আমি জানতাম ভালবাসবেই, বাসতেই হবে। তুমি যেদিন ক্ষুধার্ত ভিখেরীর মত আমার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলে নীরবে আমি সেদিন তোমার চোখ এড়িয়ে কুচক্রী হাসি হেসেছিলাম। তুমি কি দেখেছিলে? দেখনি। আমি কবিতা লিখতাম। প্রত্যেকটি কবিতায় সৃষ্টি করতাম তোমারই মত এক একজন 'মহানায়ক"! কয়েকঘন্টার ব্যবধানেই প্রত্যেকটি মহানায়ক আমার দরজায় দাঁড়িয়ে আমারই প্রজা হবার করুণ মিনতি জানাত। আমি তাদের কাউকে কাউকে আমার "সেবাদাসে" নিয়োগ দিতাম আবার কাউকে "দুর,দুর" করে তাড়িয়ে দিতাম। অষ্টপ্রহর আমার সকল কবিতার চরণ জুড়ে আমি তোমায় সৃষ্টি করলাম, খুঁদে খুঁদে! তারপর এক সন্ধ্যায় তুমি এলে। আমি জানতাম তুমি আসবে, কোন একদিন অবশ্যই আসবে।
বিষাক্ত সব অনুভুতিরা খেলা করে আমার মধ্যে। শুনবে সে গল্প? তবে শোন।
""জননীর জরায়ুর মসৃন পথে পা রেখেছি সেদিন। গন্তব্য জানিনা। জরায়ুর কোঠরে ন'মাসের ভাড়ায় উঠেছিলাম একদিন। আজ ন'মাসের চূক্তি শেষ। উল্টোপথে এগোচ্ছি.....অন্তঃত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যেন আমার "প্রথম" ঘরটি দেখতে পাই! মাথায় আলতো কোন কিছুর স্পর্শ পেলাম। অনেক গুলো চিকন দন্ডের আলতো ছোঁয়া, সেগুলো ছিল কারও হাতের আঙ্গুল! বেরিয়ে এলাম, ভীষণ আলোর ঝলক, আমি চোখ বুঁজে ছিলাম তবুও টের পেলাম সে আলোর প্রখরতা। নাহ, ন'মাস না, আমি মাত্র ৭ মাসেই আমার পুরোনো ঘর ছেড়ে চলে এসেছি এই দূর্গন্ধময় কোন এক আস্তাকুড়ে। আমার মা পাশেই নিশ্চল দেহ নিয়ে শুয়ে আছে। আমি বলতে পারিনা, বুঝতে পারি। কে যেন বললো "মরে গেছে" বাকিরা কেঁদে উঠলো। আমিও নিশ্চল। অনেকপরে কেঁদে উঠলাম। কেঁদে কেঁদে কি বলেছিলাম সেদিন। বলেছিলাম "ন'মাসের যোগান নিয়ে আমায় সাত মাসে উচ্ছেদ করলে বিধাতা। দু'মাসের হিসেব আমি মাফ করে দেব, মা কে ফিরিয়ে দাও,!!" মা সে যাত্রায় বেঁচেই গেল। বিনিময়ে আবার প্রতিদিন মরে যাওয়া, একবার করে বার বার! সে আমারই নিশ্বাসের বিষে আমি জানি। সেদিন থেকেই শুরু হল আমার সর্বনাশী কৃতকর্মের রথযাত্রা!
