যা প্রত্যেকের জন্য কাম্য ও অনুসরণীয়। পবিত্র কুর’আন বলে:
“তোমরা যারা ঈমান এনেছো! আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও যখন তাঁরা তোমাদের, যা তোমাদের জীবন দান করে, তার দিকে ডাকেন।....” (সূরা আনফাল, ৮:২৪)
আল সুদ্দী, যিনি পবিত্র কুর’আনের প্রথম যুগীয় একজন মুফাসসির ছিলেন, তিনি বলেন যে, এই আয়াতের বক্তব্য হচ্ছে এরকম যে, সাহাবীরা সত্যিকার অর্থে অবিশ্বাসের মাঝে মৃত অবস্থায় ছিলেন - যখন ইসলাম এসে তাদের প্রকৃত জীবন দান করলো।
ঈমান ও কুফরের ভিতর পার্থক্য আসলে জীবন ও মৃত্যুর ভিতর পার্থক্যের সাথে তুলনীয়। কুর’আন জানা অর্থাৎ ঐ প্রাণের উৎস যার প্রতি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল(সা.) প্রতিটি মানুষকে ডাকেন - সেটাকে জানা এবং সেটা না জানার ভিতর তফাৎটা জীবন ও মৃত্যুর ভিতর তফাতের সাথে তুলনীয়।
প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের উপর কুর’আনের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এঁরা হচ্ছেন সেই প্রজন্ম, কুর’আন যাঁদের জীবন দিয়েছিল। তাঁদের অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁরা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছিলেন, পরবর্তী সকল প্রজন্মের যারা কুর’আনে বিশ্বাস করেন, তাদের অবশ্যই ঐ দৃষ্টান্তে উন্নীত হওয়ার আকাঙ্খা থাকা উচিত।
মুহাম্মাদ(সা.)-এঁর আগমনের পূর্বের পৃথিবী
‘ইসলাম এন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইয়ে আবুল হাসান আলী নাদভী রাসূলের(সা.) আগমনের পূর্বের পৃথিবীর অবস্থা চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। নাদভী ঐ সময়কার পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির দশার বর্ণনা করেছেন। আমরা নীচে তার বর্ণনা থেকে অল্প কিছু উদ্ধৃত করছি। তিনি বলেন :
“এটা সর্বজনবিদিত যে, ঈসায়ী ষষ্ঠ শতাব্দী মানব জাতির জন্য সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন এক অধ্যায় ছিল। মানবতা তখন এমন এক পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয়েছিল, যার সাথে কোন পাহাড়ের ঐ প্রান্তসীমার তুলনা করা চলে, যার নীচে রয়েছে গভীর খাদ - শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবক্ষয়ের বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে পরিণতির দিকে তা এগিয়ে গেছে। এবং মনে হচ্ছিল যে সারা বিশ্বে এমন কোন উপায় বা ক্ষমতা নেই, যা এসে তাকে উদ্ধার করবে ও ধ্বংসের অতল গহ্বরে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে।”
উপরোক্ত বক্তব্যের পরে, তিনি তৎকালীন রোমান ও পারসিক সভ্যতার অবস্থা বর্ণনা করেন - যারা তৎকালীন দুটো প্রধান উল্লেখযোগ্য সভ্যতা ছিল। তিনি বলেন যে, তারা তখন সম্পূর্ণরূপে নৈতিকতা বিবর্জিত অবস্থায় পতিত হয়েছিল। তারা তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার বদ্ধমূল পাপাচারে নিমজ্জিত ছিল।
ঐ সময়কার জনগোষ্ঠীগুলির নৈতিকতার যে দুরবস্থা ছিল, ধর্মকর্ম হয়তো তাদের জন্য ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করতে পারত। কিন্তু পশ্চিমা শক্তির মুখ্য ধর্ম অর্থাৎ খৃস্ট ধর্ম ইতোমধ্যেই তার প্রধান শিক্ষাগুলো হারিয়ে ফেলেছিল। তা তখন গ্রীক উপকথা, রোমান মূর্তিপূজা, মিশরীয় নব্য প্লেটোবাদ ও সন্ন্যাসবাদ ইত্যাদির সংমিশ্রণে এমন এক জগাখিচুড়ীতে পরিণত হয়েছিল যে, তার নিজেরই তখন সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। একই ধরনের অন্যান্য সমস্যার জন্য ইহুদী ধর্ম বা ইহুদীরা তখনকার বিরাজমান অবস্থায় খুব একটা কার্যকরী অবদান রাখতে অম ছিল।
‘দ্য মেকিং অব হিউম্যানিটি’ বইতে রবার্ট ব্রিফল্ট বলেন :
“পঞ্চম শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপ বর্বরতার এক অমানিশার মাঝে নিমজ্জিত ছিল, যা ক্রমাগত অন্ধকার থেকে অন্ধকারতর হয়েছে। এই বর্বরতা প্রাথমিক যুগের বন্য আচার-আচরণের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ছিল - কেননা তা ছিল এককালের এক মহান সভ্যতার পচনশীল মৃতদেহের মত। ঐ মহান সভ্যতার বৈশিষ্ট্য এবং ছাপ সম্পূর্ণভাবে মুছে গিয়েছিল। ইটালী এবং গলের মত যে সমস্ত জায়গায় সভ্যতা সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছিল, সে সব জায়গাগুলোতে কেবল ধ্বংসাবশেষ, আবর্জনা ও অবলুপ্তির চিহ্ন অবশিষ্ট ছিল।”
নাদভী তাঁর বর্ণনায় উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ, ইরান, মধ্য এশিয়া (ভারতবর্ষ) এবং চীন নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করেন। তিনি বুদ্ধিজম, হিন্দুইজম ও অন্যান্য ধর্ম নিয়েও আলোচনা করেন। ঐ সমস্ত এলাকার ও ধর্মসমূহের দশা ইউরোপ ও খৃস্টধর্মের মতই ছিল। এ সমস্ত এলাকা ও ধর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এখানে এটুকুই বুঝতে পারা যথেষ্ট যে, বিশ্ব-মানবতা তখন নিশ্চিতভাবেই এক হতাশাব্যঞ্জক অবস্থায় ছিল। ঐ সময় পৃথিবীর কোন অংশ থেকেই সত্যিকার অর্থে সত্যের দিকে পথ-নিদের্শনার কোন আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল না।
আমাদের এই "সিরিজ আলোচনার" জন্য যারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই আরবদের দশাও পৃথিবীর অন্যান্যদের চেয়ে বিশেষ ভিন্ন কিছু ছিল না। সে যাহোক, পবিত্র কুর’আন যেহেতু তাদের কাছেই প্রথম উপস্থাপিত হয়েছিল এবং তারাই যেহেতু সর্বপ্রথম এর শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল - আমরা এখানে তাদের অবস্থা সম্বন্ধে একটু বিস্তারিত আলোচনায় যাব।
(চলবে......... ইনশা'আল্লাহ্!)
[এই পর্বের আগের লেখাগুলো রয়েছে এখানে:
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০১১ দুপুর ১২:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



