somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জানালার ওপাশে জোছনা............................... ১৯

২২ শে জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত ১০ টা বাজলো প্রায়। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে লীনার। ঠান্ডাটাও পড়েছে খুব জাঁকিয়ে। ধূলোবালিতে কেমন কিচ কিচ করছে শরীরটা। লীনা গোসল করার জন্য মা কে পানিটা গরম করতে বললো। ঘরে ঢুকে ওড়না টা ছুড়ে দিল বিছানার এক পাশে। তারপর একটা বালিশ টেনে নিয়ে নিজেও শুয়ে পড়লো। ইদানীং ক্লান্তিটা খুব ঘন ঘন লীনার মুখদর্শন করে যায়। চোখ বুজলো সে। হঠাৎ করেই মনে হল "আচ্ছা, আসিফ দেখতে কেমন ছিল?" আসিফের চেহারাটা হঠাৎ করেই ভুলে গেছে যেন সে। ওর নাকটা কেমন ছিল, চোখটা কিংবা চোখের চাহনী, চুল, কথা বলবার ভঙ্গি কিছুই মনে পড়ছে না লীনার!! গন্ধটা কি মনে আছে? মাথার কাছে থাকা আলনা থেকে আসিফের রেখে যাওয়া একটা শার্ট টেনে নিল সে। নাহ! লীনার মা ধুয়ে রেখেছিলেন কাপড়গুলো। কেউ মরে গেলে যেমন তার ব্যবহার্য সবকিছু মানুষ ধুঁয়ে মুছে রাখে তেমনি করে!! লীনা ভাবে আসিফ কি তার জীবনে মৃত? হ্যা মৃতই! তৌফিক আজ লীনাকে বাধ্য করেছে নিজেকে চিনতে। আজ ১৯ তারিখ, ঠিক গতমাসের এই দিনে আসিফ দের বাসা থেকে চরম অপমানের বোঝা কাঁধে করে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে সত্যের মুখোমুখি করেছিল লীনা! কত সহজেই একটি মাস কেটে গেল! এক মাসে একটিবারের জন্যও আসিফ খোঁজ নেয়নি লীনার। কাল সকালে সেল ফোনে বাবার সাথে আসিফের কথোপোকথনের রেকর্ড টা শুনছিল লীনা। সেখানে বারবার আসিফ বলছিল " যত সহজে আর দ্রুতগতিতে সম্ভব ডিভোর্স টা করে ফেলতে চাই , আর ডিভোর্সের সাথে সাথে দেনমোহরের টাকাটাও শোধ করতে চাই"। এমন নির্লজ্জ ব্যবসায়িক মনবৃত্তি যার তাকে একদিন পাগলের মত ভালবেসেছিল লীনা সে ভাবলেও আজ নিজেকে ধ্বিক্কার দিতে ইচ্ছে করে তার! ছি!

