আরেকটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার লিংক- মোবাইল বন্ধ রাখলে ক্ষতি নিজেরই
ডেটলাইন - ৩০ আগস্ট, ২০০৮। রাত্রি সাড়ে নয়টা। মৌচাকের সম্মুখ হইতে রিক্সা লইলাম। দুর্বল-পাতলা-রোগা ধরণের চালক। তবে চলিল মোটামুটি স্বাভাবিক গতিতেই। ডুবিয়া ছিলাম আকাশ-কুসুম কল্পনায়। রিক্সাটি যখন মালিবাগ বাজার ছাড়াইয়া খিলগাঁওয়ের দিকে যাইতেছিল, কল্পনা ভঙ্গ হইলো পার্শ্ববর্তী অপর এক তিন চাকার যান হইতে জনৈক যাত্রীর কথা শুনিয়া। আমার চালককে উদ্দেশ্য করিয়া তিনি বলিলেন, 'ওহে বাপু, দেখিয়া শুনিয়া থুথু নিক্ষেপ করিও। তুমি যে আমার হস্তে তোমার মুখ-নিঃসৃত জলীয় পদার্থ প্রক্ষেপন করিয়াছ!' (কথাবার্তা সকলই চলিত, কথ্য ভাষায় হইয়াছিল। রচনারীতির সুবিধার্থে এইরূপ পরিবর্তন ক্ষমার চোখে দেখিবেন আশা করি)।
আমি পীড়িত বোধ করিলাম। আহা! লোকটি নিতান্তই ভদ্রগোছের। রিক্সাচালক এতবড় অপরাধ করা সত্ত্বেও তিনি বিন্দুমাত্র কুপিত না হইয়া স্বাভাবিক স্বরে তাহাকে বুঝাইবার চেষ্টা করিতেছেন!
তবে, আমার রিক্সাচালক ঐ যাত্রীটির প্রতি ভ্রূক্ষেপও করিল না। যেন সে উহার কথা শুনিতেই পায় নাই। ইহাতে ঐ যাত্রীটি কিছুটা মনক্ষুণ্ণ হইলেন বলিয়া বোধ হইলো। তিনি স্বর একটু উঁচু করিয়া বলিলেন, 'আমি কি বলিতেছি, তাহা কি তোমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছে না?'
ইহাতেও রিক্সাচালক জবাব না দেওয়ায় তিনি তাহার রিক্সাটিকে আমাদের রিক্সাটির সম্মুখে আনিয়া দাঁড় করাইলেন এবং আমার রিক্সাওয়ালাকে দাঁড়াইতে বলিলেন। আমিও আমার রিক্সাচালকের আচরণে কিঞ্চিৎ বিরক্ত ও উক্ত ভদ্রলোকের প্রতি সহানুভূতি বোধ করিতেছি।
তিনি রিক্সার বাম পার্শ্বে দাঁড়াইয়া আমার দিকে চাহিয়া অনুযোগ করিয়া বলিলেন, 'দেখিলেন বর্তমানের রিক্সাচালকদের আচার-ব্যবহার!'
আমিও আমার রিক্সাচালককে উষ্মার স্বরে বলিলাম, 'তুমি তাহার কাছে ক্ষমা চাইতেছ না কেন? ক্ষমা চাহিয়া ব্যাপারটি মিটাইয়া ফেল।'
রিক্সাচালক 'আচ্ছা যান মাফ চাহি' বলিল ঠিকই, কিন্তু যে অভিব্যক্তির সহিত বলিল, তাহাতে সে যে তাহার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত, তাহার যথার্থ প্রকাশ ঘটিল না। ইহাতে ঐ যাত্রীকে আরও ক্ষুব্ধ বোধ হইলো। তিনি বলিলেন, 'আপনার মতো ভদ্রলোক যাত্রী রহিয়াছে বলিয়া আমি রিক্সাচালককে ছাড়িয়া দিলাম। কিন্তু আপনিও বিচার করিয়া দেখুন, কি অভব্য আচরণ তাহার।'
আমাকে 'ভদ্রলোক' বলিয়াছে! -আমার হৃদয় দ্রবীভুত হইলো। তবে, সময় ক্ষেপন হইতেছে দেখিয়া আমি বলিলাম,'আচ্ছা , ছাড়িয়া দেন চালককে। সে না বুঝিয়া অন্যায় করিয়া ফেলিয়াছে।'
'আচ্ছা।' -বলিয়া তিনি আমার দিকে দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, 'ভাইজানের নিবাস কোথায়?'
