আরেকটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার লিংক- মোবাইল বন্ধ রাখলে ক্ষতি নিজেরই
ভাইভা বোর্ডের সদস্য তিনজন। রুমে ঢুকে সালাম দিয়ে বসলাম। পিএসসির সদস্য যিনি, তিনি ভাইভার চিরাচরিত নিয়ম অনুসারে আগে নামটা কনফার্ম করলেন। পরের বাক্যই হলো - ' ওর ভাইভা নিয়ে কি হবে? ওর তো কার্ড যাবে না।'
বাকী দুই সদস্য অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন - 'কেন?'
আমি খুব একটা বিস্মিত নই। কিছু একটা যে ঘাপলা আছে, সেটা তো আমি জানিই। ঘাপলা নিশ্চিতভাবে আছে বলেই আগেরবার ১৭৪২ জন নিলেও আমার রোল সেই ১৭৪২ জনের মধ্যে ছিল না। ভাইভা খারাপ হয়নি। তারপরও অকৃতকার্য! তারমানেই হচ্ছে, কাগজপত্রে কোন ঝামেলা। হয় স্বাক্ষর গোলমাল, বা ঠিকানায় গন্ডগোল কিংবা কাগজপত্র সব নেই। ঘাপলাটা কি সেটা জানার জন্য আমিও উৎসুক।
পিএসসির সদস্য খোলাসা করলেন অন্য দুজনের কাছে-'দেখেন, স্থায়ী ঠিকানা দুই জায়গায় দুই রকম। প্রথম যে আবেদনপত্র দেয়া, সেখানে যে ঠিকানা দেয়া, এখনকার পুলিশ ভেরিফিকেশন ফর্মে সেই ঠিকানা নেই।'
অন্য দুজনও পরীক্ষা করলেন। আবেদনপত্রে যা অস্থায়ী ঠিকানা দেয়া, সেটাই ভেরিফিকেশন ফর্মে স্থায়ী ঠিকানা। - 'এরকম করেছ কেন?'
কেন আবার? - ভুলে। আবার এটাকে বেকুবি বা গাধামীও বলা চলে। ২০০৫ সালে যখন আমি আবেদনপত্র পূরণ করি, তখন স্থায়ী ঠিকানার জায়গায় দেই গ্রামের বাড়ির ঠিকানা, অস্থায়ী ঠিকানা ঢাকারটা। তখনও আমার বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন হয়নি। এরপর বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশনের সময় ঢাকার ঠিকানাটা স্থায়ী হিসেবে দেই।
তারপর ২০০৬ এর নভেম্বরে যখন ভাইভা পরীক্ষা হয়, তখন পুলিশ ভেরিফিকেশন ফর্মেও দেই ঢাকার ঠিকানাটা। এবং ততদিনে আমি ঠিক খেয়াল করতে পারি না, আবেদনপত্রে ঠিক কোন ঠিকানাটা দিয়েছিলাম। যখন প্রথম ফর্ম পূরণ করি, বিসিএস-এর ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। সুতরাং, ওতে কি তথ্য দিলাম না দিলাম তা মনে রাখারও গরজ ছিল না। এবং পূরণ করার পর কোন ধরণের কপিও রাখিনি। বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশনে যেহেতু ঢাকার ঠিকানা দিয়েছি, ধরে নেই যে, কাছাকাছি সময়ে পূরণ করা বিসিএস ফর্মেও হয়তো ঢাকারটাই দিয়েছি।
ফলাফল দাঁড়ায়, ২০০৭ সালের জানুয়ারী মাসে যে ফলাফল প্রকাশিত হয়, তাতে ১৭৪২ জনের মধ্যে আমার রোল নেই।
ঠিক কি কারণে অকৃতকার্য, তা বের করা পরে আর সম্ভব হয়নি। তাই এবার ২০০৮ এর মার্চে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাতেও একই ভুল নিয়ে আমি হাজির হই ভাইভা বোর্ডে।
এই ধরণের 'দায়িত্বজ্ঞানহীনতা'র জন্য বোর্ডের তিন সদস্য মিলে শান্ত মাথায় ও ভাষায় আমাকে তিরষ্কার করলেন। কেন আমি এ ধরণের ভুল করলাম, তারা তার কারণ নিয়েও কিঞ্চিত গবেষণা করলেন। একজন বললেন, 'উল্টোটা করলেও (অর্থাৎ স্থায়ী ঠিকানা আগে ঢাকায় এবং পরে পরিবর্তন করে গ্রামের বাড়িরটা দিলে) না হয় বুঝতাম কোটা সুবিধা নেওয়ার জন্য এমনটা করেছ। এখন যা করেছ, তাতে তো কোটা সুবিধার সুযোগ নেওয়া যাবে না।' আমি কমিশনারের নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট সঙ্গে দিয়েছি বলেও কোন ভরসা পেলাম না। তারা বললেন, আরও আগে এই ভুল ঠিক করে নেওয়া উচিত ছিল। পিএসসি সদস্য আমার পরীক্ষা নিতেই আগ্রহী নন। তার কথা, ওর পরীক্ষা নিয়ে কি হবে, ওকে তো আল্টিমেটলি সিলেক্ট করা হবে না। বোর্ডের অপর এক চিকিৎসক সদস্য কিছুটা সদয় হলেন। তিনি বললেন, 'আচ্ছা থাক, আমাদের উপর যে দায়িত্ব তা আমরা পালন করে যাই। পরেরটা পরে দেখা যাবে। আচ্ছা বাবা, তুমি আপাতত এই কাগজপত্রের কথা ভুলে যাও। আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।'
বললেই কি আর ভোলা সম্ভব! তারা যে কি প্রশ্ন করলেন আর আমি কিভাবে কি উত্তর দিলাম, তার বিস্তারিত আর মনে নেই। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে আমি জিজ্ঞেস করলাম - 'স্যার আমি এখন কি করবো?'
চিকিৎসক সদস্য বললেন, ' দেখ বাবা, বুঝতেই তো পারছো, তুমি যে ভুল করেছো, এখানে আমাদের কিছু করার নেই। লেটস হোপ ফর দ্যা বেস্ট। তুমি স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের একটা অ্যাপ্লিকেশন আর কমিশনারের সার্টিফিকেট দিয়ে যাও। দেখ, কি হয়!'
ইনডিরেক্টলি কথাগুলোর মানে দাঁড়ায় -তোমাকে সরাসরি বলে হতাশ করিয়ে দিতে চাচ্ছি না, কিন্তু বাবা, তোমার কোন আশা নাই এইবারও।
কি আর করা! পিএসসি চেয়ারম্যান বরাবর স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের আবেদন আর কমিশনার স্বাক্ষরিত নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট জমা দিয়ে আর নিজের ভাগ্যকে বিশাল এক স্যালুট দিয়ে পিএসসি থেকে বের হয়ে এলাম।
আবেদন কি গৃহীত হবে? নাকি আগেরবারের অবস্থাই দাঁড়াবে? - আশা-নিরাশার দোলাচলে কাটতে লাগলো দিন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