তৌফিক লীনাকে অনেক কথাই বলেছে যা জানবার দরকার ছিল লীনার। নিজেকে এমন করে চিনতে পারবার যে ক্ষমতা অর্জন করেছে লীনা তার সবটুকু কৃতিত্ব তৌফিকের! বিকেলে যখন তৌফিক ফোন করেছিল, হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল লীনা! তখনকার কথা গুলো আবার মনে পরে যায় ওর......................
: কি খবর তোমার?
: এই তো চলছে আর কি! আপনার কি খবর?
: আছি ভাল, তারপর বল আসিফ কি কোন যোগাযোগ করেছিল?
:নাহ!
:হুমম। সে তো সময় নিল, বললো তিন মাস সে অপেক্ষা করবে তুমি নত হও কিনা!
দম ফাটিয়ে হাসলো লীনা। মিনিট দুয়েক কথাই বের হলনা ওর।
:আপনার কি মাথা ঠিক আছে? আমি তো কোন দোষ করিনি, আমি কেন নত হব? আর এই সম্পর্কের আর বাকিই বা আছে কি?
:তুমি তো তাকে ভালবাস
:হ্যা, বাসি। তবে যাকে ভালবাসি সেই যদি সেই ভালবাসাকে অপমান করে তবে সেই ভালবাসাকে দমন করা বোধ হয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে অবধারিত ভাবেই! আর ভালবাসা কে মহিমা দেয়াই আমার দায়িত্ব তাকে কদর্য করে তোলা নয়!
:আসলে কি যে বলবো বুঝতে পারিনা! তোমার মধ্যে কীসের যে কমতি আছে, আসিফ আর কীই বা চায় কিছুই বুঝিনা!
:আসলে কী জানেন? ও যে তিনমাস সময় নিতে চায় তা আসলে নিজেকে দাঁড় করাবার জন্য, আমাকে ফেরৎ পাবার জন্য না। টাকা ছাড়া জগৎ সংসারে কিছুই চায়না সে। তিন মাসে ও নিজের ধার দেনা শোধ করে স্থির হতে চায়। তারপর দেনমোহরের টাকা দিয়ে আলাদা হতে চায়। আর কিছুই না। বিয়েটা ওর কাছে একটা ব্যবসা চুক্তি ছিল। সুবিধা না করতে পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে!
:আরে না।কী যে বল! তা হবে কেন?
:ঠিক তাইই। ওকে আমার থেকে আর কেউ বেশি চিনেনা। যে শত শত মানুষের মধ্যে সহধর্মিনী কে অপমান করতে পারে সে প্রয়োজন পড়লে তাকে গরু-মহিষের মত ভরা বাজারে বেঁচেও দিতে পারে!
তৌফিক কোন কথা খুঁজে পায়না। ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খায়, সাঁতরে কূলে উঠতে পারে না কিছুতেই। লীনাকে হালকা করতে অন্য প্রসঙ্গ তুলে।
:তুমি তো অনেক ভাল গাও, নাচতেও কী পার?
হাসে লীনা। তারপর বলে
:পারি ওডিসি আর সালসা। সালসা আমার প্যাশন!
:কি বলছো তুমি? তুমি তো তাহলে অপাত্রেই পড়েছিলে একবারে! আচ্ছা আসিফ তোমাকে কোনদিন রাতের নীলাভ আলোয় মোমবাতি জ্বালিয়ে কোন রেঁস্তোরায় (ক্যান্ডেল লাইট ডীনার) খাইয়েছে?
:না
:কোনদিন হুট খোলা রিকশায় রাতের ঝিমিয়ে পড়া শহরটা কে দেখিয়েছে?
:উহু
:ছাদে বসে আধ ফালি চাঁদ দেখিয়ে বলেছে "একটা গান শোনাও তো?"?
:নাহ
:তাহলে করেছে কি? পেতে গেলে যে কিছু দিতে হয় তাও বোঝার মত মন কী তার নেই?!
:জানিনা।
: কেমন চলছে অন্যসব?
:এই তো! ক্লাশ করি, ক্লাশ নেই, আবার অফিস সব মিলে ব্যস্ততায় কাটে সময়টা।
:হুমম। একটা কথা বলি তোমাকে?
:হ্যা বলেন।
:আমার কেন যেন মনে হয় তোমার জন্য অনেক বড় কিছু অপেক্ষা করে আছে। তোমাকে বহন করবার জন্য যে আসন প্রয়োজন তা বোধ হয় আসিফের নেই।
:হয়তবা।
: তবে আমি কিন্তু অবাক হচ্ছি। যতই দেখছি তোমার অসাধারন সময় উপযোগী গুনগুলোকে ততই মুগ্ধ হচ্ছি। বলেই উচ্চস্বরে হেসে ওঠে তৌফিক। লীনাও হাসে।
:এসব কোন গুন হল? গুন তো গায়ে পড়ে আত্মবিসর্জন দিয়ে সবার সাথে মাখামখি করতে পারা, গুন হল নিজের যথাসর্বস্ব ত্যাগ করে পুতুলের সংসার পাতা, গুন হল নিজের ইচ্ছের গলায় ছুরি চালিয়ে অন্যের শরীরের খোরাক হওয়া!
তৌফিক এবারও চুপ থাকে।কী বলবে, কিংবা কি বলা উচিৎ তাই নিয়েই ভাবতে থাকে। নিজের মনের এক কোণায় একটা চাপ চাপ কষ্টের দলা ওর দম বন্ধ করে দিতে চায়। ভীষণ লোভ হয়। কিছু মানুষ থাকে, পুরুষমানুষ, যারা নারীকে সহযাত্রী করে পেতে চায়, অনুগামি নয়। তৌফিকও সেই মানুষ।
:তুমি কেন যে ৫ বছর আগে জন্ম নিলে না! ভীষণ লোভ হচ্ছে। নিজের জীবনসঙ্গীর মধ্যে যা কিছু থাকলে একজন মানুষ নিজেকে অনায়াসে সম্রাট ভাবতে পারে তার সবই আছে তোমার। কিন্তু কপালটা তো ফেঁটেছে অনেক আগেই। তোমার সাথে পরিচয় না হলেই ভাল হত।
লীনা অবাক হয়। নিজের অজান্তেই কি লোকটার সর্বনাশ করে ফেলেছে সে! ভেবে পায়না.............