আমিও প্রত্যুত্তরে ভদ্রতাবশত হস্তখানি প্রসারিত করিয়া তাহার দক্ষিণ হস্ত ধরিলাম। বলিলাম, 'এইতো সম্মুখেই।'
ভদ্রলোক কথা বলিতেই থাকিলেন। রিক্সাচালকের অভব্যতা, আমার ভদ্র ব্যবহার ইত্যাদি নিয়া বলিতে লাগিলেন। আমিও ভদ্রতাবশত জ্বি জ্বি করিয়া গেলাম। বিলম্ব হইতেছে দেখিয়া যদিও কিছুটা বিচলিত। আলাপচারিতার মধ্যিখানে হাতখানি সরাইয়া নিয়া আসিবার চেষ্টা করিতে গিয়া দেখিলাম, এতখানি আন্তরিকতার সহিত তিনি আমার হস্ত আঁকড়াইয়া ধরিয়াছেন যে, সেই আন্তরিকতা উপেক্ষ করিবার সাধ্য আমার নাই। এরই মধ্যে রিক্সার ডান পার্শ্ব ঘেঁষিয়া উল্টো দিকে মুখ করিয়া অপর একজন দাঁড়াইয়া রহিয়াছে দেখিলাম; মনে হইলো রাস্তা পার হইবেন বা এইরূপ কিছু, আমাদের আলাপচারিতায় তাহার কোন আগ্রহ রহিয়াছে - এইরূপ মনে হইলো না।
হঠাৎ করিয়া ভদ্রলোকের কথায় পরিবর্তন লক্ষ্য করিলাম। তিনি বিরতি দিয়া দিয়া অসংলগ্ন ভাবে বলিতে লাগিলেন, 'এই যে আমাকে আপনার সহিত কথা বলিতে দেখিতেছেন, আমাদিগকে কিন্তু আরো অনেকেই লক্ষ্য করিতেছে। আমি যদি হাঁক দিই, তাহা হইলে অসংখ্য লোক চলিয়া আসিবে এক্ষুণি। কিন্তু আপনি সদাশয় ভদ্রলোক বলিয়া রিক্সাচালককে আমি কিছু বলিতেছি না।....... এখন কিন্তু আশেপাশে কেহই নাই। আপনি যদি চিৎকারও করেন, তাহা হইলেও কেউ আসিবে না।........ আমরা কিন্তু লোক সুবিধার নহি। বিশ্বাস না হইলে দেখিতে পারেন, আমার দক্ষিণ কোমরে একখানি অস্ত্র রহিয়াছে........এখন যদি আপনাকে আমরা আঘাত করি কেহই টেরও পাইবে না।' ইত্যাদি ইত্যাদি।
এরই মাঝে লক্ষ্য করিলাম, ডান পার্শ্বে দাঁড়ানো যুবকটি ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে। এবং ত্রিচক্রযানের এতটাই কাছ ঘেঁষিয়া যে ঐ দিক আমার নামিয়া যাওয়ার কোন উপায় নাই। অপর এক যুবক কোথা হইতে যেন আসিয়া উদয় হইলো। সে 'কি হইয়াছে ভাই' - বলিয়া দৃশ্যপটে একজন আগ্রহী দর্শকমাত্র - এই রূপে আবির্ভূত হইলো। এবং কিয়ৎক্ষণ পরেই আমাকে ঠেলা দিয়া সরাইয়া সে রিক্সায় উঠিয়া বসার উপক্রম করিল।