আমাদের বাড়িতে একটা কুকুর ছিল, নাম লালু। ভীষণ ভক্ত আর বিশ্বস্ত। ওর আদূরেপনায় আমি অবাক হত সবাই। কিন্তু কেমন করে কেন জানি প্রায়ই মনে হত "লালু বাঁচবে না, কেউ একজন খুব নীষ্ঠুরভাবেই মারবে ওকে"। সত্যি মরে গেল। বিষের জ্বালায় নীল হয়ে গিয়েছিল ওর সমস্ত শরীর। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম "আমি জানতাম"। চিরদিনই অন্ধকার বড্ড প্রিয় আমার! অন্ধকারে স্বপ্ন বুণতে ভালো লাগে ভীষণ। প্রায় রাতে ঘুমের ঘোরে দেখতাম অবাঞ্চিত অথচ ভীষণ স্পষ্ট কিছু দৃশ্য। একজন মানুষ দৌড়ে আসছে, হাতে একটা ছুঁরি। ছোপ ছোপ রক্ত জমা তাতে। আমি পালাচ্ছি........পালাচ্ছি........................পড়ে যাই একসময়। বুকের উপর উঠে বসা সেই হন্তারকের চোখে সে কি মায়া! আমার ঘুম ভেঙ্গে যেত। ঘেমে নেয়ে একাকার আমি। ভাবতে পার, কোন খুনীর চোখে মায়া থাকতে পারে? আমি জানতাম এমন কোন খুনী আসবে, আসবেই! একদিন আসলো সে। আমারই বুকের উপর উঠে ছুরি বসালো। তোমরা সবাই যে দগদগে ক্ষতটি দেখে "ইস্" করে উঠ সে ঐ মায়াচোখের খুনি করে গেছে। আমি আবারও বলি "আমি জানতাম"।
ও বাড়ির ঐ যে নিরুপমা, ওর মন্দ চাইনি আমি। বিয়ের দিন ওর বরকে দেখে আমি বলেছিলাম "এই নচ্ছার টাকে কোথায় পেয়েছে তোর বাবা নিরু?" নিরু রাগ করেছিল। আমি না খেয়ে চলে এসেছিলাম বিয়েবাড়ি থেকে। আসার পথে সারা রাস্তা ওর বরের জ্বলজ্বলে বিষাক্ত চোখ দুটো আমায় স্বস্তি পেতে দেয়নি একদন্ড!! নিরু গলায় দঁড়ি দিয়েছে জানো? লোকটা ছিল পাড় মাতাল, মদ আর মেয়েমানুষ ছাড়া তার রাত কাটত না। নিরু মরে গেল। আমি বললাম "আমি জানতাম"।
তুমি যেদিন আসলে আমার ঘরে, আমি জানতাম তুমি আসবে। আমি দরজা খোলা রেখেছিলাম। তুমি আসলে। তোমার প্রতিটি "না" এর মাঝে কি প্রচন্ড "হ্যা" লুকিয়ে ছিল আমি তা দিব্যি দেখতে পেয়েছিলাম। তুমি নরম কাঁশে ঠোঁট বুলালে। বললে "থাক! আর নয়!" আমি তোমায় পাহাড় চূড়ায় বাদামী রঙের উঁই ঢিবি দেখালাম, তুমি আপনমনে তাকে ভাঙলে, গড়লে। আবার বললে "আর যাব না"। আমি জোর করে টেনে নিলাম তোমায়! পাহাড়তলীর ঠিক একটু দূরেই মিঠাকূপে রসনা ডোবালে তুমি। আমার ভেতরে লুকানো থক থকে বিষ তখন উপচে পড়ছে! তোমায় আর চেনাতে হয়নি কিছুই। তুমি তেপান্তরের মাঠে নামলে নিজ থেকেই। সেখানে গোলাপী রঙের এক ছোট্ট টিলা দেখে তোমার সে কি আহ্লাদ! দূর্বাঘাসে হাত বুলিয়ে তুমি সাত জনমের শান্তি কুড়ালে। তার ঠিক নিচে গহীন গুহায় হারিয়ে গেলে তুমি। আমি জানতাম হারাবে। যখন ফিরে এলে তখন তোমায় স্বর্গের অমৃতসূধায় স্নান করা এক নাবালকের মত স্নীগ্ধ অথচ ক্লান্ত লাগছিল! তুমি যখন ডুব সাঁতার খেলছিলে আমি তখন টের পেয়েছিলাম আঁধার ঘনিয়ে আসছে। আমার নিশ্বাসের বিষে তুমি অবশেষে ধ্বংসই হবে। প্রতিটি মুহূর্তে তোমার টুকরো টুকরো অলুক্ষুনে বিপদগুলো আমায় মনে করিয়ে দেয় "আমার নিঃশ্বাসে বিষ আছে!!" রাস্তায় হোঁচট খেয়ে যখন পড়ে যাও আমি জানি, সে আমারই বিষের ফল!
অবুঝ তুমি বোঝনা। তুমি বোঝ তাও ঠিক আমি চাইনা! তোমার একটু একটু করে ডুবে যাওয়া দেখে আমি ভাবি "আমি জানতাম তুমি ডুবে যাবে, আমি জানতাম"!!
(অসমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