মা ডাকল। পানি গরম হয়ে গেছে। গোসলে ঢুকল লীনা। চুল গুলো ধূলোয় চুপসে আছে। শ্যাম্পুর বোতলটা নিতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেটাও তো নিতে ভোলেনি আসিফ!! শ্যাম্পুর বোতলে ওর বিনিয়োগটুকুও যে সে ভুলতে পারেনি সেই কথাটাই বারবার ভুলে যায় লীনা! মা কে ডেকে আবার নুতন শ্যম্পুর বোতল নেয় সে। শ্যাম্পুর ফেনা গুলো নিয়ে খেলতে থাকে সে। ডালের বড়ি দিতে দেখেছিল সে দিদা কে। ফেনাগুলোকে তেমনি হাতের মধ্যে মুঠি করে বড়ি দেবার মত করে গোসলখানার মেঝেতে ফেলতে থাকে। একটু পর সেগুলো চুপসে যায়। ঠান্ডায় কাঁপতে থাকে সে। ঝটপট মাথায় পানি ঢেলে গোসল শেষ করে। মা মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। খাওয়া শেষ করে শুয়ে পরে লীনা। রাজ্যের ভাবনা এসে ভর করে আবার! "আচ্ছা আমি কি তৌফিকের ক্ষতি করছি কোন? ওর ও তো জীবনে অনেক কষ্ট। নিঃস্বঙ্গ একটা মানুষ। কিন্তুতাকে আমি পশ্রয় তো দেইনি, স্রেফ আশ্রয় দিয়েছি" ভাবে লীনা।

বিরক্তিকর একটা আওয়াজ হচ্ছে কোথায় যেন।খেয়াল করে শোনে সে। পানি পড়ার টপ টপ আওয়াজ। গোসলের পর পানির ট্যাপ টা ভাল করে লাগানো হয়নি। লীনা ওঠে ওটা লাগানোর জন্য। বাথরুমে ঢুকে মনে হয় " আচ্ছা যদি এটা ডান দিকে ঘুরাই পানির বেগ বাড়বে, যদি বাঁ দিকে ঘুরাই তবে পানি পড়া বন্ধ হয়ে যাবে একবারে! হৃদয়ে ক্রমাগত যে রক্তক্ষরণ চলছে তারও ডান বামে ঘোরবার কোন ব্যবস্থা আছে? সেটা কি বাঁ দিকে ঘুরিয়ে দেয়া যায়না?!" পানির ট্যাপ টা বন্ধ করে আবার শুয়ে পরে লীনা। জানলা দিয়ে দেখে দেখে একটা আধ ফালি চাঁদ আর অপেক্ষায় থাকে কেউ একজন কোন একদিন এসে বলবে "একটা গান শোনাও তো!"

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৪১
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×