আমি প্রথমোক্ত প্রাথমিক দৃষ্টিতে ভদ্রবেশী লোকটির কথার জবাবে, 'না, না আমি তো চিৎকার করিতেছি না... না না আমি বুঝিতে পারিয়াছি, .. না না কিছু বাহির করা লাগিবে না, আমি আপনাদিগকে বিশ্বাস করিতেছি'.. এই রূপ অসংলগ্ন বাক্য বলিতে লাগিলাম। তবে ডান পার্শ্ব দিয়া রিক্সায় উঠিয়া বসার চেষ্টাকারী লোকটিকে কিছুতেই উঠিতে দিলাম না। এতে সে নিরতিশয় ক্ষুব্ধ
কথা বলিতে বলিতে এক পর্যায়ে প্রথমোক্তজন আমার শার্টের পকেটে হাত ঢুকাইয়া দিল। পকেটে যা কিছু টাকা-পয়সা ছিল তাহা উহার বাম হস্তগত হইলো। এই সময়ে আমি টের পাইলাম বাম হস্তের কর্মতৎপরতার কারণে তাহার ডান হস্তের আন্তরিকতায় কিছুটা যেন ছেদ পড়িল। একই সঙ্গে ডান দিকে থাকা দুই যুবক ও রিক্সার মাঝে কিছুটা যেন ফাঁকা জায়গাও লক্ষ্য করিলাম। যা থাকে নিয়তি- আমি হ্যাঁচকা টানে ডান হস্তখানি ছুটাইয়া স্কন্ধে ঝুলন্ত ব্যাগ লইয়া লম্ফ দিয়া নামিলাম রিক্সা হইতে এবং তাহার পর বিনা বাক্য ব্যায়ে যাহা করিলাম, তাহাকে প্রাণপণে বা জান হাতে লইয়া অথবা দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য হইয়া ছুটিয়া চলা
কিয়ৎক্ষণ দৌড়ানোর পরই পার্শ্বে এক গাড়ি পুলিশ দেখিতে পাইলাম। কিন্তু তাহাদের সাহায্যের জন্য ডাকিতে ইচ্ছা জাগিল না। কাহাকেও চিহ্নিত করিতে তো পারিবই না, উপরন্তু এই অঞ্চলে যে কোন প্রকার কালক্ষেপন নিকট-ভবিষ্যতের জন্য বিপদজনক হইবে ভাবিয়া একই গতিতে ছুটিয়াই চলিলাম।
এরই মাঝে পার্শ্ববর্তী ফুটপাত হইতে কেহ আওয়াজ দিয়া উঠিল - 'কি হইয়াছে ভাই?'
তাহার সাহায্য নিতেও আমার প্রবৃত্তি হইলো না। কে জানে , ইহাও উহাদের সহিত আঁতাতযুক্ত কি না?
প্রায় মাঝ রাস্তা দিয়া অনেকক্ষণ দৌড়াইয়া খিলগাঁও রেলগেটে আসিয়া পৌঁছিলাম। কোন এক অজ্ঞাত কারণে, এই সময়ে কোন দ্রুতগামী যান আামকে পিছন হইতে আসিয়া পিষ্ট করিল না বা ধাক্কা দিয়া ফেলিয়াও দিল না। হাঁফাইতে হাঁফাইতে আরেক রিক্সায় উঠিয়া গন্তব্য অভিমুখে দ্রুত যাত্রার নির্দেশ দিলাম। পিছন ফিরিয়া দেখিয়া লইলাম তাহারা আমার সহিত করমর্দন করিবার উদ্দেশ্যে আবার আসিতেছে নাতো?
প্রথম রিক্সাচালককে রিক্সাভাড়াটি দেওয়া হইলো না বলিয়া অপরাধবোধে আক্রান্ত হইলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


